
আমরা সবাই জানি যে কোনো নদী তার প্রবাহ পথের অন্তিম পর্বে এসে তার সঙ্গে বয়ে আনা পলি জমা করে সাধারণত গ্রীক অক্ষর ডেল্টা বা বাংলা বর্ণমালার মাত্রাহীন ‘ব’এর মতো এক ভূমিরূপ গঠন করে। নদী বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই বিশেষ ভূমিরূপের পরিচয় ব- দ্বীপ। সমুদ্র উপকূলবর্তী এই বিশেষ ভূমিরূপটি সাধারণভাবে পৃথিবীর অত্যন্ত জনবহুল এলাকা হিসেবেই পরিচিত। সুতরাং সমুদ্রের বেড়ে ওঠা জলতল এই মুহূর্তে বদ্বীপগুলোর অস্তিত্বের বিষয়টিকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। Nature পত্রিকার গবেষণামূলক নিবন্ধেও এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে বদ্বীপ বাসীদের জন্য।
ব-দ্বীপের নিমজ্জন – এক বৈশ্বিক সমস্যা
এই গবেষণার প্রেক্ষাপটটি সুবিস্তৃত । পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশের ২৯ টি দেশের ৪০ টি নদনদীর ওপর এই গবেষণার কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এমন সমীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম কেননা এই বদ্বীপীয় সমভূমিগুলোতেই পৃথিবীর ২৩৬ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে। ফলে এই সমস্ত অঞ্চল সমুদ্রের জলের তলায় তলিয়ে গেলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
পরিসংখ্যান বলছে যে বদ্বীপের এলাকাগুলো পৃথিবীর মোট স্থলভাগের মাত্র ১% পরিমিত স্থান দখল করে থাকলেও, এখানে কমবেশি ৩৫০- ৫০০ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬%। পাশাপাশি পৃথিবীর ৩৪টি মেগাসিটির মধ্যে অন্যূন ১০ টি বদ্বীপগুলোতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
বিজ্ঞানীদের মতে বদ্বীপের প্রচলিত ইকো সিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র
মানুষের আর্থসামাজিক, বাস্তু তান্ত্রিক এবং শক্তির উৎপাদন সংক্রান্ত ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। উর্বর মৃত্তিকার কারণে এই সমভূমিতে কৃষি সবথেকে বেশি গুরুত্ব পায়। সাথে সাথে সমুদ্রের নৈকট্য মৎস্য আহরণ, বন্দর স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রসার ইত্যাদি বিষয়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু এতো গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বদ্বীপীয় বাস্তুতন্ত্র আজকের দুনিয়ায় সবথেকে ভঙ্গুর বাস্ত ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের জলতলের সমতলে অবস্থানের কারণেই যে এই আশঙ্কার সৃষ্টি তা সহজেই অনুমেয়।
গাঙ্গেয় বদ্বীপের একেবারে প্রান্ত সীমায় অবস্থিত সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষেরা এই মুহূর্তে সবথেকে আশঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন। বদ্বীপীয় সমভূমির গড় উচ্চতা ১- ২ মিটার। এই স্বল্প উচ্চতার ফলে এই অঞ্চলগুলোতে সমুদ্র জলের উচ্চতা বেড়ে যাবার কারণে বানভাসি হবার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। এর সঙ্গে দোসর হিসেবে রয়েছে প্রবল সামুদ্রিক তুফান, ঘূর্ণিঝড়, ভূমির দ্রুতহারে বসে যাওয়া, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার খামখেয়ালিপনা এবং অন্যান্য জলবায়ু পরিবর্তনের সহযোগী সমস্যা সমূহ। এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতে বাড়তে থাকে কৃষিজমির সংকোচন, সমুদ্রের লবণাক্ত জলের আগ্রাসন, মিঠাজলের উৎসগুলোর বিনাশ, আভ্যন্তরীণ মিঠা জলের জলাভূমির লোপাট হয়ে যাওয়া, নদীতে বন্যার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। সামগ্রিক পরিস্থিতি যে ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠতে পারে তা সহজেই বুঝতে পারি সবাই।
গবেষকদের মতে এই বিপর্যয়ের ঘটনায় বদ্বীপের সামগ্রিক পরিস্থিতি ক্রমেই বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। জমি হারিয়ে,পেয় জলের জোগানে টান পড়ায় অনন্যোপায় হয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষজন বাধ্য হয় দেশান্তরে গমনে। ক্ষীয়মান সম্পদ মানুষের জীবনকে আরও গভীর উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। বাড়তে থাকে মানসিক ও সামাজিক টানাপোড়েন। গবেষকদের মতে মতে এইসব কারণেই বদ্বীপের বাস্তুতন্ত্র ইদানিং কালে অত্যন্ত ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সমুদ্র জলতলের উত্থান হারের তুলনায় অনেক দ্রুত নিমজ্জন হার।
ছোটবেলায় করা পাটিগণিতের সেই তেল মাখানো বাঁশে বানরের ওপরে ওঠার গাণিতিক সমস্যার কথা মাথায় এলো – বানর একবারে দুই ফিট করে ওঠে আর তিন ফিট করে নীচে নামে। দেখা গেছে,বদ্বীপের নিমজ্জন হার সমুদ্র জলতলের উত্থান হারের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিপদের আশঙ্কা আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে। গবেষকরা এই কারণে বদ্বীপগুলোর নিমজ্জন হার ও অনুভূমিক বিচ্যুতির মাত্রাকে মাথায় রেখে তাদের প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন –
- যে সব বদ্বীপের জনসংখ্যা ৩০ লক্ষ বা তার চেয়ে বেশি।
- ঐতিহাসিক ভাবে চিহ্নিত নিমজ্জমান বদ্বীপ সমূহ।
- অপেক্ষাকৃত কম জনবসতিপূর্ণ অথচ বাস্তু তান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বদ্বীপ সমূহ।
বিশেষজ্ঞরা ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ের তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত বদ্বীপের অর্ধেক সংখ্যক বদ্বীপই বছর পিছু ৩ মিলিমিটার হারে বসে যাচ্ছে। সমীক্ষিত ৪০ টি বদ্বীপের মধ্যে ১৩ টির ক্ষেত্রে সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের তুলনায় ( ৪ মিলিমিটার প্রতি বছর ) নিমজ্জন হার বেশি। এই বদ্বীপের মধ্যে রয়েছে নীল নদ , পো, ভিশ্চুলা,সেহান, ভারতের ব্রাহ্মণী,মহানদী, গোদাবরীর বদ্বীপ সহ আরও ছয় ছয়টি বদ্বীপ যেগুলো আন্তর্জাতিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছে যে, বদ্বীপগুলোর গড়পড়তা ৩৫% এলাকাই ডুবে যাচ্ছে এবং ৪০ টির মধ্যে ৩৮ টি বদ্বীপেই এই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ভারতের ব্রাহ্মণী, মহানদী ও গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের ৯০% এলাকাই এই বিপর্যয়ের শিকার হতে চলেছে। আমাদের কাছে এ এক বড়ো আশঙ্কার সংবাদ।
ওড়িশার মানুষজনের কাছে খুব বড়ো চিন্তার বিষয় হলো এই যে, মহানদী ও ব্রাহ্মণী নদীর বদ্বীপ দুটি সবথেকে দ্রুত গতিতে বসে যাচ্ছে। বছরে ৫ মিলিমিটার হারে ব্রাহ্মণী বদ্বীপের ৭৭% এলাকা এবং মহানদী বদ্বীপের ৬৯% এলাকা ডুবে যাচ্ছে নোনা জলের তলায়। নিবিড় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে আরও কিছু উদ্বেগের তথ্য। গবেষকরা হিসেব করে জানিয়েছেন যে, সমস্ত বদ্বীপ এলাকার ৪৬০,৩৭০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা এই মুহূর্তে অবনমনের আওতায়। হিসেব অনুযায়ী পৃথিবীর সমস্ত বদ্বীপ এলাকার বাসযোগ্য ভূমির ৬৫% এবং সমীক্ষিত ৪০ টি বদ্বীপ এলাকার ৫৪% ভূমিই ডুবে যাচ্ছে একটু একটু করে।
বড়ো বদ্বীপেরা ডুবছে তাড়াতাড়ি!
পৃথিবীর বড়ো বদ্বীপেরা ডুবছে অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে। উঠে আসা তথ্য থেকে জানা গেছে এমনই পিলে চমকানো খবর। হিসেব মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ আকারের বদ্বীপ – গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্র নদের বদ্বীপ, নীল নদের বদ্বীপ, মেকং, ইয়াংসি, আমাজন, ইরাবতী ও মিসিসিপির বদ্বীপেরা সম্মিলিতভাবে নিমজ্জমান বদ্বীপের ৫৭% এলাকা দখল করে আছে যার ক্ষেত্রীয় পরিসর ২৬৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার। সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত চারটি ভারতীয় নদী বদ্বীপের এলাকা স্থানীয় সমুদ্র জলতলের উত্থান হারের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুততার সঙ্গে ডুবে যাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কলকাতার অস্তিত্বের সামনে বড়ো প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। সমস্যাটির যেহেতু বৈশ্বিক চরিত্র রয়েছে তাই বলা যায় কলকাতার সঙ্গে এক পংক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে আলেকজান্দ্রিয়া,ব্যাঙ্কক, ঢাকা এবং সাংহাই এর মতো জনবহুল জনপদগুলো। বলাবাহুল্য যে প্লাবিত হলে এইসব মহানগরীর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হবে, বাস্তহারা হতে হবে বহুসংখ্যক মানুষকে, জীবন ও জীবিকার ওপর পড়বে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া।
মাটির গভীরে থাকা জলের উত্তোলন এর জন্য দায়ী!
দুনিয়া জুড়ে এতো বড় একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে অথচ মানুষের দিকে একবারও আঙ্গুল তোলা হবে না, এমনটা হয় নাকি? দুনিয়া জুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন বৃষ্টিপাতের শৃঙ্খলায় বদল এনেছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাবার কারনে আমরা আরও বেশি করে মাটির নিচে থাকা ভৌম জলের ওপর ভরসা করতে বাধ্য হচ্ছি। অপরিমিতভাবে জল তুলে নেবার ফলে মাটির গভীরে তৈরি হয়েছে বড়ো বড়ো শূন্য পরিসর। জল ও মাটির স্থিতাবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। জল সরে যাওয়ার ফলে মাটির কণাগুলো কাছাকাছি চলে এসে মাটিকে সংবদ্ধ করে তুলেছে। কংক্রিটের মেঝের মধ্য দিয়ে বৃষ্টির জল ঢুকতে না পারার ফলে জল তুলে নেবার পর তা আর পরিপূরিত হচ্ছে না। ভূমিভাগ বাধ্য হয়ে বসে যাচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন যে মানুষের কাজকর্মের প্রয়োজনে ভৌমজলের অবাধ নিষ্কাশনের ফলেই বদ্বীপের অবনতি এক গভীর পরিবেশ সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে আসার কারণে নদীর প্রবহন মাত্রা কমে আসছে,যার ফলে বদ্বীপের গঠন তথা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া অনেকটাই শ্লথ হয়ে গেছে।মহানদী এবং কাবানি বদ্বীপের অংশে ভৌম জলের উত্তোলন এবং নদী বাঁধের কারণে পলি জমা কমেছে। এক্ষেত্রে মানুষের ক্রিয়াকলাপকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সমস্যাটি অবশ্যই বৈশ্বিক। আর ভারতবর্ষও আজ সেই সমস্যার শিকার।
শিয়রে শমন,অথচ আমাদের এখনও হুঁশ নেই। মাঝেমাঝেই মনে হয় দুনিয়ার সব বিপর্যয়ের পেছনেই কি আমরা মানুষেরা দায়ী? আসলে মানুষ হিসেবে আমদের ক্রিয়াকলাপ প্রকৃতির রাজত্বের পরিবর্তনকে তরান্বিত করছে, উস্কে দিচ্ছে প্রকৃতিকে। আর তাই নিত্যনতুন বিপর্যয়ের প্রকোপ বেড়ে চলেছে। গবেষকরা ভারতীয় বদ্বীপগুলোকে চিহ্নিত করেছেন “ Unprepared divers “ হিসেবে – বিপর্যয়ের ইঙ্গিত পেয়েও আমরা এখনও অপ্রস্তুত।এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝবার মতো প্রস্তুতি কোথায়? আমাদের সদিচ্ছা, সচেতনতা এবং সাধনের সংকট। এগুলো ছাড়া একালে লড়াই অসম্ভব।
এমন প্রত্যাসন্ন বিপর্যয়ের কারণে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সমাজের একেবারে নীচু তলায় থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণেই এইসব মানুষেরা বদ্বীপের একেবারে সমুদ্র প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হন। উথলে ওঠা সমুদ্র সবার আগে গ্রাস করবে এই মানুষগুলোকে,অথচ তারা আশু বিপদ সম্পর্কে একদমই ওয়াকিবহাল নন। আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষেরা এমনই বিপুল বিপদের শঙ্কা নিয়েই দিনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
ঘনায়মান বিপদের অন্ধকারে বাসভূমি ডুবছে, মানুষ ডুবছে। আমরা কি এখনও ঘুমিয়ে কাটাবো?
তথ্যসূত্র : Nature পত্রিকা ও Down to Earth পত্রিকা।
জানুয়ারি ২০, ২০২৬

















সত্যিই এক গভীর বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। ভৌমজল এর ব্যবহার আইন করে বন্ধ করা উচিত। বহু বহুতল, আবাসন এর জল এর যোগান এখন এভাবেই হচ্ছে, শুধুমাত্র আমাদের সুবিধার জন্যে।
আইন কানুন সব আছে,মানার মানুষ নেই।
যথার্থই ভীষণ গুরুতর পরিস্থিতি। দুঃখের বিষয় হলো আমরা আদৌ কতোটা আঁচ করতে পারছি এর দায়ভার!!
এই বিষয়ে আগেও লিখেছি তবে দুনিয়াজুড়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির বিষয়টি সত্যিই ভয়ঙ্কর চিন্তার। এইসব বিষয়কে নিয়ে আমাদের ভাবনার সময় নেই। সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষেরা এই সমস্যার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। ফলে তাঁরা কিছুটা ওয়াকিবহাল। শহুরে লোকজন এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র সচেতন নন। এসব খবরের পাঠক কই ?