রুল অফ ১০০ বা একশ সংখ্যার নিয়ম। এতদিনে এ বাংলায় এই রুল অফ হান্ড্রেড বেশ পরিচিত শব্দ বন্ধ। সাপের কামড় নিয়ে সামান্য একটু যারা খবর রাখেন তারা সবাই এই জিনিসটি জানেন। বিষধর সাপের কামড় এর পর ১০০ মিনিটের মধ্যে ঐ রুগীকে ১০০ মিলি লিটার এন্টিভেনম দিতে পারলে রুগী ১০০% নিশ্চিত বাঁচবে। এই হল রুল অফ হান্ড্রেড।
১০০ মিলি লিটার মানে হল দশ লিলি লিটার এর দশটি বোতল বা ভায়াল। এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশের বাজারে এই দশ মিলি লিটার এর ভায়ালই পাওয়া যায়। তবে একটি কোম্পানী গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তারা পঞ্চাশ মিলি লিটার এর ভায়াল বাজারে আনছে। আর, আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট মাত্রারই পলি ভালেন্ট এন্টিভেনম (Polyvalent Antivenom) পাওয়া যায়। তাই এদেশে যে কোন বিষধর সাপের কামড় এর চিকিৎসা ঐ একই ওষুধ দিয়েই করা হয়। কামড়ের একশ মিনিটের মধ্যে ঐ একশ মিলি লিটার পরিমাণ ওষুধের প্রায়োগ নিশ্চিত করতে এই সহজ নিয়মটি চালু করা হয়েছে।
এটি কিন্তু পদার্থবিদ্যার কোন বাঁধাধরা নিয়ম বা ল এর মত নয়। যেমন নিউটনের গতির সূত্রগুলি; তাঁদের কোন ব্যতিক্রম হয় না। চিকিৎসা ব্যবস্থা যেহেতু জীবিত মানুষের শরীরের উপর প্র্য়োগ করার জন্য, এ ক্ষেত্রে পদার্থ বিজ্ঞানের মত বাঁধাধরা নিয়ম চলে না। প্রতিটি মানুষের শরীরের কাজকর্ম, রোগের লক্ষণ, বিষের প্রতিক্রিয়া আলাদা আলাদা হয়, তাই ঐ রুল অফ হান্ড্রেড এর অনেক ব্যতিক্রমও দেখা যায়। তার উপর আছে প্রতিটি সাপের বিষ প্রয়োগের আলাদা আলাদা মাত্রা। একই প্রজাতির একই আকারের একটি সাপ বিভিন্ন সময়ে, নানান কারণে, ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার বিষ শরীরে ঢোকায়। এই জন্যই সব সময় ঐ একশ মিলি লিটার ওষুধেই সব কাজ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চিত করে বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই পরে আরও একশ, এমনকি দুই শ মিলি লিটার ওষুধও দরকার হয়। কিন্তু ঐ প্রথম চিকিৎসা শুরু করার সময়ের উপর চিকিৎসার ফল অনেকাংশেই নির্ভর করে। আর একটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে; সাপের বিষ এর ওষুধ ঐ পলিভালেন্ট এন্টি ভেনম সবসময় একটি চালু স্যালাইনের সাথে মিশিয়েই প্রয়োগ করা হয়। তাই একশ মিনিটের মধ্যে একশ মিলি লিটার এন্টিভেনম রুগীর শরীরে ঢোকাতে হলে অন্তত এক ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করে দিতে হবে। এই রুল অফ হান্ড্রেড ব্যাপারটিকে একটি জন সচেতনতার শ্লোগান বলা যায়। আমরা এটি গত পনের বছর এর বেশী সময় ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে চলেছি। সুফলও পাচ্ছি। কিন্তু ঐ যে একবার বললাম, এটির অনেক ব্যতিক্রমও আছে। ব্যতিক্রমের ব্যাপারগুলি পরে বলছি।
দশ হাজার পদক্ষেপ কি? আমরা যে হাঁটি তার এক একটি পা ফেলে এগিয়ে চলাকে পদক্ষেপ বলা হয়। এই লেখার শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে, সাপের কামড় এর এই রুল অফ হান্ড্রেড কাজে লাগাতে বোধহয় দশ হাজার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, বা নিতে হবে। না, এই দশ হাজার পদক্ষেপ ব্যাপারটি সাপের কামড় এর সাথে যুক্ত নয়। যারা শরীরচর্চা করেন, বা অন্তত শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে একটু খোঁজ খবর রাখেন, তাঁরা এই দশ হাজার পদক্ষেপ ব্যাপারটি জানেন। সোজা কথা হল, শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত হাঁটতে হবে। এই নিয়মিত হাঁটা ব্যাপারটি একটু বুঝতে হবে। আমি চোখের রুগী দেখতে গিয়ে অনেক ডায়াবেটিস এর রুগী দেখি। এই রোগে হাঁটা ব্যাপারটি ওষুধের থেকে বেশী জরূরী। কিন্তু আমার রুগীদের সাথে কথা বলে দেখেছি, ৯০% রুগী হাঁটা ব্যাপারটি হয় জানেন না, কিংবা জেনেও হাঁটেন না। অনেকেই বলেন, আমাকে বাড়ীতে অনেক কাজ করতে হয়, তাতেই অনেক হাঁটা হয়ে যায়। আসলে শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে যে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হয় সেই হাঁটা কিন্তু ঐ বাড়ীর ভেতর কাজ কাম করার সময়ের হাঁটা নয়। শুধু হাঁটার জন্যই হাঁটতে হবে। সকালে বা বিকালে, কিংবা দুই বেলাই নিয়ম করে হাঁটতে বেরোতে হবে। এবার কথা হল, ন্যূনতম কতোটা হাঁটা শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য দরকার? এক্ষেত্রেও কিন্তু ঐ পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রের মত নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা বা মাপ নেই। হাঁটতে বললেই লোকে জানতে চায়, প্রতিদিন কতক্ষণ বা কত কিমি হাঁটতে হবে?
আগেই বলেছি, এর জন্য একেবারে বাঁধা ধরা কোন মাপ নেই। কেউ বলেন, দিনে অন্তত তিন-চার কিমি হাঁটুন। কেউ বলেন, অন্তত এক ঘণ্টা হাঁটুন। আবার কেউ বলেন ন্যুনতম দশ হাজার পদক্ষেপ প্রতিদিন হাঁটুন! শিরোনামের ঐ দশ হাজার পদক্ষেপ ব্যাপারটিতে এবার আমরা এসে গেলাম। এই দশ হাজার সংখ্যাটি আসলে ঠিক নয়। আপনি সকালে আর বিকালে মিলে, ধীরে সুস্থে, এক দুই জন সঙ্গীর সাথে গল্প করতে করতে দশ হাজার পদক্ষেপ হেঁটে নিতে পারেন। আর আমি সকালে বেরিয়ে, হনহন করে একা একাই পাঁচ হাজার পদক্ষেপ হেঁটে আসি। আপনার ঐ দ্বিগুণ হাঁটার থেকে আমার এই হনহন করে, চুপচাপ হাঁটা অনেক বেশি কার্যকর। আপনি পাঁচ হাজার পা হাঁটার সময় দিতে পারেন, তাই দিন। কিন্তু হাঁটাটি হতে হবে “হনহন” করে। একে পরিভাষায় বলা হয়, “ ব্রিস্ক ওয়াকিং!” আসলে যেটুকুই হাঁটুন যেন ঘাম বেরিয়ে যায়। তাই না হলে সে হাঁটার কোন মূল্য নেই।
তাহলে “দশ হাজার পদক্ষেপ” ব্যাপারটি কোথা থেকে এল? এর তাৎপর্য কি? এই “দশ হাজার পদক্ষেপ” শব্দবন্ধ আসলে একটি শ্লোগান। আমাদের ঐ “রুল অফ হান্ড্রেড” এর মতোই একটি শ্লোগান। জনগণকে সচেতন করতে আমরা কিছু “বনের মোষ তাড়ানো” লোক রুল অফ হান্ড্রেড নিয়ে পড়েছিলাম, আজও আছি। এতে আমাদের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা মুনাফা নেই। কিন্তু ঐ “দশ হাজার পদক্ষেপ” ব্যাপারটি একটি জাপানী কোম্পানির তৈরী। তাঁরা পদক্ষেপ বা ফুট ষ্টেপ গোনার একটি মেসিন বের করে। সেটির বিক্রীর জন্য ঐ শ্লোগান বাজারে ছেড়ে দেয়। স্টেপ গোনা ব্যাপারটি খুব সহজ নয়। আমি নিজে গত বছর দশেক হল প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে ৫৫ মিনিট মত হাঁটি। বেশ হনহন করে হেঁটেও খুব গুমোট গরমের সময় ছাড়া ঘাম বের হয় না। কিন্তু ঐ সময়ে কত পদক্ষেপ হাঁটি বা কত কিমি হাঁটতে পারি সেটা গুনে বা মেপে দেখা হয়নি। আমার পাড়ার থেকে বেরিয়ে, দমদমের পাড়ার ভেতরে ভেতরে একটি নির্দিষ্ট পথেই আমরা প্রায় প্রতিদিন সকালে হাঁটি। সময় ঠিক ঐ ৫৫ মিনিটেই। পরে মাঝে মাঝে নিউ টাউনে অনেক চওড়া, ফাঁকা রাস্তা ধরেও ঐ ৫০-৫৫ মিনিট হেঁটে দেখেছি , মোটামুটি চার কিমি রাস্তা হয়। মোবাইলে পেডো মিটার অ্যাপ ব্যবহার করে, মেপে দেখে জানলাম, আমার ঐ ৫৫ মিনিটে পাঁচ হাজার পদক্ষেপ হাঁটা হয়। (আমি সাড়ে বাহান্ন মিনিটে পাঁচ হাজার সাতশ পদক্ষেপ হেঁটেছি; এটা কিন্তু নিউ টাউন এর ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটা) আমার পরিচিত লোকজন যাঁরা নিয়মিত হাঁটেন তাঁদের কেউই এর থেকে বেশী হাঁটেন না। আমার কলেজের এক দাদা, আমার থেকে প্রায় পনের বছর বেশী বয়স, উনি একমাত্র আমার থেকে বেশী হাঁটেন। তাছাড়া উনি নিজের বাগানে আরও ঘণ্টা দুই পরিশ্রম করেন।
তাহলে এটা বোঝা গেল, নিয়মিত হাঁটা অভ্যেস যাদের তাঁরাও কেউ প্রতিদিন দশ হাজার পদক্ষেপ হাঁটতে পারেন না। তবে কি তাঁরা সুস্থ নেই। যাঁরা একেবারেই হাঁটেন না তাঁদের থেকে যাঁরা নিয়মিত অন্তত পাঁচ হাজার পদক্ষেপ হাঁটেন তাঁরা অবশ্যই বেশী সুস্থ আছেন। আমাদের ঐ রুল অফ হান্ড্রেড এর ক্ষেত্রেও তাই। একেবারে ১০০ মিনিটের মধ্যে শরীরে ১০০ মিলি এন্টিভেনম দেওয়া হয়েছে এমন রুগীর সংখ্যা পাঁচ শতাংশের কম। আমাদের হিসেবে ৮০% সাপে কাটা রুগী দুই ঘণ্টা পার করে হাসপাতালে পৌঁছয়। বিশেষ করে চন্দ্রবোড়া সাপের কামড় এর ক্ষেত্রে এই দেরির জন্য অসংখ্য রুগীর কিডনী আক্রান্ত হয়, তাঁদের বাঁচানোর জন্য ডায়ালিসিস দরকার হয়। রুল অফ হান্ড্রেড এর ব্যতিক্রমের ব্যাপারগুলি বিস্তৃত লেখার সুযোগ এখানে নেই। শুধু একটি জিনিস জানিয়ে এই নিবন্ধ শেষ করতে চাই। ৯৯% ক্ষেত্রে কালাচ্ বা কাল চিতি সাপ কখন কামড়েছে জানা যায় না। তাই কালাচের ক্ষেত্রে একশ মিনিট গোনা শুরু করতে হবে, শিবনেত্র দেখার সময় থেকে। এই নিয়ে আরও জানতে চাইলে আমাদের ওয়েব সাইট www.dayalbandhu.vip দেখতে পারেন।
২৪.২.২০২৬











