যোগের প্রকৃত দর্শন, ভিত্তি এবং সমকালীন বিকৃতির সমালোচনা
ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দীতে ‘যোগ’ শব্দটি বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস, কর্পোরেট ওয়েলনেস কর্মসূচি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবক (influencer), বিলিয়ন ডলারের যোগ-শিল্প এবং হাজার হাজার মানুষের সমবেত আসনচর্চা—এসবের মাধ্যমে যোগ আজ একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক পণ্য। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে—যোগ আসলে কী?
যোগ কি কেবল শরীরচর্চা? কিছু আসন, প্রাণায়াম ও নমনীয়তার প্রদর্শন? নাকি এটি মানুষের চেতনা, আত্মজ্ঞান, নৈতিক পরিশুদ্ধি এবং অস্তিত্বের গভীরতর উপলব্ধির এক অনন্য সাধনাপদ্ধতি?
ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্য—উপনিষদ, গীতা, পতঞ্জলির যোগসূত্র, বৌদ্ধ-জৈন সাধনা, বেদান্ত, তন্ত্র, এমনকি রবীন্দ্রনাথ, শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের ব্যাখ্যা—সমস্তই একবাক্যে জানায় যে যোগের মূল বিষয় শরীর নয়, চিত্ত; পেশি নয়, অন্তঃদর্শন; প্রদর্শন নয়, অন্তর্দর্শন; প্রতিযোগিতা নয়, সমত্ব।
অতএব আজকের দিনে যোগ সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য, কারণ যোগকে যত বেশি বাজার, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও আত্মপ্রদর্শনের সংস্কৃতি অধিকার করছে, ততই তার আদি দর্শন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।
১. যোগের প্রকৃতি: যোগ কী?
সংস্কৃত “যুজ্” ধাতু থেকে যোগ শব্দের উৎপত্তি। আধুনিক জনপ্রিয় ব্যাখ্যায় একে প্রায়শই ‘সংযোগ’ বা ‘ঐক্য’ অর্থে ব্যবহৃত করা হয়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে একটি শব্দের অর্থ কেবল তার ব্যুৎপত্তিগত উৎস দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং তার পারিভাষিক ও দার্শনিক প্রয়োগই প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করে। তত্ত্ববৈশারদীতে বাচস্পতি ‘যোগ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিনিমিত্ত ও প্রবৃত্তিনিমিত্ত–এই দ্বিবিধ অর্থের উল্লেখ করেছেন।পতঞ্জলির অভিপ্রায় অনুসারে পারিভাষিক অর্থই ‘যোগ’ শব্দের মুখ্যার্থ আর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ গৌণ।
এই কারণেই পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে যোগের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ সংজ্ঞা দিয়েছেন:
“যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ”
(যোগসূত্র ১.২)
অর্থাৎ, চিত্তের বৃত্তিগুলির নিরোধই যোগ।
এখানে কোথাও শরীরচর্চা, কসরত বা নমনীয়তার কথা নেই। যোগ হল এমন একটি অবস্থা এবং অনুশীলন যার মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা, আসক্তি, স্মৃতি, কল্পনা, বিভ্রম এবং অবিরাম মানসিক আলোড়ন প্রশমিত হয়।
অতএব, যোগ মূলত একটি চৈতন্যবিজ্ঞান (science of consciousness)।
২. কঠোপনিষদের আলোকে যোগ: স্থিরতার দর্শন
যোগের অন্যতম প্রাচীন সংজ্ঞা পাওয়া যায় কঠোপনিষদে (২.৩) —
“যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ।
বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টতে তামাহুঃ পরমাং গতিম্॥” ১০
“তাং যোগমিতি মন্যন্তে স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্।
অপ্রামাত্তস্তাদা ভবতি যোগা হিপ্রভবাপ্যয়ৌ।।”১১
এখানে বলা হয়েছে, যখন পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন এবং বুদ্ধি—সবকিছু স্থির হয়ে যায়, তখন সেই অবস্থাকেই ‘পরম গতি’ বলা হয়। সেই স্থিতপ্রজ্ঞ অবস্থাই যোগ।
এই সংজ্ঞাটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে যোগ মানে শরীরের নড়াচড়া; কিন্তু উপনিষদীয় দৃষ্টিতে যোগ শুরু হয় নড়াচড়ার অবসানে।
অর্থাৎ যোগের লক্ষ্য গতিশীলতা নয়, স্থিরতা; বহির্মুখিতা নয়, অন্তর্মুখিতা; ক্রিয়া নয়, চৈতন্য।
John White in his book The Highest State of Consciousness (1972) বইতে বলেছেন
If the self is experienced as actually embracing other people, self- consciousness becomes social consciousness.
৩. গীতার যোগ: সমত্বের দর্শন
ভগবদ্গীতা যোগকে কেবল ধ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং জীবনযাপনের একটি সর্বজনীন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পদ্ধতিতে পরিণত করেছে।
গীতার বহুল উদ্ধৃত সংজ্ঞা—
“সমত্বং যোগ উচ্যতে”
(গীতা ২.৪৮)
অর্থাৎ, সমত্বই যোগ।
সমত্ব মানে সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয়, প্রশংসা-নিন্দা—সব অবস্থায় মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
এই সংজ্ঞা অনুসারে একজন ব্যক্তি অত্যন্ত কঠিন আসন করতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি অহংকার, হিংসা, ঘৃণা বা লোভে আচ্ছন্ন থাকেন, তবে গীতার দৃষ্টিতে তিনি যোগী নন।
অন্যদিকে, একজন সাধারণ মানুষ যদি সমবেদনা, আত্মসংযম, সত্যনিষ্ঠা এবং সমদৃষ্টি অর্জন করেন, তবে তিনি প্রকৃত যোগের অনেক নিকটবর্তী।
৪. যোগ: চিত্তবিজ্ঞানের একটি সূক্ষ্ম পদ্ধতি
পতঞ্জলি চিত্তবৃত্তিকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেন—
•প্রমাণ
•বিপর্যয়
•বিকল্প
•নিদ্রা
•স্মৃতি
মানব-অভিজ্ঞতার সমস্ত জটিলতা এই বৃত্তিগুলির মাধ্যমে গঠিত হয়।
যোগের উদ্দেশ্য চিন্তাকে ধ্বংস করা নয়; বরং চিন্তার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, যোগ হল—
মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ,
আবেগ নিয়ন্ত্রণ,
আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি,
এবং চেতনার গভীরতর স্তরে প্রবেশের এক পদ্ধতি।
৫. অষ্টাঙ্গযোগ: যোগের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
সমকালীন বিশ্বে যোগের সবচেয়ে বড় বিকৃতি হল আসনকেই যোগের সমার্থক মনে করা, এবং সেটাই বিশ্বাস করানো।
পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গযোগে আটটি ধাপ রয়েছে—
১. যম
•অহিংসা
•সত্য
•অস্তেয়
•ব্রহ্মচর্য
•অপরিগ্রহ
২. নিয়ম
•শৌচ
•সন্তোষ
•তপঃ/তপশ্চর্যা*
•স্বাধ্যায়
*ক্ষুধা-তৃষ্ণা,শীত-উষ্ণ,কাষ্ঠমৌন-আকারমৌন ইয়্যু বিপরীত অবস্থা/ দ্বন্দ্ব সহ্য করাকে তপশ্চর্যা বলে
•ঈশ্বরপ্রণিধান (বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাক প্রমুখ যোগিগণ ঈশ্বরপ্রণিধান করতেন না। এটি পাতঞ্জল নিরীশ্বর-যোগে ছিল না; পরবর্তী সেশ্বর-যোগে অন্তর্ভুক্ত হয়। )
৩. আসন
৪. প্রাণায়াম
৫. প্রত্যাহার
৬. ধারণা
৭. ধ্যান
৮. সমাধি
এখানে লক্ষণীয় যে বর্তমানে যোগ নামে যা সর্বাধিক প্রচারিত, তা কেবল তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ।
প্রথম দুটি ধাপ নৈতিক পরিশুদ্ধির, এবং শেষ চারটি ধাপ চেতনার রূপান্তরের।
অতএব আধুনিক যোগ-সংস্কৃতি প্রায়শই অষ্টাঙ্গযোগের মাত্র এক-চতুর্থাংশকে গ্রহণ করে বাকি অংশকে উপেক্ষা করে।
জনৈক দূরদর্শন-খ্যাত ‘যোগী’ তো অনুলোম-বিলোম-কপালভাতি বৈদ্যুতিন প্রদর্শন করে জনমনে “প্রাণায়াম”কে শুধু পণ্যায়িতই করেন নি, ভীষণভাবে খর্বিত ও বিকৃতও করেছেন।
৬. যোগের প্রকৃত অন্তরায়: পাঁচ ক্লেশ
পতঞ্জলির মতে মানবদুঃখের মূল কারণ পাঁচটি ক্লেশ—
•অবিদ্যা
বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতা।
•অস্মিতা
অহংবোধ।
•রাগ
আসক্তি।
•দ্বেষ
বিদ্বেষ।
•অভিনিবেশ
(অবিদ্যাঽস্মিতারাগদ্বেষাভিনিবেশঃ পঞ্চক্লছশাঃ)
মৃত্যুভয় ও জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি।
এই পাঁচ ক্লেশই যোগের প্রকৃত প্রতিপক্ষ।
যোগের লক্ষ্য দেহকে নমনীয় করা নয়; বরং এই ক্লেশগুলির ক্ষয় ঘটানো।
বিশেষত অস্মিতা বা অহংকার হ্রাস করা যোগসাধনার অন্যতম উদ্দেশ্য। ফটোশ্যুট ও যোগ সঙ্গম পত্রের ব্যাপক প্রচার ব্যক্তির অস্মিতার নির্লজ্জ প্রকাশ।
ভারতীয় দর্শনে (বিশেষ করে পাতঞ্জল যোগদর্শনে) মানুষের যাবতীয় দুঃখ, যন্ত্রণা এবং মানসিক অশান্তির মূল কারণ হিসেবে পাঁচটি মানসিক বাধাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পাঁচটি বাধাকে একত্রে পঞ্চক্লেশ বলা হয়।মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর ‘যোগসূত্র’-তে এই পঞ্চক্লেশগুলির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। নিচে এগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:
ক. অবিদ্যা (Avidya): এটি অজ্ঞতা বা ভ্রান্ত ধারণা। অনিত্য বিষয়কে নিত্য, অপবিত্রকে পবিত্র, দুঃখকে সুখ এবং অ-আত্মাকে আত্মা বলে মনে করার ভ্রান্তিই হলো অবিদ্যা। অন্যান্য সকল ক্লেশের উৎস হলো এই অবিদ্যা।
খ. অস্মিতা (Asmita): এটি হলো অহমিকা বা ‘আমি’ বোধ। যখন মানুষ তার প্রকৃত আত্মাকে (Pure Consciousness) জড় দেহ ও মনের সাথে এক করে ফেলে এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অতিরিক্ত অহংকার করে, তখন অস্মিতার সৃষ্টি হয়।
গ. রাগ (Raga): সুখ, আনন্দ বা আসক্তির প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা মোহ। যে বস্তুতে বা অভিজ্ঞতায় মানুষ সুখ পায়, তার প্রতি তীব্র আসক্তিই হলো রাগ।
ঘ. দ্বেষ (Dvesha): ঘৃণা বা বিদ্বেষ। দুঃখ, অপ্রিয় বিষয় বা কষ্টের স্মৃতির প্রতি মানুষের মনে যে বিতৃষ্ণা, রাগ বা ক্রোধের জন্ম হয়, তাকে দ্বেষ বলে।
ঙ. অভিনিবেশ (Abhinivesha): জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি বা মৃত্যুর ভয়। প্রতিটি জীবের সহজাতভাবে বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা মৃত্যুভয়ই হলো অভিনিবেশ।যোগশাস্ত্রের মতে, চিত্তবৃত্তির নিরোধ (অর্থাৎ, মন ও মস্তিষ্কের অস্থিরতা দূর করা) এবং নিয়মিত যোগাভ্যাসের (যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি) মাধ্যমেই এই পঞ্চক্লেশ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
৭. প্রদর্শনী ও যোগ: এক মৌলিক দ্বন্দ্ব
যোগের ইতিহাসে নির্জনতা, নীরবতা ও অন্তর্মুখিতা সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন—
“ধ্যান করবে মনে, বনে, কোণে।”
গীতায় বলা হয়েছে— “বিবিক্তদেশসেবিত্বম্”
নির্জন স্থানের প্রতি অনুরাগ।
কিন্তু আধুনিক যুগে যোগ ক্রমশ রূপান্তরিত হয়েছে গণ-প্রদর্শনীতে।
হাজার হাজার মানুষের সমবেত আসনচর্চা, বিশ্বরেকর্ড স্থাপনের প্রচেষ্টা, ড্রোন ক্যামেরায় ধারণকৃত যোগ-উৎসব—এসব যোগের অন্তর্মুখী চরিত্রের সঙ্গে গভীর বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই কর্মসূচির ব্যবহারিক মূল্য থাকতে পারে, কিন্তু এগুলিকে যোগের চূড়ান্ত রূপ বলে প্রচার করা জ্ঞানগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
৮. বাজার, ব্র্যান্ড ও যোগের পণ্যায়ন
বর্তমান বিশ্বে যোগ একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শিল্পে পরিণত হয়েছে।
যোগম্যাট, যোগপোশাক, যোগ-রিসর্ট, যোগ-সেলিব্রিটি, যোগ-সার্টিফিকেশন—সব মিলিয়ে যোগ এখন একটি বাজারজাত পণ্য।
কিন্তু যোগের মৌলিক লক্ষ্য যদি অহং হ্রাস হয়, তবে যোগকে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের উপায়ে পরিণত করা এক গভীর অন্তর্বিরোধ।
যে সাধনার উদ্দেশ্য আত্মপ্রদর্শন থেকে মুক্তি, সেই সাধনাই যদি আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে তার অন্তর্নিহিত দর্শন বিপর্যস্ত হয়।
৯. রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে যোগ
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“যোগসাধনা কোন উৎকট শারীরিক, মানসিক ব্যায়ামচর্চা নয়। যোগসাধনা মানে সমস্ত জীবনকে এমনভাবে চালনা করা যাতে স্বাতন্ত্র্যের দ্বারা বিক্রমশীল হয়ে ওঠাই আমাদের লক্ষ্য না হয়, মিলনের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠাকেই আমরা চরম পরিণাম বলে মানি।”
(তপোবন/ শিক্ষা)
এই বক্তব্যে যোগের প্রকৃত মানবতাবাদী চরিত্র ফুটে ওঠে।
যোগের লক্ষ্য আত্মমগ্নতা নয়; বরং আত্মোত্তরণ।
ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরতর ঐক্য।
১০. ঋষি অরবিন্দের ‘অখণ্ড/সমাকলিত (integral)’ যোগ
অরবিন্দের অখণ্ড যোগ (Integral Yoga) বা পূর্ণযোগ হলো এক অনন্য আধ্যাত্মিক দর্শন, বাহ্যিক প্রদর্শন নয় । প্রচলিত ধারার মতো পার্থিব জীবন থেকে দূরে না গিয়ে, মানুষের সমগ্র সত্তাকে (শরীর, প্রাণ ও মন) এক দিব্য বা অতিমানস চেতনায় রূপান্তরিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
অরবিন্দের মতে All life is Yoga, while Yoga as a sadhana is a methodised effort towards self-perfection, which brings to expression the latent, hidden potentialities of being. Success in this effort unifies the human individual with the universal and transcendental Existence.
১১. অরিন্দম চক্রবর্তীর সমালোচনা: যোগ বনাম অস্মিতার রাজনীতি
দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী যথার্থই স্মরণ করিয়ে দেন যে যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য হল অস্মিতা-ক্লেশের অপসারণ।
কিন্তু যখন যোগ জাতীয় গৌরব, সংখ্যার অহংকার, রেকর্ড স্থাপন কিংবা সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনে পরিণত হয়, তখন তা যোগের মূল উদ্দেশ্যের বিরোধী হয়ে ওঠে।
যে সাধনা অহং কমানোর জন্য, তা যদি ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত অহং বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে তা যোগ নয়; যোগের অনুকরণমাত্র।
১২. যোগ ও সমদৃষ্টি
গীতার অন্যতম গভীর শিক্ষা হল—
অন্যের সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ-দুঃখের সমান বলে অনুভব করা।
এই সমদৃষ্টিই যোগের চূড়ান্ত নৈতিক পরিণতি।
সুতরাং প্রকৃত যোগী—
সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না,
ঘৃণাপ্রবণ হতে পারেন না,
বিদ্বেষকে পোষণ করতে পারেন না,
অন্যের কষ্টে উল্লাস করতে পারেন না।
কারণ যোগের চূড়ান্ত ফল আত্মবিস্তরণ নয়, আত্মঅতিক্রমণ।
উপসংহার
উপনিষদ, গীতা, পতঞ্জলি, রবীন্দ্রনাথ, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং ভারতীয় সাধনা-ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের একটিই শিক্ষা দেয়—
যোগ মূলত চেতনার বিজ্ঞান, নৈতিক আত্মশুদ্ধির পথ এবং সমত্ব-প্রতিষ্ঠার সাধনা।
আসন ও প্রাণায়াম তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু সমগ্র নয়। শরীর যোগের বাহন; গন্তব্য নয়। স্বাস্থ্য তার উপজাত; উদ্দেশ্য নয়। প্রদর্শন তার প্রকৃতি নয়; নীরব অন্তর্জাগরণই তার প্রকৃত স্বরূপ।
যে যোগ অহং কমায়, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়, সমবেদনা জাগায়, আসক্তি ও বিদ্বেষ হ্রাস করে, এবং চিত্তকে স্থির ও প্রসন্ন করে—সেই যোগই ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের প্রকৃত যোগ।
অন্যদিকে যে যোগ আত্মপ্রদর্শন, বাণিজ্য, সংখ্যার গর্ব, সাংস্কৃতিক অহংকার কিংবা রাজনৈতিক বিপণনের উপকরণে পরিণত হয়, তা যোগের বাহ্যিক অনুকরণ হতে পারে; কিন্তু তার আত্মা নয়।
যোগের প্রকৃত পরিমাপ শরীর কতটা বাঁকলো তা নয়; বরং অহং কতটা নম্র হল, চিত্ত কতটা শান্ত হল, এবং মানুষ কতটা মানুষের কাছাকাছি এল—সেইখানেই যোগের সত্য পরিচয়।
২১/৬/২০২৬ ( আন্তর্জাতিক যোগ দিবস)










