কয়েকদিন আগে এক ফেসবুক বন্ধু একটা পোষ্ট করেছিলেন – শিয়ালদহ এবং অন্যান্য স্টেশন চত্বরে হকার সরিয়ে দেওয়ার জন্য নাকি মধ্যবিত্ত মানুষজন খুব খুশি হয়েছেন। শিক্ষিত, সংবেদনশীল এবং বামপন্থী ফেসবুক বন্ধুটি এতে বেশ দুঃখ পেয়েছেন ।
শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর দিয়ে মাঝে মাঝে আমিও যাতায়াত করি। বেশ বড় চত্বর; কিন্তু ঠিক ততটাই অগোছালো এবং নোংরা। এর জন্য শুধু হকাররা দায়ী নয়; উবের, ট্যাক্সি ড্রাইভার, জনগণ, রেল কর্তৃপক্ষ সবাই দায়ী। সেই চত্বর যদি পরিষ্কার দেখি, সত্যিটা হলো, আমিও খুশি হবো। কিন্তু তার জন্য হঠাৎ করে হকার তুলে দেওয়া হবে কেন ? এ ব্যাপারে কি করা যেতে পারে, সে আলোচনায় পরে আসছি। তার আগে একটা কথা জানিয়ে রাখি যে শিয়ালদহ স্টেশনে যদি আপনার মলমূত্র ত্যাগ করার কোনো অভিপ্রায় হয়, তাহলে সেই অভিপ্রায়টা বাড়িতে পূর্ণ করে আসায় ভাল। অন্নপ্রাশন এর ভাত নয়, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আপনি প্রথম যে মাতৃদুগ্ধ পান করেছিলেন, সেটাও উঠে আসবে। এই হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা।
এবার প্রসঙ্গে আসি।
সম্ভবত পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে কম – বেশি হকার নেই- সে গরিব দেশ হোক বা বড়লোক দেশ হোক অথবা জনবহুল হোক বা স্বল্প জন্মসংখ্যার দেশ হোক। ILO – এর হিসাব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে দু বিলিয়ন এর বেশি লোক informal economy সঙ্গে যুক্ত এবং এর একটা বিরাট অংশ হচ্ছে হকার। সমগ্র পৃথিবীতে জিডিপিতে এদের অবদান কতটা, সেটা হিসাব করা খুব কঠিন; তবে কিছু কিছু উন্নয়নশীল দেশে জিডিপি তে এদের অবদান খুবই বেশি- অনেক সময়ই এক- চতুর্থাংশ বা তার কাছাকাছি! এর সাথে কিন্তু আর একটা ব্যাপার মাথায় রাখা উচিত, একাডেমিক ভাষায় যাকে বলে backward linkage মানে হকাররা যে জিনিষগুলো বিক্রি করে, সেটা যেখানে তৈরি হয়, সেখানে যারা কাজ করেন, তারাও কিন্তু এই হকারদের উপরই নির্ভরশীল এবং তাদের সংখ্যাটাও কিন্তু অনেক। অর্থনীতির কথায় এতো গেল Supply Side এর কথা ; আমাদের Demand Side এর কথাও ভাবা উচিৎ। গরিব, নিম্নবিত্ত, এমন কি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বড় অংশ, কিন্তু কেনাকাটার ব্যাপারে এই হকারদের উপরই নির্ভরশীল। কারণ তারা সস্তায় তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস এদের কাছ থেকেই পান।
উত্তর আমেরিকা, দক্ষিন আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া – আমি যে কয়েকটা দেশে গেছি, সর্বত্র হকার দেখেছি, তবে একই রকম ভাবে নয়।
এখানে দুটো দেশের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যেমন, চায়না এবং ইন্ডিয়া। দুটো দেশই জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশ এবং আয়তনেও বিশাল। চায়নাতে ফুটপাতে প্রায় সব কিছু বিক্রি হতে দেখেছি। শুধু খাবার হোটেল এর কথা এখানে বলছি, কারণ সেটাতেই সব চেয়ে বেশি জায়গা লাগে। পাঁচিলের গায়ে সব এক মাপের খাবারের দোকান; ফুটপাতে সবার আলাদা আলাদা কিন্তু একই মাপের ছোট্ট খাওয়ায় টেবিল এবং ছোট্ট ছোট্ট চারটে চেয়ার বা টুল। এখানে পাড়ার দাদা বলে, অন্যের চেয়ে বেশি জায়গা নিয়ে দোকান করার প্রশ্নই নেই। সব ফুটপাতই যে খুব চওড়া তা কিন্তু নয়; কিন্তু পথচারী, দোকানদার, বা খদ্দের – কারোরই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
১৯৯৭-৯৮ সালে অধ্যাপক সরিত ভৌমিক এর তত্ত্বাবধানে আমরা কয়েকজন দেশের সাতটা শহরের হকারদের উপর একটা কাজ করি। কলকাতার কাজটা আমি করি। সেই সময় কলকাতা পৌরসভায় কয়েকবার গিয়েছিলাম; অসীম বর্মন ছিলেন পৌর কমিশনার। ১৯৯৬ এ হঠাৎ করে কলকাতার কিছু অঞ্চলে হকার তুলে দেওয়ার পেছনে যিনি দায়িত্বে ছিলেন, সেই ব্যক্তি হলেন ইনি। এহেনও ব্যক্তি আমায় বলেছিলেন: আপনি কি মনে করেন, হকার তুলে দিয়ে হকার সমস্যার সমাধান করা যায়? এরা গঙ্গার জোয়ার ভাটার মত; একদলকে তুলে দেবেন, কদিনের মধ্যেই আর এক দল এসে সেই জায়গাতে বসে পড়বে। সরকারকে কাজের সুযোগ ( চাকরি) তৈরি করতে বলুন।
পৌর কমিশনার এর এই কথার পর তিন- তিনটে দশক পার হয়ে গেছে। উৎপাদন ব্যবস্থা আরো বেশি বেশি করে যন্ত্রগণকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তার সাথে এখন এসে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কাজের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়ে গেছে। এখন আর শঙ্কর গুহ নিয়োগীর মত কোনো এক ক্ষণজন্মা, সৃজনশীল মার্ক্সিস্ট নেই , যিনি এমন এক সেমি – মেকানাইজেশন এর পরিকল্পনা নিয়ে আসবেন, যাতে মানুষও বাঁচবে, পরিবেশও বাঁচবে, প্রতিষ্ঠানও বাঁচবে এবং শেষ পর্যন্ত সমাজটাও বাঁচবে ।
সুতরাং পেশা হিসেবে হকার বা ফেরিওয়ালা এখন আরো বেশি বাস্তবতা, ঠিক যেমন বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পগুলো।
অধ্যাপক সরিত ভৌমিক এবং National Association for Street Vendors in India ( NASVI), Self Employed Women’s Association (SEWA) ইত্যাদি সব ট্রেড ইউনিয়ন এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়,২০১৪ সালের মার্চ মাসে পার্লামেন্টে পাস হলো – Right to Livelihood ( Street Vending ) Act. এই এক্ট এর মাধ্যমে Street Vending এর আইনগত স্বীকৃতি মিলল। তার মানে এই নয় যে ফেরিওয়ালা কোনো বেআইনি পেশা ছিল – ২৫০০ বছর আগের জাতক এর গল্প হয়ে , মিলার এর Death of A Salesman, আমাদের `কাবুলিওয়ালা ` সবই তো ফেরিওয়ালার গল্প।
অনেক তো কথা হলো। কিন্তু করণীয় কি? আমি আগের একটা পোস্টে লিখেছিলাম, পরিষ্কার শহর, ফুটপাত দিয়ে স্বচ্ছন্দে হেঁটে যাওয়া, রাস্তা দিয়ে নির্বিঘ্নে গাড়ি চলাচল এবং জীবিকার অধিকার – সব শ্রেণির মানুষেরই স্বাভাবিক চাওয়া। এই চাওয়া গুলোর মধ্যে কিন্তু কোনো দ্বন্দ্ব নেই।
রাজ্য সরকারের একটা হকার নীতি আছে; লালবাজারে আছে কিয়স্কের ডিজাইনও। প্রথম কাজ হলো, সেগুলো উদ্ধার করা। যেখানে কিয়স্ক দিয়েই কাজ চলবে, সেখানে কিয়স্ক দেওয়া হোক। যেখানে কিয়স্ক দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব নয়, সেখানে সবারই একই মাপের সেমি – পার্মানেন্ট দোকান করা হোক ( এখন যেগুলো আছে, বিশেষ করে ধর্মতলা, গড়িয়াহাট, শ্যামবাজার ইত্যাদি স্থানে, সেগুলো বেশ বড় এবং বিভিন্ন মাপের ) , মাপ এক থাকলে সবার ইনভেন্টরির সংখ্যা একই থাকবে , দোকানগুলো একটু ছোট করে দিলে, গুরুত্বপূর্ন এবং জনবহুল মোড়গুলো ফাঁকা থাকবে এবং অনেক বেশি হকারকে জায়গাও দেওয়া যাবে। প্রত্যেক হকারকে তার নিজস্ব বিন ( দোকান অনুযায়ী বিনের মাপও ঠিক করে দেওয়া উচিৎ) রাখতে হবে এবং সেটা বাধ্যতামূলক; একই সাথে খদ্দের রাও যাতে সেটা ব্যবহার করে, সেটা দেখতে হবে। নিজের স্থান পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব, সেই দোকানদারের। মানুষের জীবিকা রক্ষা করতে আজ যে সমস্ত ছেলেমেয়েগুলো বুলডোজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়ছেন, এই ভাবে যদি ভাবেন, তাহলে মনে হয়, সাধারণ মানুষের পূর্ণ সমর্থন পাবেন ।
ফুটপাত দিয়ে মানুষের যাতায়াত বাড়লে এবং শহর সুন্দর হলে , টুরিস্ট এর সংখ্যা বাড়লে, হকারদের বিক্রিও বাড়বে।
এ ছাড়াও কিছু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ। দোকান গুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দোকানদারের। ভাঙ্গাচোরা কাঠামো, ছেঁড়া-ফাটা, বিবর্ণ প্লাস্টিকের চাদর শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে। সেগুলো বন্ধ হোক।
রাস্তায় যারা খাবার বিক্রি করেন, তাদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক।
হকার সংগ্রাম সমিতির সভাপতি শক্তিমান ঘোষের কথায় প্রতি বছর পুলিশ হকারদের কাছ থেকে ২৬০ কোটি টাকা আদায় করে। এটা বন্ধ হোক।
প্রত্যেক হকারকে সরকার থেকে কার্ড দেওয়া হোক। বৈধতা থাকলে পুলিশের অত্যাচার কমবে। বৈধতা থাকলে, ব্যাংক লোনও যাতে সহজে পাওয়া যায়, সরকারের তারও ব্যবস্থা করা উচিৎ।
মানুষের রুটি – রুজির সুবন্দোবস্ত থাকলে মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হয়, আইন শৃঙ্খলা ভাল থাকে, হাসপাতালে ভিড় কমে, কল্যাণমূলক প্রকল্পের ( বিভিন্ন ধরনের ভাতা) খরচ কমে, এবং শেষ পর্যন্ত সরকারেরও খরচ কমে।
লেখাটা খুব বড় হয়ে গেল। কিন্তু ছোট করার উপায় নেই; যেখানে কোটি কোটি লোকের জীবনের প্রশ্ন, সেটা তো একটু বিস্তৃত ভাবে লিখতে হবেই।
পরবর্তীতে আরো কিছু মনে পড়লে এখানে যোগ করে দেবো।
শেষ করার আগে সবার একটা কথা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ – জীবিকার অধিকার মানুষের প্রথম এবং প্রাথমিক অধিকার। এবং তা যাতে মানুষ সম্মানজনকভাবে করতে পারে, সেটা সরকার, রাজনৈতিক দল, এবং জনগণের দায়িত্ব।












এই সময়ে খুব জরুরি একটি লেখা