“আমার যেসব বলার আছে, তা বাক্সে বন্দী
বাইরে চাপ চাপ রক্ত – মাঠের কোনে মৃত লাশ;
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলেছে মরার আগে
খুব খিদে পেয়েছিল লাশটির…”
আমরা, যারা কবিতাগুলো পড়ব বলে বইটি হাতে নিয়েছি, তাদের কেউ কেউ জানি, এ বইয়ের কবি নাদিরা মারা গিয়েছে। যেমন করে রেডিওয় মৃত্যুসংবাদ শোনানো হয় সেভাবে বলতে গেলে, গত এগারোই ডিসেম্বর দিনহাটা-নিবাসী কবি নাদিরা আজাদের জীবনাবসান ঘটে, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল বত্রিশ বছর।
এই বই নাদিরা আজাদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু কবিতার সঙ্কলন। মরণোত্তর সঙ্কলন যেহেতু, সেহেতু কবি (যিনি আবার একটি পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন) ফাইনাল প্রুফ দেখেননি, শেষ মুহূর্তের জরুরি সম্পাদনা বা সংশোধন করার সুযোগ পাননি। লেখার সময়কালও সবক্ষেত্রে স্পষ্ট নয় – যা, হয়তো, কবি বেঁচে থাকলে তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যেত, এক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। এইসব অসম্পূর্ণতা মাথায় রেখেই কবিতাগুলো পড়ুন।
“এযাবৎ কখনও হৃদয়ের আসল রঙ দেখিনি
শিশুসন্তানের চিতা দেখে আরামের ঘুম পাচ্ছিল…
একজন কুৎসিত মেয়ে দৌড়াচ্ছে – তোমরা বাঁচাওনি…”
মাত্র বত্রিশ বছরের জীবনকালের একটা বড় অংশ নাদিরা কাটিয়েছিল দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে। ব্যাধি অবশ্য কোনোভাবেই কাবু করতে পারেনি তার দুর্দম প্রাণশক্তিকে – তাই, কিছুতেই এঁটে উঠতে না পেরে, প্রাণটুকু কেড়ে নিয়ে, প্রায় চিটিং করে, ব্যাধি এ যাত্রা জিতে গেল।
“আমি আঢাকা স্তনের মেয়েদের পাড়ায় গিয়েছি
তারা সবাই বুকে চাঁদ নিয়ে খিস্তি করে
তাদের যোনিতে তোমাদের মতো মিথ্যে জন্ম নেয় না…”
নাদিরা। নাদিরা আজাদ। এমন সার্থকনামা মানুষ কমই হয়। আজাদ শব্দের অর্থ সকলেই জানেন। আর নাদিরা। আরবি নাদির শব্দের অর্থ, মোটামুটিভাবে, অনন্য বা অসাধারণ। আমাদের নাদিরা-ও ছিল ঠিক তেমনই। বিরল, ব্যতিক্রমী, অসাধারণ। কবিতা লিখত, আবৃত্তি করত, নাটকের দলের মধ্যমণি ছিল, আবার একখানা পত্রিকা সম্পাদনাও করত। প্রতিবাদে আন্দোলনে সবসময়ই সামনের সারিতে, এমনকি অশক্ত শরীর নিয়েও।
“আমি সূর্যের তীব্রতা সইতে পারিনি
তাই অন্ধকার আমায় মান্যতা দিয়েছে,
কোনও সকালে ঘাসের ফুলে প্রজাপতির শিকার পাইনি
এখনও হাতে মুঠোভরা জোনাকি রেখেছি আলো জ্বালবো।…”
এক জীবনে যতখানি বাঁচা জরুরি – একটা জীবন বাকি সবার হয়ে সবার জন্য সবার একজন হয়ে বেঁচে থেকে দৃষ্টান্ত করে তোলা সম্ভব – নাদিরা, খুব সম্ভবত, ততখানিই, ঠিক তেমন করেই, বেঁচে ছিল। অন্তত সেই আইডিয়াল জীবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিল সে।
পুরনো ডায়েরির পাতায়, দেখি, সে লিখে রেখেছে –
“যদিও আমার এখন বটবৃক্ষ হওয়া অনেক বাকি।”
ব্যাস, এটুকুই। ‘’যদিও” কেন? যদিও বলতেই আমাদের মাথায় একটা তথাপি বা তবুও জুড়ে উত্তর ঘোরে – অথবা, উত্তর না পেলে, প্রশ্ন। কিন্তু নাদিরা কথাটা শেষ করেছে পূর্ণচ্ছেদ দিয়ে – আর এখন তো সে যাবতীয় প্রশ্নের থেকে বহু দূরে। আমরা শুধু জানি, দু’হাজার চব্বিশ সালের জানুয়ারি মাসের ছয় তারিখের ডায়েরির পাতায় নাদিরা লিখে গিয়েছে এই কথাটুকু – নির্দিষ্ট ওই তারিখেই কথাটা লেখা হয়েছিল, নাকি পরে অন্য কোনও দিন, সেটা জানার কোনও উপায় আর নেই। আমরা এ-ও জানি যে ওই বছরেরই আগস্ট মাসে এই রাজ্যেই ঘটে যাবে চূড়ান্ত নারকীয় এক হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণ – যার অভিঘাত রাজ্য ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে গোটা দেশে, এমনকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও – এবং সেই নারকীয় ঘটনার বিচার চেয়ে রাজ্যজোড়া আন্দোলনের ক্ষেত্রে নাদিরা আজাদ সত্যিই বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছিল। অভয়া আন্দোলনের, বিশেষত উত্তরবঙ্গে, অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছিল সে।
উত্তরবঙ্গের দিনহাটা অঞ্চলে প্রতিবাদ আন্দোলনে নাদিরার ভূমিকা এতখানিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, রাজ্যের শাসকদলের দাপুটে নেতামন্ত্রী একেবারে নাম করেই নাদিরার উদ্দেশে কদর্য কটুকাটব্য করতেন (এ-ও কি কম বড় স্বীকৃতি?!)।
“…আমি আমার প্রথম প্রেমিককে বলতাম ভোররাতে ঘরে ফেরার কথা
আমি এখন আর সন্ধের পর বড়ো রাস্তা ধরে হাঁটি না,
মহানগরী ফুঁপিয়ে উঠে বলেছিল সবটা নারী এখনও সে হয়ে ওঠেনি ;
একরাতে মহানগরীর বুকে মেয়ে বেড়ালের ধর্ষণ হলে…
আমি প্রতি রাতে যৌনাঙ্গ ঘরে রেখে কর্মক্ষেত্রে যাই।…”
নেহাত শাসক-প্রশাসকের ধামাধরা না হলে, এই ঘটনার প্রতিবাদে, অবশ্য, পথে নেমেছিলেন রাজ্যের অধিকাংশ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মানুষই – এমনকি শাসকপক্ষের সমর্থকদের একাংশও এই ঘটনার প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। লক্ষ লক্ষ কণ্ঠ গর্জে উঠেছিল – বিচার চাই!
বিচার, অর্থাৎ অপরাধীর শাস্তি। অপরাধীর সঙ্গে প্রভাবশালী যোগ থাকলে এদেশে বিচার মেলা সহজ নয়। বরং না মেলা-ই দস্তুর। জানা সত্ত্বেও লোকজন পথে নামে – একসময় ক্লান্ত হয়ে, হতাশ হয়ে অধিকাংশই ফিরে যায় – কেউ কেউ পথ ছাড়ে না।
“…ইচ্ছে পূরণ হলে পথে পথে স্বপ্ন গুনে এনো
আমি জীবন আঁকতে গিয়ে ভুলভাল আঁকি
মৃত্যুর রঙ আর ফ্যাকাশে হবে না জেনো।”
শুরুতেই বলেছি, ২০২৫ সালের ১১-ই ডিসেম্বর নাদিরা আজাদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল, মাত্র বত্রিশ বছর। যেমন বলেছি, কৈশোর অতিক্রম করতে না করতেই তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। এবং বাম রাজনৈতিক আদর্শের মতোই, সেই ব্যাধিও ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী – দ্বিতীয়টি যদি তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়, প্রথমটি তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল – এবং আমাদের স্মৃতিতে নাদিরাকে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখবে।
“প্রতিটি ভোর মৃত্যু এগিয়ে আসার খবর জানায়
একেকটি সকাল কিছু সফল ও ব্যর্থতার বার্তা আনে
বয়স বাড়লে বুকে কাঁটা ঝোপের স্তূপ বাড়তে থাকে…”
প্রিয় পাঠিকা ও পাঠক, এই কবিতাগুলো, নিঃসন্দেহে, বাংলা ভাষায় লিখিত শ্রেষ্ঠ কবিতার তালিকায় আসার যোগ্য নয়। এই পংক্তিগুলো এক কিশোরীর লেখা – এক তরুণীর লেখা। এক ছটফটে যুবতীর লেখা। আর পাঁচটা কাজের মধ্যে, মাঠে-ময়দানে লাগাতার লড়াইয়ের মধ্যে, কৈশোরাবধি নিত্যসঙ্গী ব্যাধির চিকিৎসার মধ্যে – ভূতগ্রস্তের মতো, অজানা কোনও তাড়নায়, লিখে চলা কিছু পংক্তি। এগুলো কি কবিতা হয়ে উঠতে পেরেছে? এভাবে কি কবিতা লেখা যায়?
নাকি ঠিক এভাবেই কবিতা লেখা যায়? হয়ে ওঠার হলে, ঠিক এভাবেই, এরকম করেই, এলোমেলো লিখে রাখা পংক্তিমালা কবিতা হয়ে ওঠে? কে জানে! আমি কবিও নই, কবিতা-বিশেষজ্ঞ বা কাব্যসমালোচকও নই।
আমি কেবলই এক অক্ষম মানুষ, যে কিনা নাদিরার মতো চেটেপুটে বাঁচতে চেয়েছিল – অমন করে বাঁচাটাই যে একমাত্র বাঁচা, তা জানার পরেও কথাটা ভুলে গিয়েছিল। এই বইয়ে সংগৃহীত পংক্তিমালা আমাকে নিজের সেই ব্যর্থতার কথা মনে পড়িয়ে দিল।
এর পর, আপনিও কবিতাগুলো পড়বেন কিনা, সে আপনিই বিচার করুন।
“তুমি জানোনা – কিছুই জানোনা – শুধু স্বপ্ন ও সূর্য
চুপিসারে আসো যাও…
এখনও পশ্চিমী ঝঞ্ঝা আসতে বহুদিন বাকি…
তুমি ঝিরঝির আশার পাশেই
নদী-আকাশ-আলো হয়ে আসো।”











এই রিভিউটিও যেন একটি স্বতন্ত্র কবিতা