১.
কলকাতার কোল ঘেঁষে যেমন বিধাননগর উপনগরী, মুম্বাইয়ের ঠিক তেমনিই নবি মুম্বাই। একেবারে শুরুতে অবশ্য ডাকা হতো নিউ মুম্বাই নামে,পরে ইংরেজি নিউ শব্দের মারাঠিকরণ করে নিউ বদলে নভি শব্দকে জুড়ে দেওয়া হলো। নিউ মুম্বাই সেই থেকে নভি মুম্বাই – ঠিক যেন দিদির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বোনটি।
নানান কাজের ছল ছুতোয় মুম্বাই গিয়েছি বার কয়েক, তবে সমুদ্রের ওপর দিয়ে তৈরি করা লম্বা অটল সেতু পেরিয়ে নভি মুম্বাইতে প্রথম পা রাখা বছর দুয়েক আগে, এক সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য। জনপদ হিসেবে শহর বা নগরীর আকর্ষণ দুর্নিবার, অমোঘ। আলোর টানে ছুটে আসা পতঙ্গের মতো আশপাশের গেঁয়ো গন্ধ মাখা গ্রাম বসতির মানুষজন এসে ভিড় জমায় নগরীর উপকন্ঠে। কালে কালে সেগুলোও পূর্ণগর্ভা হয়ে ওঠে। নতুন মলাটে শরীর ঢেকে একসময় তারাও হয়ে ওঠে উপনগরী। নভি মুম্বাইয়ের পত্তনের
ইতিহাসও এরকম। এই শহরের শরীর জুড়ে রয়েছে সু – নগর পরিকল্পনার ছাপ। ঠিক আমাদের কল্যাণী বা বিধাননগরের মতো।
২.
সূর্যের আলো দিকচক্রবালের দখল নিতে না নিতেই নিজেদের এপার্টমেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে শ্রুতি এবং সুনীল – আগরওয়াল পরিবারের দুই বরিষ্ঠ সদস্য। সকালের নরম আলো গায়ে মেখে খানিকটা সময় বাইরের খোলা পরিসরে হাঁটাহাঁটি করতে বেশ ভালো লাগে। সমুদ্রের লাগোয়া অবস্থানের কারণে এখানে শীতের হাড়কাঁপানো উপদ্রব একেবারেই নেই। তাই বর্ষার বানভাসি দিনগুলোকে বাদ দিয়ে দলবেঁধে এভাবে হাঁটাহাঁটি করতে বেশ ভালো লাগে ওদের। শরীর আর মন দুইই সহজেই চাঙ্গা হয়ে যায় এই প্রভাতী প্রয়াসের কল্যাণে। নানা বয়সের মানুষজনের এমন স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রশংসার দাবি রাখে বৈকি। নিজেরাও এমন কাজে সামিল হতে পেরে মনে মনে খুব তৃপ্তি পায়।
৩.
আজ হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই দূরে চলে এসেছে ওঁরা। নভি মুম্বাইয়ের পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে রয়েছে বিস্তির্ণ জলাভূমি। জোয়ার ভাটার প্রভাবে এখানে জলের জোগান বাড়ে আবার কমে। মুম্বাইকে অনেকেই ঠাট্টা করে বলে বিষয়ী মানুষজনের আস্তানা। বাণিজ্যিক এলাকা বলে এখানকার আবাসিকরা নাকি সবসময় লাভ ক্ষতির হিসাব করে পা ফেলে। আর তাই হয়তো এই জলাভূমির অংশটি তাঁদের অনেকের কাছেই অনুর্বর, বাজা এলাকা; অথচ এই জলাভূমিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক আশ্চর্য অতিথিশালা, গেস্ট হাউস।
৪.
সারা দেশ জুড়েই আজ জলাভূমিগুলো গভীর সংকটে। সুনীল সে কথা বিলক্ষণ জানেন। নভি মুম্বাইয়ের প্রান্তিক এই জলাভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে তাঁর মনে। নতুন এই জনপদের শহুরে ভিড় আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে যায় থানে খাঁড়িতে এসে। ম্যানগ্রোভের জঙ্গল রাতারাতি কেটে পরিষ্কার করে জমি হাঙরের দল জমির দখল নিতে তলে তলে তৈরি হয়েছে। নতুন করে শহরের বিস্তার ঘটাবার পরিকল্পনা চলছে। এই বাদা জলাভূমির ৮০ হেক্টর জমিতে নাকি নতুন বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর সবটাই করা হয়েছে তথাকথিত উন্নয়নের নামে। এই সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে উন্নয়ন কথাটাকে খুব ক্লিশে লাগে। নভি মুম্বাইয়ের এই অঞ্চলে নতুন করে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে, বাড়বে বিনিয়োগ, প্রসারিত হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ, সাধারণ গরীব মানুষের আয় বাড়বে,উন্নত হবে জীবনযাত্রার মান , নতুন করে পরিকাঠামোর বিকাশ রাতারাতি বদলে ফেলবে এই জলাভূমিএলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাতাবরণ, এখানেই তৈরি করা হবে আন্তর্জাতিক মানের গল্ফ কোর্স। এ এক আশ্চর্য রূপান্তরের গল্প কাহিনি। একালে উন্নয়ন বিণা গীতি নাই বাপু!
৫.
বাংলায় ওদের নাম হলো কানঠুটি, বৈজ্ঞানিক নাম Phoenicopterus , আর দুনিয়া ওদের চেনে ফ্লেমিঙ্গো নামে। এই শব্দটির উৎপত্তি অবশ্য স্প্যানিশ বা পর্তুগিজ শব্দ ফ্লামেঙ্গো থেকে যার অর্থ আগুনরঙা। একান্তভাবেই জলাভূমির আবাসিক এই ফ্লেমিঙ্গোদের দেখা মিলবে ভারতের পশ্চিম উপকূলের নানা আস্তানায়। নভি মুম্বাইয়ের এই জলাভূমি ভারি পছন্দের জায়গা ফ্লেমিঙ্গো পাখিদের কাছে।আর তাই বাতাসে হিমেল হাওয়ায় দাপট একটু বাড়লেই আগুনরঙা ডানায় ভর করে তারা দলে দলে পৌঁছে যায় নভি মুম্বাইয়ের এই অঞ্চলে। এই অতিথিদের সঙ্গ দিতে এখানেই মজুত রয়েছে বিচিত্র সব মাছরাঙা, সোনা জঙ্ঘা (painted storks),শামুকখোর (asian openbills), কাদা খোঁচা (sand pipers),পানকৌড়ি (cormorants), পেলিকান,ছোটো বক (egrets ) আরও কত রকমের জলার পাখি। নভেম্বর মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত নভি মুম্বাইয়ের এই প্রান্তিক জলাভূমি বিচিত্র সব খেচর অতিথিদের সমাগমে এক আনন্দবাসরে পরিণত হয়। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি মৌলের জোগান মেলে,ফলে মাছের জোগানে কখনোই টান পড়েনা। উড়ে এসে জুড়ে বসা এই সব পাখিরা মনের সুখে মাস কয়েক দিন কাটায়। এ এক আশ্চর্য প্রাণধারা। শীতের মাসগুলোতে ফ্লেমিঙ্গোদের ভিড়ে গোটা এলাকা গোলাপি পালকের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। বেলাপুর ও উরানের সাথে সাথে থানে খাঁড়ির সংলগ্ন এলাকায় এই জমায়েত দেখতে হাজির হয় বিপুলসংখ্যক মানুষ। উন্নয়নের ছল ছুতোয় এই প্রাণ তন্ত্রকে ধ্বংস করে ফেলা হবে?
৬.
প্রাতর্ভ্রমণের চক্করে পড়ে শ্রুতি আর সুনীল এই জলাভূমির জীবন চক্রের প্রেমে পড়ে যায়। সেদিন থানে খাঁড়ির কাছে এসে অভ্যাস মতো জলার দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হয় শ্রুতি – কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে না ওদিকটা? সুনীলকে একথা বলতেই সেও অবাক হয়। ম্যানগ্রোভের ঝাড়টা যেন খালি হয়ে গিয়েছে! পরেরদিন ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয় তাঁরা যাতে করে এই খালি হয়ে যাবার বিষয়টাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা যায়। পায়ে পায়ে জলাভূমির ধারে পৌঁছে যেতেই দিনের আলোয় সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁদের কাছে। সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা বুঝতে পারেন কেউ না কেউ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে গাছগুলোকে কেটে ফেলছে। কুঠারের আঘাতে তছনচ হয়ে গেছে গোটা এলাকাটা।
৭.
ওই দিনের পর থেকেই শুরু হলো শ্রুতি আর সুনীলের নতুন লড়াই, গণজাগরণের লড়াই। আগরওয়াল দম্পতি বুঝতে পেরেছিলেন যে যতদিন না প্রশাসনিক স্তর থেকে এই সংহার পর্বকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে ততদিন পর্যন্ত এই উন্নয়নমেধ যজ্ঞকে রোধ করা সম্ভব নয়। সুনীলের তোলা ছোট্ট ভিডিওটাই হয়ে উঠলো তাদের লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্র। আইনের পথেই শুরু হলো সেই অবিচলিত প্রতিবাদ। প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাঁরা বারংবার আবেদন জানিয়েছেন জলাভূমি দখলের বিরুদ্ধে। বিল্ডার্স,প্রমোটারদের উদ্যোগে বাধা দিতে চায়নি প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কোর্টের এই দরজা ওই দরজা ঘুরে ঘুরে হতোদ্যম হয়েও হাল ছাড়েননি তাঁরা, জলাভূমিকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা জারি রেখেছেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালে মুম্বাইয়ের উচ্চতম ন্যায়ালয় ঘোষণা করলো এক ঐতিহাসিক রায় – নভি মুম্বাইয়ের প্রান্তিক জলাভূমির ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও জলাভূমির অংশকে কোনো ভাবেই নষ্ট করা চলবে না। তথাকথিত উন্নয়নের নামে পরিবেশের ভারসাম্য কোনোভাবেই বিঘ্নিত করা যাবে না।
৮.
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর নভি মুম্বাইয়ের জলাভূমি ফিরে পেলো নতুন জীবন, শ্রুতি এবং সুনীল ফিরে পেল শান্তি ও স্বস্তি। যাঁরা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কেটে নষ্ট করার খেলায় মেতে উঠেছিল, আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের নিবৃত্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই জলাভূমির হারিয়ে যাওয়া খুশি একটু একটু করে ফিরে আসতে থাকে। আবার আগের মতো প্রাণময় হয়ে ওঠে জলার পরিবেশ – ম্যানগ্রোভ গাছপালারা আবার নতুন করে ডালপালা ছড়িয়ে দিতে থাকলো জীবনের জয়বার্তাকে ঘোষণা করে,আগুনরঙা ডানা মেলে দলে দলে ফিরে এলো ফ্লেমিঙ্গো পাখিদের ঝাঁক, গোটা জলাভূমি এলাকা আবার ঢাকা পড়লো গোলাপি রঙের পশমিনা চাদরের আড়ালে, জয়ী হলো টিকে থাকার এক দুর্দান্ত লড়াই।
৯.
একটূ সময় পেলে প্রকৃতি পরিবেশ নিজের ক্ষয়ক্ষতি নিজেই মেরামত করে নিতে পারে , কেবল তাঁর একান্ত নিয়মগুলোকে অনুসরণ করে চলার অভ্যাস করতে হয় মানুষকে। একটা সহজ কথা আমরা বারেবারে ভুলে যাই যে আমরা এই প্রকৃতি পরিবেশেরই অচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর বিণাশ মানেই হলো নিজেদের অন্তিম মুহুর্তটিকে ত্বরান্বিত করা। এই পরম সত্যটাকে বুঝতে পেরেই শ্রুতি ও সুনীল রুখে দাঁড়ানোর কথা ভেবেছিলেন ; আর তাই আজও বহমান রয়েছে নভি মুম্বাইয়ের জলাভূমির সেই আশ্চর্য প্রাণধারা।
১০.
মাঝে মাঝেই অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন – আমরা কীভাবে পরিবেশের কথা ভাবতে পারি? এই কাহিনি লেখার পর আমি আজ সহজেই বলতে পারি সুনীল আর শ্রুতির কথা। ওঁরা সাগ্রহে এক কঠিন ব্রত পালন করেছেন সকলের মঙ্গলার্থে, দেখিয়েছেন লড়াইয়ের নয়া রাস্তা। আজ তাঁদের কৃচ্ছতার কারণেই নভি মুম্বাই বিশ্বের ফ্লেমিঙ্গো মানচিত্রে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। এটাই বা কম কিসে?
মে ২১. ২০২৬



















কুর্নিশ 🙏