বারুইপুরে এগারো বছরের একটি বালিকার ধর্ষণ ও খুনের মতো অতি নিন্দনীয় ন্যাক্কারজনক কাণ্ডে ততোধিক নিন্দনীয় ন্যাক্কারজনক অবস্থান নিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। নির্যাতিতা বালিকার পরিবারের সব দাবি মেনে তিনি তদন্তের জন্য সিট গঠন করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে, গোটা ঘটনাকে সংখ্যালঘু শ্রেণির বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ব্যবহার করে রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিলেন। তিনি বললেন, নির্যাতিতার পরিবারকে সব রকম সহযোগিতা করা হবে, কিন্তু যাঁরা এই ঘটনায় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কথায়, ” এই ঘটনার একটা কমিউনাল দিক আছে।এর আগে সি এ এ আন্দোলন ও ওয়াকফ বোর্ডের আইনের প্রতিবাদে আন্দোলনে অশান্তি করেছে।এদের এমন ব্যবস্থা করব যে এরপর আর কোনোদিন বাইরে বেরোবে না।” অর্থাৎ প্রতিবাদ করলেই দমন, আর প্রতিবাদী মুসলিম হলেই সেটা সাম্প্রদায়িক , তাতে ” কমিউনাল দিক “, এটা খুঁজে নেবেন শুভেন্দু অধিকারী । মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে তিনি নিজে যেভাবে সব কিছুতেই সংখ্যালঘুদের হুমকি দিচ্ছেন ,তাতে প্রশ্ন উঠছে: আদৌ কি তিনি একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী? বোঝা যাচ্ছে তিনি এখন হিমন্ত বিশ্ব শর্মার লাইন নিয়েছেন।রাজ্যের সমস্ত মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই সংবিধান অস্বীকার করে রীতিমতো প্ররোচনা দিয়ে চলেছেন।
এরপরেও আশঙ্কা, রাজ্যটা ঠিক মতো চলবে তো? একটি বালিকাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না জানানোর পরেও পুলিশের পক্ষ থেকে তার অনুসন্ধানে কোন অভিযান চালানো হয়নি। বালিকার পরিবারের লোকজন স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে উদ্ধার করে বালিকার মৃতদেহ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি বলে চার জনকে চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আসে। তারপরেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে।কারণ? অভিযুক্ত চারজনই আরএসএস কর্মী। বিজেপি নেতা তাদের ছাড়িয়ে আনবার জন্য উদ্যোগ নেন। ফোন করেন পুলিশকে। পুলিশ ছেড়ে দেয়। এই ঘটনাটাই যথেষ্ট নতুন সরকারের মুখ আর মুখোশকে আলাদা করে দিতে। ক্ষমতায় আসবার সময় তারা বলেছিল এখন থেকে চলবে আইনের শাসন। শাসকের আইন নয়। অথচ যেমনি শাসক দলের চার জন ধরা পরল দুষ্কৃতী বলে অভিযুক্ত হয়ে, তখনই স্থানীয় বিধায়ক নেতা সক্রিয় হয়ে উঠলেন পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য। এটা কি? শাসকের আইন নয়?
এরপর মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতি যেভাবে বিক্ষুব্ধ মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিত করে তাদেরকে সাম্প্রদায়িক এবং সংখ্যালঘু শ্রেণির দাবি বা ইস্যুতে আন্দোলনের সঙ্গে একটি বালিকার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন সেটা কি তিনি আইনের শাসন করছেন ?
মুখ্যমন্ত্রী যদি এভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু শ্রেণীকে টার্গেট করে রাজ্যের প্রশাসনের শীর্ষে বসে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে থাকেন, তাহলে তিনিও কি আইনের শাসনে সঠিক কাজ করছেন?
বারুইপুরের ঘটনা থেকে বোঝা গেল রাজ্য এক চিলতেও পরিবর্তিত হয়নি। ধর্ষণের পর খুন, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, দলের রং দেখে দুষ্কৃতী ছেড়ে দেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুষ্কৃতীরাজ প্রশ্রয় দেওয়া, এই সবই আগের মতই চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হল কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি । নির্যাতিত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়াবার জন্য স্থানীয় মানুষদের নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রঙে চিহ্নিত করে হুমকি দেওয়া। যেন এতবড় নারকীয় ঘটনায় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা ও শাসক দলের নেতার ফোনে দুষ্কৃতী ছেড়ে দেওয়ার প্রতিবাদ করে অন্যায় তারাই করেছেন।
আশ্চর্য তারপরেও মুখ্যমন্ত্রী নিজেও নীরব। একটি কথাও বললেন না পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে। দলীয় নেতার হস্তক্ষেপে দুষ্কৃতী ছেড়ে দেওয়া বিষয়টাও তিনি এড়িয়ে গেলেন।
শুধু তিনি পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করবার জন্য একটি আলাদা ধারায় মামলা রুজু করে প্রমান করলেন, নিষ্ক্রিয় পুলিশ অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দিলেও দোষ নেই।সব দোষ জনগণের। ক্ষোভে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর শাস্তি পেতে হবে জনগণকেই। বেশ, বেশ, এর নাম আইনের শাসন।
এখানেই শেষ নয়। নির্যাতিতার পরিবারের কাছে যাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না পৌঁছতে পারেন তার জন্য তাঁকে বাড়ির মধ্যেই গৃহবন্দি থাকতে বাধ্য করা হয়েছে বলে বারবার অভিযোগ জানাতে থাকলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।কারণ,ঘটনার পরেই বাড়ির সামনে মোতায়েন করা হলো অসংখ্য পুলিশ আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ান। তিনি বেরোতেই পারছেন না, এমন অবস্থা!!
কিভাবে রাজ্যে অরাজক পরিস্থিতি ঘটলেও সেখান থেকে বিরোধীদের সরিয়ে দিতে হয় তারও একটা নির্লজ্জ রূপ দেখল রাজ্যবাসী।
পশ্চিমবঙ্গ যে আরো অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে বারুইপুর দেখিয়ে দিল।









