শোনো এক গাঁয়ের কথা শোনাই শোনো
রূপকথা নয় সে নয়।……
এমন এক গাঁয়ের কথা পড়ে আমার অবশ্য রূপকথা বলেই মনে হয়েছিল। আর মনে হবে নাই বা কেন? ভারতবর্ষের মতো একটা দেশে যেখানে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে জাতপাতের বেড়া তোলা, যেখানে এই জাতপাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের শাসন ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য রাজনীতি, যেখানে এখনও উচ্চ আর নিম্নের চুলচেরা বিভাজন, যেখানে মানুষকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দেবার আগে অনুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয় মানুষের ধর্ম, বর্ণ,জাত,পাতের পরিচয়, সেখানে এমন জাতপাতের বিভাজনকে সর্বসম্মতিক্রমে বিসর্জন দেওয়া একটা গ্রামের কথা শুনলে রূপকথার গল্প ছাড়া আর কিইবা মনে হবে?
গ্রামের নাম সৌন্দালা। রাজ্যের ব্যস্ত রাজধানী থেকে এই গ্রামীণ জনপদের অবস্থান ৩৫০ কিলোমিটার দূরে। এখানেই অবস্থান এই রূপকথার গ্রামের। রূপকথার শর্ত মেনে এখানে একজন রাজা স্থানীয় প্রশাসক আছেন বটে, তবে এমন এক সব পেয়েছির দেশে সবাই রাজা অথবা রাণী। এইসব মানুষদের জন্যই সৌন্দালা এক আশ্চর্য রূপকথার দেশ।
এক বিকেলের গপ্পো বলি। গোধূলির ম্লান আলো সন্ধ্যার অন্ধকারে আড়াল হতেই এক ট্রে ভরা চায়ের কাপ আর কিছু নোনতা গাঁঠি ভাজা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে এক তরুণী গৃহবধূ। আজ সান্ধ্য চা পানের আসর বসানোর পালা পড়েছে এই বাড়ির মানুষদের ওপর। গৃহবধূটি গরম গরম চায়ের পেয়ালা এগিয়ে দেয় সকলের হাতে হাতে। চায়ের পেয়ালায় চুমুক চড়াতে চড়াতে খোশ গল্পে মেতে ওঠে সবাই। সেই আসরে হাজির সৌন্দালা গ্রামের সরপঞ্চ সাহেব সকলকে ধন্যবাদ জানান। আসরের কোলাহল ধীরে ধীরে শান্ত হয়।
সৌন্দালা গ্রাম সভার আধিকারিকরা খুব সম্প্রতি এক সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে : গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ গ্রাম সভার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ওই দিন থেকেই তাঁদের গ্রামকে বর্ণহীন ( Caste Free ) গ্রাম হিসেবে মান্যতা দেওয়া হলো। এর অর্থ হলো ঐ দিন থেকে কোনো মানুষকেই তাঁর কাস্ট বা বর্ণ পরিচয়ের নিরিখে বিচার করা হবে না । এতোদিনের চেনা বর্ণ ভিত্তিক সামাজিক স্তরায়নের অবসান ঘটিয়ে মানবতার পরিচয়কেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সৌন্দালায়।
এতোদিনের বেড়া ভেঙে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়টি যে নেহাতই কাগুজে সিদ্ধান্ত নয় তা প্রমাণ করার ঐকান্তিক তাগিদ থেকেই গ্রাম সভার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে চা পানের আসর বসিয়েছিলেন এক দলিত পরিবারের মানুষের বাড়িতে। এই অনুষ্ঠানটি নির্বাচনের আগে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মতো লোকদেখানো আয়োজন নয়, সৌন্দালা নতুন যুগের দিশারী।আর তাই এখন থেকে গ্রামের সমস্ত ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা একসাথে খেলা করছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত বেড়া পেরিয়ে, গ্রামের সমস্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে সম্মিলিতভাবে সব রকম বিধিনিষেধ এড়িয়ে।
কেন এমন সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী? আসলে সৌন্দালার মতো এক অখ্যাত গ্রামীণ জনপদের গ্রাম সভার আধিকারিকরা সম্মিলিতভাবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা ভেবেছেন তা সবদিক থেকেই বৈপ্লবিক। রাজধানী মুম্বাই থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গতানুগতিকতার নিগড়ে বাঁধা এক অনালোড়িত গ্রাম সমাজের মানুষ দেশজুড়ে এমন নতুন ভাবনার তরঙ্গ তুললেন কোন্ মন্ত্রবলে ? এই ঘটনার আগে মহারাষ্ট্রের এই জেলাকে চিনতো সামাজিক বয়কট আর বর্ণভেদের আঁতুরঘর বলে। আর আজ? পাঁচ ফেব্রুয়ারির সিদ্ধান্ত রাতারাতি বদলে দিয়েছে এতোদিনের সব পরিচিতি। সৌন্দালার সুগন্ধ এখন ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে।
“ আমাদের দেশে গরুকে মা হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয় অথচ একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে আমাদের কতো দ্বিধা! এটা অন্যায় । এই দৃষ্টিভঙ্গির আশু পরিবর্তন হওয়া দরকার। এ কেমন সমাজ আমাদের যেখানে কোনো বিশেষ বর্ণের মানুষের কাছ থেকে জিনিসপত্র কেনা বা তথাকথিত নিম্নবর্ণের চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করা হয়? এমন সব অন্ধকার যুগের ভাবনা যাতে আমাদের সৌন্দালার মানুষজনের মধ্যে শিকড় গাড়তে না পারে সেজন্যই আমরা আগেভাগেই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। আমরা আশাবাদী যে এরফলে আমাদের সৌন্দালা সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার অনন্য পরিচয়ের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারবে।”
শারদ জানিয়েছেন যে এই বর্ণহীন প্রশাসনের কথা তিনি প্রথম শুনেছিলেন একজন সমাজকর্মী প্রমোদ জিনজাদের কাছে। এছাড়া তাঁর বাবা এবং স্ত্রী দুজনেই তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দিয়েছেন। শুধুমাত্র বর্ণহীন গ্রাম প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েই থেমে থাকেনি সৌন্দালা। আরও কিছু জরুরি নিয়ম কানুন প্রবর্তনের ঘোষণা করেছেন তারা, যেমন কারো সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করা এবং মিথ্যা বদনাম করা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হবে, গ্রামের বিধবা মহিলাদের পুনর্বিবাহের আয়োজন করা এবং নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানোকে সর্বস্তরে প্রাথমিকতা দেওয়া।
২০২৩ সালের আগে পর্যন্ত বর্তমান আহিল্যানগর জেলাটি আহমেদনগর নামেই পরিচিত ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের ধর্মীয় মেরুকরণের নির্লজ্জ প্রচেষ্টায় বিভ্রান্ত হয়ে এই এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, নীতিহীন ভ্রষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের নিরন্তর উস্কানিমূলক বিবৃতি, সংখ্যালঘুদের বয়কট, মন্দির মসজিদ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক বিসম্বাদে এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। সেই অবস্থাকে পেছনে ফেলে নতুন ভাবনায় মানুষজনকে ভাবিত করে উন্নয়ন পথ পাড়ি দেওয়া যে মোটেই সহজ নয়,তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।
দীর্ঘদিনের অসমতা আর বিভেদের আবর্জনা পরিষ্কার করে এক নতুন সৌন্দালার জাগরণ হচ্ছে। এখন প্রতিদিন সকাল দশটায় গ্রামের মন্দিরের ওপর বাঁধা লাউডস্পিকারে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। সকলে উঠে দাঁড়িয়ে তার প্রতি বিধিবদ্ধ সম্মাননা জ্ঞাপন করেন। গ্রামের সমস্ত মন্দির, মসজিদ, গির্জায় সকলের প্রবেশ অবারিত। এতোদিনের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে।
শারদ তাঁর প্রতিবেশীদের বলেছেন, আমাদের সকলের রক্তের রঙ লাল, গেরুয়া, নীল বা সবুজ। আমরা সবাই দেশমাতৃকার কাছে দায়বদ্ধ। আমাদের অন্য কোনো ধর্ম বর্ণ জাতপাত নেই। আমাদের সকলের ধর্ম মানবিকতা। আজ থেকে এই হোক সৌন্দালার সমস্ত মানুষের একমাত্র পরিচয়।
ঋণ স্বীকার: দ্যা প্রিন্ট।
মার্চ ১১ ,২০২৬











শুনতে স্বপ্নের মত। উদ্যোক্তাদের প্রণাম জানাই। এমন স্বপ্নদ্রষ্টা প্রতি গ্রামে জন্ম নিক,প্রতিটি গ্রাম সৌন্দালা হয়ে উঠুক !
ধন্যবাদ সৌমেন। এতো ডামাডোলের মধ্যেও যে স্বপ্ন দেখি আমরা তা এমন খবরগুলোর জন্যই। সারা দেশ ও ছোট্ট গ্রামের মতো হয়ে উঠলে আত্মসর্বস্ব নেতৃকুলের কী হবে? এমন একটা বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেও সৌন্দালার মানুষজন নিরুত্তাপ। ওদের আরও স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিতে হবে।
Darun!!!
সত্যিই তাই। লেখাটা পড়ে যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্রকাশ তাই হলো লেখকের জন্য সেরা পুরস্কার। ধন্যবাদ।
সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওরকম গোঁড়া অঞ্চলে দাঁড়িয়ে সৌন্দালা গ্রামের এই পদক্ষেপ একপ্রকার অবিশ্বাস্য! গ্রামপ্রধান গ্রামবাসীদের মধ্যে চেতনার প্রসারে শিবাজী মহারাজের উদাহরণ ও যে সকল যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন তা আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। সৌন্দালার হাত ধরে অন্তত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোও দ্রুত গোঁড়ামিমুক্ত হোক এটাই প্রার্থনা। আর এরকম সদর্থক সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এগুলো কেন ভাইরাল হয় না?
ধন্যবাদ অভ্রদীপ। প্রবাসে থেকেও যে সময়করে ধৈর্য ধরে লেখাগুলো পড়েছো এবং এমন মন্তব্য করে পাঠাচ্ছো তার জন্য লেখক হিসেবে আমি খুব আশাবাদী যে একদিন আমাদের উত্তর প্রজন্মের হাত ধরেই নতুন ভারত জেগে উঠবে।
প্রথমেই আমি শুভেচ্ছা জানাই,সৌন্দালার সকল মানুষ কে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ভাবে চারিদিকে জাতপাত ধর্মের প্রাবল্য এক অস্থির ভয় বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছে সেই খানে এই নিঃশব্দ বিপ্লব অবশ্যই প্রশংসা যোগ্য।আর এই প্রতিবেদন টির জন্য লেখক কে ধন্যবাদ।
সৌন্দালার কথা অমৃত সমান
সোমনাথ মুখো ভণে
শোনো পুণ্যবান।
দারুন ব্যাপার! খুব ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে। এই বার্তা ছড়িয়ে পরুক গ্রাম থেকে গ্রামে।
ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব পাঠকদের। ছড়িয়ে পড়ুক।এমন খবর লাখে একটা মেলে।