একদিন সকালে ক্যাথল্যাব শুরু হবে, খবর আসে একজন প্রথম বর্ষের ছাত্র পরীক্ষা দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে, তাকে ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করা হচ্ছে। এটা কিন্তু কোনো স্কুল নয়, একটা মেডিক্যাল কলেজের গল্প। ইসিজি দেখে বিশ্বাস হলো না, আবার রিপিট ইসিজি… বছর কুড়ির একটা ছেলে – anterior wall MI. নিয়ম অনুযায়ী তাকে তুলে তক্ষণি এঞ্জিও করা উচিত। কনসেন্ট দেবে কে? বাড়ির কেউ নেই, কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক মাথারা কেউ কনসেন্ট দেবে না। অন্ততপক্ষে থ্রম্বোলিসিস! কেউ কনসেন্ট দেওয়ার নেই। অতঃপর ফোনে দাদার থেকে কোনোমতে কনসেন্ট নিয়ে থ্রম্বোলিসিস হলো। পরে সেই ছাত্রের এঞ্জিওগ্রাফি ও স্টেন্ট বসানোর প্রক্রিয়া কিন্তু সেই কলেজে বাড়ির লোকেরা করায়নি, সেটা হয়েছে কলকাতার সেন্টার অফ এক্সেলেন্স হাসপাতালে।
বাড়ির লোকের অবর্তমানে ছাত্রছাত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব দুরূহ কাজ। সেদিন থ্রম্বোলিসিস করে মাথায় রক্তপাত হলে দায়িত্ব কেউ নিত কিনা বলা মুশকিল! হাসপাতালের মধ্যেই যদি এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়, একটা স্কুলের জন্য সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল বই কি! কিন্তু যে মুহূর্তে ডাক্তার নিরীক্ষণ করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নিদান দিয়েছিলেন, তক্ষুণি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত ছিল। সেটা না করা অবহেলা তো বটেই…
কিন্তু প্রশ্নটা এই অবহেলায় আটকে নেই। প্রশ্ন চলে গেছে অনেকদূর। গরম চা খেয়ে মেঝে নোংরা হবে বলে ফেলে দেয়নি, সুতরাং মিশনে মেঝে নোংরা করলে অত্যাচার হয়। এই গল্প বাড়তে বাড়তে অনেকের পোস্টে মিশনে যৌন হেনস্তা অব্দি চলে গেছে…
মিশনে আমি দশ বছর কাটিয়েছি। নরেন্দ্রপুর নয়, আসানসোলে। স্কুলে দশ বছর কাটালেও আশ্রমের সাথে বিশাল আত্মিক যোগাযোগ ছিল, এই ঢপ দেবো না। কিন্তু এরকম অত্যাচারের গল্প আমার কানে আসেনি। স্কুলের সর্বাঙ্গীণ সুন্দর ছিল, সেই কথাও আমি বলব না। মিশনে ডিসক্রিমিনেশন হতো, কোন ক্লাস থেকে শুনলে অবাক হবেন। ক্লাস ওয়ান থেকে… টিউশনি পড়লে ফার্স্ট বেঞ্চে, নয়তো কান ধরে লাস্ট বেঞ্চে – ছয় বছরের বাচ্চার সাথে এই জিনিস হয়েছে। আমাদের প্রোগ্রাম হতো সব খোলা আকাশের নিচে, মহারাজরা মাইক পেয়ে জগৎ সংসারের সব শিক্ষা ওই রোদের মধ্যেই দিয়ে যেতেন, যেটা আমরা না শুনতাম না বুঝতাম। কেউ হয়তো সেই রোদের মধ্যেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলো।
কিন্তু সেই ছেলেকে কোলে তুলে সিক রুমে নিয়ে যেতেন আমাদেরই স্যারেরা। সেই স্যারদের অনেকেই আমাদের সাথে সেই রোদে দাঁড়িয়েই অনুষ্ঠান শুনেছেন। ক্লাসে বাঁদরামির জন্য থাপ্পড় যেমন মেরেছেন, তেমনি ফ্যান ছাড়া ক্লাসে ঘামতে ঘামতে বোর্ড ভরে পড়িয়েছেন, শেষ পিরিয়ডেও চিৎকার করে পড়িয়েছেন পাশের ক্লাস অব্দি যা শোনা যায়। মাধ্যমিকের আগে খাতা ভর্তি টেস্ট পেপার সলভ করে নিয়ে গেছি, চেক করে দিয়েছেন হাসি মুখে। আমাদের প্রতি পদে ডিসিপ্লিনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, স্বামীজির আদর্শের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তাতে কি মিশনের সব স্টুডেন্ট বিশ্ব উদ্ধার করে দিয়েছে? আসানসোলের নামকরা চোর ডাকাত (থুড়ি নেতা) মিশনেরই স্টুডেন্ট। তাদের একজনের গুণকীর্তন করতে কয়েক বছর আগে মিশনের স্যারেরাই হ্যাজ নামিয়েছিল। এই ক্রিমিনালদের ছোটবেলা কেটেছে এই রামকৃষ্ণ মিশনের আঙিনাতেই। এরা ঠাকুর মা স্বামীজীর আদর্শেই মানুষ হয়েছে। তারপর গরিব মানুষের রক্ত চুষে তাদের জমি বাড়ি হাতিয়েছে। আমাদের আজকের দিনের হিরো সন্দীপ ঘোষ মশাইও নাকি আসানসোল মিশনের প্রাক্তনী এবং সামনের সারির ছাত্র ছিলেন 

উল্টোদিকে মিশনের বাইরে কি এমন ছাত্রছাত্রী তৈরি হয়নি যারা সমাজের জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে? সেই উত্তরটাও না। কিন্তু এটা মানতেই হবে মিশনের একটা বড় অংশের ছাত্র স্বামীজির আদর্শকে আঁকড়ে সমাজের উন্নতিকল্পে কাজ করেছে এবং তাদের গড়ে তোলার পেছনে মিশনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সমাজের সারসত্য এটাই। ভালো খারাপ মিশিয়ে এই সমাজ। মিশন সমাজের বাইরে কিছু নয়। তার ভেতরের মানুষগুলোও রক্ত মাংসের তৈরি, দোষগুণের অতীত নয়। ছাত্রটিকে মিশন গরম চা গেলায়নি, সেই চা ফেলে দিতেও মিশন বারণ করেনি। মুহূর্তের ভুলে ব্যাপারটা হয়েছে। তারপর সে ক্লাসেও চলে গেছে। যদিও তারপর ডাক্তারের পরামর্শ মেনে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো অবশ্যই উচিত ছিল, যেটা হয়নি। কিন্তু চা খেয়ে একটা মানুষ মারা যেতে পারে, এটা কি কেউ ভেবেছিল!
ছাত্রদের অসন্তোষ খুব স্বাভাবিক। আমি বলছি আমাদের সময় যদি এরকম কিছু হতো, স্টুডেন্টরা এরকমই প্রতিক্রিয়া দিত। স্কুলের নিয়মের বেড়ি স্টুডেন্টরা হাসিমুখে পায়ে পরে নেবে, সেটা কোনোদিন হয়না। আমাদের তো অনেক টিচারও মিশন কর্তৃপক্ষের উপর ক্ষুণ্ন ছিল 
নতুন মহারাজ বহু শিক্ষকমশাইদের মৌরুসি পাট্টা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমার তো মনে হয় আমাদের এরকম কিছু হলে সেই শিক্ষকরাই মহারাজকে স্কুল থেকে তাড়ানোর একটা বন্দোবস্ত করে ফেলতেন!! কিন্তু সেই মহারাজকেই পাশ করার পর বহু ছাত্র মাথায় করে রাখে, নিজেদের ভুল বুঝে…
আবারও বলছি নরেন্দ্রপুরে আমি কোনোদিন যাইনি, সেখানে অভ্যন্তরে কী চলছে আমার জানা নেই। সেটার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। কিন্তু একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে হাতিয়ার করে নিজেদের এজেন্ডা পূরণ করবে না, এতে আখেড়ে সমাজেরই ক্ষতি।










