
এমন ঘটনা তো আকছার ঘটে আমাদের দেশে। অভাবের কারণে স্কুলের ফিজ ঠিকমতো মেটাতে না পাড়ার দায়ে স্কুলছুট হয়ে পড়াশোনায় ইতি টেনে দেওয়া। এই একই ছবির দেখা মিলবে এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার উন্নয়নকামী দেশগুলোতে। আমাদের আজকের নিবন্ধের নায়ক উইলিয়াম কামওয়াম্বার জীবনের গল্পটাও ঠিক এমনই। আফ্রিকার মালাউইয়ের ছেলে এই উইলিয়াম। বয়স তখন মাত্র ১৪ । নিদারুন অর্থাভাবের কারণে মালাউইয়ের এই গ্রামীণ ছাত্রটিকে স্কুলের পড়াশোনার পাট শেষ করার আগেই স্কুলছুট হতে হলো। অথচ উইলিয়ামের শেখার আগ্রহ ছিল অন্যদের থেকে অনেক বেশি।

স্কুল ছাড়া মানেই হলো বছর ১৪ ছেলেটির প্রায় ভবঘুরে হয়ে যাওয়া। উইলিয়াম অনন্যোপায় হয়ে গ্রামের লাইব্রেরিতে গিয়ে নানান রকম বইপত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে। উইলিয়াম জানে বই হলো একটি বই হলো মনের জানালা। এর মধ্য দিয়েই জগতের আলো এসে শরীর আর মনকে ছুঁয়ে যায়। বই হলো সুপ্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। উইলিয়াম সারাটা দিন বই দেখে কাটায়।এভাবে প্রতিদিন দেখা অনেক বইয়ের মধ্যে একটা বই তার নজর টানলো। এই বইটা উসকে দেয় তাঁর নতুন কিছু করার ইচ্ছেটাকে।

উইলিয়ামের ইংরেজির জ্ঞান খুব বেশি ছিলোনা। কিন্তু বইয়ে থাকা একটা ছবিই তার ভাবনা চিন্তা সব নাড়িয়ে দিলো – একটা উইন্ড টারবাইনের ছবি। এমন একটা টারবাইন তৈরি করলে হয়না? যেমন ভাবা তেমন কাজ শুরু করে উইলিয়াম। বাড়ির আশেপাশে ফেলে দেওয়া নানান উপকরণ যেমন – ধাতব স্ক্র্যাপ, ট্রাক্টরের ভাঙাচোরা পার্টস্, ভাঙা বাতিল সাইকেলের যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিকের পাইপ , গাছের ডাল – এইসব নিয়ে শুরু হলো উইলিয়াম কামওয়াম্বার ওয়ার্কশপ। “প্রথমে ভেবেছিলাম ওই ছবি দেখে একটা মডেল তৈরি করবো,পরে ভেবে দেখলাম যে মডেল দিয়ে তো আমাদের সমস্যা মিটবে না। তাই শেষ পর্যন্ত তাকে পুরোদস্তুর সক্রিয় করে তোলার কাজ শুরু করতে হলো।”- উইলিয়ামের মনের কথা।

মালাউইয়ের মতো একটি নিদারুণ দারিদ্র্য ও বুভুক্ষা পীড়িত দেশে যেখানে ক্ষুধার তাড়নায় মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুযোগটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে, সেখানে কল্পনা আর উদ্ভাবনী শক্তির ডানা মেলে উইলিয়াম এক নতুন স্বপ্নের দেশে পৌঁছাতে চায়। এ এক আশ্চর্য উড়ান!
উইলিয়াম কামওয়াম্বার বেড়ে ওঠা মালাউইয়ের প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা মাসিটালায়। কৃষিজীবী পরিবারের সন্তান সে।
রুক্ষ শুষ্ক পরিবেশের কারণে ভুট্টাই হলো ঐ অঞ্চলের একমাত্র কৃষিজ ফসল। ২০০১ সালে মালাউই এক দীর্ঘমেয়াদি খরা পরিস্থিতির শিকার হয়। খরার সাথে হাত ধরাধরি করে এলো দুর্ভিক্ষ। পাশাপাশি বন্যা এবং মালাউই সরকারের খাদ্যের মজুত ভাণ্ডার নিঃশেষ করে ফেলার কারণে দেশজুড়ে দেখা দিল অভূতপূর্ব দুর্ভিক্ষ। উইলিয়াম কামওয়াম্বার পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিলনা তাঁর স্কুলে পঠনপাঠনের ব্যয়ভার বহন করা।

এমনই এক প্রেক্ষাপটে এক স্কুলছুট ছাত্রের উইন্ড টারবাইন তৈরির কথা ভাবাটাই ছিল এক দুঃসাহসী প্রচেষ্ঠার মতো। ওই কিশোর তাঁর স্বপ্নের পথ থেকে সরে যায়নি। উইলিয়ামদের গ্রামে অর্থের অভাব, পরিকাঠামোর অভাব, বিদ্যুতের অভাব ছিল। এতো অসুবিধা সত্ত্বেও গ্রামের পাঠাগারের একটা বইকে অবলম্বন করেই উইলিয়াম কামওয়াম্বার নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু হলো। বইয়ের ছবি দেখে দেখে স্কুলছুট উইলিয়াম বানিয়ে ফেললো এক উইন্ড টারবাইনের মডেল। এই নতুন যন্ত্রের আদলটা বইয়ে দেখানো ছবির মতো হলেও উইলিয়াম কামওয়াম্বার ইচ্ছে ছিল একটা সচল কার্যকর বায়ুচালিত কল তৈরি করা যা তাঁদের পরিবারের সাথে সাথে গোটা গ্রামের মানুষের প্রয়োজন মেটাবে। মাটি থেকে প্রায় ১৬ ফিট উঁচু এই উইন্ডমিল সচল হয়ে উঠতেই এখান থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎকে কাজে লাগিয়ে ঘরের চারটি বাল্ব এবং দুটি রেডিও সেট চালু করা সম্ভব হলো। এমন কান্ড দেখে গ্রামের মানুষজনতো রীতিমতো অবাক! তারা সবাই এসে ভিড় জমায় উইলিয়ামের বাড়িতে নিজেদের মোবাইল ফোন রিচার্জ করার জন্য।
অথচ একটা ছবি দেখে এতোটা করা মোটেই সহজ কাজ ছিলোনা। নিরন্তর পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে, সাফল্য আর অসফলতার জটিল পর্যায়গুলো পেরিয়ে পেরিয়ে চলতে হয়েছে । উইলিয়ামের মতো এক অখ্যাত গ্রামীণ স্কুল পড়ুয়া এভাবেই নিজের ইচ্ছে শক্তিতে ভর করে পৌঁছে গেছে উদ্ভাবকের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। ভেঙে দিয়েছে আমাদের এযাবৎকালের বিশ্বাস যে একমাত্র ল্যাবরেটরির সংহত পরিকাঠামো এবং উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা ছাড়া কখনও নতুন কিছু উদ্ভাবন করা সম্ভব নয়।

উইলিয়ামের সফল প্রচেষ্টা সেইসব গতে বাঁধা ধারনাকে ভুল বলে প্রমাণিত করেছে। প্রয়োজনের তাগিদই যে উদ্ভাবনের জননী –এই বহু কথিত আপ্তবাক্যকে বোধহয় আমরা ভুলে গেছি ইদানিং কালে। উইলিয়াম কামওয়াম্বার উদ্ভাবন আমাদের সেই ভুলতে বসা বিশ্বাসকে আবার নতুন করে যেন ফিরিয়ে দিল।
সুগন্ধি ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়তে বিলম্ব হয়না। উইলিয়াম কামওয়াম্বার এই প্রয়োজনীয় উদ্ভাবনের খবর তাঁর নিজের গ্রামের সীমানা পেরিয়ে মালাউইয়ের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লো। মালাউইয়ান সংবাদ পত্রের পাতায় পাতায় প্রকাশিত হতে থাকলো তাঁর লড়াই আর উদ্ভাবনের খবর। এভাবেই TED Global সংস্থার নজরে পড়ে যায় উইলিয়াম । তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতায় উইলিয়ামের উদ্ভাবনকে আরও বড়ো পরিসরে পৌঁছে দেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে উইলিয়ামের তৈরি বায়ু কলকে ব্যবহার করে আরও বহু সংখ্যক মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে এর সুবিধা নিতে পারে। এতো কিছুর মধ্যেও উইলিয়াম তাঁর স্কুল জীবনের ব্যথার কথা ভুলতে পারেনি। তাই TED Fellowship পাবার পরেই সে নতুন করে ভর্তি হলো দক্ষিণ আফ্রিকার লিডারশিপ একাডেমিতে। স্কুলের পর্ব মিটিয়ে ডার্টমাউথ কলেজ থেকে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স নিয়ে ২০১৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে। ভাঙ্গাচোরা বাতিল উপকরণ থেকে তৈরি উইন্ড টারবাইনের কল্যাণে উইলিয়াম ফিরে পেল তাঁর সুতো ছেঁড়া জীবন যা তাঁকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

আজ উইলিয়াম কামওয়াম্বা বিশ্বময় একটি উদ্দীপ্ত দীপশিখার নাম , এক নিরলস পরিশ্রম আর প্রেরণার নাম। সারা দুনিয়ার উইলিয়ামদের স্বপ্ন সফল হোক। এই কাহিনি প্রেরণার উৎস হয়ে উঠুক আরও আরও স্কুলছুট উইলিয়ামদের কাছে। ভাবতে হবে আমাদেরও যাতে ভবিষ্যতে দারিদ্র্যের কারণে কোনো উইলিয়ামকেই স্কুলছুট না হতে হয়।
উইলিয়াম কামওয়াম্বা এখন ৩৯ বছরের এক তরতাজা যুবক। তাঁর এই স্বপ্নসফর নিয়ে লেখা হয়েছে একাধিক বই । তৈরি হয়েছে ফিল্ম। উইলিয়াম আরও স্বপ্ন দেখুক, আরও নতুন নতুন কাজ করুক মানুষের জন্য। শুভকামনা রইলো তাঁর জন্য।

এপ্রিল ১০.২০২৬











অসাধারণ ! আর কত ছেলেমেয়ে সব পেয়েও শেখার আগ্রহ হারাচ্ছে। বিচিত্র –
আপনার শিক্ষার্থীদের উইলিয়ামের কথা পড়ে শোনান। এমন প্রেরণার বড়ো প্রয়োজন এই ভাঙাচোরা সময়ে।
উইলিয়াম কাম ওয়ান্ডার জন্য র ইলো অনেক শুভেচ্ছা আর তার স্বপ্ন গুলি বেঁচে থেকে পূর্ণতা পাক এই কামনাই করি।
এই শুভেচ্ছা উইলিয়ামের কাছে পাঠিয়ে দেবো।
would love to know more about the prospects of the turbine. Is the model being incorporated? And wind turbines are already in use in many nations for electricity generation. Would love to know how this model is fundamentally different if we set aside the concept of recycling materials. Also would love to know regarding the help from the company- how impactful was it?