হাসপাতালের ছাপানো বিলে নামটা দেখে চমকে উঠলাম। ঘেন্না বায়েন।
-সে কী ! এমন নাম কেন!
-আমার আগে তিন দিদি। আমি মায়ের চার নম্বর মেয়ে। তাই…
খুব অনাটকীয় ভাবে, মুখে কোনও অভিব্যক্তি ছাড়াই বললো মেয়েটা। বুঝলাম ছোটবেলা থেকে অজস্রবার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে এই নামকরণের। তাই উত্তরে ঈষৎ ক্লান্তি মেশা যান্ত্রিকতা।
-তাই বলে এমন নাম?
আমার বিস্ময় কাটতে চাইছিল না!
-হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, ওর দিদির নাম চায়না। ওকেও ওর বাবা-মা চায় নি! মানে ছেলে চেয়েছিল!
পাশ থেকে বলল কৃষ্ণবর্ণ তরুণ। ছেলেটার চোখদুটি ভারি মায়াময়।
আমি কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম প্রেসক্রিপশন লিখতে। আর সমানে আমার জ্বালাধরা ঝাপসা চোখের সামনে ফুটে উঠছিল ঘেন্না শব্দটা!
ঘেন্না তো শুধু অসহায়, অশিক্ষিত, প্রান্তিক পরিবারটির জন্য নয়, ঘেন্না হয় নিজের ওপর!
প্রতিদিন সংবাদপত্রে পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে “গৌরবর্ণা পাত্রীই কাম্য” দেখতে দেখতে ঘেন্না হয়। ঘেন্না হয় ফর্সা হবার ক্রিম লেখার অনুরোধ পেলে। ঘেন্না হয় রাজনীতির ব্যবসায়ীদের চোখের চামড়াহীন দুর্নীতি আর শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীকে শিরদাঁড়া সমেত বিক্রি হতে দেখে। ঘেন্না হয়, বিচারহীন কৃষ্ণপক্ষে মানুষ আর পশুর বিভেদ মুছে যেতে দেখে।
মিথ্যা তো কেবল ভুল তথ্য নয় মিথ্যা এখন অস্ত্র। প্রতিনিয়ত অপপ্রচার, অর্ধসত্য, অসত্য সব মিলিয়ে সত্যকে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট করে দেওয়ার ন্যাক্কারজনক প্রচেষ্টা দেখে ঘেন্না হয় । ঘেন্না হয় নীতি বা আদর্শ নয়, শুধু ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি দেখলে।
ধর্ম, জাত, ভাষা সবকিছু দিয়ে মানুষকে ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা। ঘেন্না হয় সেই মৌলবাদকে।
মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম শিশুদুগ্ধের কারখানা ধ্বংস করে, শিশু-কিশোরী সমেত আস্ত একটা বালিকা বিদ্যালয় কে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করে, মাসের পর মাস সমস্ত অধিবাসী শুদ্ধ একটা শহর কে নরক করে দেওয়া এগুলো তো ছিলই, ঘেন্না হয় সংবেদনশীলতার অভাবে। প্রতিক্রিয়ার অভাবে।
এত বড় একটা অন্যায় যুদ্ধ হয়ে চলেছে আর আমরা হিসেব করছি কখন কোন ব্লুচিপ শেয়ার সস্তা দামে কেনা যায়, একমাত্র সন্তানের মৃতদেহ কোলে নিয়ে মানুষ কাঁদছে, আর আমরা স্ক্রোল করে চলে যাচ্ছি পরের রিলে।
সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রনেতারা মূক ও বধির, জড়বুদ্ধি, ক্লীবলিঙ্গ!
আমার ঝাপসা হয়ে আসা কম্পিউটার স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বহুকাল আগে এক অনাথবৎ নাথবতীর হাহাকার মেশা সুতীব্র উচ্চারণ “বাবুমশাইরা এই রকম এক একটা কাল আসে পৃথিবীতে যখন এই সব গুণীজনরা সব চুপ করে বসে থাকে আর আর যে অত্যাচারিত হয়, সে অত্যাচারিত হয়েই যায়, হয়েই যায়, হয়েই যায়।”
হাতে পড়ল ঘেন্না বায়েনের আগের একটি প্রেসক্রিপশন। সেখানে অন্য নাম।
-এটা আবার কার নাম? রাধিকা বায়েন মণ্ডল।এই নামটা তো খুব সুন্দর!
ঘেন্না একটু লজ্জা পেয়ে হেসে মাথা নিচু করল।
পাশের চেয়ার থেকে হাতজোড় করলেন যুবক বনমালী মন্ডল।
– আজ্ঞে ওটা ওর ডাকনাম। বিয়ের পর আমাদের বাড়ি থেকে দেওয়া। SIR এ ওর নাম কেটে দিয়েছে। ওদের
বোঝাতেই পারলাম না যে ওর ভালো নামই ঘেন্না।
(উত্তরবঙ্গের চা বাগানে তোলা এই ছবিটির সঙ্গে এই ঘেন্নার সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। বরং ছবিটি যেন ঘেন্না বায়েনের অ্যান্টিথিসিস। রোজ জীবনযুদ্ধে জিতে যাওয়া এই মেয়েদের নাম হয়ত স্নেহা তিরকি, প্রেমা লাকড়া, মমতা ওঁরাও, প্রিয়াঙ্কা কিস্কু বা এমনকি দ্রৌপদী মুর্মু ! )










