কালচক্র যেহেতু সতত ঘুর্ণায়মান, ভবিষ্যতকালে যা যা ঘটবে সেই সব কাহিনি সর্বকালবেত্তাদের কাছে কিছুই অজ্ঞাত নয়। আর লেখকের কলম আর পাঠক যেহেতু সর্বকালবেত্তা, তাই কালাতীত কাহিনিসমূহ তাদের কাছে অনায়াসলব্ধ।
তারাও চাইলেই সেই সব রহস্য সহজে জানতে পারে।
অতীব বিস্ময়ের ব্যাপার একই ধরণের কাপাস তুলো নানা কালে সময়ের তকলিতে ঘুরে ঘুরে একই ধরণের কাহিনি-সুতো তৈরি করে। সেই রকমের এক কাহিনি আজ শোনাই।
সুদূর ভবিষ্যতে এই কাহিনি ঘটেছিল। সতর্ক ভাবে খেয়াল না করলে এটি সমকালীন ঘটনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সমকালের সঙ্গে এই ঘটনার কোনই যোগ নেই। এটি ভবিষ্যতের এক হস্তি সাম্রাজ্যে ঘটেছিল। যেহেতু ঘটনা ভবিষ্যৎ কালের কাজেই কাহিনি বর্ণনায় ক্রিয়াপদের প্রচলিত পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় থাকবে না।
সেই সুদূর ভবিষ্যৎকালে ভাতর বলে এক দ্বীপরাষ্ট্র ছিল। নামকরণের ইতিহাস ঐতিহাসিক ভাবেই সরল। সেই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের মূল আহার্য ছিল ভাত। এই কারণেই দেশের নাম ভাতর হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করে।
ভাতরের অধিবাসীরা নিজেদেরকে ভাতরীয় বলে বিবৃত করত। তারা নিজেদের দেশ নিয়ে এতটাই গর্বিত ছিল যে তারা,
– এই দেশেতেই জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি…
এই জাতীয় ইচ্ছা প্রকাশ্যেই বলাবলি করত।
যদিও এই ইচ্ছা প্রকাশের ফলেই তাদের অর্থাৎ আম ভাতরীয়দের সমূহ বিপদ উপস্থিত হয়েছিল। সেই বিপদের কথা যথাকালে বলা হবে।
ভবিষ্যতের সেই ভাতর রাষ্ট্রের শাসকেরা জন্মগতভাবে মানুষ ছিল যদিও, কিন্তু পরবর্তীতে কালপ্রভাবে ও বৈজ্ঞানিক উত্তরণে সেই শাসকেরা সবাইই হয়ে দাঁড়িয়েছিল হাতির জিন বিশিষ্ট মানুষ।
ঠিক কী কারণে জানা যায় না, গণতন্ত্র নামের এক সোনার পাথরবাটি(যা আসলে ইনিকিউবেটর)-তে রেখে ভাতরীয় জনগণ সেই হস্তিমানবদের তৈরি করত।
এই সোনার পাথরবাটির ক্ষমতা ছিল অসীম আর অলঙ্ঘ্যনীয়। যে কোনও সাধারণ মানুষকে এই ইনকিউবেটরে কিছুদিন রেখে পরিপক্ব করে তুললে তার মধ্যে হাতির জিন ক্রমশ পরিলক্ষিত হয়। কালে কালে সে অতিভোজী বৃংহনপটু ও মনুষ্যদলনকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনক কিছু সংস্কারবশে ভাতরীয়রা দিনের পরে দিন এই হস্তিমানবদের সহ্য করে। বস্তুতঃ সহ্য করতে বাধ্যও হয় কেন না হস্তিমানবদের আজ্ঞাধীন নিষ্ঠুর কোতোয়াল(অর্থাৎ যারা বিনা কারণেও কোতল করতে পারে) আর বেতনভুক কাজিরা হস্তিপ্রভুদের রক্ষা করতে সদা অতন্দ্র থাকে।
ভবিষ্যতের যে কালখণ্ডের কথা বলছি, সেই সময় ভাতরের প্রধানহস্তি ছিল ইতিহাসবিখ্যাত নোরু। নোরুর প্রকৃত পদবী কী ছিল সেই সম্বন্ধে আলোচনা অনিরাপদ জ্ঞানে আমরা পরিহার করব। নোরুর নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে যা জানা যায়, তাও পরস্পরবিরোধী।
কেউ কেউ বলে এটি নরসুন্দর নামের সংক্ষিপ্তরূপ। কিন্তু নরসুন্দরই বা কেন? এই শব্দটার উৎপত্তি কোথা থেকে?
অবধান করুন। নামটা এক অদ্ভুত উপায়ে অর্জিত। ইংরাজিতে সেভ ইয়োর স্টেট (Save your state) আদর্শটি ভাতরের পুরোনো শাসকেরা একদা নাকি বলে গিয়েছিল। কালক্রমে ছাপার ভুলে প্রথম শব্দে একটা এইচ ঢুকে যায়। কথাটা গিয়ে দাঁড়ায় Shave your state। যেহেতু সোনার পাথরবাটিতে পাওয়া সমস্ত দলিল আর তমসুক আগেই বলেছি, অলঙঘ্যনীয়, কাজেই শাসককে সেটি করতেই হবে। নোরু তার স্বদেশের দাড়ি গোঁফ কামাতে শুরু করে।
তার থেকেই নাকি ওই নরসুন্দর নামের উৎপত্তি। আর তার থেকে সংক্ষিপ্ত হয়ে নোরু।
এই কামানোর ফলে সে নিজে আর তার বন্ধুরাও প্রভূত কামায়।
আবার নোরু-র একনিষ্ঠ ভক্তেরা বলে এই শব্দটি প্রকৃতপক্ষে অ্যাব্রিভিয়েশন। ইংরেজি ‘নোবল রুলার’ শব্দটির সংক্ষিপ্ত রূপই হল নো-রু। উল্টোদিকের নিন্ধুকেরা বলে অ্যাব্রিভিয়েশন ঠিকই। তবে সেটা ভাতরের বর্তমান মাৎস্যন্যায় মানে ‘নো রুল’ অবস্থাটির।
আমরা এই সব বিতর্কে যাব না।
নোরু যদিও দেশকে কামায়, প্রধানহস্তি হবার পর, সে কিন্তু নিজের দাড়ি বর্ধিত করেছে যত্নভরে। তার পরিধেয় জ্যাকেট ও কামিজ সোনার সুতোয় বোনা হয়। সে মূলত নিরামিষাশী হয়েও নরমাংসভোজী এই রকম নানা গুজব তার সম্বন্ধে ছড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু যে কথাটি আদতেই গুজব নয় তা হল প্রধানহস্তি এই নোরু, নিজে উদ্যোগী হয়ে আদা নিয়ে যার কারবার এমন একজন ব্যাপারীকে রাষ্ট্রের অর্থে জাহাজ ভর্তি করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
একই রকম অবস্থা বিরাজমান ভাতর নামের এই দ্বীপরাষ্ট্রের সব প্রদেশেই। ভাতরে ফেডুফেডু শাসনব্যবস্থা বিরাজমান। এইখানে ভাতর রাষ্ট্রের ফেডুফেডু শাসনব্যবস্থার ব্যাপারে কিছু জেনে নিতে হবে।
নয়াখিল্লি নামের রাজধানীতে থাকেন কেন্দ্রীয় সর্বময় শাসক শ্রীমান নোরু। তাঁর পদের নাম প্রধানহস্তি। কিন্তু প্রদেশে প্রদেশেও ওই গণতান্ত্রিক সোনার বাটির থেকে উত্থিত অন্যান্য শাসকেরা আছেন। সেই সব প্রদেশে মুখ্যহস্তি আর হস্তিনীরা শাসন পরিচালনা করেন। কোনও কোনও মুখ্যহস্তি কেন্দ্রের প্রধানহস্তি নোরুর একই দলের বিধায় কেন্দ্রের তথা নোরুর অনুগত। কিন্তু সকল মুখ্যহস্তি তা নয়।
আমরা এই অকিঞ্চিৎকর কাহিনির শেষদিকে চলে এসেছি।
ভাতরবাসীরা বেশি কিছু চায় না। শুধু খিদে পেলে ভাত চায়।
তারা এই প্রসঙ্গ উঠলে সুপ্রাচীন একটি কবিতা উদ্ধৃত করে,
“অন্ন বাক্য অন্ন প্রাণ অন্নই চেতনা
অন্ন ধ্বনি অন্ন মন্ত্র অন্ন আরাধনা।
অন্ন চিন্তা অন্ন গান অন্নই কবিতা
অন্ন অগ্নি অন্ন বায়ু নক্ষত্র সবিতা।
অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি, সর্বধর্মসার
অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওঙ্কার।
সে অন্নে যে বিষ দেয় কিংবা তাকে কাড়ে
ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে।”
কিন্তু প্রধানহস্তি তাদের পুরোনো কথা মনে করিয়ে দেন।
কাহিনির প্রথমেই যা বলেছিলাম, তারা মানে ভাতরীয়রা একদা প্রবল গর্বিত উচ্ছ্বাসে গান গেয়েছিল,– আমার এই দেশেতেই জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি।
প্রধানহস্তি তাঁর মনের কথা নামের বিখ্যাত ভাষণে সেই কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন একাধিক বার। বারবার বলেছেন,– কই রে শ্যালকপুত্রেরা, সেই কবে মরবি বলেছিলি, এখনও মরলি না যে।
বস্তুত খালি ভাষণই নয়, মুদ্রাবাতিল আর নানা রকম অকারণ ধরপাকড়ে তাঁর নিজের উদ্যোগও ভাতরীয়দের মারার ব্যাপারে কম নয়।
বিভিন্ন প্রদেশের মুখ্যহস্তিরা যদ্যপি সোনার পাথরবাটি দ্বারা ঘটিত জেনেটিক পরিবর্তনের কল্যাণে সকলেই ক্ষমতাবান কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা অনেকেই ‘আমি স্বয়ং নয়াখিল্লির প্রধানহস্তি হবো’ এই জাতীয় আশা পোষণ করে।
কোনও আদর্শের কারণে নয়, স্রেফ সেই ক্ষমতা দখলের কারণে তারা ক্ষমতাদর্পী নোরু মহারাজকে জনগণের অছিলায় বিব্রত করে স্থানচ্যুত করতে চায়। গণ্ডের ওপরে পিণ্ডের মত সেই অবাধ্য হস্তিমানবদের পেছনে আবার জনসমর্থনও রয়েছে। কারণ সহজেই অনুমেয়। ভাতর রাষ্ট্র নামকরণ যে কারণে সেখানে এখন সেই ভাতেরই অভাব। তাই মুর্খ নির্বোধ অভুক্ত প্রকৃত মানুষেরা কোনও কোনও হস্তিমানবকে তাদের বিদ্রোহের অবলম্বন হিসেবে ভাবতে চায়।
সন্ত্রস্ত প্রধানহস্তি নোরু আর তাঁর সুনিপুণ মাহুত ‘শ্রী ১০৮ আদা নিয়ে ব্যস্ত’ দুজনেই অতি চতুর ও বুদ্ধিমান। তাঁরা লাইব্রেরি থেকে একটি প্রাচীন বইয়ের ডিজিট্যালাইজড্ কপি উদ্ধার করেছেন। বইটা দুরূহ কেন না সেটি অধুনা অপ্রচলিত বাংলা লিপিতে প্রস্তুত।
তাঁরা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সেটি পড়িয়ে তার থেকে এক বুদ্ধি উদ্ধার করেছেন। হস্তিসংক্রান্ত বইটির লেখক ধৃতিমান লাহিড়ী চৌধুরী।
সেই ‘হাতির বই’ পুস্তকে অবাধ্য বন্য হাতি ধরা ও বশ করার অধ্যায়ে কুনকি হাতি প্রয়োগের ব্যাপারে বলা আছে।
নিজেদের জেনেটিক প্রোফাইলের সঙ্গে যার প্রোফাইল ম্যাচ করে তেমনই একজনকে শ্রী প্রধানহস্তি খুঁজে বার করেছেন। সে হল তাঁরই সমকালীন এক ভঙ্গরাজ্যের মুখ্যহস্তিনী।
বস্তুত এটা খুবই বিস্ময়কর যে ঐতিহাসিক ভাবে প্রধানহস্তি শ্রীমান নোরু যে যন্ত্রে তৈরি সেই একই ইনকিউবেটরে তৈরি সেই মুখ্যহস্তিনীও।
ইনকিউবেটরের নামটা অদ্ভুত। সেই নামটি হল,
– আরে শেষ করো!
এই মুখ্যহস্তিনী জন্মাবধি জানে, এই কুনকিবৃত্তির জন্যেই সে জেনেটিকভাবে তৈরি।
কাজেই প্রধানহস্তি নোরু সেই তাকেই গোপন নির্দেশে কুনকি হাতি হিসেবে নিয়োগ করে ভঙ্গপ্রতিবেশী উড্র রাজ্যে শুধু নয়, আপাতবিদ্রোহী বন্য মুখ্যহস্তি যেখানে যেখানে আছে সেই সমস্ত অরণ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
শেষ খবর পাওয়া অবধি কুনকি হাতিটি বিভিন্ন অরণ্যে গমনাগমন শুরু করেছে।
প্রধানহস্তি খবর শুনে নিশ্চিন্ত হয়েছেন। তিনি মাহুতকে পত্রযোগে কোড-ল্যংগুয়েজে জানিয়েছেন,– প্রিয় ‘আদা নিয়ে ব্যস্ত’ মহাশয়, জেনে খুশি হবেন আপনার জাহাজের ছিদ্র মেরামত করার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।










