সুকুমার রায়ের লেখা ‘একুশে আইন’ এর কথা কে না জানে ! উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়ক, বিধান সভার স্বাস্থ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান, আমতা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান, পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের সম্মানীয় সদস্য, কুকুরের ডায়ালিসিস-খ্যাত তৃণমূলী চিকিৎসকনেতা নির্মল মাজিও জানতেন। তাই আমতার ব্লক মেডিক্যাল অফিসার এবং আমতা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপারের দায়িত্বরত তরুণী চিকিৎসককে ফোন করে অশালীন প্রস্তাব দেওয়া, প্রকাশ্য সভায় অশোভন আচরণ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডেকে এনে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা, কুপ্রস্তাবে সাড়া না দিলে ‘আর জি কর করে দেব’ এহেন হুমকি দিতে স্বাভাবিক কারণেই নির্মল মাঝি কোন সঙ্কোচবোধ করেন নি।
নিগৃহীতা চিকিৎসক CMOH (জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক), হাওড়ার জেলাশাসক, Director of Health Service (রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান)-কে জানিয়েও কোন সুরাহা পাননি।
এর আগে উলুবেড়িয়া মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসক নিগ্রহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন এই স্বনামধন্য বিধায়ক। সিসিটিভি ফুটেজ সমেত সমস্ত তথ্য প্রমাণ লোপাটের ক্ষেত্রে আর জি কর কাণ্ড বা তার অনেক আগে থেকেই দক্ষতা অর্জন করেছেন এই কৃতবিদ্য মহাপুরুষরা। অভিযুক্তদের চার্জশিট না দিয়ে জামিনা পাওয়ানোয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন মাননীয় তৃণমূল বিধায়ক।
গত ২৩ শে নভেম্বর অভয়া মঞ্চ, জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস, মুক্তকন্ঠে আমতা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অধিকার মঞ্চের যৌথ উদ্যোগে আমতায় একটি প্রতিবাদী জমায়েত ও মিছিল হয়। কলাতলা মোড় থেকে থানা পর্যন্ত মিছিল হয়। কয়েকশো স্থানীয় মানুষ যোগ দেন এই মিছিলে এবং থানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ২৫শে নভেম্বর পশ আইন না মানার অভিযোগে স্বাস্থ্য ভবনে নির্মল মাজির শাস্তির দাবিতে ডেপুটেশন দেয় জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস।সচিব মৌখিক আশ্বাস দিলেও জানা যায় বিধানসভার স্পিকারের অনুমতি ছাড়া বিধানসভার বিধায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়না!
এই পরিস্থিতিতে অভয়া মঞ্চ, জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস আর মুক্তকন্ঠে আমতা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অধিকার মঞ্চের আহবানে ১৪ ই ডিসেম্বর আর একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়। কলকাতা এবং হাওড়া থেকে অভয়া মঞ্চ এবং জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস এর বহু প্রতিবাদী মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দেন। অগণিত স্থানীয় মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে প্রতিবাদ সভা এবং মিছিলে যোগ দেন, এঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিলেন নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ। এলাকায় সন্ত্রাস জারি রাখতে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করতে নানা ভাবে চেষ্টা চালায় শাসক দল। স্থানীয় সংগঠক এবং অভয়া মঞ্চের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে যাবার অভিজ্ঞতা কর্মসূচিকে রূপায়িত করতে সাহায্য করে।
সভার সূচনায় সভানেত্রী হিসাবে বক্তব্য রাখেন এলাকার শিক্ষিকা বৈশাখী মাঝি । প্রতিবাদী গান পরিবেশন করেন স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী স্বপন মাখাল। সভায় বক্তব্য রাখেন জয়েন্ট প্ল্যাটফর্মের যুগ্ম আহ্বায়ক ডক্টর হীরালাল কোনার, অভয়া মঞ্চের আহবায়ক ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ এবং মণীষা আদক, পঞ্চায়েত যৌথ কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ রায়, ডক্টর অর্পিতা রায়চৌধুরী, ডক্টর উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়, ডক্টর সরস্বতী দত্ত, ডক্টর পবিত্র গোস্বামী এবং মুক্ত কন্ঠে আমতার নেত্রী মধুমিতা চ্যাটার্জী। সভা সঞ্চালনা করেন মুক্ত কণ্ঠে আমতা এবং স্টুডেন্টস হেলথ হোমের সংগঠক অভয় ঘোষাল। এই সভায় সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ রায়ের অনুরোধে পঞ্চায়েত যৌথ কর্মচারী সমিতির ২০২৬ এর ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেন ডক্টর হীরালাল কোনার এবং ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ। এই ক্যালেন্ডারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনের উল্লেখের সঙ্গে ৯ অগাস্ট দিনটিকে অভয়া দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সভার শেষে সভাস্থল থেকে সিনেমা তলা পর্যন্ত পথ মিছিলের জনজোয়ারে ভেসে যায়। এই সভায় এবং মিছিলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী ভারতী মুৎসুদ্দী। মিছিলের পর সবশেষে আমতা সিনেমা তলায় ডক্টর তমোনাশ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন প্রতিবাদী মানুষ জানেন কী ভাবে দুর্বৃত্তের দমনে বিধানসভার অনুমোদন আদায় করে নিতে হয়। গণ আন্দোলনই বিচার ছিনিয়ে আনার একমাত্র পথ।
এলাকার বিধায়ক ভক্ষকের ভূমিকায়, বিধানসভা দুর্বৃত্তের রক্ষাকবচ। আর জি কর, পাশকুঁড়া, উলুবেড়িয়া এবং রাজ্যের সর্বত্র শাসকদল নারী নিগ্রহ, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসে অভিযুক্ত, পরিত্রাতা প্রশাসন- “চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়/ এদিক ওদিক ডাইনে বাঁয়/রাজার কাছে খবর ছোটে/পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে”। আনুগত্যের নিরাপদ সম্মোহনকে ছুঁড়ে ফেলে বিরুদ্ধতার চাবুক হাতে নেয়াই এখন একমাত্র শপথ। এই ব্যবস্থার বদল ছাড়া বিচার মেলার কোন উপায় নেই।










