হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাতের তত্ত্ব পন্ডিতদের বিতর্ক সভা আর পরিভাষা কন্টকিত পুঁথির পাতার বাইরে কতটা ছড়িয়েছিল সন্দেহ আছে| এই ভুবনের ভার যাদের করতলে, মেঘের আড়াল থেকে যারা আমাদের প্রতিটি অনুপল নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের নিজস্ব বৃত্তে অবশ্য এ কথা নতুন নয়। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান যখন প্রকাশ্যে হুংকার দিয়ে ঘোষণা করেন, প্রাচীন পারসিক সভ্যতা কে আক্ষরিক অর্থে ধ্বংস করতে তাঁর একরাত্রি যথেষ্ট, তখন আমাদের চেনা চিরাচরিত ভূরাজনীতির পরিসরে একটা দানবীয় সুনামির ঢেউ আছড়ে পড়ে। মাটি ফেটে আগ্নেয় ভুগর্ভের গন্ধক ধোঁয়া ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসে। মাত্র কয়েকদিন আগেই এই উন্মাদ নেতার নৌ বাহিনী কোনরকম প্ররোচনা ছাড়াই মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিপক্ষের একটি জাহাজ টরপেডো দেগে ডুবিয়ে দিয়েছিল, ঘটনাচক্রে যা আমাদের দেশের নৌ বাহিনীর সাথে এক শান্তি পূর্ণ যৌথ মহড়া সেরে স্বদেশে ফিরছিল। এই জাহাজের প্রায় সব নাবিকের সলিল সমাধি ঘটে। অথচ দর্পিত রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্য, জাহাজটাকে ধ্বংস না করে বন্দী করাও যেত কিন্তু তলা থেকে টরপেডো মেরে জাহাজ ডুবির অনবদ্য মজা (“it’s fun”) উপভোগ করা যেত না।
মদমত্ত শক্তির এহেন আস্ফালন, নির্লজ্জ অশ্লীল হুংকার নিকট অতীতে আমরা দেখিনি। সাম্রাজ্যবাদ চিরকাল যুদ্ধের সার্থবাহী, মিথ্যা তুচ্ছ অজুহাতে পররাষ্ট্র আক্রমণের দৃষ্টান্ত এত বেশি যে আলাদাভাবে উল্লেখ করা বাহুল্য মাত্র। কিন্তু যতই বাজে বা ঠুনকো হোক, কোন একটা আপাত গ্রাহ্য যুক্তির আশ্রয় নেয়া হত সবসময়, রাষ্ট্রসংঘ বা ওরকম কোন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে শিখন্ডী খাড়া করে চেষ্টা করা হত আগ্রাসনের রক্তলোলুপ চেহারাকে আপাত -শোভন মুখোশের আড়ালে ঢেকে রাখার। খুবই পাতলা সেই মুখোশ, সামান্য রাজনৈতিক সচেতনতা থাকলেই স্পষ্ট দেখা যেত পেছনের হিংস্র শ্বদন্তের পাটি।
তবুও আদৌ কোন অজুহাতের তোয়াক্কা না করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য জাতিবিদ্বেষ আর যুদ্ধের আস্ফালনের সঙ্গে তার একটা মৌলিক পার্থক্য আছে।
এই পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক আইনের যে অবয়ব গড়ে উঠেছিল, রাষ্ট্রসংঘ, আন্তর্জাতিক ফৌজদারী আদালত ( International criminal court or I.C.C. ) ইত্যাদি সহ সেই পরিকাঠামোর সম্পূর্ণ বিলুপ্তি সূচিত করে।
এই সংস্থাগুলো শুরু থেকেই একপেশে আর নখদন্ত হীন, নয়া ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও অন্তত তাত্ত্বিকভাবে উপরিতলের উদার মানবিক মায়া-আবরণ এক রকম টিকে ছিল। তা ছিল চেতনার জগতে সাম্রাজ্যবাদের দখলদারি বা হেজিমনি কায়েম করার মূল অস্ত্র। সেই সাজানো রঙ্গমঞ্চের পর্দা ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলল সাম্প্রতিক অতীতের কয়েকটি ঘটনা, যার মধ্য দিয়ে ১৮-১৯ শতক বা তারও আগের ধ্রুপদী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের রক্ত পিপাসু প্রেত ইতিহাসের কবর থেকে যেন নবকলেবরে উঠে দাঁড়ালো। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ থেকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় পর্বের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা, ভেনিজুয়েলায় হামলা, এসবই এই দানবের পদচিহ্ন নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দিয়েছিল। ইউক্রেনের যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবের নামে খনিজ সম্পদ নিয়ে ট্রাম্প ও পুতিনের ভাগ বাটোয়ারার উদ্ধত প্রচেষ্টা আফ্রিকা এশিয়ার পুরনো উপনিবেশ গুলো নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর আচরণ মনে করিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক আইন কাঠামোর ভঙ্গুর ইমারতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছিল গাজার ঘটনাবলী। আসলে মধ্যপ্রাচ্যের তৈল সমৃদ্ধ মরুর বুকে জায়নবাদী ইজরায়েল রাষ্ট্র সূচনা লগ্ন থেকেই উপনিবেশের সাবেক চেহারা বজায় রেখে চলছিল। প্যালেস্টাইনের মানুষের ভৌগোলিক বাসভূমিতে উপনিবেশ স্থাপন করে একদিকে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখা, অন্যদিকে প্রাচীন কিংবদন্তীর ইহুদি ধর্মীয় সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়ে এক ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে (ultra orthodox ) তুষ্ট রাখা এই দুইয়ের মধ্য দিয়েই ইজরায়েলের উদ্ধত যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রসত্তার বিকাশ।
মার্কিন প্রভুর অগাধ আশীর্বাদ ও প্রশ্রয় তার যথেচ্ছাচারের ছাড়পত্র। আরাফাতের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা না এলেও অসলো চুক্তির মাধ্যমে অন্তত তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটুকু অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, আরাফাতের মৃত্যুর পর বা তার আগে থেকেই তার সংগঠন ফতাহ্ কে নানা ভাবে বশম্বদ ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে ফেলা গিয়েছিল। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্যালেস্টাইনের মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বিকল্প খুঁজে নেয় হামাসের নেতৃত্বে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে। গাজা ভূখণ্ডে হামাস ইজরায়েলের প্রভুত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। প্যালেস্টাইনের অপর ভূখন্ডে ( পশ্চিম তীর বা West Bank ) ফতাহ র প্রভাব থাকলেও গাজায় হামাসের গণভিত্তি ছিল নিরঙ্কুশ। এর গভীরে অবশ্য আরেকটা জটিল কূটনীতিরও কিছু ভূমিকা ছিল, যা এক অর্থে পুরনো আর নয়া উপনিবেশবাদের দ্বন্দ্বকে চিহ্নিত করে। পশ্চিমী, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপীয় বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলো অসলো চুক্তি তথা দ্বি রাষ্ট্র সমাধানের (two state solution ) প্রতি মৌখিক সমর্থনের মাধ্যমে একটা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিল। এতে গাজা আর পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের পক্ষে সরাসরি ইহুদী উপনিবেশ স্থাপন করা সম্ভব নয়, যদিও সামরিক ও অন্যান্য সব ব্যাপারে ইজরায়েলের তথা পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের সার্বিক কর্তৃত্ব বজায় থাকত। নয়া উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা সর্বোত্তম ব্যবস্থা, যা আপাতভাবে এক শান্তি কল্যাণের ধোঁকার আড়ালে ঔপনিবেশিক শোষণকে সুনিশ্চিত করে। কিন্তু জায়নবাদী ইজরায়েল, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়ানিহুর রাজনৈতিক জোট সঙ্গী মৌলবাদী দলগুলোর কাছে সাবেক ঘরানার প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্য বিস্তার এক পবিত্র কর্তব্য। ফলে স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্টাইনের প্রতীকী বা তাত্ত্বিক অস্তিত্ব টুকুও এদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই অসলো চুক্তি অনুসারে প্যালেস্টাইনের প্রতিনিধি Fatah কে কোণঠাসা করে হামাসকে কিছুটা প্রশ্রয়ে গাজার দখল নিতে দিলে একদিকে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে স্থায়ী অন্তর্দ্বন্দ্ব বাধিয়ে তাকে দুর্বল করা যায়, আর অন্যদিকে হামাসের সশস্ত্র সংগ্রামের অজুহাতে গাজায় সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর যথেচ্ছ অত্যাচারের যুক্তি মেলে, এই ছিল নেতানিয়ানিহুর কৌশলী উদ্দেশ্য।
তবে সব সময় যেমন হয়, হামাস শাসকের হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলল। ইরান ও তার সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হিউতি) পরোক্ষ সহায়তায় গাজায় হামাস মুক্তি সংগ্রামের দিশারী হয়ে উঠলো। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ইরাক এরকম হাতে গোনা কয়েকটি দেশ বাদে বাকি আরব দেশগুলোর জনগণ প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার সমর্থক হলেও এই দেশগুলোর স্বৈরাচারী শাসকদের সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গভীর আঁতাত। কিছুটা পুরনো যুদ্ধের স্মৃতি আর জনরোষের ভয়ে কুয়েত, সৌদি বা আমির শাহির মত আরব দেশগুলোর শাসকদের অন্তত মৌখিকভাবে ইজরাযেলের বিরোধিতা করতে হয়। হামাসের শক্তি বৃদ্ধির অশনি সংকেত দেখে ইজরাযেল একদিকে যেমন প্যালেস্টাইনের জনগণের ওপর দমন পীড়নের মাত্রা বহু গুণে বাড়িয়ে তুলল, পাশাপাশি প্যালেস্টাইন ও তার একমাত্র সহায় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কোনঠাসা করতে বাকি আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিনিময় ও কূটনৈতিক আঁতাত পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিল। মার্কিন মদতে এই চুক্তি যখন প্রায় পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে চলেছে, আন্তর্জাতিক স্তরে অসলো চুক্তি বা প্যালেস্টাইন প্রশ্ন প্রায় এক বিস্মৃত অধ্যায়, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর মরিয়া হামাসের অভাবিত অভ্যুত্থান ঔপনিবেশিক শক্তির দুর্গের প্রাকার আক্ষরিক অর্থে ধুলিস্যাৎ করে দিল। যেকোনো অভ্যুত্থানের মতোই এই ঘটনায় বেশ কিছু সংখ্যক নিরীহ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। গাজার সীমান্তবর্তী ইজরায়েলি জনপদ থেকে পণবন্দী নিয়ে যাওয়া হামাসের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলেও অযৌক্তিক নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও ধর্ষণের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছিল নিঃসন্দেহে। যদিও হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব এগুলোকে বিচ্যুতি হিসেবেই চিহ্নিত করেছিল। তবে শুধু হামাসের হাতে নয়, পরবর্তীকালে জানা তথ্য অনুসারে সেদিন ইজরাযেলের সেনাবাহিনী ‘হানিবল নীতি’ চালু করেছিল। যার অর্থ নিজেদের নাগরিকদের পণবন্দী হওয়ার সম্ভাবনা দেখলে তাদের হত্যা করা। নিঃসন্দেহে বেশ কিছু সংখ্যক প্রাণ এই নিষ্ঠুর নীতির বলিও হয়েছিল। অনভিপ্রেত হলেও গাজার ঘটনায় হামাসের নিষ্ঠুরতা অপ্রত্যাশিত নয়। সমগ্র প্যালেস্টাইনের মানুষকে যেভাবে জায়নবাদী রাষ্ট্র মানবেতর জীব হিসেবে পদপিষ্ট করেছে বছরের পর বছর, অকারণ গ্রেপ্তার, হত্যা, উচ্ছেদ আর আরো নানাভাবে দমন পীড়নের ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে কয়েকটা আস্ত প্রজন্ম, তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে তৈরি হয়েছে পাল্টা ঘৃণার গরল, যা জ্বলন্ত লাভার মত সেদিন প্লাবিত হয়েছিল গাজা সীমান্ত জুড়ে। আমাদের দেশের ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সঙ্গে বোধহয় তুলনা করা যায় গাজার উপনিবেশ বিরোধী এই ঘৃণার আগুনকে। সেই বিদ্রোহেও জনরোষ বহু ক্ষেত্রেই সামরিক বেসামরিক নির্বিশেষে সমস্ত ইংরেজ নরনারীর বিরুদ্ধে হত্যার উন্মাদনায় ধাবিত হয়েছিল। গাজার ঘটনা কোন ব্যতিক্রম নয়, আর প্রাথমিক বিমূঢ়তার জড়ত্ব কাটিয়ে রাষ্ট্রশক্তি যে দানবীয় হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়লো গাজার জনগণের ওপরে, তার সঙ্গেও মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকের নির্মম পাশবিক দমনের ইতিহাস যেন হুবহু মিলে যায়। প্রতিশোধকামী ব্রিটিশ বাহিনী গ্রামের পর গ্রামে শিশু বৃদ্ধ নারী পুরুষ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে হত্যা করেছিল, কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দিয়ে বা গাছ থেকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে। আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত ইজরায়েল তার চেয়ে অনেক দক্ষতায় অনেক বেশি মানুষকে হত্যা করল আকাশ পথ থেকে নির্বিচার বোমা বর্ষণে। বসতবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিচালিত ত্রাণ শিবির কোন কিছুই বাদ গেল না। হিরোশিমা নাগাসাকি কিংবা ভিয়েতনামের পর পৃথিবী স্তব্ধবাক বিভীষিকায় দেখলো আরেক নারকীয় মারণযজ্ঞ। এতদিন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির বিশেষ পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের সাবেকি উপনিবেশকে সযত্নে লালন করা হয়েছিল, মাঝে মাঝে তার রণচণ্ডী হিংস্র মূর্তি প্রকাশ্যে আসার উপক্রম হলেই রেখে ঢেকে রাখা যেত।
কিন্তু গাজার গণহত্যা আর তার সমর্থনে ইজরায়েলের রাষ্ট্রনেতাদের প্রকাশ্য উদ্ধত উল্লাস, সব ধরনের যুদ্ধাপরাধকে আত্মরক্ষার ন্যায্য অধিকার বলে দাবি করা, এসব আর কোন আন্তর্জাতিক আইনের গণ্ডিতেই আটকে রাখা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে অন্তর্জাল ও সামাজিক মাধ্যমে দাবানলের দ্রুততায় রাষ্ট্রীয় হত্যালীলার টাটকা ছবি পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। দেশে দেশে সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদে মুখর হলেন, ইজরায়েলের ওপর অতীতের দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গ সরকারের মত সব রকম বয়কট ও নিষেধাজ্ঞার জোরালো দাবি উঠতে লাগলো। পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার মানুষ নিজেদের নির্বাচিত সরকারের কাছে ইজরায়েলকে সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য বন্ধ করার ডাক দিয়ে পথে নামলেন। কিন্তু এক বিপন্ন বিস্ময়ে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করল এইসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অদ্ভুত অসহায় অবস্থা। দুর্বল ভাষায় ইসরাইলকে সংযত হওয়ার আবেদন বা গাজায় অল্পবিস্তর ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর বেশি কিছু করার তাদের ক্ষমতা নেই, ইজরায়েলের সামরিক সাহায্য বাতিল বা নিয়ন্ত্রণের মতো কোনো প্রস্তাব আলোচনা করাই প্রায় যাবে না, বাস্তবে কার্যকর করা তো দূরের কথা। কি এক অদৃশ্য পুতুল নাচের সুতোয় যেন এইসব নির্বাচিত সরকার গুলো বাঁধা পড়ে আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, স্বদেশের ক্রমবর্ধমান ইজরায়েল বিরোধী জনমতের কোন সত্যিকারের গুরুত্ব নেই নির্বাচিত সরকার গুলোর কাছে। ইজরায়েলের সঙ্গে সামরিক কূটনৈতিক আঁতাত তাদের যাবতীয় গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার চেয়ে অনেক গভীর ও অলংঘনীয়। বিশ্বজোড়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের যে জটিল দাবার ছকটাকে চট করে দেখা যেত না, গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামোর নেপথ্যে বসে যেসব শক্তি পুতুল নাচের সুতোয় টান দিত, গাজা পরবর্তী ঘটনাবলী তাদের সহসা নগ্ন করে দিল। নয়া উপনিবেশবাদী হেজিমনির ভিত্তিমূল কেঁপে উঠল প্রচন্ড আঘাতে। ইউরোপের চেয়েও আমেরিকায় ইজরায়েলের প্রতি জনসমর্থন ঐতিহাসিকভাবে অনেক বেশি, কিন্তু সেখানেও অন্তত ডেমোক্রেট সমর্থকদের মধ্যে ক্রমশ ইজরায়েল বিরোধিতার সুর স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ষাটের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের মতো ছাত্র অধ্যাপক বিক্ষোভের ঢেউ উঠলো। সেই বিক্ষোভ অংকুরে বিনাশ করার জন্য পশ্চিমি গণতন্ত্র তথা বাকস্বাধীনতার স্বঘোষিত নায়ক মার্কিন রাষ্ট্রের হিংস্র বর্বর দমননীতি তার ভাবমূর্তির বাইরের মুখোশ যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তা ছিন্নভিন্ন করে দিল।
ইজরায়েল প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষা ও প্রয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর স্ববিরোধী নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় এইসব সংস্থার বহু পদস্থ কর্মী নিজেদের বিবেকের ডাকে পদত্যাগ করলেন। আন্তর্জাতিক ফৌজদারী আদালতের প্রধান প্রসিকিউটার করিম খান এক ব্যতিক্রমী সাহসের পরিচয় দিয়ে সরাসরি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়ানিহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেফতারি পরোয়ানা বের করার আবেদন জানিয়ে বসলেন। আগে পুতিনের নামেও এরকম হুলিয়া বেরিয়েছিল, তার পেছনে ছিল মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপের সোচ্চার সমর্থন, কিন্তু পাশার দান এভাবে উল্টে যাওয়ায় মার্কিন ইউরোপীয় জোটের মুশকিল হল। কোন কোন রাষ্ট্রনেতা প্রকাশ্যে বলেই ফেললেন, I C C র মত সংস্থা তো আসলে তৈরি হয়েছিল এশিয়া আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার তথাকথিত অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী সরকারকে শায়েস্তা করতে। কি করে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ, মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের উজ্জ্বল রত্ন (crown jewel ) ইজরায়েলকে তাদের সঙ্গে এক আসনে বসানো হচ্ছে। মার্কিন সরকার সরাসরি ICC আর ICJ ( international court of justice) কে ব্যর্থ, অকেজো বলে ভর্ৎসনা করল, ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকান সেনেটরদের মুখে সরাসরি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য শাস্তির হুমকি শোনা গেল ( যা পরে ট্রাম্পের শাসনের শুরুতেই কার্যকর হয়েছিল )। এমন কি শোনা গেল বোমা ফেলে হেগ শহরে এই সংস্থার সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব। পশ্চিম ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ অবশ্য ICC র এত প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করতে পারেনি। হাজার হোক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কমিউনিজমকে ঠেকাতে কল্যাণকামী রাষ্ট্র ( welfare state ) আর তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো নির্মাণে পশ্চিম ইউরোপ মূল ভূমিকা নিয়েছিল। আমেরিকা কখনোই lCC, ICJ র সদস্যপদ গ্রহণ করেনি। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এই সংস্থাগুলোকে সরাসরি নস্যাৎ করতে পারে না। যেকোনো ICC সদস্য দেশের ভৌগলিক সীমায় নেতানিয়ানিহু পা দিলেই তাঁকে গ্রেফতার করার কথা, অথচ বামপন্থী শাসিত স্পেন আর উপনিবেশ বিরোধী ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত আয়ারল্যান্ডের মতো দু একটি দেশ বাদে বাকি সব দেশের সরকার কিভাবে আইনের ফাঁক দিয়ে গ্রেপ্তারির দায় এড়ানো সম্ভব তার উপায় খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। করিম খান বা তাঁর আইনি পরামর্শদাতা লেবানিজ আইনজীবী আমাল ক্লুনি এবং ICC ও ICJ র সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা বা বিচারকদের ওপর ট্রাম্পের সরকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ( sanction ) জোরালো আঘাত হানল। করিম খান যেন আমাদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের মহারাজা নন্দকুমারের ভূমিকায় অবতীর্ণ, মার্কিন প্রভুদের আক্রমণের সম্ভাবনা জেনেও তাঁরও হয়তো মনে হয়েছিল, “একটা পুরো জাতি …পোষা কুকুরের মত শায়িত থাকবে বছরের পর বছর, চরম প্রতিবাদ ধ্বনিত হবে না, কেউ মুখ খুলবে না, এই লজ্জা মাথায় নিয়ে আমি আর বাঁচতে পারছি না” ( ‘বণিকের মানদণ্ড’ , উৎপল দত্ত) ।
হেজিমনির নেপথ্যের সাজঘর সম্পূর্ণ বেআব্রু হয়ে যাওয়ায় তার আর বিশেষ মূল্য থাকলো না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে স্বাভাবিকভাবেই পুরোনো উপনিবেশবাদের রনধ্বজা উড়িয়ে ট্রাম্পের উত্থান। সমস্ত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা (world order ) ভেঙে তছনছ করা এই জমানার অভিজ্ঞান। রাষ্ট্রসঙ্ঘ চিরকাল বৃহৎ শক্তির সেবক, কিন্তু যেভাবে তার তাত্ত্বিক ভূমিকাটুকুও ট্রাম্প আর তার দোসর নেতানিয়ানিহুর হাতে আক্রান্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ( persona non grata) হিসেবে দাগিয়ে দেয়া হচ্ছে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উপর চাপানো হচ্ছে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি, এরকম পৃথিবী সম্ভবত এর আগে দেখেছে লীগ অফ নেশনস এর অবলুপ্তির প্রাক্কালে, যখন বিশ্ব জুড়ে নাৎসী আর ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সেই ইতিহাসের প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত ট্রাম্পের উত্থানের গতিপথে।
নাৎসী জার্মানির অতীত গরিমার জায়গায় আমেরিকার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের ডাক (MAGA – Make America Great Again), অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী মানুষের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ, সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দর্পিত অহংকার অতীতের হাড়-হিম করা স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। ট্রাম্পের রথে সেই সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন মৌলবাদী প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের ধর্ম ধ্বজা, ইজরায়েলের ইহুদি ধর্মীয় সাম্রাজ্যের হোতাদের সঙ্গে যা খাপে খাপে মিলে যায়। অতি সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমে যীশুর ভূমিকায় অবতীর্ণ ট্রাম্পের ছবি আলোড়ন তুলেছিল, পরে যদিও বিরূপ সমালোচনার চাপে ট্রাম্প সেটা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। আরো একধাপ এগিয়ে ইরান আক্রমণ প্রসঙ্গে পোপের সমালোচনার উত্তরে তাঁকে ট্রাম্প কটূ ভাষায় আক্রমণ করেছেন, যেন মধ্যযুগের এক পর্বে সম্রাটের পোপকে ছাপিয়ে সর্বভৌম হয়ে ওঠার আধুনিক পুনরভিনয় ।
নাৎসি জার্মানির মতোই ট্রাম্পের জমানায় আমেরিকার মুক্ত জ্ঞান চর্চার উজ্জ্বল কেন্দ্রগুলো আক্রান্ত, জগতশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুদান সংকোচন এবং আরও নানা ভাবে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করার ফলে বহু বিশ্ববন্দিত গবেষক অধ্যাপক ইউরোপ ও অন্যত্র চলে যেতে শুরু করেছেন। হিটলারের জার্মানির এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাকি ইউরোপীয় উপনিবেশ গুলো দখল করে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পশ্চিম ইউরোপ আজ হীনবল, তৈল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের দখলদারির আসল লড়াই আমেরিকার সঙ্গে রাশিয়া-চীন জোটের। ইউক্রেন আর ইরান এই মহাযুদ্ধের দুই আলাদা যুদ্ধক্ষেত্র, আগামীতে নিশ্চিতভাবেই পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা জুড়ে এই যুদ্ধ বিস্তৃত হবে। কিন্তু এখনো নিশ্চিতভাবে বলার সময় না আসলেও, ট্রাম্পের অশ্বমেধের ঘোড়া ইরানের চোরাবালিতে পথ হারিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। আসলে ইরানকে এই মুহূর্তে সরাসরি আক্রমণ করার হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পকে প্ররোচিত করেছেন নেতানিয়ানিহু। নানান দুর্নীতির অভিযোগে ইজরায়েলের সর্বোচ্চ আদালতে নেতানিয়ানিহুর বিচার চলছে, এমনকি এ অভিযোগও আছে যে হামাসের গাজা অভ্যুত্থানের কথা জেনেও তিনি ইচ্ছে করে অগ্রাহ্য করেছেন যাতে তারপর প্রবল জিঘাংসায় গাজাকে ধ্বংস করার ছাড়পত্র মেলে। এইসব তদন্ত ও বিচারের দাবি ঠেকিয়ে রাখতে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে কোন না কোন ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি এপস্টাইন ফাইলস থেকে ট্রাম্প নেতানিয়ানিহু সহ বহু রাষ্ট্রনেতা ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে যে পূতিগন্ধময় পাপচক্র এক সূত্রে বেঁধে রেখেছিল তার হদিস মিলেছে। নেতানিয়ানিহুর বিচার না করে যুদ্ধপরিস্থিতির অছিলায় তাঁকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য ট্রাম্প যখন ইজরায়েলের রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ নয়, প্রায় হুকুম করেন (যদিও সে আদেশ পালিত হয়নি), তখন এই অন্ধকার যোগসাজসের আদল স্পষ্ট বোঝা যায়। ট্রাম্পের সামরিক বাহিনীর একাংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁর দম্ভ ও নেতানিয়ানিহুর প্ররোচনায় যুদ্ধ শুরু হয়। ট্রাম্প সম্ভবত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে যেভাবে অপহরণ করে এনে সেই দেশের তৈল সম্পদ দখল করেছিলেন একইভাবে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক শীর্ষ নেতৃত্বকে একযোগে হত্যা করে ইরানকে নতজানু হতে বাধ্য করতে পারবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু ইরানের মৌলবাদী ধর্মতন্ত্র অন্য অনেক দিক থেকেই স্বৈরাচারী ও পশ্চাৎমুখী হলেও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমী ধনতন্ত্রের আগ্রাসী থাবার বিরুদ্ধে তার জেহাদ খাঁটি এবং চেতনার গভীরে প্রোথিত। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংগঠিত ধর্মীয় চেতনা অনেক ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা নিয়েছে। ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহ, তিতুমীরের কৃষক বিদ্রোহ, কিউবার বিপ্লবে ক্যাথলিক চার্চের সক্রিয় সহায়তা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ইরানের জাতিসত্তা ও ধর্মীয় চেতনার সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রাচীর তাই এত সহজে ভেঙে পড়েনি। বরং বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে, হরমুজ প্রণালী অবরোধের মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিরাট সংকট সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। আমেরিকা এখন সম্মানজনক পশ্চাদপসরণের অজুহাত খুঁজতে ব্যস্ত। অন্যদিকে ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল আর তার সযত্নলালিত হেজেমনির বদলে সাবেক হিংস্র উপনিবেশবাদ তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূল নয়। NATO র ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ ইউক্রেন প্রশ্নে ইতিমধ্যেই তীব্র হয়েছিল, এরপর অন্য সদস্যদের অগ্রাহ্য করে এককভাবে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে ইউরোপ স্পষ্ট ভাষায় আমেরিকার পাশ থেকে সরে এসেছে। অদূর ভবিষ্যতে NATO থেকে আমেরিকার বেরিয়ে আসা বোধহয় প্রায় সুনিশ্চিত। ইতালির নব্য ফ্যাসিবাদী প্রধানমন্ত্রী মেলোনি গাজা প্রশ্নে মার্কিন-ইজরায়েল জোটের পাশে থাকলেও ইরানের ঘটনা আর পোপের প্রতি ট্রাম্পের কটূক্তির প্রতিক্রিয়ায় ইতালির অবস্থান বিপরীত মেরুতে সরে গিয়েছে, ইজরায়েলের সঙ্গে পঞ্চবার্ষিক অস্ত্র চুক্তি পুনর্নবীকরণ না করার সিদ্ধান্ত তার প্রতিফলন।
দিন কয়েক আগে হাঙ্গেরির মার্কিন ইজরায়েল সমর্থিত বহু বছরের দক্ষিণপন্থী শাসক ভিক্টর অরবান নির্বাচনে বিপুলভাবে পরাজিত হয়েছেন। নতুন সরকার ICC র প্রতি আনুগত্য জানিয়ে, নেতানিয়ানিহু হাঙ্গেরিতে পা দিলে তাঁকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে বলা উচিত, অরবান শুধু গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তীব্র বিরোধী ছিলেন তা নয়, তাঁর জমানায় নেতানিয়াহুকে হাঙ্গেরিতে আমন্ত্রণ ও সাদর অভ্যর্থনা জানানো হয়। এই ঘটনাবলী সাম্রাজ্যবাদী অক্ষগুলোর ভেতরের দ্বন্দ্ব আর ফাটলের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ইতিহাসের এক নতুন ক্রান্তি লগ্নে উপস্থিত হয়েছে পৃথিবী। নয়া উদারবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল যে হেজিমনির মোহ আবরণ, তা ছিন্ন হয়েছে বহুলাংশে। আলো আঁধারির দ্বিধা ঘুচে ঔপনিবেশিক শক্তির পুরনো আর প্রকৃত রক্তলোলুপ হিংস্র স্বরূপ চিনতে আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। এটা সব অর্থেই ” best of the times, worst of the times “,
কোন ত্রিশঙ্কু অবস্থানের বিলাসিতা ইতিহাস এই মুহূর্তে বরদাস্ত করবে না। প্রগতি আর সাম্যের পক্ষে যেসব মানুষ তাদের চোখ থেকে বেভুল “স্বপ্নের নীল মদ্য” উবে গিয়ে ” কাঠ ফাটা রোদ সেঁকে চামড়া”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের ফলে অন্তত পশ্চিম ইউরোপে সাম্রাজ্যবাদের বজ্রমুষ্টি দুর্বল হয়েছিল। পৃথিবীর নানা প্রান্তে মাথাচাড়া দিয়েছিল সাম্যবাদী স্বপ্ন। বর্তমান আন্তর্জাতিক সংকট আবার পুঁজিবাদ ও নব্য ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করে নতুন ভুবন নির্মাণের পথের দিশা দেখাতে পারে। কিন্তু তার জন্য চাই সার্বিক ও প্রকৃত বামপন্থী ঐক্য। ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ যখন তার পুরনো করাল মূর্তি ধারণ করে তখন শ্রেণী সংগ্রামের ধ্রুপদী পদ্ধতি প্রকরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তত্ত্বের কূটকচালি, নানা রঙের রাজনৈতিক সমীকরণের জটিল হিসেব অর্থহীন হয়ে পুঁজিবাদ বনাম সাম্যবাদের পক্ষের শক্তিগুলোর স্পষ্ট দ্বিমেরুভবন হতে থাকে। সাম্প্রতিক অতীতে আমাদের দেশে উত্তর ভারতের কৃষক আন্দোলন, এই মুহূর্তে নয়ডা গুরগাঁও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলন, কৃষিজমি, অরণ্য ও খনিজ সম্পদের ওপর হিংস্র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এই সংগ্রাম গুলোকে এক সূত্রে বাঁধতে হলে বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য ভীষণভাবে জরুরি। সংসদীয় রাজনীতি, আইনি পথে লড়াই নিশ্চয়ই গুরুত্বহীন নয়, কিন্তু তা একমাত্র বা এমন কি সংগ্রামের মূল প্রকরণ হতে পারে না। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত আজ অনেকাংশে ফ্যাসিবাদী শক্তির করায়ত্ত, বাবরি মসজিদ মামলার রায় থেকে গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম বেতনের প্রশ্নে আদালতের অবস্থান এই পরিস্থিতিকে নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয়। সংসদীয় মঞ্চও অর্থ আর দুর্নীতির বিপুল স্রোতে নিমজ্জিত। নির্বাচন কমিশন ও সংবাদ মাধ্যমের ওপর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিরঙ্কুশ। তা বলে সংসদীয় ও আইনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে আসা চলবে না, কিন্তু সেই যুদ্ধের আসল আয়ুধ সংগ্রহ করতে হবে রাজপথ থেকে আলপথ কাঁপিয়ে দেয়া সাহসী গণ আন্দোলনে, কলকারখানায় শ্রমিকের পাশে ধর্মঘট ও অন্যান্য উপায়ে প্রতিরোধে সামিল হয়ে, শিল্প করিডোর স্থাপনের অছিলায় জমি- জঙ্গল-খনির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে। প্রয়োজন ও সুযোগ মতো অবশ্যই অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে, কিন্তু অস্ত্রের চেয়েও মানুষের যুথবদ্ধ সংগ্রামী চেতনার শক্তি বেশি একথা মনে রেখে।
“ভালোবেসে এই মাটি, রুখেছে দুর্জয় যারা দানবের রথ
নিয়ন বাতিতে জ্বলে মেকি দেশপ্রেম, রাষ্ট্রীয় পাহারা
জিয়ন কাঠির, দ্রোহজ কুসুমের খোঁজে ঘোরে দিশাহারা
বহু ঊর্ধ্বে, পাতার গহনে, বেপরোয়া লড়াকু হিম্মত
লোহুতে তোলে ঢেউ, চেতনায় লেখে আজাদীর স্বপ্নিল
ভাষা, মুক্তমনা বহুস্বরে গড়ে ব্যারিকেড, শকুনি-কুটিল
পাশা উল্টে দিয়ে, পায়ে পায়ে ঝঞ্ঝা তোলে এগোয় মিছিল…”
(‘সাংস্কৃতিক সমসময়’ পত্রিকায় পূর্ব – প্রকাশিত, বর্তমান লেখকের ‘ আজাদি’ কবিতার অংশ)











