নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে যেভাবে একটি ছাত্রের মৃত্যু ঘটেছে সেটা যেমন চরম দুর্ভাগ্যজনক তেমনি সন্দেহজনক। কারণ, গরম চা খেয়ে ফেললে, সহ্যের অতিরিক্ত অত্যাধিক গরম হলে মুখ থেকে ফেলে দিতে বাধ্য, কখনোই গিলতে পারে না। তাই এই মৃত্যু নিয়ে ময়না তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক।দ্বিতীয়ত, চা খাওয়ায় যদি শরীরের অভ্যন্তরে এতটাই প্রদাহের কারণ হয়, তাহলে সেই ছেলে কী করে দু ঘণ্টা ক্লাস করল, এবং শেষে বাবা আসার পর বাবার মোবাইলে খেলা দেখে? এই মৃত্যুর বিচারবিভাগীয় তদন্ত হোক।চা খাওয়ার ঘটনার জন্য মৃত্যু না অন্য কোন কারণে সেটা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হলে বোঝা যাবে না। প্রয়োজনে সরকার সিট গঠন করুক।
কিছু ছাত্র ও অভিভাবক মিশন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সময়ের মতো যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া, দ্রুততার সঙ্গে গাড়ি করে উন্নততর চিকিৎসা পরিষেবা দিতে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি হসপিটালে না নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এনেছে। ছাত্রদের মুখ থেকে জানা গেছে নরেন্দ্রপুর এর ওয়ার্ড মাস্টাররা অসদাচরণ করে। তাদের অমানবিক ব্যবহার ছাত্রদেরকে পীড়িত করে। তাদের ভয়ে কিংবা প্রধান শিক্ষককে সময়মতো খবর না দেওয়ার গাফিলতিতে ছাত্রটিকে মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এই অভিযোগগুলো কতটা সত্যি সেটা নিয়েও কিন্তু যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।
নরেন্দ্রপুর মিশন ও রামকৃষ্ণ মিশন এর সুনাম এবং বাংলা ছাত্র সমাজের স্বার্থে যথাযথ তদন্ত তাই জরুরী।
মিশন কর্তৃপক্ষ অবশ্য ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে দুজন অভিযুক্ত কর্মীকে সাসপেন্ড করেছে।। প্রধান শিক্ষক নিজেই ইস্তফা দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট ছাড়া আর কাউকে দায়ী বলে চিহ্নিত করা যায় না। তাই যতক্ষণ সেটা না হাতে আসছে, ততক্ষণ কিছু করার নেই।এদিকে কিছু লোক জল ঘোলা করার রাজনীতি শুরু করেছে, মিশন কর্তৃপক্ষকে সমালোচনা, নিন্দা বা অপদস্থ করে হয়ত কোনো চেপে রাখা পুরোনো ব্যর্থতার ঝাল মেটাতে চাইছেন। এসব নিয়ে আলোচনার আগে দরকার নিরপেক্ষ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
যেহেতু ছেলেটি আবাসিক ছাত্র, তাই সমগ্র তদন্ত ছাড়াই রামকৃষ্ণ মিশনকে কাঠ গড়ায় তোলা হয়েছে। তবু মহারাজদের নিয়ে কুমন্তব্য কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। কারণ তাদের ছাত্র বৎসল ভূমিকা সর্বজনবিদিত। এত দীর্ঘ বছর ধরে রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত বিদ্যালয়ের কলেজে বিভিন্ন হোস্টেলে প্রতিদিন এত ছাত্র পড়াশোনা করে চলেছে। কোথাও কোন দুর্ঘটনা তো দূরের কথা, একটুও গাফিলতির কোনো ঘটনা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারে না। ছেলেটির মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছে, কেন ওয়ার্ড মাস্টার ছেলেটিকে গুরুত্ব দিলো না, প্রধান শিক্ষককে কেন অত দেরিতে জানানো হলো, বিদ্যালয় থেকে গাড়ি করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো না, আরও আগে যাওয়া হল না, কেন বাবা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো এই সব প্রশ্নের সম্যক তদন্ত হওয়া দরকার, ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর প্রধান শিক্ষককে খবর দেওয়া হয়েছিল কিনা, যারা খবর দেওয়ার দায়িত্বে তারা কী করছিলেন, প্রধান শিক্ষক কতক্ষণ পরে খবর পেয়েছিলেন, তারপর কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, কেন ছেলেটির মৃত্যু হল, কেন বাঁচানো গেল না, কার এক্ষেত্রে দায়, দায়িত্বে যাঁরা যাঁরা তাঁদের প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় এনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি তদন্ত করতে প্রয়োজনে কমিটি হোক। সরকার সেই কমিটি গড়তে পারে, হাইকোর্টের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে মাথায় রেখে যথাসম্ভব দ্রুত তদন্তের রিপোর্ট আসুক, সেই অনুযায়ী যার যা শাস্তি প্রাপ্য, সেটা হোক।কিন্তু তার আগেই গণ বিচার, রাজনীতির ঘোলা জলে নেমে মাছ ধরা, ফেসবুক থেকে শুরু করে টিভির আলোচনায় মিডিয়া ট্রায়াল, এগুলো অসুস্থ সমাজের লক্ষণ।
গোটা ঘটনা নিয়ে বলার আছে কয়েকটি কথা।
১) একটি বারো ক্লাসের ছেলে গরম চা একবারে ঢক ঢক করে খেয়ে নিল, এটা কিন্তু খুব অস্বাভাবিক। প্রথম কথা,চা কেউ কোল্ড ড্রিঙ্কসের মতো করে খায় না। দ্বিতীয়ত, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই, স্বেচ্ছায় ছেলেটি দুম করে ঝোঁকের বশে ভুল করে এক ঢোকে গরম চা গলায় ঢেলে ফেলেছে, তাহলে শারীরিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া অনুযায়ী সেইটা মানুষ মুখের থেকে ফেলে দেবে নিচে। যতই বারণ বা শাস্তির ভয় থাক। অত ফুটন্ত গরম চা যা খেলে ভিতরে প্রবল প্রদাহে মৃত্যু ঘটতে পারে সেটা কখনোই সে ঢোক দিয়ে গিলতে পারবে না।
২) প্রথম দুই ঘণ্টায় ছেলেটি কাউকে কোনো অস্বস্তির কথা জানায় নি। চা খাওয়ার পর সে ক্লাস করেছে। তাই গরম চা খেয়ে মরে গেছে এটা ভাবাও অস্বাভাবিক।
৩) ছেলেটি অসুস্থ হওয়ার পর তাকে প্রথমেই হাসপাতালে নেওয়ার কথা কেউ ভাবে নি। তবুও ধরে নিচ্ছি কোথাও না কোথাও কিছু করা যেত। তবে তার মানেই স্টাফদের তরফে ইচ্ছাকৃত অবহেলা ছিল, এটা ভেবে নেওয়াও ঠিক নয়। দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান শিক্ষক মহারাজ জানতেই পারেনি। ডাক্তার হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলার পর ঘটনাটি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এতে তিন ঘণ্টা নষ্ট হয়, যা তার মৃত্যুর বড় কারণ, অথচ এই সময় পর্বে কেউ তাঁকে প্রথম দুই ঘণ্টা অসুস্থ দেখে নি। ছেলেটিও কিছু জানায় নি।
তাই তার মৃত্যু চরম দুর্ভাগ্যজনক। তার মানেই সেটা কারুর কর্তব্যে গাফিলতি দরুন ঘটেছে সেটা না হতেও পারে। তবুও অভিযোগ এসেছে যখন ছাত্রদের পক্ষ থেকে, অভিভাবকদের পক্ষ থেকে, তখন একটা তদন্ত হোক, দরকার হলে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির অধীনে বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আনা হোক। রামকৃষ্ণ মিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন যাতে না হয় তার জন্যে কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে সাহায্য করুক। তারপর কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নিয়ে কী ব্যবস্থা নেয় সেটাও দেখা দরকার।
এই পরিস্থিতিতে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান শিক্ষক ইস্তফা দিয়েছেন, দুজন কর্মীকে কর্তৃপক্ষ সাসপেন্ড করেছে।সেটা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষের আপদকালীন পদক্ষেপ হিসেবে সময়োচিত বলে মনে হয়েছে ।
কিন্তু এর মধ্যেই পথে নেমে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন আন্দোলন শুরু করে দিতে পথে নেমেছে। একশ্রেণীর ছাত্র এবং অভিভাবক চাইছে রামকৃষ্ণ মিশনকে টার্গেট করে মিশনকে কাঠগড়ায় তুলে তাদেরকেই দায়ী করতে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট হাতে না পেয়ে এটা করা অনৈতিক।বিশেষ করে এটা করা হচ্ছে সেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিদ্যালয় সংগঠনটির সম্পর্কে যাঁরা বাংলায় অসংখ্য কৃতী ছাত্রদের তৈরি করে চলেছেন এবং গত একশ বছরে যে রামকৃষ্ণ মিশনকে নিয়ে কাদা লেপার মতো একটিও ঘটনার ইতিহাস নেই।
আসলে প্রতিবাদী জনতার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, এ যেন ডাইনি খোঁজা চলছে। বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের দিকভ্রান্ত হতাশা আর হঠকারী বিক্ষোভ অস্থির মানসিকতা চিহ্নিত করেছে যে গোটা সমাজটাই ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।যেখানে দুর্ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক ইস্তফা দিয়েছেন, দুজন কর্মীকে কর্তৃপক্ষ সাসপেন্ড করল, সেখানে এমন একটি দুর্ভাগ্যজনক এক্সিডেন্ট নিয়ে যেভাবে জল ঘোলা করা হচ্ছে সেটাও উদ্দেশ্যমূলক অবশ্যই। ছাত্রদের একাংশের মুখে অভিযোগ, মিশন অতিরিক্ত মাত্রায় শৃঙ্খলা পরায়ণতা চাপিয়ে দেয়, তাহলে কি চাপাবে?
মুক্ত বিহঙ্গের মতো আকাশ চাচ্ছে আজকের প্রজন্ম। রামকৃষ্ণ মিশন তাদের জন্য কি?
সমগ্র ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি হোক। কিন্তু তার আগে আন্দোলন, রাজনীতি করে জল ঘোলা করার সুযোগ খোঁজা বন্ধ হোক।যেভাবে সিপিএমের বাম ছাত্র সংগঠন পথে নেমে আন্দোলন করছেন তারা কিসের দাবিতে কী চায়,সেটাই তো স্পষ্ট নয়। রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ তো কাউকে আড়াল করছে না, তারা তো মিথ্যের মুখোশ পরে ঘটনাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে অসহায় ছাত্রের মৃত্যুর জন্য দায় এড়াতে বিবৃতি দিয়ে সরে পড়ে নি। দোষীদের আড়াল করতেও মিশন কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে না। তাহলে হঠাৎ রামকৃষ্ণ মিশনের বিরুদ্ধে মিছিল কেন?
এটাই হল হঠকারী বাম রাজনীতি। যখন বাংলায় মৌলবাদী রাজনীতি হিন্দুত্বের আস্ফালন চলছে, তখন রামকৃষ্ণ মিশনকে ইসকনের মতো কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবনায় ভাবছে। এতে তারাই ভুল পথে হাঁটছে। সমাজ মাধ্যম থেকে রাজনীতির আঙিনায় এই জাতীয় আলোচনা বন্ধ করে প্রকৃত তদন্তের রিপোর্ট দ্রুত সামনে আসুক। এটাই এখন সময়ের দাবি। সবার আগে দরকার অরাজনৈতিকভাবে বিষয়টিকে দেখা ,নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দোষী শাস্তি বিধান করা। এখন এটাই সময়ের দাবি।












সঠিক বিশ্লেষণ। ধন্যবাদ।