১৩ এপ্রিল ২০২৬ ভারতের ইতিহাসে একটি কালো দিন। সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণাকারী বাবা সাহেব আম্বেদকারের জন্মদিনের আগের দিন পশ্চিমবঙ্গের এক বিরাট অংশের মানুষ চরম বৈষম্যের শিকার হলেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জোরের সঙ্গে জানিয়ে দিলেন ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষিত হবার আগে ভোটাধিকার দেবার প্রশ্নই উঠছে না। এই বারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়া শেষ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। SIR অসাংবিধানিক এই দাবিতে যে শক্তিশালী মামলাটি করা হয়েছিল তারও কোন আশু নিষ্পত্তি হবে না ভোটের আগে। সার্বিকভাবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার পরিপন্থী কাজ করল দেশের উচ্চতম ন্যায়ালয়।
‘Under adjudication’ থেকে deleted হয়ে ট্রাইব্যুনালের সামনে অনন্ত লাইনে দাঁড়ানো ২৭ লক্ষের বেশি মানুষ এবং ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে কোন কারণ না দেখিয়ে deleted সাড়ে পাঁচ লক্ষ – প্রায় ৩৩ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়েই নির্বাচনী যুদ্ধ হবে।
১৬ এপ্রিল ২০২৬ সংবিধানের ১৪২ ধারা প্রয়োগ করে ফ্রিজ করে দেওয়া তালিকা আবার খোলার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ঘোষণা করেছে নির্বাচনের দু’দিন আগে পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের ছাড়পত্র মিললে ভোট দেওয়া যাবে। এই রকম ভাবে SIR যেমন এই প্রথম, ভোটার তালিকা শেষ না করে ভোট যেমন এই প্রথম, তেমনই ফ্রিজ করে দেওয়া তালিকায় নতুন ভোটার ঢোকানোও এই প্রথম। এতে উচ্ছ্বসিত হবার বিন্দুমাত্র কারণ নেই, নির্বাচনের আগে ট্রাইব্যুনালে আর খুব অল্প সংখ্যক ভোটারের ভাগ্য নির্ধারিত হবার সুযোগ আছে।
এই মুহূর্তে রাষ্ট্র শক্তির ইচ্ছা প্রতিষ্ঠিত হলেও সাময়িক পশ্চাদপসরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে কী করে আবার লড়াই শুরু করা যায়, কী পদ্ধতিতে করা যায়, সেটা ঠিক করেই সময়ের ডাকে সাড়া দিতে হবে।
৬০ লক্ষাধিক বিচারাধীন ভোটারতালিকা থেকে প্রায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি ভোটাধিকার হারিয়েছেন, এর মধ্যে বিপুল সংখ্যায় মুসলিম, দলিত, আদিবাসী, মতুয়া এবং মহিলা। সংখ্যালঘু-প্রধান জেলা গুলিতে ভোটাধিকার বঞ্চিতের সংখ্যা তুলনামুলক ভাবে অনেক বেশি। ভোটাধিকার হারানো ৩৩ লক্ষ মানুষের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যাধিক্য ফ্যাসিবাদী শক্তির বিভাজনের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করে।
কিছু অতি উৎসাহী মানুষ নানা নিদান ঘোষণা করছেন। এই উৎসাহব্যঞ্জক আহবানে উত্তেজনা থাকলেও কোন বাস্তবতা নেই। নানা দিক থেকে বহু প্রচেষ্টা করেও SIR আমরা ঠেকাতে পারিনি, আদালত মোতাবেক ভোট হবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে, এটা ধরে নেওয়াই বাস্তবসম্মত। বিজেপি সরকারের SIR চক্রান্তকে পরাস্ত করবে রাজ্যের শাসক তৃণমূল – এই চিন্তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অন্যান্য সংসদীয় দলগুলিও SIR এর অপ্রতিরোধ্য রথ রুখতে ব্যর্থ। বাংলার ইতিহাসে ৩৩ লক্ষ মানুষকে বাদ রেখে এক নজিরবিহীন ভোট সম্ভবত হয়ে যাবে কয়েক দিন পরেই।
শাসক গোষ্ঠী গণতন্ত্রের উপর আঘাত হানছে নানা দিক থেকে। ওষুধ, জ্বালানি সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশ ছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপারগ কেন্দ্রীয় সরকার, নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে তিন দিনের বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন শুরু করেছে। প্রথম দিন লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ (‘নারীশক্তি বন্দন অধিনিয়ম’) সহ ডিলিমিটেশন ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আসন পুনর্বিন্যাস করার জন্য তিনটি বিল পেশ করেছে। যার একটি অন্যটির সাথে যুক্ত। বাঙলায় বিপুল সংখ্যক ভোটারকে বাইরে রেখে ভোটের দুঃখজনক সময়ে আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিকার রক্ষার বিষয়ে দৃষ্টি সজাগ রাখাও সময়ের দাবি।
সংগ্রামী গণমঞ্চ ভোটাধিকার বঞ্চিত ৩৩ লক্ষ মানুষের কাছে আবেদন করছে তাঁরা যেন এক মুহূর্তের জন্যও ক্ষমা না করেন এই ফ্যাসিস্ট আগ্রাসী শক্তিকে, এক মুহূর্তের জন্যেও যেন তাঁরা না ভোলেন এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে SIR আটকায়নি এই রাজ্যের সরকার। যাঁরা ভোট দেবেন তাঁরাও যেন প্রতি মুহূর্তে মনে রাখেন তাঁদের পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী, সহমর্মীদের এক বিরাট অংশ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন ! যাদের চক্রান্ত মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করল, বাংলার ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।
এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি এবং সংগঠনগুলির বিশেষ দায়িত্ব থেকে যায়। সংগ্রামী গণমঞ্চ রাষ্ট্র কর্তৃক উপেক্ষিত, ভোটাধিকার বঞ্চিত এই মানুষদের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলি এবং আরো কিছু প্রগতিশীল সংগঠন বিভিন্ন এলাকায় মানুষের জন্য আইনি এবং অন্যান্য সহায়তার দরজা খুলে রেখেছে। ধৈর্য ও বিবেচনা সহকারে পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হবে। এমন কিছু কাজ করা ঠিক হবে না যাতে শাসকের হাত শক্ত হয়।
অগণিত মানুষের অসম্মান আর বঞ্চনা ধুলোয় মিশে যাবে না। কড়ায় গণ্ডায় এর হিসাব নিতে হবে। নির্বাচনের আগে এবং পরে এই জনবিরোধী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, দলিত, আদিবাসী, নারী, সংখ্যালঘু – সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে নিপীড়িত এবং শোষিত মানুষের দীর্ঘস্থায়ী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই ফিরে পেতে হবে হারানো অধিকার। নয়ডা, মানেসর, পানিপথ, সিজিমালি নতুন সংগ্রামের দিশা দেখাচ্ছে।
এক নির্বাচনে সব যুদ্ধ শেষ হবে না।
সংগ্রাম চলছে, সংগ্রাম চলবে।










