সালটা ২০১১, আমরা মেডিক্যাল কলেজে তখন সদ্য পা দিয়েছি। গল্পটা শুরু হয়েছিল তারও আগে, রেজাল্ট বেরোনোর পরপরই। বিভিন্ন দাদা দিদিরা বাড়ি বয়ে একদম ভর্তির সমস্ত প্রক্রিয়া বোঝাচ্ছে, হোস্টেল রুম বুক করে দিচ্ছে – সে এক বিশাল দক্ষযজ্ঞ। পরে বোঝা গেলো, এই সিনিয়ররা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নিজেদের হোস্টেলে ‘ ছেলে তোলার ‘ জন্য এই রান্না করে দেওয়া/ দাড়ি কামিয়ে দেওয়ার মতো কাজগুলো করছে। আমরা মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, হোস্টেল আমাদের নিতেই হতো। সেই কোনো একটা দলে ভোট দেওয়ার মতোই ব্যাপার আর কি… যেই এক হোস্টেলে উঠব ঠিক করলাম অমনি অন্য দলের সিনিয়ররা রে রে করে উঠল, ঠ্যাং খোড়া করে দেব ইত্যাদি বলল আর কি… যাইহোক হোস্টেলে উঠে যাওয়ার পর আমরাই আবার হয়ে গেলাম দলের প্রতিনিধি, দিয়ে আমরাই ঘাটা ডে স্কলারদের রান্না করা/ দাড়ি কামিয়ে দেওয়ার কাজটা নিলাম।
যাইহোক গল্পটা এই বিষয়ে নয়। আমরা যখন কলেজে ঢুকি তখন আমরা ছাত্র পরিষদ, কলেজে ইউনিয়ন তাদেরই হাতে। প্রধান বিরোধী পক্ষ ডিএসএ, আর এসএফআই মেডিক্যাল কলেজে তখন থেকেই মহাশূন্যে বিরাজ করছিল। অন্যদিকে বেশ কিছু বহু বছর ধরে কলেজে থেকে যাওয়া বনেদি স্টুডেন্টরা তখন তৃণমূলের ধামা ধরতে শুরু করেছে। আমরা তাদের বিশেষ পাত্তা দিতাম না।
আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচে ডিএসএ ভোটে জিতে ইউনিয়ন ১৫-৫ করে ফেলেছে। আমাদের ব্যাচটা জিততে পারলেই ১০-১০, তারপর ইউনিয়ন দখল শুধু সময়ের অপেক্ষা। মেডিক্যাল কলেজের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ক্ষমতা দখলের একটা বিশাল লড়াই, সেটার কী কেন ইত্যাদি অনেক পরে জেনেছি, বুঝেছি। যাইহোক, কলেজে ঢুকে সিনিয়রদের থেকে বুঝলাম ইউনিয়ন চলে গেলে ডিএসএ কলেজে থাকতে দেবে না (ঠিক যেমন বিজেপি এলে মাছ খেতে দেবে না) , তাই ভোটে জেতার জন্য জীবন লড়িয়ে দাও।
শালা এমন জীবন লড়ালাম, শেষে ভোটেও দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু দাঁড়ালেই তো হবেনা। ডিএসএর হাতে মেন হোস্টেল – গুচ্ছ গুচ্ছ ছেলে তুলেছে। সিবিএসই, আল আমিন মিশন তাদেরই পক্ষে যেহেতু তারা ধারে ভারে বেশি – অনীক দা স্টেজে উঠলে থাম্পিং হতো যেন আজই হল ভেঙে পড়বে… আমাদের সিনিয়র ব্যাচ থেকে লোক ভাড়া করে লোকবল দেখাতে হতো…
যাইহোক এর মাঝেই আমরা ক্যালানি খেলাম হোস্টেলে, আমরা বলতে আমাদের সিনিয়ররা। ফেস্ট নিয়ে ঝামেলার জন্য লোকজন এসে হোস্টেল ভেঙে দিয়ে গেলো। আমরা ফার্স্ট ইয়ার বলে রক্ষা পেয়েছিলাম। পরদিন কালীঘাটে মাথাদের সব মিটিং হলো – দিয়ে রাতারাতি আমরা হয়ে গেলাম ছাপু থেকে তিনু – নয়তো দিদি আমাদের প্রোটেকশন দেবে কী করে! তারপর হলো একটা পিকনিক। মেন হোস্টেলের ছেলেরা করেছিল পিকনিক, তা করতেই পারে… কিন্তু তাতে একজন মেয়েও গেছিল, যে কোনোভাবেই বয়েস হোস্টেলের পার্ট নয়, তা সে বন্ধুদের সাথে যেতেই পারে। কে আবার সেই ছবি ফেবুতে দিয়ে দেয়, তো সে দিতেই পারে! কিন্তু সমস্যা হলো ইতিমধ্যে ভোট ঘোষণা হয় গেছিল। তো ব্যাপারটা দাঁড়ালো মেন হোস্টেলের ডিএসএর লোকেরা সাধারণ ছাত্রদের ইনফ্লুয়েন্স করার জন্য পলিটিকাল ইভেন্ট করেছে ভোট ঘোষণার পর, যেটা নির্বাচনী আচরণ বিধির বিরুদ্ধে…
তাও মানা গেলো, না হয় যারা গেছিল তারা ভোটে দাঁড়াতে পারবে না… না, কলেজ কাউন্সিলের মিটিং করে ঠিক হলো তারা ভোট দিতেই পারবে না। হায় কপাল!! “একি মহারথী প্রথা! নাহি শিশু লঙ্কাপুরে শুনি না হাসিবে এ কথা!!” কিন্তু তাই হলো… অনেক প্রতিবাদ হলো, অনশন হলো… ভোটের দিন পুলিশ এসে ডিএসএর সভা তুলে দিলো। ভোট হলো, আমরা স্বচ্ছন্দে জিতে গেলাম – তৃণমূল ছাত্র পরিষদের লোকজন আর কি! এসআইআর এসআইআর গন্ধ পাচ্ছেন!
ভোটে জিতে কাজ প্রচুর করেছি, ক্লাস টাইম মতো এরেঞ্জ করা, প্রজেক্টর বয়ে বয়ে নিয়ে আসা, ডেলি রুটিন সবাইকে পাঠানো। সিনিয়ররা বলেছিল শুধু নিজেদের লোকেদের মেসেজে রুটিন পাঠাতে, ফেবু তে গ্রুপ খুলে সবাইকে অ্যাড করে রুটিন দিতাম। যাতে অসম বণ্টন না হয়। পরের বছর যখন ভোট এলো এই উন্নয়নের জোয়ারেই জিতে যাওয়ার কথা আমাদের 😂😂 কিন্তু আমার বন্ধুই আমাকে বলল আমি তোদের ভোট দিয়ে দেবো, তোরা অনেক কাজ করেছিস। কিন্তু তোরা জিতবি না। কারণ আঠারজন এবার ফিরে আসবে, তাই এবারের সমীকরণ আলাদা। শুধু কাজ করেও ভোট জেতা যায় না…
কিন্তু পেছনে খেলা ততদিনে অনেক ঘুরে গেছে, তৃণমূল তখন সর্বত্র বিরাজ করছে। ডিএসএর অর্ধেক কাজের ছেলেরা পাড়ায় থ্রেট খেয়েই বসে গেছে… আল আমিন মিশন তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে গেছে, সব মিলিয়ে আমরা আর হারিনি… কিন্তু কীভাবে কেন হারিনি, কীভাবে জিতেছি সেটা জানি। ভোট এরকমই, ন্যায্য ভাবে নির্বাচন কোথাও কোনোদিন হয়নি, ক্যাপশনের লেখাটাও সেজন্যেই…
আমরা যদি ছাপু থেকে মার খেয়ে যেতাম, রাতারাতি তিনু না হতাম, তৃণমূল তাও আসতো। সে গোটা রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে, মেডিক্যাল কলেজ ছেড়ে দিত নাকি! ৩৪ বছর সিপিএম রাজত্ব করেছে। ক’টা ভোট তারা শান্তিপূর্ণ ভাবে করিয়েছে! ২০১১ তেও ওরাই জিততে পারত যদি কংগ্রেসের হাত না ছাড়ত, ডুবিয়েছে ওদের ওভার কনফিডেন্স। কিন্তু আমি আমার পাড়াতেই দেখেছি মস্তানদের আখড়াটা লাল থেকে বিকেলের মধ্যে সবুজ হয়ে যেতে। আজ আসানসোলে এসে দেখলাম সেই আখড়াটা গেরুয়া রঙে মুড়ে ফেলা হয়েছে… সময়ের অপেক্ষা!! সেই মানুষগুলোই, যারা সিপিএমের ধামা ধরে হুজ্জুতি করত, তৃণমূলের হয়ে তোলা তুলত, সেই মানুষগুলোই বিজেপির পতাকা নিয়ে ছুটছে… এই বাংলায় বদলা নয় বদল, আসল বদল কোনোদিনই কিছু হবেনা। কারণ আমরা নিজেরাই হচ্ছি বলদ। আমার পাশের বাড়ির লোকটার সাথে অন্যায় হলে আমরা দরজা বন্ধ করে ঘুমাই। এই রাজ্যে পার্টির ক্যাডার, সিন্ডিকেট রাজ চলবে না তো কোথায় চলবে!
যাইহোক, যেটা বক্তব্য; কে কাজ করলো, কে করলো না, কে টাকা মারলো, কে মারলো না, কাকে মানুষ চাইলো, কাকে চাইলো না – এই কিছুর উপরই ভোটের রেজাল্ট নির্ভর করে না। যদি তাই হতো, ইউসুফ পাঠান কোনোদিন অধীর চৌধুরীকে হারাতে পারত না। ম্যান, মাসল, মানি – এই নিয়েই নির্বাচন। এই পাওয়ার দিয়ে যে পার্টি আসতে পারবে, তাই আসবে, কেউ কিছুই করতে পারবে না। কারণ লড়াইটা এথিক্সের নয়ই, কোনোদিন ছিল না, হবেও না।
তবে মমতা হারলে ট্রিট 🕺🕺🎊🎊🎉🎉











