
এমনতরো বিজ্ঞাপন আজও নিশ্চয়ই ছাপা হয় তবে এই বুড়ো বয়সে এসে কিশোর বেলার উৎসাহে ভাটা পড়েছে,তাই কাগজের আনাচেকানাচে চোখ বুলিয়ে তেমন কিছু আজ আর খোঁজা হয়না। তা বলে কি মানুষের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে? উঁহু, তেমনটা মোটেই নয়। আমাদের চারপাশের কতকিছুই তো প্রতিদিন নজর এড়িয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। সেসব আবার কোনো এক কালে ফিরে আসবে তেমনটাও বুঝি নয়। যদি ফিরে আসে বা তার দেখা মেলে হঠাৎ করেই তা হলে কিন্তু রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যাবে।
জীবজগতের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে। হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া প্রাণিদের দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে খুঁজে পাওয়া গেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানকারী গবেষকরা। এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া প্রাণি এবং তাদের খুঁজে পাওয়ার কথা নিয়েই এই পর্বের আলোচনা। মোট ছয়টি পর্বের এই আলোচনার আজ তৃতীয় পর্ব। আমাদের আজকের অতিথি এই বাঙলারই এক হারিয়ে যাওয়া মাছ। নাম – Chel Snakehead Fish 🐠 ।
আমাদের সাবেক বাসাবাড়ির একেবারে ঢিল ছোড়া দূরত্বেই ছিল নাগ বাবুদের বাজার। একটু চলনদার হয়ে উঠতেই ছুটির দিনে ব্যাগ হাতে বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়া রীতিমতো অভ্যাস হয়ে উঠেছিল। এ বিষয়ে বাবাও বেশ উৎসাহ দিয়ে বলতেন – চল্! বাজার ঘুইরা আসি। বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়া মানেই হলো পাঁচ মিনিটের পথ পঁচিশ মিনিটে পাড়ি দেওয়া। দু পা যেতে না যেতেই, কেউ না কেউ কথার পশরা নিয়ে বাবার সামনে হাজির হতেন। এ কথা সে কথায় সময় বয়ে যেতো। আমি আর কি করি? খানিকটা ব্যাজার মুখে কেষ্ট ঠাকুরের মতো একঠেঙে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
আমার কাছে মাছের বাজার ছিল মহা আকর্ষণের জায়গা। কতরকমের মাছ! এমনই এক বাজার অভিযানে গিয়ে চিনেছিলাম একই প্রজাতির তিন ধরনের মাছের পার্থক্য – গজাল বা গজার, শোল আর চ্যাং বা টাকি বা ল্যাটা মাছ। আকারের তারতম্য ভেদে মাছ তিনটির উল্লেখ করা হলো।
অর্থাৎ দশাসই চেহারার গজাল, মাঝারি আকারের শোল আর এদের থেকে ঢের ছোট চ্যাং মাছ। বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জল থেকে তুলে নেওয়ার পরও ওরা দিব্যি ডাঙায় বেঁচে থাকতো। মাথা সাপের মাথার মতো বলেই এদের স্নেকহেড ফিস বলে।
বিজ্ঞানী মহলে এই মাছটির নাম – চেল স্নেকহেড ফিস বা বোরনা স্নেকহেড ফিস। বিজ্ঞান সম্মত নাম অবশ্য Channa amphibeus । পৃথিবীতে যত ধরনের শোল মাছ বা স্নেকহেড ফিস পাওয়া যায় তাদের মধ্যে বিরলতম হলো এই চেল স্নেকহেড ফিস। আমাদের উত্তরবঙ্গের চেল নদীতেই কেবলমাত্র এদের দেখা পাওয়া যেত একসময়। তারপর এক সময় তারা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। অথচ যিনি অন্তত একটি বারের জন্য হলেও চাক্ষুষ করেছেন তাঁর পক্ষে এই মাছটিকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব, কেটে রসিয়ে কষিয়ে রান্না করে খাওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার।

চেল নদীর স্নেকহেডদের নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বা উৎসাহ একেবারে হাল আমলের তা কিন্তু নয়। উনবিংশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই চেল নদীর এই মাছেদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয় লোকজনের কাছে পরিচিত বোরা চাঙ গবেষক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই সূত্র ধরেই ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির মিউজিয়ামের তদানীন্তন কিউরেটর J.T.Pearson এই মাছের বিষয়ে সকলকে জানান। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের P. C. Russell এর পাঠানো শোল মাছের দুটি নমুনা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই পিয়ারসন সাহেব তাঁর অভিমত জানিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে বৃটিশ চিকিৎসক McClelland চেল নদী থেকে ধরা দুটি মাছকে নিয়ে গবেষণা করে তাদের চেল স্নেকহেডের নিকট স্বজন Ophiocephalus barca বলে ঘোষণা করেন। যদিও অপর দুই বিজ্ঞানী Shaw এবং Shebbeare ওই একই নমুনাকে Channa amphibeus হিসেবে মান্যতা দেন। গবেষক বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংগৃহীত নমুনার পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে কিছুটা টানাপোড়েন থাকলেও চেল নদীর সেই বিশেষ অতিথিটি Channa amphibeus হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন বিজ্ঞানীরা।

জুন ২৮, ২০২৬














পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী লেখকের কাছে এমন লেখা প্রত্যাশিত ছিল। খুব ভালো লাগলো, বিশেষ করে এই মাছকে খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে আমাদের রাজ্যের নাম জড়িয়ে থাকার জন্য। আরও তিন পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।
ধন্যবাদ অঞ্জনা মুখোপাধ্যায়কে। ভালো লাগাটা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন।