তেলাপোকা বা আরশোলা একরকম ক্ষতিকর পোকা যেগুলি আমাদের ঘর গেরস্থালির মধ্যে লুকিয়ে থেকে সুযোগ পেলেই খাদ্য দ্রব্যে হানা দেয়, সংক্রামিত করে এবং নানারকম রোগের সৃষ্টি করে। বহু চেষ্টা করেও এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন এদের অসম্ভব প্রতিরোধ, অভিযোজন ও বংশবৃদ্ধির ক্ষমতার জন্য। এই পৃথিবীতে মানুষ এসেছে ৬৫ লক্ষ বছর আগে, এরা এসেছে ৩২ কোটি বছর আগে। এখন অবধি চিহ্নিত এদের ৪৬০০ প্রজাতির মধ্যে গৃহস্থালিতে ৩০ প্রজাতির তৎপরতা। ভারতের মত ক্রান্তীয় ও উষ্ণ জলবায়ুর অঞ্চলে এরা বেশি সক্রিয়।
১৫ মে ‘২৬ শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারক সূর্যকান্ত একটি রায় প্রসঙ্গে বেকার যুবক যুবতীদের আরশোলা ও পরজীবী প্রাণীদের সঙ্গে তুলনা করেন। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলি সেভাবে কোন প্রতিবাদ করে না। কিন্তু তার একদিন পরেই মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদ জাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রতে উচ্চশিক্ষা করা, আম আদমি পার্টির প্রাক্তন সংগঠক, ৩১ বছর বয়সী যুবক অভিজিৎ দীপকে শাসনতন্ত্র, তাদের কর্তাব্যক্তি, শাসক দলকে পরিহাস করে সমাজ মাধ্যমে ‘ ককরোচ জনতা পার্টি ‘ গঠন করেন। সঙ্গে সঙ্গে সমাজ মাধ্যমে সই করে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ নেটিজেন, যাদের মধ্যে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ প্রমুখ রা রয়েছেন, সদস্য হন। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সদস্য সংখ্যা দু কোটি ছাড়িয়ে যায়।
স্বাভাবিকভাবে সমস্যাসঙ্কুল নাগরিক জীবনে নানারকম চর্চা শুরু হয় যে এটি কি বাংলাদেশ, নেপালের মত জেন জি বিদ্রোহ করার আরেকটি মার্কিন ডিপ স্টেট ষড়যন্ত্র, নাকি অন্যকিছু, নাকি নেহাতই সমাজ মাধ্যম কেন্দ্রিক সমালোচনামূলক পরিহাস, নাকি সত্যি সত্যি কোন প্রয়াসের সলতে পাকানো ইত্যাদি। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার খোঁজখবর নেওয়া এবং সমাজ মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ব্লক করা জল্পনাগুলিকে আরও বাড়ায়।
আর সত্যি কথা বলতে দেশ জুড়ে আর্থিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে সাধারণ মানুষ খুব কষ্টে আছে। কেন্দ্রে তিনবার টানা ও ২২ টি রাজ্যে শাসন করা এবং দাক্ষিণাত্য বাদে সারা ভারত দখল করা একচ্ছত্র বিজেপির বিরোধী সর্বভারতীয় কোন রাজনৈতিক দলের আর উপস্থিতি নেই এই মুহূর্তে। কংগ্রেস বিশালভাবেই ছিল কিন্তু যেদিন থেকে চির বালক রাহুল গান্ধী এর কর্তৃত্ব করছেন তখন থেকে কংগ্রেস সম্পূর্ণ বেহাল এবং নির্বাচনী পরাজয়ের রেকর্ড গড়ে চলেছে। নীতীশ কুমার প্রমুখরা একটি সর্বভারতীয় বিরোধী জোট তৈরির চেষ্টা করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটি সচেতনভাবে জন্মলগ্নেই ভেস্তে দেন। ‘ ইন্ডিয়া ‘ নামে তার কঙ্কাল টিও রাহুল গান্ধী ভেঙে দেন সাম্প্রতিক তামিলনাড়ু নির্বাচনে হেরে ডিএমকের সঙ্গে জোট থেকে লাফ মেরে বিজয়ী টিভিকে জোটে ঢুকে মন্ত্রীত্ব নিয়ে। সেদিক থেকে দেশ জুড়ে অবশ্যই এক রাজনৈতিক শূন্যতা রয়েছে এবং দেশবাসীরও নানানরকম জনমুখী বিকল্পের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। সেদিক থেকে সমাজ মাধ্যমে র বাইরে বেরিয়ে সিজেপি কি করে সেদিকে আমজনতার লক্ষ্য রয়েছে।
লক্ষ্য রয়েছে রাজনীতির লোকেদেরও। সিপিআইএম এর সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন তারা পরিস্থিতির উপর লক্ষ্য রাখছেন। যথাক্রমে বিহারে ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে পরাজিত হয়ে নকশালদের একটি গোষ্ঠী এবং তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যে সিজেপি কে সমর্থন করেছে। কংগ্রেস ও অন্যরাও জল মাপছে। কিন্তু সিজেপি কে নিয়ে সমাজ মাধ্যমে সবচাইতে হৈ চৈ জুড়েছে যারা তারা বাড়ির সামনের ড্রেনটাও পরিস্কার করতে পারে না, পাশের বাড়ির লোক যাদের চেনে না, নির্বাচনে দাঁড়ালে কোনদিনও জামানত বাঁচাতে পারে না, দেশ ও দেশবাসী সম্পর্কে জ্ঞানগম্মি না থাকা, গণভিত্তিহীন, একপ্রকার স্বঘোষিত বিপ্লবী। এমনিতেই অকারণে attention seeking এর জন্য এরা হৈ চৈ করে থাকে। একটি উদাহরণ দেই। ত্রিপুরায় বিজেপির সহযোগী টিপ্রা মথা কে বিজেপির বিরুদ্ধে কল্পিতভাবে আরোপিত করে সমাজ মাধ্যমে কৃত্রিম sensation তৈরি করেছিল, তারপরেই যখন মথা বিজেপি মন্ত্রিসভায় যোগ দিল তখন অন্য ইস্যু নিয়ে তরপাচ্ছে। এদের দোষ না। গত ১৫ বছর মাননীয়ার পদলেহন করে, তার আশ্রয়ে থেকে সুযোগ সুবিধা নিয়ে, দিব্যি অলস ও আরামের জীবন কাটিয়েছে। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের পালা বদলে ভয় পেয়ে গেছে। তাদের আশা আরশোলার দল আবার সব ওলোট পালোট করে দেবে। সেই সুযোগে মাননীয়া আবার স্বমহিমায় ফিরবেন, তারা যথারীতি নিশ্চিন্তে বাঁশি বাজাতে পারবেন।
আরশোলার দল কত টা কি করবে ভবিষ্যত বলবে। কিন্তু কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে ভারত নেপাল বা বাংলাদেশ নয় যে কিছু যুব ও এনজিও র লোক এবং ছাত্র ও ছাত্র নামে জামাতের ধেড়ে ক্যাডার কাঠমান্ডু আর ঢাকা অবরুদ্ধ করে দিলেই দেশের শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। ভারত এক বিশাল ও বিকেন্দ্রিভূত দেশ। যে কারণেই প্রতিবেশী পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মত ভারতে এখন অবধি কোন সফল সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে নি। বিপরীতে শাসক বিজেপি – আরএসএস অত্যন্ত শক্তিশালী গণভিত্তি সম্পন্ন দল এবং তাদের হাতে সামরিক ও অসামরিক বাহিনী, সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ এজেন্সি, আদালত, নির্বাচন কমিশন, অর্থ সব কিছুই। রাজধানী নয়া দিল্লিতে বোট ক্লাবেও এখন আর কোন সমাবেশ করা যায়না কেবল যন্তর মন্তর এ প্রতীকী প্রতিবাদ করা ছাড়া। আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমান ভারত সরকার কোয়াড সহ মার্কিন – ইজরায়েল জোটেও আছে, আবার রাশিয়ার সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব।
সিজেপি যে পাঁচটি র্যাডিকাল দাবি রেখেছে আজ অবধি কোন ভারতীয় রাজনৈতিক দল রাখতে পারেনি। এই দলগুলি তাদের পত্রপত্রিকায় ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্তের ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিক্ষোভকে মহিমান্বিত করে। অথচ ২০২৩ এ কিছু বেকার যুবক যুবতী মোদিজীর নতুন সংসদে অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়েছিল তাদের কোন খোঁজ নেয় না। এইসব নানা কারণে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির উপর মানুষের বিশেষ বিশ্বাস নেই। মানুষ নির্বাচনে এদের মধ্যে কে কম খারাপ হবে শুধু সেটাই খোঁজে। আর সব কিছু যখন সীমা অতিক্রম করে যায় তখন ১৯৪২ এর ভারত ছোড়ো আন্দোলন অথবা ১৯৭৫ – ‘৭৭ এর জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলনের মত মহাপ্রলয় ঘটিয়ে ফেলে।
সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে আমরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করব সিজেপি মার্কিন প্রতিষ্ঠিত ও চালানো সমাজ মাধ্যমে তোলা ঝড়কে ভারতীয় পরিস্থিতিতে বাস্তব রাজনীতির কঠিন ময়দানে কিভাবে কার্যকর করে সেটি দেখার জন্য।
২৬.০৫.২০২৬









