সাথী,
ফ্যাসিবাদী মতাদর্শে পরিচালিত আর.এস.এস-বিজেপির জমানায় ভারতবর্ষ আজ এক গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। তৃণমূল কংগ্রেস মৌখিকভাবে এই শাসনের বিরোধিতা করলেও বস্তুত তার স্বৈরশাসন, দুর্নীতি ও ধর্ম নিয়ে রাজনীতির কার্যক্রম সেই সঙ্কটে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে এই রাজ্যের রাজনীতি প্রধানত আবর্তিত হচ্ছে দক্ষিণপন্থী এবং অতি দক্ষিণপন্থী মেরুর মধ্যে। একদিকে ফ্যাসিস্ট আর.এস.এস-বিজেপি এবং অন্যদিকে স্বৈরাচারী তৃণমূল, এই দুই প্রবল জনবিরোধী শক্তির মাঝে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে রাজ্যের আম-জনতার।
২০১৪ সালে কেন্দ্রে মোদী-সরকার গঠনের পর গোটা দেশ জুড়েই ফ্যাসিস্ট আর.এস.এস-বিজেপির আগ্রাসন বাড়তে থাকে। মার্কিন-প্রভুদের তাঁবেদার, ইজরায়েলের মতো একটি জায়নবাদী রাষ্ট্রের বন্ধু এই কেন্দ্রীয় সরকার দেশকে কর্পোরেট-পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য শ্রমিক-কৃষক সহ খেটে-খাওয়া মানুষের ওপর আক্রমণকে তীব্রতর করে। টুঁটি টিপে ধরা হতে থাকে যে-কোনও বিরোধী কণ্ঠস্বরের। ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতিকে ভিত্তি করে সারা দেশ জুড়ে বাড়তে থাকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। কখনও CAA, কখনও NRC, আবার অতি সম্প্রতি SIR-এর নামে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে বিজেপি।পশ্চিমবাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাস্তবে সংসদীয় রাজনীতিতে এ-রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের মতো একটি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত দক্ষিণপন্থী দলই আবার আর.এস.এস-বিজেপি’র মূল প্রতিপক্ষ, যাদের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনের কারনেই বিজেপি তার পায়ের তলায় মাটি পেয়েছে।
একদিকে বিজেপি এবং অন্যদিকে তৃণমূল, এই দুই জনবিরোধী শক্তির জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতেই ২০২৪ এ ঘটে যায় ঐতিহাসিক ‘অভয়া আন্দোলন’। অসংখ্য মানুষ দিনের পর দিন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নেমে তাঁদের অনাস্থা প্রকাশ করেন বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে। ‘নারী-স্বাধীনতা’ তথা ‘লিঙ্গ-সাম্যের’ ধারনাটি ছিলো ‘অভয়া আন্দোলন’-এর মূল বিন্দু, যা উপাদান হিসাবে ফ্যাসীবাদ-বিরোধী। তাই রাজ্যের মূল বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও জনগনের এই আন্দোলনে ব্রাত্য থেকে যায় বিজেপি। তৃণমূল ও বিজেপি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে গড়ে ওঠা অভূতপূর্ব এই গণআন্দোলনে শত-সহস্র মানুষ অংশগ্রহণ করে। অভয়া আন্দোলন এবং এর আগে ও পরে গ্রাম-শহর – শহরতলিতে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা শ্রমিক,কৃষক, দলিত, আদিবাসী, জনজাতি গোষ্ঠী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, নারী এবং প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষের আন্দোলন অন্তত এইটুকু প্রমাণ করেছে যে অসংগঠিত আকারে হলেও আমাদের রাজ্যে একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজের জোরদার অস্তিত্ব আজও রয়েছে। অতীতের শক্তিশালী বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবেই এই সমাজ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে, যা বাংলার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট।
সুস্পষ্ট একটি দিশায় এই প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজকে সংগঠিত করতে পারাটা আজ আমাদের কাছে একটি অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই দুরূহ কাজটি কারোর একার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে আমাদের রাজ্যে সংগ্রামী বামপন্থী সংগঠনগুলি সহ অসংখ্য প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক মানুষের সমন্বয়ে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের বিপরীতে গণআন্দোলনের শক্তির একটি বিকল্প মেরুকরণ ঘটতে পারে বলে আমাদের ধারণা। আর.এস.এস-বিজেপি যে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত সংগঠন, এবং, আমাদের দেশের কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস সহ অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলগুলির চেয়ে এরা যে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর, তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। তার সঙ্গে আমরা এটাও মনে করি, এ-রাজ্যে বিজেপির পায়ের তলায় মাটি শক্ত হওয়ার পিছনে তৃণমূলের স্বৈরাচারী শাসনের একটা নির্ধারক ভূমিকা আছে। গ্রামাঞ্চলে তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচতে বহু মানুষ আত্মরক্ষার জন্যই বিকল্প হিসাবে বিজেপি-কে বেছে নিয়েছে, এ’টা বাস্তব। অবশ্য, ‘আর.এস.এস ভালো, বিজেপি খারাপ’, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এই অপরিণামদর্শী তত্ত্ব আগে থেকেই বাংলায় সঙ্ঘ-পরিবারের উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। এ-রাজ্যের তৃণমূল সরকার ‘রাম মন্দিরের’ বিপরীতে কখনও ‘জগন্নাথ মন্দির’, অথবা ‘রাম নবমীর’ বিপরীতে কখনও ‘হনুমান জয়ন্তী’র মতো কর্মসূচীকে বেছে নিয়েছে । কেন্দ্র রাজ্য উভয় সরকারই বিপুল অর্থব্যয় করে মৌলবাদের তোষণ করছে এবং সাংবিধানিক ভাবে ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে ধূলিসাৎ করে ধর্মীয় আঙিনায় রাজনীতিকে বহুলাংশে আবদ্ধ করে ফেলছে। এর ফলে পরোক্ষ ভাবে আর.এস.এস-এর অ্যাজেন্ডাই শক্তিশালী হচ্ছে। কাজেই বাংলায় আর.এস.এস-বিজেপির ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে কার্যকরীভাবে রুখতে গেলে তৃণমূলের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। এই দক্ষিণপন্থী এবং অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির বিপরীতে বাংলার রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থাবিরোধী গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল শক্তি গুলিকে সংগঠিত করতে পারলে আগামী দিনে তা সমাজের গণতান্ত্রিক পরিসরকে আরও শক্তিশালী করবে, শ্রেণী-সংগ্রাম বিকাশের পক্ষেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দক্ষিণপন্থাবিরোধী গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এই শক্তিকে নয়া উদারবাদী অবস্থান ও তার প্রণয়নের সাথে সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা বজায় রেখে মেহনতি মানুষের লড়াই-আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই নিজস্ব সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক মতামত গড়ে তুলতে হবে। নিঃসন্দেহে এ’টি একটি কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী কাজ।
আমাদের নির্দিষ্ট প্রস্তাব :
১) যে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি এবং ব্যক্তিবর্গ সম্মতি প্রকাশ করছেন, তাঁদের সমন্বিত করে একটি ‘মঞ্চ’ গঠন করা হোক।
২) মঞ্চটি দক্ষিণপন্থাবিরোধী গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের হওয়া উচিত।
৩) এই মঞ্চের রাজনৈতিক চরিত্র ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার বিরোধী।
৪) এই মঞ্চ ‘নয়া উদারনৈতিক’ অর্থনীতি এবং তার যাবতীয় প্রণয়নের বিরোধী।
৫) নির্বাচন সহ সমস্ত রাজনৈতিক প্রশ্নে সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতেই এই মঞ্চ চলবে।
৬) প্রস্তাবিত মঞ্চটিকে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংগঠন হিসাবেই দেখতে হবে, পশ্চিমবাংলায় আগামীদিনে যার একটি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হবে।
৭) এই মঞ্চ মানুষের জীবন ও জীবিকা, সংস্কৃতি, লিঙ্গসাম্য ও পরিবেশসংক্রান্ত গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া প্রতিষ্ঠার জন্য লড়বে, খেটে-খাওয়া মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবে।
২৪শে ফেব্রুয়ারি এই মঞ্চের পথ চলার একটা সূচনা-বিন্দু মাত্র। আমরা মনে করি, এই ধরণের একটি দীর্ঘস্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করতে হলে একটি নিবিড় ও ধৈর্যশীল পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, নানান বিষয়ে খোলামেলা মত-বিনিময় ও আলাপ-আলোচনা করা দরকার, যাতে একটি ন্যূনতম সাধারণ বোঝাপড়ায় আমরা সবাই মিলে পৌঁছতে পারি। আগামীদিনে পথ চলতে চলতে, এবং সর্বোপরি, বাস্তব গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার মধ্যে দিয়েই এই মঞ্চ ক্রমশ পরিণত হয়ে উঠবে বলে আমরা আশা রাখি।
সংগ্রামী অভিনন্দন সহ,
আহ্বায়কমন্ডলী,
২৪/০২/২০২৬










