বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘বাংলা পক্ষ’-র প্রতিষ্ঠাতা গর্গ চ্যাটার্জীকে গ্রেফতার করে বিজেপি আসলে বাঙালিকে একটু সবক শেখাতে চাইল। তাদের মূল উদ্দেশ্য মুক্ত চিন্তার বাঙালিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাস্তায় হাঁটানো। তাই বাংলার মানুষের আদর্শ রামমোহন রবীন্দ্র নজরুল সুভাষ রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দকে নিয়ে গড়ে ওঠা সত্তা ও অস্মিতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়াটা খুব জরুরি একটা পদক্ষেপ, বিশেষত যদি এই রাজ্যে তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হয়। বাঙালির মধ্যেই হিন্দুত্বের প্রসার এবং একই সঙ্গে বাঙালিকে হিন্দি হিন্দুত্বের সংস্কৃতির জোশে মজাতে বাংলার মাটিতে অবাঙালি আধিপত্য নির্মাণ প্রয়োজন। তাহলে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো একটা সাংস্কৃতিক ভিত্তি পেয়ে যাবে। এটার জন্যই শুধু মহাকরণ দখল যথেষ্ট নয়, দরকার বাংলার মানুষের মধ্যে তার্কিক বিভাজন, সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে আক্রমণ, এবং মুক্ত চিন্তা ও বাম মতাদর্শের বিনাশ। ক্ষমতায় আসার পরদিন সেটাই করতে বিজেপি বাংলা পক্ষের প্রতিষ্ঠাতাকে জেলে ঢোকালো শুধু এটা বোঝাতে যে আর বাঙালিত্ব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি তারা সইবে না।
ভোটের অনেক আগে থেকেই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী দল বিজেপি বাংলার চিন্তা চেতনা ও সত্তাকে আক্রমণ করতে রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ কাউকেই বাদ দেয় নি। ক্ষমতা দখলের পর তারা তাদের ফ্যাসিবাদী রূপ ধরেছে। নির্বাচন কমিশনের দায়ের করা একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগকে সামনে রেখে দুবার নোটিস পাঠাল কলকাতা পুলিশের সাইবার সেল এবং তারপরেই তাঁকে গ্রেপ্তার সবটাই সাজানো চিত্রনাট্য।
গর্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ভোটের সময় সামাজিক মাধ্যমে ইভিএম এবং ভোট গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর এই “উস্কানিমূলক” মন্তব্য ও “বিভ্রান্তিকর তথ্য” ছাড়ানোর অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, গর্গ চট্টোপাধ্যায়
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা EVM নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করেন এবং ভোট গণনার সময় নির্বাচন কমিশন গোপনে বিশেষ পরিকল্পনা কার্যকর করেছে বলেও অভিযোগ তোলেন। এই ধরনের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা জনমনে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন।
আশ্চর্য ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের। তারা যে বেছে বেছে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন সেটা দিনের আলোর মতন স্পষ্ট। এ কথা আর বলা যাবে না যে এই কথাগুলি প্রথম গর্ব চট্টোপাধ্যায় বলছেন। কারণ যে ইভিএম নিয়ে সংশয় প্রকাশ ও নানা নেতার নানা মন্তব্য তো সমাজ মাধ্যমে বহুদিন ধরে ঘুরছে। তাই নিয়ে কোন কথা কেউ বলেনি, নির্বাচন কমিশনের আজ হঠাৎ কেন মনে হল যে গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের কথার জন্য অশান্তি সৃষ্টি হবে?
আসলে বিজেপি জল মাপছে। গর্গ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর সংগঠন বাংলা পক্ষকে নিষ্ক্রিয় করা দরকার। পাশাপাশি এটাও জানা দরকার, বাংলার জন্য গলা ফাটানো, বাঙালি অপমানিত হলে ছুটে যাওয়া ছেলে মেয়েগুলোকে বাঙালি কতটা সাপোর্ট করে? কেন করে? কেন করে না? তাহলে বাংলায় অবাঙালি রাজনীতি সংস্কৃতি ও সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলতে কতটা বেগ পেতে হতে পারে, বাঙালির কাছ থেকে কতটা প্রতিরোধ আসতে পারে, সেটা আন্দাজ করার জন্যই খুব পরিকল্পনা করে এটা করা হয়েছে।
এটাই সত্যি, বাঙালি কি গর্গের জন্য প্রতিবাদে মুখর হবে? কতটা? এটা জানা যাবে এই ঘটনার পর কটা বাঙালি কোনো দল ছাড়াই তাকে সমর্থন করে,আর দলগুলো কী করে? কতটা প্রতিবাদ করে, এটাও দেখার।
তাই এই প্লট নির্মাণ করা হল। বাঙালির উপর অবাঙালি আধিপত্যের চাষ শুরু করার আগে গর্গ চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেফতার একটা মাটি পরীক্ষার মতো প্রাক শর্ত ছিল। আসল প্লট বাংলার চিন্তা চেতনায় হিন্দি ভাষা ও চেতনার বিকাশ। যারা তাতে বাধা দেবে, তাকে তো সরানোটাই কাজ। তাই সেটাই হচ্ছে। এই গ্রেপ্তার আসলে বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও চিন্তন মহল যারা বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতি নিয়ে সরব, তাদেরকে নীরব করার জন্য হুমকি।
বিজেপি দেখতে চাইছে গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের সংগঠনকে সহজে নিষ্ক্রিয় করা গেল কিনা। এই ইস্যুতে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ কতটা প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং তাতেও কোন বিভাজন ঘটানো যায় কিনা। কোন কোন রাজনৈতিক দল বাঙালি অস্মিতা সামনে রেখে প্রতিবাদে নামছে। কতজন বুদ্ধিজীবি ও কটা পত্রপত্রিকায় এই নিয়ে প্রতিবাদে লেখালেখি হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে অনেক সুদূরপ্রসারী হিসেব কষেই গর্গকে গ্রেফতার করা হল। বাঙালি যদি নিয়ে সেভাবে প্রতিবাদ আন্দোলন না করে তাহলে সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষার আঙিনায় বিজেপি তাদের কর্মসূচি চালু করবে অচিরেই। নতুবা আগে পরিবেশ তৈরি করে তারপর তাদের অবাঙালি বাহিনীকে উস্কানি দেবে,লেলিয়ে দেবে।
গর্গ চট্টোপাধ্যায় এই গেম প্ল্যানে শুধুই একটা সফট টার্গেট। বাংলায় অবাঙালি আধিপত্য নির্মাণের দিকে তাকিয়ে বড় পরিবর্তনের দাবার বোর্ডে বোড়ে ছাড়া কিছু না।
বাঙালির ভবিষ্যৎ এখন বাঙালি হাতে। কতজন বাঙালি বিজেপির এই বাঙালিকে ঘাড় ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে শাসন করার গেম প্ল্যান আটকাতে প্রতিবাদের ঝড় তুলল? আজ যদি গর্গকে বাঙালি সমাজ নৈতিক সমর্থন দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত হয় তাহলে আগামী দিনে অ-বাঙালি আগ্রাসনের মুখে বাঙালির হয়ে কথা বলবে কে? ভারতীয় পুঁজির অনেক দিনের টার্গেট বাংলাকে দখল করা এবং বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতি ও সম্পদের ওপর হিন্দি ওয়ালাদের আধিপত্য বিস্তার করা। চাকরি দেওয়ার ধুয়ো তুলে শিল্পায়নের নামে নতুন সরকার সে পথে এগোবে। বাঙালি যদি আত্মজিজ্ঞাসা নিয়ে এই পরিবর্তনের চরিত্র বোঝার চেষ্টা না করে কেবলই উন্নয়নের স্বার্থে নিজের স্বর হারিয়ে ফেলে তাহলে আগামীদিনে তার কেবলই অবাঙালি পুঁজি ও প্রভুর দাস বৃত্তি করেই চলতে হবে। খড় খুটোর মতন উড়ে যাবে। বাঙালি এটা বুঝতে পারছে কি?










