ডিসেম্বরের (২০২৫) প্রথম সপ্তাহে ভারত এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী থাকল। ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা ইন্ডিগোর সৌজন্যে প্রতিদিন গড়ে ৬০০-৭০০ ফ্লাইট বাতিল, হাজার হাজার মানুষ লটবহর নিয়ে বিমানবন্দরের মাটিতে শুয়ে, জরুরি কাজকর্ম শিকেয়, যে সমস্ত বিমান চলছে তার টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া। সংবাদে প্রকাশ দিল্লি- মুম্বাই বা দিল্লি-কলকাতা ফ্লাইটের টিকিট এর দাম লাখ টাকার কাছাকাছি। এই কালোবাজারি প্রকাশ্য ও আইনসংগত। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিমানের যাত্রী যেহেতু সমাজের উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়, সোসাল মিডিয়ায় ও ক্ষমতার প্রতিটি কেন্দ্রে যেহেতু এই শ্রেণির একাধিপত্য তাই দেশ ব্যাপী হাহাকার ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। তাই সংকটের বাহাত্তর ঘন্টা পরে সরকার বাহাদুর টিকিটের দাম বেঁধে দিলেন। অতিমারী সময় কোন যানবাহন না পেয়ে পথে ঘাটে অসহায় ভাবে মানুষের মৃত্যুতে যাদের টনক নড়েনি, সেই ভারতীয় রেল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন থেকে রাতারাতি পাঁচ শতাধিক ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু কেন এই সংকট, খোলা আকাশ নীতির তিন দশক পরে কেন একটি বেসরকারি বিমান কোম্পানির সংকটে সারা দেশের বিমান পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়ল, বিমান নিরাপত্তা নীতিকে কারণ দেখিয়ে কেন সংকটের মূল চরিত্রকে ঘোরাবার চেষ্টা চলছে– ইন্ডিগোর সংকট এই সমস্ত প্রশ্নগুলোকে আজ সামনে নিয়ে এসেছে।
৩ ডিসেম্বর থেকে এত প্লেনের একসাথে উড়ান বাতিলের কারণ হিসাবে যে নতুন নির্দেশিকার কথা বলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রথমে আলোচনা জরুরি।যাত্রী নিরাপত্তার জন্য গৃহীত এই নীতির নাম ‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশনস’ (এফডিটিএল)। এই নীতির মোদ্দা কথা হল পাইলটরা বিমানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বিমান চালাবার সময় ক্লান্তি তাদের গ্রাস না করে সেজন্য পাইলটরা কতক্ষণ বিমান চালাবে সেই নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া। এই নিয়মে যেমন বলা হয়েছে একজন পাইলট বছরে সর্বোচ্চ ৯০০ ঘন্টা বিমান চালাবেন কিন্তু প্রতি ২৮ দিনে তারা কখনোই একশ ঘন্টার বেশি বিমান চালাবেন না। ফ্লাইটে দুজন পাইলট থাকলে একনাগাড়ে ৮ ঘন্টা এবং ৩ থেকে ৪ জন পাইলট থাকলে একনাগাড়ে ১৩-১৬ ঘন্টার বেশি বিমান চালানো যাবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য একজন পাইলটের কাজের সময় শুরু হয় বিমান ছাড়ার এক ঘন্টা আগে থেকে এবং শেষ হয় বিমান তার গন্তব্যে পৌঁছানোর পর। ইন্টারন্যাশানাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও) এই নীতি সারা পৃথিবী জন্য এই মাপকাঠি তৈরি করেছে আগেই এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বিমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনেশট্রেশন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অ্যাভিয়েশন সেফটি এজেন্সি দীর্ঘদিন এই মাপকাঠি মেনেই বিমান চালায়।
ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই বিমান পরিষেবার ক্ষেত্রে বিমান পরিবহন সংস্থাগুলির গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার সময় মিডিয়ায় কোন সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই পাইলটদের দোষী করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই অবস্থায় ইন্ডিয়ান পাইলট অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে এফডিটিএল লাগু করার দাবি তুলছিল। এই দাবি একশ শতাংশ সঙ্গত কারণ এর সঙ্গে সরাসরি যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। ইন্ডিগো বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে বলা যায় যে কর্মী সংখ্যা কম, গ্রাউন্ডসম্যানদের সামান্য মজুরি, অত্যাধিক কাজের চাপে পরিষেবায় গাফিলতি থেকে যাওয়ার বিষয়টা বহুদিন ধরেই সবার জানা। মোদি সরকার অপরিকল্পিত ধ্বংসাত্মক নীতি গ্রহণ করার জন্য কুখ্যাত, নোটবন্দী, অতিমারীর সময় দীর্ঘ লকডাউন যার প্রমাণ।কিন্তু এবারে সেই অভিযোগ করা যাবে না। ২০২৪ সালের মে মাসে দীর্ঘ আলোচনার পরে ঠিক হয় দুটি পর্বে (জুলাই ১ এবং নভেম্বর ১/২০২৫) এই নতুন নিয়ম চালু হবে। সোজা হিসাবে ইন্ডিগো ২০ মাস সময় পেয়েছিল পরিকাঠামো উন্নত করে, পাইলট নিয়োগ করে তাদের সংস্থাকে নতুন নিয়মের উপযোগী করে তোলার। ইন্ডিগোর রেকর্ড দেখাচ্ছে প্রায় ৫০০ বিমানের মালিক এই সংস্থা আভ্যন্তরীন বাজার দখলের পর আন্তর্জাতিক আকাশে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ রাখতে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারস, বোয়িং ৭৭৭ এর বিলাসবহুল এয়ারক্রাফট বিদেশি কোম্পানির কাছে বরাত দিলেও এফডিটিএল লাগুর জন্য পাইলট নিয়োগের মত জরুরি কাজ তারা ফেলে রেখেছে।
এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রস্তুতি না নেওয়ার হিম্মত ইন্ডিগো দেখাতে পারছে একটাই কারণে। ভারতের আভ্যন্তরীণ বিমানপরিষেবায় একচেটিয়া দখলদারি, সংখ্যার বিচারে ৬৫ শতাংশ। পৃথিবীর কোথাও বিমান পরিষেবায় এই ধরণের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের দখলে আছে ২১%, চিনে চায়না সার্দান এয়ারলাইনসের ১৬%, গ্রেট ব্রিটেনে ইজি জেটের ৪৭%, সংযুক্ত আরব আমিরশাহূতে এমিরেটসের ৫০% ইত্যাদি। ভারতে ইন্ডিগোর দূরবর্তী প্রতিযুগে নবরূপে পুনর্গঠিত এয়ার ইন্ডিয়া যাদের হাতে আছে মোট আভ্যন্তরীণ বাজারের ২৭.৩%। শুধু গত একবছরের হিসাব যদি দেখা যায় তাহলে ইন্ডিগোতে সফর করেছেন ১০ কোটি যাত্রী, যেখানে এয়ার ইন্ডিয়াতে সফর করেছেন ১.৫ কোটি যাত্রী। বিমান পরিষেবা গবেষণা সংস্থা সিরিয়ামের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ইন্ডিগো দেশের মধ্যে যে ১৫২৬ টি সেক্টরে বিমান চালায় তারমধ্য ৫৯৫ টিতে তারা একচেটিয়া (monopoly) এবং ২০০ টি ইন্ডিগো ছাড়া আর একটি কোম্পানি রয়েছে (duopoly)। এই একচেটিয়া দখলদারির কারণে তারা ভেবেছে সরকারকে বাধ্য করা সম্ভব নতুন নিয়ম লাগু করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আসতে, এই একচেটিয়াকরণ সম্ভব করেছে লক্ষ লক্ষ যাত্রীর পণবন্দী হওয়াকে। মুনাফার লোভে ইন্ডিগোতে কর্মচারী স্বার্থ পেছনের দিকে চলে গেছে। অতিমারী পূর্ব সময়ে ইন্ডিগোর মোট খরচের ১১% কর্মচারীদের পেছনে খরচ হত, অতিমারী পরবর্তী পর্বে সেই খরচ কমে হয়েছে ৮%। পরিষেবাতে তার স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম লোকাল সার্কেলের সমীক্ষা অনুযায়ী এ বছর অক্টোবর মাসে ইন্ডিগোর যথাসময়ে সার্ভিস দেওয়ার হার ছিল ৮৪% যা নভেম্বরে হয় ৬৮%।
ইন্ডিগোর এই একাধিপত্য একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯২ সালে উদারীকরণ – বেসরকারিকরণ – ভুবনায়নের নীতি মেনে ভারতে ‘মুক্ত আকাশ’ নীতি চালু হয়। বাজার অর্থনীতির সেই সোনাঝরা দিনে বলা হয়েছিল যা কিছু ব্যক্তিগত তাই পবিত্র। সে সময় প্রথমে কার্গো পরিষেবা শুরু হয়, তারপর আসে উন্নত পরিষেবার গ্যারান্টি দিয়ে একের পর এক বেসরকারি বিমান পরিষেবা দেওয়ার কোম্পানি। কিন্তু মাত্র দু দশকের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যে মজা বোঝা যায় ভারতের আকাশে।অস্বচ্ছ বানিজ্য নীতি, অদক্ষ পরিচালন ব্যবস্থা, তেলের খরচ বৃদ্ধি, দুর্নীতির কারণে ঝাঁপ ফেলে দেয় জেট এয়ারওয়েজ, কিং ফিশার, গো এয়ারের মত সংস্থা। নাম সাক্ষী হয়ে থেকে যায় স্পাইস জেট। সরকারি নীতির কারণে এয়ার ইন্ডিয়া (ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস সহ) তখন রূগ্ন। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ইন্ডিগো তাদের বানিজ্য বাড়ায়। বিশেষ করে ছোট শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও কম ভাড়া হয়ে ওঠে তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি। আমরা যদি ২০১৪ সালের ছবিটা দেখি তবে বুঝতে পারব একদশক আগেও কিছু প্রতিযোগিতা ছিল। তখন আভ্যন্তরীন বিমান পরিষেবায় প্রতি তিনজনের একজন ইন্ডিগোতে চাপত, এয়ার ইন্ডিয়াতে প্রতি পাঁচ জনে একজন এবং জেট এয়ারওয়েজ ও স্পাইস জেটে প্রতি ছ জনে একজন। কিন্তু গত একদশকে ছবিটার আরো দ্রুত বদল ঘটল। ইন্ডিগোর সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার ঐক্য গড়ে উঠল। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী বিগত লোকসভা নির্বাচনের আগে ইন্ডিগোর মালিক ইন্টারগ্লোব ৩৬ কোটি টাকার ইলেকটোরাল বন্ড কেনে। এছাড়া ইন্টারগ্লোবের প্রোমোটার রাহুল ভাটিয়া ব্যক্তিগত ভাবে কেনেন ২০ কোটি টাকার বন্ড। পরিবহন ক্ষেত্রে সেসময় এটাই ছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাঁদা। এছাড়া স্পাইস জেট বন্ড কিনেছিল মাত্র ৬৫ লাখ টাকার। আজ প্রকৃত অর্থে ইন্ডিগো অভ্যন্তরীণ বিমান পরিষেবার বেতাজ বাদশা যারা মনে করে আইন সবার জন্য নয়।
বাজার অর্থনীতির সমর্থকরা বলেন প্রতিযোগিতা থাকার কারণে গ্রাহকরা উপকৃত হন। পণ্য ও পরিষেবা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছে অনেক অপশন থাকে। কিন্তু নব্বই দশকে চালু হওয়া এই নীতির ফলিত প্রয়োগে দেখালাম অধিগ্রহণ ও সংযুক্তির মাধ্যমে বাজারের একচেটিয়াকরণ হচ্ছে ফলে মার খাচ্ছে গ্রাহক। মোদি জমানার অমৃতকাল এর সবচেয়ে সফল উদাহরন। ভারতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক বা দুটো কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় টেলিকমুনিকেশন (রিলায়েন্স জিও ৪০%, দ্বিতীয় স্থানে এয়ারটেল), জল বন্দর (সরকারের পরই আদানি গ্রুপ ২০%), বিমানবন্দর (আদানি গ্রুপ ২৩%), সিমেন্ট (আদানি ৩৫%)। ২০২৩ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন ডেপুটি গভর্নর ভিরাল আচার্য তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ৫ টি কর্পোরেট গ্রুপ — রিলায়েন্স, আদানি, টাটা গ্রুপ, আদিত্য বিড়লা ও ভারতী টেলিকম নন-ফিনানসিয়াল সেক্টরে ১৮% সম্পদের মালিক। এই একচেটিয়া বানিজ্য প্রতিযোগিতা শেষ করে দেয়। বিমানবন্দরে অসহায় ভাবে অপেক্ষারত ইন্ডিগোর যাত্রীরা নতুন ভারতে সেই বঞ্চনারই প্রতীক।
১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ এই সময় পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় রূপে প্রকাশিত।











তথ্য এবং বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা।