নতুন সরকার এসেই তাদের জাত চিনিয়ে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন সেনাপতি এখন মসনদে। ২০১১ সাল থেকে বারবার আমরা দেখেছি বিরোধীদের উপর সন্ত্রাস—শারীরিক নিগ্রহ, খুন, পার্টি অফিস ভেঙে দেওয়া ও দখল করা, সংগঠন ভেঙে দেওয়া—কিছুই বাদ যায়নি। একটি মাত্র পুরসভা বা বিধানসভাতেও বিরোধী দলের উপস্থিতি মেনে নেওয়া হয়নি। প্রতিরোধের কারণে কিছুটা কম হলেও এবারও তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে, মানুষের জীবিকার উপর দানবীয় আক্রমণ। মসনদের পালা বদলের পরে এই সবই কি অপ্রত্যাশিত ছিল? না।
ঐতিহাসিকভাবেই বিজেপি আদর্শগতভাবে পুঁজির পক্ষে। সেই পুঁজির জন্য রাস্তা তৈরি করতেই তারা একটি ফ্যাসিস্ট, সাম্প্রদায়িক, জনবিরোধী এবং শেষ পর্যন্ত দেশবিরোধী দলে পরিণত হয়েছে।
উৎপাদন প্রক্রিয়ার (productive forces /technology) অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে সৃষ্টি হয়েছে অতিরিক্ত পণ্য। সেই পণ্য বিক্রি করতেই নিয়ে আসা হয়েছে ভোগবাদ (consumerism)- অন্য কথায় যে সংস্কৃতিকে বলা যায় এ দিল মাঙ্গে মোর”, “commodity fetishism”, বা “conspicuous consumption”। নামী, দামি ব্র্যান্ডের গুণগত মান নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলছি না। কিন্তু তার জন্য যে আর্থিক মূল্য আমরা দিচ্ছি, গুণগত মান কি ততগুণ ভালো? এর আরও দিক আছে। এই মূল্য দিতে গিয়ে আমাকে জীবনের অনেক প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে খরচ কমাতে হচ্ছে। আর ব্র্যান্ডেড পোশাক, গাড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করে আমি আমার বন্ধু- বান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে কী বলতে চাইছি? আমি তোমার চেয়ে বড়লোক?
এইভাবেই সমাজ ভেঙে যায়।
একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২৬ বছর আগে এ দেশে আসার আগে শিয়ালদহ ও মেট্রো সিনেমার ফুটপাত থেকে আমি একটি টি-শার্ট এবং একটি ট্র্যাকস্যুট কিনেছিলাম। বহুল ব্যবহৃত সেই দুটো এখনও প্রায় একই রকম আছে। পুরোনো গাড়ি চালাই বলে আমি কম নেমন্তন্ন পেয়েছি—তথ্য তাও বলে না। আপনার পরিচয় আপনি। আপনি কী পরছেন, কী চড়ছেন, তার উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আপনি কী করছেন, নির্ভর করে আপনার যাপন এর উপর।
উত্তমকুমার বা সত্যজিৎ রায় কোন ব্র্যান্ডের জামাকাপড় পরতেন, কিংবা কী গাড়ি ব্যবহার করতেন, কেউ বলতে পারবেন? একেবারে নিজেদের মধ্যে থেকেই একটা উদাহরণ দিই। কোনো বাম রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীদের কথা বলছি না। আমাদের সবার প্রিয় পুণ্যদা (ডা: পুণ্যব্রত গুণ) বা শহীদ হাসপাতালের শৈবালদাকে (ডা: শৈবাল জানা) দেখুন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তাঁদের কিছু ব্যবহার করতে দেখিনি। মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁরা তার জন্য কম পেয়েছেন বলে কোনোদিন মনে হয়নি।
যে ‘উন্নয়ন’-এর কথা তারা বলে, সেই মডেলের উন্নয়ন আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদ একটি বিশ্বব্যবস্থা (World System Theory), আর তার হাতে রয়েছে প্রভূত অর্থ, সামরিক শক্তি ও মিডিয়া। তাই আমরা ভাবি বুলেট ট্রেন, বন্দে ভারতই উন্নয়নের প্রতীক! এতে আপত্তি নেই, কিন্তু শিয়ালদহ-কৃষ্ণনগর লোকাল ট্রেনের কী হবে? প্রতিদিন যারা প্রায় ছয় ঘণ্টা ট্রেনে কাটান, তারা কি একটু বসার জায়গাও পাবেন না? একটি বুলেট ট্রেনের খরচে সারা ভারতের রেল সুরক্ষার অনেকটাই নিশ্চিত করা যায়।
তথাকথিত উন্নয়নের নামে একদল মধ্যবিত্তকেও তারা সঙ্গে পেয়ে যাচ্ছে। কারণ তাদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই হকাররাই স্বাভাবিক, সুস্থ নাগরিক জীবনের প্রতিবন্ধক। সত্যিটা তা নয়। কেন এত হকার? কেন jobless growth-এর বাজনা বাজাতে হবে? কেন এত বড় আদানি সাম্রাজ্যে মাত্র ২৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়? কেন দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দৈনিক ১০০ টাকা রোজগার করে? কেন দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ হলো চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের বাধ্যবাধকতা। কেন জোসেফ স্টিগলিৎসের মতো বাজারমুখী অর্থনীতিবিদ বলতে বাধ্য হন যে জিডিপি মূলত রাজনীতিবিদদের হাতিয়ার? এই সঠিক প্রশ্নগুলোই আমাদের মাথা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক দখলের এই প্রক্রিয়াই ফ্যাসিবাদের অন্যতম স্বরূপ।
বামপন্থীদের দায়িত্ব ভোগবাদ এবং উন্নয়নের এই ভুল ধারণাকে আঘাত করা।
সমস্ত সামাজিক নিরিখে ব্যর্থ এই বিজেপি সরকার উন্নয়নের নামে গরিব মানুষের বিপক্ষে যাবে, এটা জানাই ছিল। হকার উচ্ছেদ তার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। হকারদের সংগঠন আছে। তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারত এই সরকার। তা তারা করেনি। রাতের অন্ধকারে বুলডোজার নিয়ে এসে, দৈনন্দিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পরিশ্রম করে, মানবেতর জীবনযাপন করে যে সামান্য পুঁজি তারা সৃষ্টি করতে পেরেছিল, তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যে দারিদ্র্যের জন্য আমি দায়ি নয় , সেই দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে আমায় লাঞ্ছিত করা হচ্ছে; রাষ্ট্রের হাতে নিপীড়িত হচ্ছে আমার অস্তিত্ব; যখন যে রকম প্রয়োজন, সেই প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণী দিয়ে, জাত দিয়ে, বর্ণ দিয়ে, ধর্ম দিয়ে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। মনুষ্যত্বকে আর কত নীচে নামানো যায়!
শ্রেণীবিভক্ত একটি সমাজে শ্রেণী সংগ্রামের তীব্রতা না থাকলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীই আপনার চেতনা দখল করে বসে থাকে। পরমব্রত বা মীরা ভট্টাচার্য হয়ে যান content creator। কিন্তু এই শ্রেণীকে বাদ দিয়ে তো এই আন্দোলনকে গণআন্দোলনে পরিণত করা যাবে না। তাই দরকার লাখ লাখ organic intellectuals। আপনার বাড়িতে, পাশের বাড়িতে, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে বোঝাতে হবে আসল সত্যিটা কী। তার আগে অবশ্য দরকার নিজের চেতনাকে সংঘবদ্ধ করে নেওয়া।
সব বাম দল মিলে মাত্র পাঁচ শতাংশ ভোট এবং বিধানসভায় মাত্র একটি আসন যাদের দখলে, আজ রাস্তার লড়াইয়ে তারাই দেখিয়ে দিচ্ছে তারা কাদের পক্ষে। আর ৪১ শতাংশ ভোট ও ৮০টি আসন পাওয়া দলটা গরাদের বাইরে থাকার জন্য ভেঙ্গে চুরমার, মানুষের পাশে থাকা তো দুরের কথা। একটি রাজনৈতিক দলে মানুষ নানা কারণে যোগদান করেন। রাজনৈতিক আদর্শ তার মধ্যে অন্যতম। তৃণমূলের কোনো আদর্শ ছিল না। রাজনৈতিক আদর্শ না থাকলে শুধুমাত্র বিরোধিতা করে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। আর ক্ষমতায় থেকে সন্ত্রাস ও সীমাহীন দুর্নীতিতে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, দল ক্ষমতায় না থাকলে তাঁরা যে সেই দলে থাকবেন না, সেটাই স্বাভাবিক।
হকারদের নিয়ে যে লড়াই শুরু হলো, তা আসলে জমি দখলের লড়াইয়ের প্রস্তুতি ম্যাচ। এ লড়াই এই শহর থেকে ছড়িয়ে রাঢ়বঙ্গ হয়ে উত্তরবঙ্গের সবুজ প্রান্তরে পৌঁছবে—এ শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ভুলে যাবেন না, পশ্চিমবঙ্গ দখলের পর ৫৬ ইঞ্চির কাছে অভিনন্দন জানিয়ে আঙ্কেল শ্যামের একটি ফোন এসেছিল। আসামের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানেও আঙ্কেল শ্যামের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ওই যে শুরুতেই ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের কথা বলেছিলাম না—পুঁজিবাদ একটি বিশ্বব্যবস্থা।
রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই সব সময়ই কঠিন। আরও কঠিন হয় যখন সেই রাষ্ট্রটি ফ্যাসিস্ট চরিত্র ধারণ করে। তাই কুর্নিশ জানাই সেই সব যোদ্ধাদের, যাঁরা এই লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন। তাঁদের জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
এখন আর অতীতের ভুল খোঁজার সময় নয়। যুদ্ধটা এখন সাধারণ মানুষের জীবিকার সঙ্গে বৃহৎ পুঁজির; বাম এবং ডানের মধ্যে; এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে এক সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের। এ বড় কঠিন সময় । কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে শেষ পযর্ন্ত জনগণই বার বার জিতে এসেছে এবং তাঁরাই ইতিহাস রচনা করেছে।
তাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—
“প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’’










