ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ রবার্ট আওয়েন আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা খুশি মত সময় কাটানোর দাবি তোলেন যা শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম শ্লোগানে পরিণত হয়। ১৮৪৭ এর ফ্যাক্টরি আইনে ইংল্যান্ডে নারী ও শিশু শ্রমিকদের জন্য ১০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম হয়। ১৮৪৮ এর ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ফ্রান্সে ১২ ঘণ্টার আইন হয়। ১৮৮৬র ১ লা মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকদের জমায়েত শুরু হয়। ৪ঠা মে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অসংখ্য শ্রমিক। ইতিহাসে ১ লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসাবে জায়গা করে নেয়।
শ্রমশক্তির এক বিরাট অংশ নারী শ্রমিক – “A powerful force! A force that the powers of this world must reckon with when it is a question of the cost of living, maternity insurance, child labour and legislation to protect female labour” (Alexandra Kolontai, 1913)। তাই মে দিবসের গল্প আর আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের গল্পটা অনেকটা একই রকম- রক্ত ঘাম আর শ্রমের স্বীকৃতি।
১৯১১ সালের ২৫শে মার্চ, শনিবার, নিউ ইয়র্ক সিটির ট্রায়াঙ্গেল শার্টওয়েস্ট ফ্যাক্টরিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এই অগ্নিকাণ্ডটি ছিল শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক শিল্প দুর্ঘটনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম মারাত্মক দুর্ঘটনা। এই আগুনে ১৪৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় — এর মধ্যে ১২৩ জনই ছিলেন নারী ও বালিকা এবং ২৩ জন পুরুষ। ট্রায়াঙ্গেল ওয়েস্ট কোম্পানি .কারখানাটি মহিলাদের ব্লাউজ তৈরি করত, যা “শার্টওয়েস্ট” নামে পরিচিত ছিল। কারখানাটিতে প্রায় ৫০০ জন কর্মী কাজ করতেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ ইতালীয় এবং ইহুদি অভিবাসী মহিলা ও কিশোরী, যারা সপ্তাহের দিনগুলিতে দিনে নয় ঘন্টা এবং শনিবারে সাত ঘন্টা কাজ করতেন,: ৫২ ঘন্টার কাজের জন্য তাঁরা সপ্তাহে ৭ থেকে ১২ ডলার উপার্জন করতেন,। এই অগ্নিকাণ্ড কর্মক্ষেত্রে কারখানার নিরাপত্তাহীনতা এবং নারী শ্রমিকদের অসহায় জীবনযাপনকে সামনে নিয়ে আসে। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় অনেক কম মজুরিতে সস্তা শ্রম দিতে বাধ্য করা হত মেয়েদের, আজ ও এই ছবি খুব বদলায়নি। একদিকে মালিকের অতিরিক্ত শোষণ আর অন্যদিকে পিতৃতন্ত্রের শোষণের জাঁতাকলে আজ ও পিষ্ট হয়ে চলেছে নারীশ্রম।‘Women’s Day’ is a link in the long, solid chain of the women’s proletarian movement” (Alexandra Kolontai, 1913).পণ্যায়নের দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস শ্রমজীবী নারীর তকমাকে দূরে সরিয়ে কার্ড দিবসে পরিণত হয়েছে। প্রসাধনীর পসরায় চাপা পড়ে গেছে নারীর শ্রম। সর্বংসহা জননী আর গৃহলক্ষ্মী আরাধনার ঢক্কানিনাদে শোনা যায়না মেয়েদের কান্না ঘাম আর শ্রমের রোজনামচা। তাই একদিকে নগরের রাস্তায় রাস্তায় শাড়ি গয়না প্রসাধনের বিজ্ঞাপনে ঝোলে আপাদমস্তক হিরে জহরতে মোড়া সনাতনী নারী অথবা আধুনিক আভরণ আর আবরণে সুসজ্জিতা আধুনিকার ছবি, অন্যদিকে পড়ে থাকে শ্বাপদে খুবলে খাওয়া ধর্ষিতার নগ্ন শরীর- খেত খামারে, কারখানা বা স্কুলবাড়ির পিছনে ফাঁকা মাঠে, টিউশনি পড়তে যাবার রাস্তায়, কলেজের ইউনিয়ন রুমে বা হাসপাতালের সেমিনার রুমে, পরিপাটি চাদর গায়ে দিয়ে। কে বা কারা এসে মেয়েদের শরীর থেকে প্রাণরস শুষে নিল সে সব গল্প কেউ জানেনা, কেউ দেখেনি। মাঝে মাঝে জালে ধরা পড়ে কিছ বিকৃতকাম নিশাচর সরীসৃপ। নেড়া আসামির তিনমাসের জেল আর সাত দিনের ফাঁসির সাজা ঘোষণা করে মহাখুশি হয় প্যাঁচা, কুমির, শেয়াল আর কাকেশ্বর কুচকুচেরা। এর মধ্যেই মাঝে মাঝে চেনা গল্প অচেনা করে দেয় কিছু মেয়ে। চেনা ছক ভেঙ্গে অচিনপুরের গল্প শোনায়।তেমনই এক গল্পের আসর বসেছিল ১১ মার্চ গুরুদাস কলেজের রাজেন্দ্র লাল সভাকক্ষে- ‘Breaking Gender Stereotypes: Anecdotes of women in the transport sector’। ‘রুটি, গোলাপ আর শান্তির জন্য’ মেয়েদের লড়াই এর ঘামে ভেজা ছবি দিয়ে সাজানো ছিল কলেজের আঙিনা –নারীশ্রমের উপর বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের তোলা নানান আলোকচিত্র । অনুষ্ঠানের আয়োজক নন্দনার (গুরুদাস কলেজের women’s cell) পক্ষ থেকে অধ্যাপিকা দেবলীনা বিশ্বাস, অধ্যাপিকা নবারুণা মজুমদার এবং Internal Quality Assurance Cell (IQAC)।বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক এবং নারী দিবস উদযাপন মঞ্চের অন্যতম সংগঠক স্বাতী ভট্টাচার্য, আজাদ ফাউন্ডেশনের মৌসুমি সরকার, রাবণ প্রকাশনার কর্ণধার সোমাইয়া আখতার, টোটো চালক রাখি বিশ্বাস, অ্যাপ ক্যাব চালক মঞ্জুশ্রী সাহা। বক্তৃতা নয়, আলাপচারিতা আর প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলোচনা শুরু করেন সঞ্চালক অধ্যাপিকা অরিত্রী সামন্ত। স্বাতী ভট্টাচার্য ক্ষমতার গল্প বলেন। শাসক দলের ক্ষমতার সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের হাত ধরাধরি, পরিবারের পিতৃতান্ত্রিকতার সঙ্গে সামাজিক ক্ষমতা আর পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকত্বের গাঁটছড়া, আর কী ভাবে মেয়েরা সেই সব বোঝাপড়াকে হারিয়ে দিয়ে রাস্তায় নামছে তার গল্প। আজাদ ফাউন্ডেশন থেকে এসেছিলেন মৌসুমি সরকার। মেয়েদের সক্ষমতার লক্ষ্যে কাজ করে এই সংস্থা। মেয়েদের গাড়ি চালানো শিখিয়ে অ্যাপ ক্যাব চালানোর কাজের ব্যবস্থা করে দেয় আজাদ ফাউন্ডেশন। মৌসুমি বললেন মেয়েদের গাড়ি চালানো শিখিয়ে গণ পরিবহনের চালক করতে গেলে শুধু গাড়ি চালানোর শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। আত্মরক্ষার শিক্ষা এবং অনলাইন অ্যাপের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পুরুষের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে পেশায় টিকে থাকার মানসিক রসদ প্রয়োজন হয়। পরিবারের লোকজনের সঙ্গেও কথা বলতে হয়। রাবণ প্রকাশনার সোমাইয়া ও শোনান লিঙ্গবৈষম্য পরিবার এবং কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। রাখি আর মঞ্জুশ্রী শোনান বেনজির লড়াইয়ের গল্প। মঞ্জুশ্রী বাজার করে ফেরার পথে একটি লিফলেটের মাধ্যমে জানতে পারেন আজাদ ফাউন্ডেশনের কথা। সংসারে অনেক লড়াই এর পর গাড়ি চালানো শেখা এবং তাকে পুরোদস্তুর পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন। উপার্জনের টাকা সংসারে ঢোকার পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে থকে। এখন বিদেশে কাজের সুযোগ এলে স্বামী দেশে ঘরকন্নার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। এই জয় শুধু মঞ্জুশ্রীর নয়, হারতে হারতে ভেঙ্গে না পড়া, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সব মেয়েদের জয়। রাখির লড়াই আরেক রকম। স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘তিলোত্তমা টোটো স্ট্যান্ড’ সঙ্কলন গ্রন্থে তিলোত্তমা টোটো স্ট্যান্ড প্রবন্ধে স্বাতী লিখেছেন পুরুষ টোটোচালকদের প্রবল বিরোধিতা, সরাসরি আক্রমণ এবং শাসক দলের প্রভাবশালী নেতাদের অত্যাচার নীরবে সহ্য করেই মহিলা টোটো চালকরা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামেন।চেন্নাইতে সরকা্রের কাছে সাহায্য পেলেও কোন বড় স্টেশনে মহিলা টোটোচালক যাত্রী তুলতে পারেনা পুরুষ চালকদের প্রতিরোধের ফলে। রাখির কাকু কাকিমা এগিয়ে এসে আর্থিক ভাবে সাহায্য করেন। নিজের টোটো নিয়ে রাস্তায় নামেন রাখি। পুরুষ টোটো এবং অটোচালকদের গালাগালি, টীকা টিপ্পনী এবং সরাসরি আক্রমণ সহ্য না করতে পেরে, শাসক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ক্ষমতা আর টাকা পয়সার ভাগ বাঁটোয়ারাতে ব্যর্থ হয়ে মহিলা টোটোচালক রা এখন শুধু ‘ফ্লাইং’ প্যাসেঞ্জার তোলেন। স্ট্যান্ডে অনেক সময় পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে অল্প বয়সীরা মহিলা চালক দেখলে বেশি সময় লাগতে পারে ভেবে এড়িয়ে যান, কিন্তু বয়স্করা অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশি সহনশীলতা এবং সহানুভুতি দেখান। গাড়ির লাইসেন্স বার করা, ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনা, গাড়িতে প্যাসেঞ্জার তোলা, – প্রত্যেকটা পদক্ষেপে পাহাড় প্রমাণ বাধা ডিঙ্গিয়ে আসতে হয় মেয়েদের। এসেও অনেকেই টিকে থাকতে পারেন না। আবার হার না মেনে লড়ে চলেছেন রাখি, মঞ্জুশ্রী, সরস্বতী, রুম্পা, সঙ্ঘমিত্রা, সোনালিরা। এঁরা কেউই শুরু থেকেই প্রতিবাদী বা ব্যতিক্রমী পথ হাঁটার জন্য তৈরি ছিলেন না। পথের বাঁকে লুকিয়ে থাকা বিপদ এদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে শিখিয়েছে।অনেক গুলো ছক ভাঙ্গা গল্প আর দুর্জয় স্বপ্ন নিয়ে নারীশ্রমশক্তির উদযাপন করে গুরুদাস কলেজ। ছাত্র ছাত্রীরা সক্রিয় ভাবে আলোচনায় অংশ নেয়।
“বাধার পাহাড় কাটছে একটু একটু করে-
“আমরা কী চাই সে তো আমরা জানি,
যেতে চাই একসাথে কোন ঠিকানায়,
এ যে জোয়ারের ঢেউ, ফিরাতে কি পারে কেউ?
স্বপন পুরে কে যাবি রে স্বপন পুরে কে যাবি আয় “ (প্রতুল মুখোপাধ্যায়)
চিত্র সৌজন্য:
গুরুদাস কলেজ আয়োজিত আন্ত:কলেজ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা /প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীরা ( গুরুদাস কলেজ, স্কটিশ চার্চ কলেজ ও জয়পুরিয়া কলেজ,)
গত শতকের তিনের দশকে জন মেনার্ড কেইনস বলেছিলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি শিগগিরই এমন সুদিন এনে দেবে, যাতে মানুষকে সপ্তাহে পনের-ষোল ঘণ্টা কাজ করলেই চলবে।
না! আমি কাউকে বেইমান বলাটা সমর্থন করি না। সন্তানহারা মাকে বলাটা তো নয়ই! এটা অপ্রার্থিত, এবং আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়! তবে, রাজনীতির আখড়ায় প্রাচীনযুগ থেকেই এসব
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে বিশেষ করে ২০১১ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর পঞ্চায়েত – পুরসভা থেকে বিধানসভা – লোকসভা প্রতিটি নির্বাচন ঘিরে শাসক দলের প্রশ্রয়ে
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।