আগেই বলা হয়েছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হলে এলার্জি হয়। তাই-
- অ্যালার্জি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার (Immune System) একটি অতিরিক্ত বা ভুল প্রতিক্রিয়া, যেখানে ধুলো, পরাগরেণু, খাবার, পশুর লোম, ছত্রাক—এগুলোর মতো স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিহীন জিনিসকে শরীর হুমকি ভেবে তার বিরুদ্ধে আক্রমণ করে।
- এর ফলে শরীরে হাঁচি, কাশি, ত্বকে ফুসকুড়ি, চোখে চুলকানি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়।
এই বিষয়ে বুঝতে গেলে কয়েকটি নামের সাথে পরিচিত হতে হবে, যেগুলো এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্তঃ
- এলার্জেনঃ এলার্জেন হলো এমন কিছু পদার্থ, যা আসলে সাধারণ ভাবে ক্ষতিকর নয়, কিন্তু শরীর ভুল করে শত্রু হিসেবে চিনে ফেলে। এই সব পদার্থ এলার্জি তৈরি করে। এগুলো যে কোনও ধুলো, খাদ্য বা জীবানু বা জীবানুর অংশ হতে পারে। শিশুদের সাধারণ এলার্জেন হলো—
-
- দুধ, ডিম, চিনাবাদাম।
- ধুলো ও ডাস্ট মাইট।
- ফুলের পরাগ (Pollen)।
- পশুর লোম।
- কিছু ওষুধ।
সব শিশুর শরীর কিন্তু একই এলার্জেনে একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
- এন্টিজেনঃ এন্টিজেন হল এমন কোনো বাইরের পদার্থ যা শরীরে প্রবেশ করলে ইমিউন সিস্টেম তাকে শনাক্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে বা ইমিউন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যে সব বাইরের ক্ষতিকারক পদার্থ শরীরের ক্ষতি করে বা শরীরকে আক্রমন করে, তাদের বলা হয় এন্টিজেন। এটি যে কোনও পদার্থ বা জীবানু হতে পারে।
- এন্টিবডিঃ এন্টিজেনকে ধ্বংস করতে তার বিরুদ্ধে শরীর যে সব রাসায়নিক প্রোটিন তৈরি করে, তাকে বলা হয় এন্টিবডি।
এলার্জির ধাপঃ
এলার্জি কয়েকটি ধাপে ঘটে –
১. Sensitization Phase বা সংবেদনশীল হয়ে ওঠা পর্যায়ঃ
প্রথমবার যখন শরীর কোনো অ্যালার্জেন (যেমন ধুলো, পোলেন, ডিম, দুধ ইত্যাদি) এর সংস্পর্শে আসে, তখন
- শরীর ওই পদার্থটিকে ভুল করে “বিপজ্জনক” মনে করে।
- এরপর B-lymphocyte নামের ইমিউন কোষ IgE নামক এন্টিবডি তৈরি করে।
- এই IgE গিয়ে Mast Cell এবং Basophil নামের কোষের সাথে যুক্ত হয়।
এই অবস্থাকে বলা হয় সেন্সিটাইজেশন—এ পর্যায়ে সাধারণত কোনো উপসর্গ দেখা যায় না।
২. Re-Exposure Phase (পুনরায় অ্যালার্জেনের প্রবেশ)
পরবর্তীতে একই অ্যালার্জেন আবার শরীরে ঢুকলে-
- অ্যালার্জেনটি Mast Cell–এ যুক্ত নির্দিষ্ট IgE অ্যান্টিবডির সাথে যুক্ত হয়।
- সাথে সাথে Mast Cell এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকের থলি বা গ্রানুল থেকে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরন প্রক্রিয়া শুরু হয়। একে Degranulation বলে।
৩. Chemical Mediator Release (রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ)
এই Degranulation–এর সময় Mast Cell থেকে শরীরে বেশ কিছু রাসায়নিক বের হয়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- হিস্টামিন (Histamine)।
- লিউকোট্রিন (Leukotrienes)।
- প্রোস্টাগ্লানডিন (Prostaglandin।
- সাইটোকাইন (Cytokines)।
এগুলোই মূলত অ্যালার্জির লক্ষণ তৈরি করে।
এই সব বিভিন্ন রাসায়নিক শরীরে নানা রকম অ্যালার্জির লক্ষণ তৈরি করে। যেমন
হিস্টামিন (Histamine) যে সব কাজ করে-
Mast cell থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, তা হলো হিস্টামিন (Histamine)।
হিস্টামিনের প্রভাবে—
- নাক দিয়ে জল পড়ে।
- নাক বন্ধ হয়ে যায়।
- হাঁচি হয়।
- ত্বকে চুলকানি হয়।
- চোখ লাল হযে যায়।
এলার্জির ঔষধ প্রধানত হিস্টামিনের বিরুদ্ধে কাজ করে। এই কারণেই এলার্জির ওষুধকে বলা হয় অ্যান্টি-হিস্টামিন।
লিউকোট্রিন (Leukotrienes) যে সব কাজ করে
- শ্বাসনালি সংকুচিত করে → শ্বাসকষ্ট ও wheezing বা শোঁ শোঁ শব্দ হয়।
- কাশি বাড়ায়।
প্রস্টাগ্লানডিন (Prostaglandins) যে সব কাজ করে
- প্রদাহ বাড়ায়।
- ব্যথা ও ফোলার অনুভূতি তৈরি করে।
সাইটোকাইন (Cytokines) যে সব কাজ করে
- দীর্ঘস্থায়ী অ্যালার্জি, যেমন রাইনাইটিস বা নাক দিয়ে জল পড়া এবং অ্যাজমা তৈরি করে।
প্রথম এবং পরের প্রতিক্রিয়া (Early Phase vs Late Phase Reaction)
প্রথম ৫–৩০ মিনিট)
হিস্টামিন নিঃসরণের ফলে হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে জল, চোখ চুলকানো ইত্যাদি হয়।
পরের প্রতিক্রিয়া (৬–১২ ঘণ্টা পরে)
সাইটকাইন ও লিউকোট্রিন নিঃসরণের ফলে
- নাক বন্ধ।
- দীর্ঘস্থায়ী কাশি।
- শ্বাসকষ্ট।
- ত্বকে ফোলা ভাব- এইসব হয়।
দেখা গেছে সকলের সমান ভাবে এলার্জি হয় না। কারও বেশি এবং কারও কম হয়। এর কিছু মূল বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। যেমন-
- ১. বংশগত কারণ (Genetics) – মা অথবা বাবার অ্যালার্জি থাকলে শিশুর ঝুঁকি ২–৩ গুণ বেড়ে যায়।
- ২. IgE বেশি তৈরি হওয়া – যাদের শরীরে IgE উৎপাদনের প্রবণতা বেশি, তাদের বেশি অ্যালার্জি হয়।
- ৩. Th2- Immunity Dominance- যেসব মানুষের ইমিউন সিস্টেমে Th2 Helper Cells নামক লিম্ফোসাইট কোষ বেশি সক্রিয় থাকে, তারা অ্যালার্জির প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়।
- ৪. পরিবেশগত অবস্থা বা Environmental factors – ধুলো, ধোঁয়া, পোলেন বা ফুলের রেণু, ফাঙ্গাস বা ছত্রাক, পোষা প্রাণী, দূষণ—এই সব কিছুর মধ্যে যারা বেশি থাকে, তাদের IgE প্রতিক্রিয়া বাড়ায়। ফলে তাদের বেশি এলার্জি হয়।
আরও কিছু তথ্যঃ
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হলে কী হয়?
- এলার্জি বা এসমা (Asthma)।
- অটোইমিউন রোগ (Autoimmune disease)- যেমন: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা এক ধরণের বাত ও আরও কিছু অসুখ আছে।
- ইমিউন সিস্টেম নিজের শরীরকে আক্রমণ করে
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হলে কী হয়?
- ঘন ঘন সর্দি–কাশি হয়।
- দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ হতে পারে।
- ফুসফুসের ইনফেকশন হতে পারে।
- ক্ষত দেরিতে শুকায়।
- শিশুদের গ্রোথ স্লো হয়ে যেতে পারে।
চরম ক্ষেত্রে Immunodeficiency Disease দেখা দিতে পারে। এতে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ে এবং নানা রকম রোগ শরীরকে আক্রমণ করে।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ কি ভাবে বাড়ানো যায়?
- পর্যাপ্ত ঘুম।
- ভিটামিন C, D, জিঙ্ক যুক্ত খাবার।
- নিয়মিত ব্যায়াম করা।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা।
- সুষম খাদ্য খাওয়া।
- স্ট্রেস কমানো।
- টিকাদান (Vaccination) সঠিক সময়ে শিশুদের টিকা দেওয়া এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড়দেরও টিকা দেওয়ার দরকার হয়।
IgE অ্যান্টিবডির ভূমিকা
IgE হলো এমন একটি অ্যান্টিবডি যা এলার্জির মূল চাবিকাঠি। এর কাজ—
- এলার্জেন চিনে নেওয়া।
- Mast cell-এর সঙ্গে যুক্ত থাকা।
- এলার্জেন এলেই তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া ঘটানো।
যেসব শিশুর শরীরে IgE বেশি তৈরি হয়, তারা সাধারণত এলার্জি-প্রবণ হয়।
এলার্জি ও প্রদাহ (Inflammation)
এলার্জি হলে হিস্টামিন ছাড়াও আরও কিছু রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, যা রক্তনালিকে ফুলিয়ে তোলে, ত্বক ও শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ দীর্ঘদিন চললে—
- অ্যাজমা,
- একজিমা,
- এবং ক্রনিক এলার্জি বা দীর্ঘস্থায়ী এলার্জি দেখা দিতে পারে।
কেন সব শিশুর এলার্জি হয় না?
এলার্জি হওয়ার পেছনে কিছু বিষয় কাজ করে, যেমন-
- জেনেটিক কারণ,
- পরিবেশগত প্রভাব ,
- জীবনের শুরুতে খাদ্য ও সংক্রমণের ধরন।
তাই সব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একরকম নয়।
এলার্জি বনাম স্বাভাবিক প্রতিরোধ
স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা—
- ক্ষতিকর জীবাণুকে আক্রমণ করে।
- দরকার শেষ হলে শান্ত হয়।
এলার্জিতে—
- নিরীহ জিনিসে শরীর আক্রমণ করে।
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া হয়।
এই অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াই সমস্যার মূল।
শিশুদের এলার্জি ধীরে ধীরে কমে কেন?
অনেক শিশুর এলার্জি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। কারণ—
- রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিপক্ব হয়।
- শরীর ধীরে ধীরে সহনশীল হয়।
- IgE এর প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে আসে।
তাই সব এলার্জি আজীবন থাকে না।









