পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে বিশেষ করে ২০১১ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর পঞ্চায়েত – পুরসভা থেকে বিধানসভা – লোকসভা প্রতিটি নির্বাচন ঘিরে শাসক দলের প্রশ্রয়ে এবং পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় ও নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রিয় নিরাপত্তাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় যে হাড়হিম করা সন্ত্রাস, ভয়ংকর হিংসা, মৃত্যু মিছিল, বিরোধী দলের সমর্থকদের উপর আক্রমণ, তাদের মহিলাদের ধর্ষণ, তাদের ঘরবাড়ি ব্যবসা কেন্দ্র লুঠ ও জ্বালিয়ে দেওয়া, মুসলিম সমাজবিরোধীদের দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ ও দাঙ্গা, সীমান্ত অঞ্চলে বাংলাদেশী সন্ত্রাসী ডাকাত জিহাদিদের তাণ্ডব, বিরোধী ও সাধারণ ভোটারদের ভোট দিতে না দেওয়া, বুথ দখল, বিরোধী এজেন্টদের বসতে না দেওয়া বা মেরে বের করে দেওয়া, ছাপ্পা ভোট, ই ভি এম মেসিন লুঠ ইত্যাদি এবার অনুপস্থিত ছিল। ২০২১ এ মনে আছে বিজেপি কে ভোট দেওয়ার জন্য হুগলির এক যুবকের মাথা কেটে ফেলা হয়েছিল তার মায়ের সামনে।
এর পরও এবার শাসক দল ও তাদের সমাজবিরোধীরা কোচবিহার থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগণা ক্রমাগত অশান্তি এবং বিরোধীদের আক্রমণ চালিয়ে গেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের মধ্যে পশ্চিম বর্ধমানে এক কংগ্রেস কর্মীকে এবং ঝাড়গ্রামে এক বিজেপি কর্মীকে হত্যা করা হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রিয় নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপ নেওয়ায় সর্বত্র পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। মানুষ নির্ভয়ে ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছেন। ৯২ – ৯৩ % রেকর্ড ভোটের হার। উদয়ন গুহ, হামিদুর রহমান, গোলাম রব্বানী, রহিম বক্সী, হুমায়ুন কবীর, আমিনুর ইসলাম, আলি বিশ্বাস, বাবু মাস্টার, শওকত মোল্লা, শেখ শাজাহান, জাহাঙ্গীর খান প্রমুখ তৃণ বাহুবলী রা নির্বাচন গুলিতে বটেই সারা বছর সারা বাংলা যেভাবে দাপিয়ে বেড়ায় এবার ট্যা ফু করতে পারে নি।
আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ এবং মৃত্যু মিছিল হীন এই নির্বাচন খুবই আনন্দের। এবার মানুষ যাদের ভোট দেবেন তারাই জিতবেন। বিভিন্ন চ্যানেল অবশ্য এক্সিট পোল এ মেতে উঠেছে যেগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘরে বসে বানানো বা পক্ষপাতপূর্ণ হয়।
সর্বভারতীয় সমীক্ষক সংস্থাগুলি বেশিরভাগ তামিলনাড়ুতে ডিএমকে জোট, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি, অসমে বিজেপি এবং কেরলমে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফ কে (বিজেপির বেশ কিছু আসন সহ) এগিয়ে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে চারটি সংস্থা বিজেপি এবং একটি সংস্থা তৃণমূল কে এগিয়ে রেখেছে। যদিও আমার ব্যক্তিগত মত প্রায় ৪০% মুসলমান ভোট ব্যাঙ্ক, মহিলা সহ বিপুল উপভোক্তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের জেতার কথা এবং বিজেপি ও কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বাড়ার কথা, যদি না ১৯৭৭ ও ২০১১ তে মানুষ ক্ষেপে গিয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম কে যেমন ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সেরকম চরম দুর্নীতিগ্রস্ত অরাজক তৃণমূল শাসন কে ছুঁড়ে ফেলে।
সমাজ মাধ্যমে অনবরত অশ্লীল মিম, কার্টুন, ফটোশপ, ট্রোল ইত্যাদি বিশেষ করে মহিলাদের বিরুদ্ধে ঘটেই চলেছে যা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং যা রাষ্ট্র ও সমাজ মাধ্যম সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তবে এগুলি সাধারণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং তাদের কাছে গুরুত্বহীন। পশ্চিমবঙ্গ যেখানে দেশের মধ্যে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধে, গণ ধর্ষণে যোগী রাজ্যের সঙ্গে বহু বছর ধরে শীর্ষে, যেখানে অভয়া ধর্ষণ – হত্যা – ধামা চাপা র মত ভয়ংকর ঘটনা হয় সেখানকার বিদ্বজ্জন রা এবং একটি বাণিজ্যিক কাগজ যে শতাব্দী ধরে বাংলা সমাজে অপসংস্কৃতি ও পশ্চিমী যৌন বিকৃতি ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং মুনাফার জন্য যাবতীয় অশ্লীল ও নারীর অবমাননাকর বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে আসছে তারা যখন নির্বাচনের মূল এসেন্স কে বাদ দিয়ে একটি নিন্দনীয় অশ্লীল মিম নিয়ে ন্যায় শাস্ত্রী হয়ে ওঠে সেখানে তাদের পছন্দের দলকে সুবিধা করে দেওয়ার সন্দেহ দেখা দেয়। প্রসঙ্গক্রমে ডায়মন্ড হারবারের পুলিশ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের নির্বাচন কমিশন ও আদালতে অভিযোগ নিয়ম অন্তর্ভূত। সেখানে মাঝেমাঝে বক্তৃতার তুবড়ি ছোটানো তৃণ সাংসদ মহুয়া মৈত্রের একটি ঠিক বা ফেক লাস্য নাচের ভিডিও ছড়ানো খুবই অশ্লীল ও নিন্দনীয়। পাল্টা আবার কেউ শিল্পপতি ও বিজেপি সাংসদ সজ্জন মিত্তলের গৃহে থেকে চার পাঁচ দিন অনুশীলন করে মহুয়া মৈত্রের লাস্যময়ী নাচের ভিডিও ছড়িয়ে দিতে পারে।
আমরা আশা করব নির্বাচন পরবর্তী ও গণনা পরবর্তী পরিস্থিতি যেন শান্তিপূর্ণ থাকে। মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার সৎ ভাবে মানুষের জন্য কাজ করে।
এর সঙ্গে আমাদের দুরাশা যে নিজেদের শিক্ষিত ও গণতান্ত্রিক দাবি করা বাঙালি সত্যিই সত্যিই শিক্ষিত ও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠুক। যুদ্ধ পরিস্থিতির মত সেনা নামিয়ে কেন সেখানে নির্বাচন করতে হবে? কেন পশ্চিমবঙ্গ কে দেখে সারা দেশ ও বিশ্ব হাসবে ও উপহাস করবে? বাঙালি ও পশ্চিমবঙ্গের প্রমাণ করার সময় হয়েছে যে সে মৌলবাদ ও গৃহযুদ্ধপীড়িত সাবসাহারান সোমালিয়া, সুদান, মালি, নাইজেরিয়ার চাইতে ভালো অবস্থায় রয়েছে।
২৯.০৪.২০২৬










