রাজ্যে নতুন সরকার গড়তে না গড়তেই নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে এক নতুন ভয়ঙ্কর গুণ্ডা দমন আইন এনেছে বিজেপি সরকার। আপাতত সেটি আদালতের বিচারাধীন। আইনটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন এ পি ডি আর মামলা করেছে। জনস্বার্থে মামলা হয়েছে। নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত করতে সর্বস্তরে জোট বাঁধছে নাগরিকরা। সংগঠিত হচ্ছেন বিভিন্ন গণতন্ত্রকামী সংগঠন। রাজ্য জুড়ে সেমিনার ও গণ কনভেনশনের এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় গুণ্ডা দমন আইন। কেন?
সকলেরই বক্তব্য, পরাধীন দেশবাসীকে দমন করতে, স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে বিপ্লবীদের উপর নির্বিচার অত্যাচার করতে ব্রিটিশ রাউলাট আইন এনেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার, শুভেন্দুর এই আইন প্রায় একই। তাই প্রশ্নও আসছে এটাই যে, রাজ্যে নতুন সরকার গড়ার সুযোগ পেয়ে বিজেপি কি আবার সেই ঔপনিবেশিক শাসন ফিরিয়ে আনতে চায়? আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, শুভেন্দু অধিকারীর হাতেই কি তাহলে পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের মৃত্যু এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠছে?
এই কথা ওঠাটাই স্বাভাবিক। কারণ, বিনা বিচারে যে কোনো ব্যক্তিকে আটক রেখে রাজ্যে ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করতে উদ্যোগী হল রাজ্য সরকার। গুণ্ডা আইন বা “পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল ২০২৬” একটি সম্পূর্ণ দমনমূলক একটি বিল। বদলে যাচ্ছে রাজ্যের চরিত্র।রাজ্যকে পুলিশি স্টেট বানানো হচ্ছে। স্রেফ সন্দেহের বশে যে কোনো নাগরিককে বিনা প্রমাণে এক বছর আটক করে রাখতে পারবে পুলিশ। এটাই আইনে বলা হয়েছে। আশঙ্কা, এরপর “গুণ্ডা” বলে আটকে রাখা যাবে সরকার বিরোধী যেকোনো লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী বা নেতৃত্বকে। তার জন্য কোন এফ আই আর হবে না, চার্জশিট হবে না, আদালতে জামিনের আবেদন করা যাবে না।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই হুমকি দিয়ে বলেছেন কারখানা গেটে তালা ঝোলাতে গেলে গেলে তাদের এই আইনে আটক করা হবে। অথচ বিধানসভায় এই বিল নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, “দাঙ্গাকারী দুর্বৃত্ত এবং অতীতে খারাপ রেকর্ড থাকা লোকজনকে পুলিশ এইভাবে আটকে রাখতে চায়।” অর্থাৎ এই আইনে সরকার কী করতে চায় সেটা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা ও আশঙ্কা দুইই আছে।
এই আইনে গুণ্ডা শব্দটির সংজ্ঞা যেমন ব্যাপ্তি বিস্তর তেমনই , “সুপরিচিত” শব্দের মধ্যে দিয়ে স্রেফ জনমত ও সামাজিক ভিত্তি করা হয়েছে, সম্পূর্ণ নস্যাৎ করা হল আইনের প্রক্রিয়া, বিচার সাপেক্ষে প্রমাণ। নতুন আইনে পুলিশ সুপার পর্যায়ের আধিকারিকের মনে হলে কাউকে বাড়ি থেকে তুলে এনে তাঁকে আটক করা যাবে। এইভাবে পুলিশের হাতে গুন্ডা দমনের নামে যে অধিকার আইন করে দেওয়া হলো তাতে নাগরিকের গণতান্ত্রিক ও সংবিধানসম্মত অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। রাজ্যকে একপ্রকার একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হল।
সব থেকে আশঙ্কা এই বিলে প্রতিরোধমূলক আটক (Preventive Detention)- এ বিশেষ জোর। এটা সব থেকে সন্দেহজনক। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই, ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ করতে পারে -এই আশঙ্কার ভিত্তিতে যে কাউকে আটক করা। শাসক দল তার উদ্দেশ্য মেটাতে এই আইনে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা।
বিলটিতে ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-শব্দ বন্ধে বিস্তৃত ও অস্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে কেবল সুনির্দিষ্ট অপরাধ নয়, এমন আচরণও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা মানুষের মধ্যে ‘ভয়’, ‘আতঙ্ক’ বা ‘নিরাপত্তাহীনতা’ সৃষ্টি করতে পারে, কিংবা বৈধ ব্যবসা বা জীবিকায় বাধা দিতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এই শব্দগুলো যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, আইনগতভাবে এগুলোর ব্যাখ্যা প্রশাসন নিজের মতো করে করে যাকে খুশি আটক করতে পারে। কোনও নির্দিষ্ট সীমানা নেই। ফলে কোন কাজকে সমাজবিরোধী বলা হবে, তা মূলত প্রশাসন তথা শাসকের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করবে।
‘গুন্ডা’ শব্দটির সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্ক অবশ্যম্ভাবী। নির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত না হয়েও প্রশাসন যদি ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে করে, তাকেও এই আইনে আটক করা যাবে। তার জন্য কোনও প্রমাণ দেখানোর দায় নেই। স্রেফ সন্দেহ বা প্রশাসনের ধারণাকে ভিত্তি করে এই আটক আদতে মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার হরণ।
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসবার পর থেকে রাজ্য জুড়ে চলছে পুলিশি পৃষ্ঠপোষণায় জঙ্গল রাজ। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতার দম্ভ, রাজ্যের সর্বত্র বুলডোজার দমন, হকার উচ্ছেদ সীমাহীন অমানবিকতার নজির সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিদিন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার নামে চলছে প্রাক্তন সরকারের বিধায়ক নেতা কর্মীদের উপর ডিম থেরাপি। জনজীবনে ক্রমবর্ধমান দুর্বৃত্তায়ন চালানো হচ্ছে জনবিক্ষোভের নামে। এভাবেই সাজানো অভিযোগ এনে, কিছু মানুষের মতামত দেখিয়ে, পুলিশকে দিয়ে বিরোধী কণ্ঠ থামাতে প্রস্তাবিত এই জনসুরক্ষা আইন ব্যবহার করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
গুণ্ডা দমন আইনে শুধু এলাকায় গুণ্ডাদের গুণ্ডাগিরির কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের কারুর আচরণে কাজে কথায় যদি কোথাও অশান্তি সৃষ্টি হয় বা হতে পারে বলে প্রশাসনের আশঙ্কা হয় তাহলে প্রয়োগ হবে গুণ্ডা আইন। অর্থাৎ কিছু না করলেও বা না ঘটালেও ভবিষ্যতে বিপজ্জনক কিছু ঘটাতে পারে, এটা ধরে নিয়ে যে কোনো নাগরিককে হাজতবাস করানো যাবে। কিন্তু সেই নাগরিক বিচার বা জামিন চাইতে পারবে না, কারণ তাকে গ্রেপ্তার করা হবে না, শুধু আটক করা হবে। নাগরিক অধিকার হরণের এমন ভয়ঙ্কর আইন এই রাজ্যে প্রথম। কেন?
এই আইনে নাগরিক সমাজে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাড়ি বসে নিজের ওয়ালে ফেসবুক পোস্ট করলেও প্রশাসনের মনে হতে পারে, কোনো এলাকায় বা জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হতে পারে, এমন অভিযোগ এনে রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিরোধী, তাঁদের আটক করে রাখা হতে পারে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্দি করা হতে পারে লেখক, সাংবাদিক অধ্যাপক শিক্ষক যাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে লিখবেন। মানবাধিকার কর্মী, পরিবেশ কর্মী, সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য আইনের আন্দোলন সংগঠিত করা আর টি আই কর্মী টার্গেট হয়ে গেলে এই আইনে আটক হতে পারেন। কোনো জন সমাবেশ থেকে সরকারবিরোধী ভাষণ হলে সেই সমাবেশের সংগঠককেও গুণ্ডা দমনে আটক হতে পারে। এমনকি এই আইনে ব্যাপক তল্লাশি, বাজেয়াপ্ত করা ও আটক করার অবাথ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। বিরোধী কণ্ঠস্বর চিরতরে Spin করার এমন নিদান সত্যিই আগে কোনো রাজ্যের আইনে ছিল না!
মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন, যেসব আইন এতদিন রাজ্যে রয়েছে তাই দিয়ে হবে না। আরও কড়া আইন চাই।
হ্যাঁ, সর্ব অর্থেই এই আইন ভয়ঙ্কর।শুধু আটক নয়, অভিযুক্তের নথি, বাড়ি, সম্পত্তি ক্রোক করার সংস্থান রাখা আছে।
এরকম আক্রমণাত্মক আইন বানানোর কারণ কী? আসলে ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়নের নামে রাজ্যের জল জমি সম্পদ বাজার তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কর্পোরেটের হাতে। স্বাভাবিকভাবে তাতে বিপন্ন হবে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা সম্পত্তি। তাই তারা বিরোধিতা করলে বা প্রতিরোধ গড়ে তুললে, বা তাদের হয়ে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করলে তখন চাই শক্তিশালী দমনমূলক আইন। সবটাই উন্নয়নের নামে কর্পোরেট স্বার্থে। নির্বিচারে জোর করে জমি অধিগ্রহণে বাধা দিলে কিংবা কৃষিক শ্রমিক নিয়ে আন্দোলন করলে, সরকারি প্রকল্পে বাধা দিলে এই আইন প্রয়োগ হবে, আশঙ্কা এটাই। হকার উচ্ছেদ থেকে স্মার্ট মিটার, সরকারের একের পর এক জনবিরোধী নীতি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধ, সংগ্রামে নেতৃত্বে এখন বাম দলগুলি। এটা বুঝেই মানুষের আন্দোলন দমন করতেই এই আইন?
বস্তুত, আধা গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া দলের সরকারের দুর্নীতি ও অদক্ষ শাসনে বিরক্ত মানুষ সমাজ বিবর্তনের নিয়মেই ঝুঁকে পড়ে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের দিকে শুধু একটি নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা আর উন্নয়নের আশায়, কিন্তু সেটাকেই সুযোগ করে ফ্যাসিস্ট শক্তি নামিয়ে আনে অনির্বাচনীয় অত্যাচার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপশাসনের অবসানের পর শুভেন্দুর সেই ফ্যাসির শাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই আইন।
বাকিটা জানাবে ভবিষ্যৎ।










