(স্থান, কাল,পাত্র সবই কাল্পনিক)
কাজের বাড়ি বলে কথা। মনীশবাবু সকাল থেকে চরম ব্যস্ত। নয় নয় করে তিনশ’ লোকের আপ্যায়ন, তাদের আতিথেয়তা এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। সব তাকেই তো একা হাতে করতে হবে।ছেলে বিদেশে, স্টেটসের কানেকটিকট সিটিতে , আই টি-তে বড় চাকরি করে । গত রাতে ফোন করে তার মাকে বলেছে, – খুব খারাপ লাগছে, মা।গুবলুর মুখে ভাত। আমার তো মামা হিসেবে ওকে প্রথম ভাত খাওয়ানোর কথা । তা নয় এখানে ওয়ালমার্টের ডেবিট-ক্রেডিট মেলাচ্ছি।
মনীশবাবু মনে মনে হাসলেন। তখন তো তোকে আমিই বলেছিলাম। স্টেট গভঃ-এ না পোষালে অন্ততঃ ইউ পি এস সি-র পরীক্ষাটা দিয়ে দেখ। তখন ঠোঁট উল্টে বললি, – এখানে কাজের স্কোপ নেই,পরিবেশ ও বেশ খারাপ । করাপটেট লোকজনে ভর্তি। রেড টেপ আর ধান্দাবাজ লোকে ছেয়ে গেছে।
মনীশবাবু মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে উত্তর দিয়েছিলেন। আমরা কি আর চাকরি করিনি? দিব্যি তো পয়ত্রিশ বছর আরামসে চাকরি করে সুস্থ শরীরে তিন বছর হ’ল রিটায়ার করেছি ।
ছেলে অবশ্য তার পরে গেছে ওদেশে। বড় কারিগরি কলেজ থেকে বি টেক করে বিদেশি কোম্পানির ক্যাম্পাস সিলেকশনে আই টি-র অফার পেয়ে ওদেশে গেছে। বোনের বিয়েটা দিয়েই গেছে। যদিও গুবলু নামটা তারই দেয়া তবে ভাগ্নেকে চাক্ষুষ করেনি সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মামা ।
পাঁচিল জুড়ে ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। গেটে ফুলের সজ্জা হয়েছে। নিজে হাতে তৈরি লিকার চায়ের কাপ হাতে মনীশবাবু গেটে দাঁড়াতে নজরে এল শান্তিলাল খালি ভ্যানরিকশা নিয়ে ফিরছে।
– কি রে ডেকরেটরের মাল কই ?
– ভোম্বল তোমাকে দেখা করতে বলেছে?
– কে ভোম্বল ? তুই তো অন্নপূর্ণা ডেকরেটার্সে যাবি ?
– ভোম্বল বলেছে, তার পার্মিশান ছাড়া কোন কাজের বাড়ির মাল সাপ্লাই হবে না।
– মগের মুলুক নাকি, কে ভোম্বল আগে বল ?
– তোমরা যাকে রবীন সমাদ্দার বল, আমরা ভ্যানওয়ালারা বলি ভোম্বল। ওর বাবাকে বলতাম জগন্নাথ ।
নামটা শুনে মনীশবাবুর উত্তেজনাটা কেমন যেন ঘেঁটে গেল। বাইশ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। ঠারে ঠোরে তার সুনাম দুর্নাম সবই শুনেছেন।
– কেন, আমাকে যেতে হবে কেন?
– গজ গজ করছিল ভোম্বল, হিসেব করে দেখেছে, এ পাড়াতে তিনটে পোল কম পড়েছে। সেটা এই বাড়ি থেকে।
– ঠিক আছে আমি ফোন করে দেখছি।
তিন বার রিং হতে ওপার থেকে উত্তর উত্তর এল একটা মেয়েলি গলায় , – কাকে চাইছেন ?
– রবীন আছে, মানে রবীন সমাদ্দার। আমি ওর এক কাকু বলছি। ওকে ছোটবেলায় পড়িয়েছি। তুমি কি ওর মিসেস?
– আধ ঘন্টা পরে করুন । ও এখন পুজো কচ্ছে । কট্ করে লাইন কেটে গেল। হয়তো কেটে দিল।
মনীশ সেন কিছু গন্যমান্য লোক নন। তবে একসময় সরকারি অফিসে ছোট অফিসার ছিলেন। সৎ মানুষ । সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলেন। পাড়ার লোকের দায়ে অদায়ে এগিয়ে আসেন। অফিসে এক সময় কর্মচারী সমিতির ক্যাশিয়ার ছিলেন। এখন তো সমিতি বলে কিছুই নেই। আর তিনিও এখন একজন প্রাক্তন ও-এ বা অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট।
গিন্নি ও তার মেয়ে এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। আর যার মুখে ভাত সেই গুবলু বাবু তো রাত এগারোটা অবধি তার কোলে শুয়ে শুয়ে ব ব করে আওয়াজ করে হাসতে হাসতে ঘুমোতেই ভুলে গেছিল। সে ও এখন ঘুমে কাদা। অন্ততঃ আরো ঘন্টা দুয়েক ঘুমোবে গুবলু।
কোন রকমে প্যান্ট শার্ট গলিয়ে শান্তিকে বললেন, – চল একবার ঘুরেই আসি।
বাড়ির নীচের একটা ঘর নিয়ে কাউন্সিলর সাহেবের অফিস। সাহেব বললে বেশি বলা হয়। ও আসলে তাঁর ছেলে সায়নের সাথে এক ক্লাসে পড়ত। ছোট বেলায় দু’জনের হৃদ্যতাও কিছু কম ছিল না। তিনি দু’জনকে একসাথে অনেকদিন অঙ্ক করিয়েছেন, ইংরাজি দেখিয়েছেন। রবীনের বাবাও পার্টির লোক ছিল। তবে তিনি ইহ জগৎ ত্যাগ করেছেন। আর তার পার্টি তো এখন ভেন্টিলেটরে। এপাড়া ওপাড়ার ব্যাপার। ঘরের বাইরে একটা ছেলে বসে বাংলা-জগৎ পড়ছিল। শুনেছেন এটা কোন পার্টির মুখ পত্র।
– নাম বলুন, ভেতরে লোক আছে। বাইরে অপেক্ষা করুন। ছেলেটি একটা স্লিপ দিল। তাতে লেখা টোকন- ৩। বসলেন এক কোণে। শান্তিলাল তিন চাকার ভ্যান- রিকশার ওপরে বসে বিড়ি টানতে টানতে পা দোলাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ডাক এল।
– মনীশ সেন, ভিতরে যান। সংক্ষেপে বলবেন। বেশি ভ্যাজর ভ্যাজর করবেন না। দাদার মিটিং আছে আজ। তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।
ভিতরে গিয়ে মনীশ দেখলেন একটা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে সেই রবীন সমাদ্দার বসে আছে। অনেকদিন দেখা হয়নি। ওর অবয়বটা কেমন যেন বদলে গেছে।
– কেমন আছো রবীন?
– কাজের কথা বলুন।
– মানে আমার নাতির আজ অন্নপ্রাশন। রান্না-বাড়া চলছে। কিন্তু পরিবেশনের জন্য ডেকরেটর্সের মাল আনতে গেছিল শান্তি ভ্যানওয়ালা। কিন্তু… ।
মাঝপথে কথা থামিয়ে দিয়ে রবীন বা ভোম্বল বলল, – কত লোক খাবে?
– এমন কিছু বেশি নয় বাবা, তুমি ব্যস্ত মানুষ তাই তোমাকে আর বলা হয়নি। টুকি তো বলছিল রবীনদাকে বললে না?
টুকি মনীশবাবুর মেয়ে অনীষার ডাক নাম । তার প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বলতা ছিল রবীনের। সে অবশ্য অনেক কাল আগের কথা।
– পৌরসভার পারমিশন আছে? এত লোক খাওয়াচ্ছেন?
– এর জন্যে আবার কিসের পারমিশন? কোন কালে তো দরকার হয়নি। তোমার বাবাও তো কতদিন এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিল। এত অনুষ্ঠান বিয়ে থা হল। কই দরকার তো হয় নি?
– তর্ক করছেন মনীশবাবু। যদি কোন ফুড পয়জনিং বা ডায়রিয়া এপিসোড হয় কে দায়ী থাকবে? আপনি না আমি?
আমতা আমতা করলেন মনীশবাবু এবং বুঝতে পারলেন কথাটার যুক্তি আছে। কিন্তু আজ রবিবার মিউনিসিপালিটির অফিস বন্ধ। চেষ্টা করলেও কোন কাজ হবে না। তিনি একবার যুক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেন। – তোমার বাবাও তো একটা সময়..।
– থাক থাক ওসব ঘেঁটে লাভ নেই। বাবা এবং তার পার্টি দু’টোই ক্যালেন্ডার হয়ে গেছে।
মুখের ওপরে রবীন ওরফে ভোম্বল ফস্ করে একটা লম্বা সিগারেট ধরিয়ে বলল, – যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন। আজ বিকেলে কাছারিপাড়ায় জমায়েত আছে। আমাকে তৈরি হতে হবে।
– বাবা,সব রেডি শুধু এই টুকুর জন্য বেইজ্জতি হব। আর একটু পরেই সবাই আসতে শুরু করবে।
– তাতে আমার কি যায় আসে? সাতাশ নম্বর বুথে গতবার হিসেব করে দেখেছি একজন অ্যাবসেন্ট এবং তিনটে ভোট অপোনেন্টে কাস্টিং হয়েছে। আমি সব খোঁজ নিয়েছি।
– না মানে ভোট দেয়া তো ব্যক্তিগত ব্যাপার। মানে নীতি আদর্শের প্রশ্ন। আর ওটা গোপনীয়।
– গোপনীয়? তা আমি কি করে জানলাম? আপনার কি মনে হয় রিটার্নিং অফিসাররা এমনি এমনি ওখানে আরামে বসে চাকরি করছে ? আপনার নাতির মুখে ভাত, আপনি গোপনে দিতে চান দিন আমার কোন আপত্তি নেই। তবে একটা লোকও যদি পেটের সমস্যায় ভোগে জেল খাটিয়ে ছাড়ব।
মনীশ চমকে উঠলেন।এর মধ্যে এসব কথা আসে কোত্থেকে ? তিনি ঢোক গিলে বললেন, – না, তা বলছিনা। তুমি একটা ব্যবস্থা করে দাও। রান্নিরা বসে আছে। আর দেরি হলে দুপুরে ঠিক টাইমে ব্যাচ বসাতে পারব না।
ভোম্বল টুলের থেকে পা নামিয়ে অ্যাশট্রেতে সিগারেটের বাটটা গুঁজে হাঁক দিল, – কালু, এদিকে আয়। একটা কাগজে লিখে দিতে বল কিছু হলে কাউন্সিলর দায়ী থাকবে না।
কালু ঘরে ঢুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, – যান যান বাইরে দাঁড়ান।বল্লাম সাত সকালে দাদাকে বিরক্ত করবেন না।
– আমার পারমিশান?
– আচ্ছা লোক তো! কথা বোঝেন না।ওখানে দাঁড়ান ব্যবস্থা হচ্ছে।
ব্যবস্থা অবশ্যই একটা হল। কাগজ হাতে নিয়ে পৌঢ় মনীশ বাবু মাথা নীচু করে শান্তির ভ্যানে গিয়ে উঠলেন।অপমানে গা মাথা জ্বলছে। হাঁটুর বয়েসি ছেলে সব। একটা কাগজে মুচলেকা তাঁকে দিতেই হল এই মর্মে যে, অনুষ্ঠানে খাদ্যসংক্রান্ত কোন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটলে মনীশ বাবু দায়ী থাকবেন। আর যেহেতু আগাম অনুমতিপত্র
নেয়া হয়নি তাই আপতকালিন ব্যবস্থাপনার জন্য আগাম দশ হাজার টাকা জমা রাখতে হবে।
শেষ লাইনটার পরের জায়গাটায় সই করতে গিয়ে মনীশ চমকে উঠলেন। এ তো ব্ল্যাকমেলিং। কথাটা মনে করালে বাইরের ছেলেটি বলল।- মশাই, পারমিট চাইলে বাড়ি গিয়ে শান্তির হাতে পাঠিয়ে দেবেন। কাচড়া কোরবেন না। দাদা সিম্পল লোক। এসব ছুট ঝামিলা পসন্দ করে না। আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না শান্তির হাতে ক্যাশ পাঠিয়ে দিন।
– আর যদি দুর্ঘটনা না ঘটে তখন টাকার কি হবে?
– কত কাজ হবে,ওয়ার্ডের উন্নোয়োন হবে।কত লোকের উপগারে লাগবে। আপনার কি টাকার অভাব? সবার কথা একটু ভাবুন।
শান্তি জ্বলন্ত বিড়ি ফেলে দিয়ে প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলল। – এসব আগে মিটিয়ে রাখতে হয়। জলে নেমে কুমিরের সাথে ঝগড়া ।
শান্তি তাকে বাড়ি মুখ অবধি পৌঁছে দিয়ে ডেকরেটার্সের ঘরে গেল মালগুলো আনতে। গেটে ঢুকতে গিন্নি জোরে জোরে বলতে থাকল,- এই এক লোক, আজও গেছে মর্নিং ওয়াকে। সকালের আড্ডা না মারলে পোষাবে কেন?
গিন্নির কোলে গুবলু। ভিতর বাড়িতে রান্নার তোড়জোড় হচ্ছে। জামাই চলে এসেছে। মাইকের লোকজন বাঁশের খুঁটিতে ইলেকট্রিকের তার লাগাচ্ছে।
মেয়ে এসে এক কাপ চা হাতে ধরিয়ে বলল,- বাপি, আমি একটু পার্লারে যাব তোমার জামাইয়ের বাইকে।তুমি গুবলুকে দেখবে। মা রান্নাঘরে একটু ব্যস্ত থাকবে। গোয়ালা দুধ দিয়ে গেলে মা পায়েস বসাবে।
– হ্যাঁ মা।
সকালের সেই উৎফুল্ল মনোভাবে কেমন যেন জল ঢেলে দিয়েছে কেউ। মনীশ হাতে দৈনিক খবরের কাগজ নিয়ে একটা চেয়ার টেনে সামিয়ানার নীচে চা পান করতে লাগলেন । এখন আমেরিকার কানেকটিকট সিটিতে রাত গভীর। তবে কটা বাজে সেটা হিসাব করতে হবে।
অনুষ্ঠানের বাড়ি জুড়ে এটা ওটা কাজ চলছে জোর কদমে।
বেশ খানিকটা বাদে ঢুকল শান্তিলাল মালপত্র নিয়ে। ফর্দ ধরিয়ে দিল মনীশের হাতে।- গুনে গুনে ফেরৎ দিতে হবে। যত্ন করে রেখে দিন।
বিকেল চারটে নাগাদ সবার খাওয়া প্রায় শেষ। ভোম্বল এসেছিল সপরিবারে এবং দু’জন সাগরেদ সহ। মনীশের স্ত্রী খুব গদগদ কণ্ঠে বলল, – তুমি এসেছো, কি যে খুশি হয়েছি।
সে বাচ্চাকে আশীর্বাদ করল উপহার দিয়ে। কথা প্রসঙ্গে বলল,- হয়ত আর মেম্বার থাকতে পারব না পরের বার।
– কেন গো, কি সমস্যা?
– না কাকিমা। সমস্যা নয়। হয়তো এম এল এ-তে নমিনেশন পাবো । আপনারা একটু দেখবেন। এই বুথটাতে যাতে আমরা হান্ড্রেড পার্সেন্ট হতে পারি।
মনীশ দূরে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিলেন। আর সকালের অপমানে তার মাথাটা আর নীচু হয়ে যাচ্ছিল।
এই শহরতলিতে তিনি আছেন প্রায় তিরিশ বছর এই একই জায়গায়। তার প্রিয় জায়গা । তিলে তিলে তৈরি করেছেন এই বাসস্থান এবং এক ছেল ও মেয়েকে। দুজনেই চাকরি করে। তাঁর গর্ব করার মত এই পৌরসভা।
শান্তি সন্ধ্যার পরে ফর্দ ধরে মালপত্র বুঝে নিয়ে ডেকরেটার্সের ঘরে ফেরৎ দিয়ে এসেছে।
এখন একটু ফাঁকা লাগছে বাড়িটা। অদূরে শহরতলীর রেলস্টেশন তার চার নম্বর প্লাটফর্মে রোজ আড্ডা দিতে যান। আজও মনটা উসখুস করছে।
শান্তিকে ভাড়াটা মেটাতে হবে, গিন্নিকে এই অজুহাত দেখিয়ে রাস্তায় বেরোলেন মনীশ। কিন্তু রাস্তায় বেশ ভিড়। মিছিল কিম্বা ঐ জাতীয় কিছু একটা আটকে আছে রেল গেটে। রেল গেটের আগে রিকশা স্ট্যান্ড। সবদিনই প্রায় শান্তিকে বসে থাকতে দেখেন ভ্যান দাঁড় করিয়ে অন্যদের সাথে গল্প করতে বা আড্ডা দিতে। আজ শান্তি ওখানে নেই। আরো কিছুটা এগিয়ে দেখলেন বেশ কিছু লোকজন ঝান্ডা নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। রেল গেট খুলতেই মিছিল ধীরে এগিয়ে চলল। দেখলেন ভোম্বলদের পার্টিরই মিছিল। সে সামনের দিকেই আছে। আর ভোম্বলের কাছ ঘেঁসে গলা ফুলিয়ে স্লোগানে গলা মেলাচ্ছে শান্তিলাল। তাঁর মনে একটা খিঁচ খিঁচানি এল।
জমল না আজ আড্ডা। চেনা জানা একজন দুজনের সাথে কথা শেষ করে গেলেন শম্ভুকে টাকাটা মেটাতে। অন্নপূর্ণা ডেকরেটর্সের মালিক।
– আসুন দাদা আসুন। সব ঠিক ঠাক ছিল তো? কোন অসুবিধা হয়নি তো?
– সবই ঠিক ছিল। তবে আরো ঠিক হতো যদি কথাটা তুমি সেদিনই বলতে। যেদিন বায়না করে গেলাম।
– কি কথা বলুন তো দাদা? আপনি আমার অনেক পুরোনো কাস্টমার।
– পারমিশন এর কথাটা আগে বললে আমাকে সাত সকালে হয়রানি হতে হত না।
– কিসের পারমিশন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
– তুমিই তো শান্তিকে বলেছিলে পারমিশন না থাকলে মাল পত্র দেবে না।
– ছিঃ ছিঃ ছিঃ। শান্তি তো প্রথম এলোই আমার কাছে দশটার পর। আমিই তো লিষ্টটা করে সব গুছিয়ে দিলাম।
কোথাও একটা অবস্থার ঘোরপ্যাঁচ আছে বুঝতে পেরে শম্ভু তার সাথে যে ছোকরা সাহায্য করে। তাকে বলল দু’কাপ চা আনতে। তখন মনীশ সবিস্তারে ঘটনা বললেন। মোটামুটি সবকিছু। তবে আর্থিক ব্যাপরটা লজ্জায় এড়িয়ে গেলেন।
শুনে শম্ভু বলল, – দেখুন মনীশবাবু। আপনাকে শুধু মুচলেকা দিয়েই তো কাজটা করে দিয়েছে। আর সুবোধ সাহাকে কিন্তু নগদে এক লাখ টাকা খেসারত দিয়ে আসতে হয়েছে। কেননা তিনি দোতলা কমপ্লিট করার সময় ইট বালি সিমেন্ট নিজের পছন্দের সাপ্লায়ার থেকে নিয়েছিলেন বলে।
– হুম্। এতো মগের মুলুক। এটুকু বলে মনীশ টাকা পয়সা মিটিয়ে বেরোতে চাইলেন।
শম্ভু কানে কানে বললে, – শান্তি হাজার হোক ভ্যান রিক্সাওয়ালা তো। ওদেরকে খুব বেশি বিশ্বাস করবেন না। আমার নম্বর তো ছিল। আমাকে তো প্রথমে ফোনটা করতে পারতেন।
মনীশবাবু রাজনীতির সাথে কোন সময়ই খুব বেশি জড়িয়ে পড়েন নি।তবে রাজনীতি যে দূর্নীতি মুক্ত হওয়া উচিৎ এটা সব সময় বিশ্বাস করেন।
রাতে লোকজন বিশেষ নেই সবাই চলে গেছে, আত্মীয় স্বজন একজন দুজন আছে। জামাই ফিরে গেছে নিজের বাড়িতে। তবে গুবলু ও তার মা আছে।
রাতে নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশ থেকে ছেলের ফোন এলো। ছেলে অধিকাংশ মায়ের সাথে বেশি কথা বললেও বাবার সাথে কয়েকটা কথা অবশ্যই বলে। শরীরের ও আশে পাশের খোঁজ খবর নেয়।
– বাবা, আমি থাকলে আজ তোমাকে এত খাটতে হত না। এই সময়ে কাছে থাকতে পারলাম না। আফশোস হচ্ছে।
– তা হয়তো ঠিক।তবে কিছু পেতে গেলে কিছুটা ছাড়তেও হয়। আমিও তো একদিন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে এসেছিলাম।
– আমি ভাবছি আর একটা বছর এদের কাজ করে দেশে ব্যাক করব।
– তাতে লাভ, আমার না তোমার ? না দেশের?
– তুমিই তো বলতে ফিরে আসতে।
– যেদিন ফেরার মত পরিবেশ হবে। আমরাই তোমাকে ফিরে আসতে বলব।
– তুমি শেষ অবধি মানলে?
(শেষ)










