আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। চারদিকে কত অনুষ্ঠান, কত বক্তৃতা, কত আলোচনা সভা! সমাজ মাধ্যমের দেওয়াল জুড়ে কত রকমারি ছবি, কত বাহারের লেখা- এক সাংঘাতিক ব্যাপার!
“মাতৃভাষা, মাতৃদুগ্ধের সমান”, এই জাতীয় বয়ান, “আমার গর্বের বাংলা ভাষা” এইসব কিছু অন্ততঃ আমাকে কেনো জানি আজ টানছে না। হ্যাঁ টানছে না। এই সব কিছু নিয়ে আমি আজ আবেগাপ্লুত হয়ে উঠছি না! নিজেকে বারংবার প্রশ্ন করে যাচ্ছি, কেনো আমি নিজেকে একবারে সম্পৃক্ত করতে পারছি না! আমি যে ভাষায় কথা বলি, যে ভাষায় লিখি, যে ভাষায় নিজের আবেগ, প্রক্ষোভকে উৎসারিত করি – আজকের দিনটি তো সেই ভাষার এক গর্বের দিন। আমার মন কেনো শিহরিত হচ্ছে না? না দেখতে পাওয়া অবয়বহীন বিমূর্ত আমার মনটাকে প্রশ্ন করি ……. মনের মাঝে অনেক কথা একেবারে জট পাকিয়ে এসে উপস্থিত হয়ে যায়। কোনটিকে আগে ঠাঁই দেবো আর কোনটিকে বা পরে, বুঝতে পারছি না; সবকিছু একেবারে এলোমেলো, অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। তাও স্থিতধী হওয়ার চেষ্টা করতে করতে অকপট স্বীকারোক্তি হিসেবে এই ভাবনা গুলোকে আজ লিখতে চাই, নথিভুক্ত করে রেখে যেতে চাই পৌঢ়ত্বের এই অনুভবকে! চারদিকে আনুষ্ঠানিকতার মাঝে বড্ড বেমানান এই অনুভব। হোক বেমানান, তাও লেখা থাক।
খন্ডিত ভারতবর্ষের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশে সেই বাহান্নোর রক্তে রাঙা বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য যুগান্তকারী ঐতিহাসিক আন্দোলন, পঞ্চাশের দশক জুড়ে ঐসময়কার পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন ……… তার গর্ভ থেকে উঠে আসা নিখাদ ধর্ম নিরপেক্ষ ভাষা- আবেগ সঞ্জাত বাংলা- বাঙালি জাতিসত্তার উত্তাল বিকাশ ………… ভাষার জন্য একটা নতুন দেশের উদ্ভব- একাত্তরের বাংলাদেশ; সব কিছু আমার মনের মানসপটে ছবি হয়ে আছে। মনে ছবি হয়ে আছে আসামের বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আত্মত্যাগের লড়াই, কি করে ভুলে যাবো, হিন্দির আগ্ৰাসনের বিরুদ্ধে দাক্ষিণাত্যের মানুষের দূর্দমনীয় লড়াই! সব মনে আছে তো। আমেরিকা জুড়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের মাতৃভাষার স্বীকৃতির লড়াই , দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, লাটাভিয়া – বিভিন্ন দেশের ভাষা আন্দোলনের খবর কৈশোর, যৌবনের দিনগুলোতে বড় আগ্ৰহ করে জেনেছিলাম, বুঝবার চেষ্টা করেছিলাম। এই জানা – বোঝার মধ্য দিয়ে কখন মনের অজান্তেই আমার মনের মাঝে আমার মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে এক অদ্ভুত ভালোলাগার স্বপ্ন, আবেগ তৈরী হয়েছিলো, তা টেরই পাই নি। আজ জীবনের বেশ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে এই স্বপ্নগুলি যেন বেশ ফিকে, বেশ ক্লিশে হয়ে গেছে। কেনো আমার ভাষা নিয়ে আমার স্বপ্ন, আবার আবেগ এরকম ফিকে হয়ে গেলো? এই প্রশ্নের ঘুরপাক থেকেই তো আজকের অনুভব।
ষাটের দশকের একেবারে শেষ বছরে, ঊনসত্তরে আমার জন্ম। একেবারে ছোটোবেলার কথা মনে নেই। শিশু মহল বিদ্যালয়, ফণীন্দ্র দেব বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগ পার করে পঞ্চম শ্রেণীতে জলপাইগুড়ি জিলা স্কুল। একেবারে প্রথম শ্রেণী থেকেই মাতৃভাষা বাংলার সাথে সাথে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি পড়া ও লেখা। মাধ্যমিক পরীক্ষায় একশো নম্বরের বাংলা, একশো নম্বরের ইংরেজী পরীক্ষা দিয়েছি। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীতে দুই বছরের জন্য সংস্কৃত শিক্ষা! এই দুই বছরের সংস্কৃত শিক্ষা, আজ কিচ্ছুটি মনে নেই! হঠাৎ হঠাৎ নর, নরৌ, নরাঃ – ধাতুরূপ পড়বার কথা মনে পড়ে যায়।
উচ্চমাধ্যমিক স্তরে দু’শো নম্বরের বাংলা ও ইংরেজী দিতে হয়েছে। সেই ছোটো বেলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ, অনুচ্ছেদ রচনা, ব্যাকরণ, পত্র রচনা সব কিছু চলেছে। গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ, কাব্যনাটক, নাটক, রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনী ইত্যাদি নানা কিছুই পড়তে হয়েছে; পরীক্ষাও দিতে হয়েছে। বেশিরভাগ সময় মুখস্থ করবার অবিরাম চেষ্টা থেকেই যা কিছু শেখা বা অর্জন যাই বলি না কেনো। এরই মাঝে আবার বাংলা ভাষার ইতিহাসও কিছুটা গিলতে হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে সাম্মানিক স্নাতক স্তরে প্রবেশ করলাম প্রাণিবিদ্যা মূল বিষয় নিয়ে। আমার এক ভয়ঙ্কর অবস্থা! সাম্মানিক স্তরে একটি বইও বাংলায় নেই! শ্রেণী কক্ষে অধ্যাপক মহাশয়ও পুরোপুরি ইংরেজিতে পাঠদান করছেন। আমি তো কিচ্ছুই বুঝতে পারছি না! সাধারণ স্নাতক স্তরের একটিও উন্নতমানের বিষয় সম্বলিত বাংলা ভাষায় লেখা বই নেই! উদ্ভিদ বিদ্যা ও রসায়ন এই দুটো বিষয়সহ সব কিছু নিয়ে এক প্রাণান্তকর যাত্রা শুরু হলো। স্নাতক সাম্মানিক স্তরের প্রথম বছরটা এই ইংরেজি নিয়ে সড়গড় হতেই কেটে গেলো! উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত থাকা মেধাটা এই খটোমটো ইংরেজি বুঝে উঠতে উঠতে কিরকম যেনো ভোঁতা হওয়া শুরু হয়ে গেলো। তখনই সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়ার অদম্য তাড়ণায় বেশিরভাগই না বুঝে মুখস্থ করবার এক প্রয়াস শুরু হয়ে গেলো; নিজের ভেতর থাকা অল্পস্বল্প সৃজন ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার শুরুয়াৎ হলো। অন্ধ অনুসরণ আর অনুকরণ করতে করতে, “মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতো” এই ভাবনার প্রতি এক বিবমিষা জাগ্ৰত হলো এবং তা মনের মণিকোঠায় কিছুটা স্থায়িত্বও পেলো। এরপর স্নাতকোত্তর স্তর, তারপর শিক্ষক শিক্ষণ – সবেতেই আমার মাতৃভাষা “বাংলা”র সঙ্গে আড়ি পর্ব শুরু হলো। চাকুরী পাওয়ার সব পরীক্ষায়ও বাংলা’র কোনো রকম অস্তিত্ব নেই! এই করতে করতে, গলাধঃকরণের দক্ষতা ও তা পরীক্ষার খাতায় মোটামুটি সুচারুভাবে উগড়ে দিয়ে চলে এলাম শিক্ষকতায়। এখানেও প্রশাসনিক কাজকর্মে কোথাও বাংলা কে আর পেলাম না …….. এখনও এইভাবেই চলছে!
কোথায় আমার আদরের মাতৃভাষা বাংলা? বিশ্বের জ্ঞান- বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি – যা কিছুর সঙ্গে সামান্য যোগাযোগ ঘটেছে, সে তো সেই বিজাতীয় ভাষা ইংরেজি দিয়েই!
আমার বাড়িতে শ্রীহট্টীয় কথ্য ভাষা – সিলেটিতে কথাবার্তা হতো। একদিকে তার শব্দ, উচ্চারণ ভঙ্গীমা আবার উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকবার জন্য বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের স্থানিক কথ্য ভাষার শব্দ ও উচ্চারণ ভঙ্গিমা এবং এর সাথে সাথে জলপাইগুড়ি শহর ও শহরতলির রাজবংশী কথ্য ভাষার মিশেল ঘটে আমার কথা বলার ভঙ্গিমাও অদ্ভুত আকার নিয়ে গেলো! মনে আছে ঐ সময় কোলকাতায় বাড়ির সকলের সাথে গিয়েছিলাম, সেখানে আমার আত্মীয় স্বজন, নিকটজনের আমার মুখের ভাষা শুনে কি হাসি! একটা তাচ্ছিল্য জুটেছিলো! কেনো আমি আমি ভালো কলকাত্তাইয়া বাংলা বলতে পারি না, এইভেবে আমার খুব কষ্ট হয়েছিলো। তারপর কিছু দিন জলপাইগুড়ি এসে সেই ছোটবেলা, কোলকাতার মতো দিয়েছি, খেয়েছি বলতে গিয়ে পাড়ার বন্ধুদের কাছ থেকে গালিও শুনলাম। এইরকম অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে স্থানিক বিশিষ্টতার বাংলা বলতে বলতে পৌঢ়ত্বে পৌঁছে গেলাম। ইংরেজিটাও যথাযথভাবে শেখা হলো না, আর মাতৃভাষা বাংলা সেও কিরকম অবহেলিত, ব্রাত্য থেকে গেলো! এরকম আধাখ্যাঁচড়া মাতৃভাষা শিখে কি আর ঐ ভাষার প্রতি একেবারে হ্নদয় থেকে আবেগ আসতে পারে?
খন্ডিত বঙ্গের, পশ্চিমবঙ্গে জন্মে, এক বাঙালি সংস্কৃতি – কৃষ্টির শহরে বড় হয়ে, সেই শহরের জীবন বীমা নিগমের বিভাগীয় দপ্তরে, বীমা থেকে ঋণ নেওয়ার আবেদন পত্র বাংলায় লিখে জমা দিয়েছিলাম তখন সেই বিভাগের করণিক, বাঙালি হয়েও আমায় বলেছিলেন, “আপনি দরখাস্তটি বাংলায় লিখে জমা দিন”। একথা শুনে, আমার পরিণতমনস্ক বৌদ্ধিক মন ঝগড়া করতে উদ্যত হয় নি। মনে আছে একবার জলপাইগুড়ি রেল স্টেশনে, আসন সংরক্ষণের আবেদন পত্রে বাংলা নেই কেনো বলে তর্ক জুড়ে ছিলাম! ঐ আবেদন পত্রটি আজ পর্যন্ত এই পশ্চিমবঙ্গের কোথাও বাংলায় পূরণ করবার সৌভাগ্য আমার হয় নাই! একবার এক ফৌজদারী মামলায় জলপাইগুড়ি নবাববাড়ির আদালতের এজলাসে জামিনের জন্য যেতে হয়েছিলো। মহামান্য বিচারক ও আমার ব্যবহারজীবীর মধ্যে আলাপচারিতা সব ইংরেজিতে হলো। কিছু বুঝলাম, আর কিছু বুঝলাম না অথচ বিচার হলো আমার ভূমিকা নিয়ে! আমি দেশের আইন নাগরিক হিসেবে কিভাবে লঙ্ঘন করলাম, কতটা করলাম তাও পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না। মহামান্য বিচারকের রায় হিসেবে সবুজাভ কাগজে যা এলো তাও ইংরেজিতে দীর্ঘ লেখা। আমার ঘনিষ্ঠ উকিল বাবু বললেন, “যাও, হয়ে গেছে!” কি যে হয়ে গেছে বা হয়ে গেলো তা আমার মতো স্নাতকোত্তর শিক্ষক বুঝতে পারলাম না প্রাঞ্জল ভাবে। এক মহা বিচিত্র ব্যাপার।
যাই হোক এইরকম ভাবে মাতৃদুগ্ধসম মাতৃভাষা বাংলাকে দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি …… আমার মৃত্যুর শংসাপত্রটিও লেখা হবে বিজাতীয় ভাষা ইংরেজিতে!
যাই হোক এবার আসা যাক একেবারে ব্যক্তিগত সাংসারিক পরিমন্ডলে। পারিবারিক সম্বন্ধ করে যার সঙ্গে যৌবনে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলাম , সে আবার কোনো দিন বাংলা বিদ্যালয় স্তরে ভাষা হিসেবে পড়ে নি। বাড়িতে তার বাবা, মা অর্থাৎ আমার শ্বশুর, শ্বাশুড়ি’র কাছে বাংলা কিছু শিখেছে। এবার আমার সত্যি সত্যিই ষোলকলা পূর্ণ হলো। ঘরে বাংলা, অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক হিন্দি, মাঝে মাঝে ইংরেজি সব কিছু মিলিয়ে এক অপরূপ যাত্রার শুরু।
আরও মজার বিষয়, কর্মসূত্রে জলপাইগুড়ি জেলার ডুয়ার্সের একটি বিদ্যালয়ে চাকরি করতে গিয়ে যাদের ছাত্র- ছাত্রী হিসেবে পেলাম, তাদের বেশিরভাগেরই মাতৃভাষা বাংলা নয়। কারোর মাতৃভাষা কুরুখ, কারোর অলচিকি, কারোর নেপালি, কারোর মাতৃভাষা বড়ো। তারা আবার বাড়িতে নিজের মাতৃভাষা ব্যবহার করে না; কথ্য ভাষা রূপে ব্যবহার করে সংযোগ রক্ষাকারী ভাষা সাদ্রী। এরা সকলে একসাথে মিলে বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়ে পড়ে। প্রথম ভাষা হিসেবে বাংলা ও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখে। সপ্তম- অষ্টম শ্রেণীতে আবার শেখে সংস্কৃত! সত্যিই এক বহুমুখী বিচিত্র অবস্থার মেলবন্ধন। সঠিক উচ্চারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলা শেখা ও বলা এবং সাথে সাথে লেখা- এক অদ্ভুত অবস্থা দেখে চলেছি।
শুধুমাত্র বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এক অসম্ভব কঠিন কাজ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সকলের সাথে সাথে ভানুভক্ত, রঘুনাথ মুর্মু ……. সকলকে নিয়েই এগোতে হবে। কোন পাঠ্যক্রম ধরে পাঠ্যসূচি তৈরী করতে কি পথ ধরতে হবে সেটাই তো এক বড়সড় গবেষণার বিষয়। এক বিচিত্র জোড়াতালি গোছের বৌদ্ধিক প্রস্তুতি নিয়ে কতদূর যাওয়া সম্ভব সেটাও এখন আমার কাছে এক জিজ্ঞাসা বটে!
ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা সমূহ নিয়ে প্রথম বিজ্ঞান সম্মত সমীক্ষা যা গ্ৰিয়ারসন সাহেব করে গেছেন, পরবর্তীতে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন- সব কিছুর থেকে প্রাপ্ত নির্যাস: মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান – বাস্তবে এখনও স্বপ্নই থেকে গেছে। আমাদের স্বাধীনতার বয়স আশি হতে চললো, দেশের ভাষা সমস্যার স্বরূপই কার্যত বোঝা গেলো না। দেশের ত্রিভাষা নীতি, সংবিধানের অষ্টম তহশিল, কোঠারি কমিশনের ভাষা সংক্রান্ত সুপারিশ, পরবর্তীতে জাতীয় শিক্ষা নীতি, এখনকার হালের একেবারে অত্যাধুনিক জাতীয় নীতি সবকিছু মনের ভেতরে একেবারে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে। এক দিশাহীন জগাখিচুড়ি অবস্থা! কবে সুস্পষ্টতা আসবে তা বাস্তবিকই অজানা। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বরেণ্য মহান সব দেশ নেতা/ নেত্রীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার সর্বস্তরে পড়বার সুযোগ সৃষ্টির দাবী- স্বাধীনতার আশি ছুঁই ছুঁই সময়ে এসেও কি সম্ভব হয়েছে? বাপুজীর সেই বুনিয়াদি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়, মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতার যে দৃঢ় শপথের উচ্চারণ, তার ছিঁটেফোঁটার তো আজ অবশিষ্ট নেই!আমাদের মতো বহু ভাষাভাষী দেশের ভাষা সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি কি হওয়া উচিত তা এখনও অধরা।
নিজের জীবনের পথচলা ও এখন পর্যন্ত যে বহু ভাষাভাষীদের নিয়ে একসঙ্গে চলছি তাতে একটা কথাই দ্বিধাহীন ভাবে বলবো, তা হলো অনেক ক্ষেত্রেই অনেকে কি বলছেন তা আক্ষরিক ভাবে বুঝি না, ভাবে বুঝি বা অনুভব করি। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ জুড়ে মাঝে মাঝেই ছাইচাঁপা আগুনের মতো ভাষাকে কেন্দ্র করে বিভেদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরের বৃহত্তর রাজবংশী জনগোষ্ঠীর কথ্য ভাষা বাংলা ভাষা থেকে আলাদা এই নিয়ে অশান্তি এখনও ধিকি ধিকি করে অব্যাহত। উত্তরের পাহাড়ের নেপালি ভাষা ব্যবহারকারীদের ভাষা কেন্দ্রিক আবেগ – সব নিয়ে বিবাদের উপাদানগুলিতে বিভেদকামীরা মাঝে মাঝে ঘৃতাহুতি দিয়ে হিংসার ভয়াবহ বাতাবরণ তৈরী করে তোলেন।
জাতিসত্তার রাজনীতি কখনো ভাষার নামে, কখনো সংস্কৃতির নামে , কখনো বা ধর্মের নামে আছড়ে পড়ে। পরিচিতি সত্তার রাজনীতি এই উত্তরাংশে এক নতুন রূপে নতুন বিপদ রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ এত আলোড়িত, যে তার মাঝে “না রোটি-কাপড়া আউর মাকান”এর মৌলিক সমস্যা নিরসনের দাবী আজ ধামাচাপা পড়ে যেতে চলেছে। শুধুমাত্র আমাদের জলপাইগুড়ি জেলাতেই সাতশত একান্নটি বাচিক গোষ্ঠীর সম্প্রদায় রয়েছেন। প্রতিদিন, প্রতিরাত মিলিয়ে চব্বিশ ঘন্টায়, প্রতিটি আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডার থেকে শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। এর গাণিতিক হিসেব- নিকেশে চোখ আউড়ালে আঁতকেই উঠতে হয়। “ভাষা সাম্রাজ্যবাদ” বল্গাহীন আগ্ৰাসনে আমাদের সকলের প্রিয় মাতৃভাষা থেকে প্রতি মুহূর্তে শব্দ লোপাট হয়ে যাচ্ছে; আমাদের হুঁশই নেই। এই ভাষা সন্ত্রাসের থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে কি? এর মধ্যে আবার চলভাষ নামক যন্ত্রে ইংরেজি হরফে মাতৃভাষা সহজে লিখবার কৌশল রপ্ত করবার জন্য আমরা মশগুল হয়ে বুঁদ হয়ে আছি; তারপর কিছুটা বাংলা, কিছুটা আবার হিন্দি, তার সাথে ইংরেজি সব মিলিয়ে ‘বাংরেজি’র যা দৌরাত্ম্য ক্রমবর্ধমান তাতে এককথায় ভাষারই তো অস্তিত্ব বিপন্ন! নোয়াম চামস্কি, ব্লুমফিল্ড এর ভাষা ও ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণা আমাদের যে ভাষা- বিপন্নতার ইঙ্গিত দেয় তাতে ভয় হয়, অনাগত প্রজন্মের কাছে আমাদের যার যার যা মাতৃভাষা হিসেবে এখন পর্যন্ত যা অবশিষ্ট আছে তা থাকবে তো?
চলতে চলতে আবার নিজের প্রসঙ্গে ফিরে আসি, আমার নিজের সন্তানকে বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়ে পড়াই নি। পড়িয়েছি খ্রীষ্টান মিশনারি পরিষদ পরিচালিত ইংরেজী মাধ্যমের বিদ্যালয়ে। ছেলে বড় হয়ে কেতাদুরস্ত আদব কায়দায় সাহেব- সুবোদের মতো ইংরেজিতে বলিয়ে- কইয়ে হয়ে উঠবে …. সহজে বাজার দখলের প্রচলিত ছকে কিস্তিমাত করে দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে – এই বাসনা পূরণ করার সুপ্ত বাসনা যা আমার মনের মধ্যে ছিলো তাকে সাকার করবার চেষ্টা করেছি। ছেলে ভালো ইংরেজি বলতে পারবে, এও এক চাওয়া যে থাকতে পারে, তা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝলাম। যে বিদ্যালয়ে ছেলেকে পড়ালাম, সেই বিদ্যালয়ে পৌষ সংক্রান্তির ছুটি থাকে না, নবান্নের ছুটি থাকে না, করম পূজায় বিদ্যালয় খোলা থাকে, দোল পূর্ণিমার পরের দিন শ্রেণী পরীক্ষার সূচি থাকে, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন বিদ্যালয়ে আট পর্বের সময় তালিকা অনুযায়ী পড়াশোনা হয়। এক শিকড়হীন, নিজস্ব কৃষ্টি – সংস্কৃতি বিমুক্ত জীবন শৈলী বিহীন জীবনযাত্রা অনুসারী মানুষ হিসেবে আমার আত্মজ দেশের নাগরিক হিসেবে বাড়তে থাকে! বাংলা, বাঙালিয়ানা, বাঙালি জাতিসত্তা সব কিছুর ভিত্তিমূল বিনাশ করে এগোতে এগোতে বাংলা ভাষার দূর্দশাগ্রস্ত তা নিয়ে বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে আবেগঘন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করে তার আলোকচিত্র নির্লজ্জের মতো সমাজ মাধ্যমে নিজেই ফলাও করে আবার প্রকাশও করি। সেই প্রকাশিত ছবিতে কয়জন আবার লাইক দিয়ে আঙুলের খোঁচা বা লাল পান চিহ্ন দিলো তার সংখ্যা গুণে আমার মহান কাজের মূল্যায়ণ করি– নিজে ডিগ্ৰিধারী আহাম্মক এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে নিজেকেই তুলে ধরি ।
ভাষা-বিভাষা-নিভাষার বহতা স্রোতে নিজের মাতৃভাষা, নিজের সংস্কৃতির তিলে তিলে মৃত্যু দেখেও আমার সম্বিত ফেরে না। মহাকালের এক মহাঘোরের মাঝে পাঁক খেতে খেতে আমি নিজেকেই যে হারিয়ে ফেলেছি- বুঝতেই পারি না!
উত্তর-সত্য পরা আধুনিক বাজার নির্ভর ভুবনায়নের যুগে যে দেশ, যে দেশের, যে সম্প্রদায়ের মানুষ বাজার বা পূঁজি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যবহারিক ভাষা আমার স্বপ্নের মাতৃভাষার গলা, বুক, উদর, উপাঙ্গ সব কিছু কে গ্ৰাস করতে থাকে …… আমার সামনে; আমি নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করে ফেলি ঐ নিয়ন্ত্রকদের কাছে। এই বদলে যাওয়া, চুপসে যাওয়া আমার কাছে “ভাষা দিবস” এর কোনো তাৎপর্য, কোনো অর্থবহতা আছে কি? এই ভাষা দিবসের দিন আমি নিজের কাছে নিজেই এক চরম প্রবঞ্চনা করে চলি। আমার মাতৃভাষা, আমার মায়ের দুধের মতো এই কথা গুলো শূন্যে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমাকে দেখে খিলখিল করে হাসতে থাকে! সেই আব্বাসউদ্দীন সাহেবের গানের কলি মনে পড়ে যায়, “ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে…. ” ; আমিই তো সেই বগা , সেই বক পাখি, মহা ফান্দে আটকে গেছি! এই ফান্দ থেকে বেরোনোর জন্য আবার সবাই এক হতে হবে, হ্যাঁ এক হতেই হবে। ঐ ভাষার নামে, ঐ ধর্মের নামে, ঐ সংস্কৃতির নামে আমাদের মাঝে বিভেদের প্রাচীর দূর করা ছাড়া আর কোনো পথ যে নেই!
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬









