“আজ চোদ্দই আগস্ট/
“আজ পাথর ভাঙার কোরাস গাইছে রাত/
রাতের গায়ে লক্ষ আলো/
রাতের গায়ে আগামী আজাদি/
রাতের গায়ে আর্তনাদ” (অদিতি বসু রায়)
দু’বছর আগে ১৪ আগস্টে তুফান এসেছিল এই শহরে, এই রাজ্যে। সরকারি হাসপাতালের অভ্যন্তরে এক মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল সমস্ত বঞ্চিত নির্যাতিত নারী ও ট্রান্সকুইয়াররা। লিঙ্গ নির্বিশেষ প্রতিবাদী জনসমুদ্র ভাসিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের সব শহর, গ্রাম, গঞ্জ। এক অত্যাচারী ব্যবস্থায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল মানুষের। বৈষম্য আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বতস্ফূর্ত জনরোষ ফুঁসে উঠেছিল সেদিন। ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল রাতের অন্ধকার। ধর্ষণ আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে রাতের দখল নিয়েছিল মেয়েরা, প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষেরা। স্বাধীনোত্তর ভারত দেখেছিল আর এক স্বাধীনতার উদযাপন।
তার পর কেটে গেছে আরো দুটি বছর। জোয়ার ভাঁটার স্রোতে লড়াই চলেছে অবিরাম। ২০২৫ এ রাতদখল ঐক্যমঞ্চ রানুচ্ছায়ামঞ্চে বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান করেছিল। কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, রাজ্যের নানা জেলা শহর ও গ্রামে অভয়া মঞ্চ ও সহযোগী সংগঠন গুলির উদ্যোগে রাত দখলের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।
অভয়া আন্দোলন তৃণমূল শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে সংহত করতে অণুঘটকের কাজ করল।
গত ৪ঠা মে রাজ্যে ঘটল রাজনৈতিক পালাবদল। অভয়ার বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এল বিজেপি সরকার। গত চারমাসে নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা’র বিধায়ক হিসাবে শপথ গ্রহণ, কিছু সাসপেনসন, কিছু সকাল বেলায় ধরে বিকেল বেলায় ছেড়ে দেওয়া জাতীয় কাজ ছাড়া আর কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বিচারের। হবার কথাও ছিল না। যেটা হবার কথা ছিল সেটা ১৪ আগস্ট, ২০২৬ এ হল।
রাত দখল ঐক্যমঞ্চ এই বছর ১৪ আগস্ট যাদবপুর এইট বি বাস টার্মিনাসে সন্ধ্যায় একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। জমায়েতে আনন্দ পটবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ চলচ্চিত্রটি দেখানোর কথা ছিল। এই দিনই বিজেপি মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ঢাকুরিয়া ব্রিজ পারাপার করে রাতের দখল নেবেন ঘোষণা করলেন। শিষ্ট প্রশাসন ফোনে এবং লিখিতভাবে জানিয়ে রাত দখল ঐক্যমঞ্চের কর্মসূচিকে বেআইনি ঘোষণা করল। এই চলচ্চিত্র না কি সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিতে পারে ! মসজিদ থেকে মাইক খুলে নিলে উস্কানি নয়, নামাজ কুরবানি বন্ধ করলে উস্কানি নয়, এমন কি পাঁচশ বছরের পুরোনো একটা আস্ত মসজিদ সশস্ত্র করসেবকরা দূর দূরান্ত থেকে ট্রেনে করে এসে রামের নামে ভেঙ্গে দিলেও সেটা উস্কানি নয়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের স্বীকৃতি! শুধু বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাম্প্রদায়িক প্রচারের পর্দাফাঁস করে দেয় যে ছবি সেটা দেখানো যাবেনা। আশি নব্বই এর দশকের ভারতে সাম্প্রদায়িকতার পুনর্নির্মাণ নতুন প্রজন্মের সামনে নিয়ে এলে কাদের অসুবিধা হতে পারে একথা বলাই বাহুল্য। তাই সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতীদের মনোরঞ্জনার্থে এই ছবি এবং সমগ্র কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষিত হল। প্রিজন ভ্যান সমেত অসংখ্য পুলিশ ঘিরে রাখল এইট বি বাস টার্মিনাস। তবু অনুষ্ঠান বন্ধ করা গেল না।
গলায় ‘ চুপ, রাষ্ট্র চলছে ‘ পোস্টার ঝুলিয়ে, মুখে কালো রিবন বেঁধে শুরু হল মৌন অবস্থান।
ক্রমশ অবস্থান মুখর হল। মাইকের অনুমতি নেই, তাই খালি গলায় গান দিয়ে শুরু হল কর্মসূচি – “অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত
শুনি তব উদার বাণী
হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খ্রিষ্টানি”।
“ও আমার দেশের মাটি”র সঙ্গে হল “মুক্তির মন্দির সোপানতলে”, “আমরা করব জয়”, “পল রবসন”, “ডিঙ্গা ভাসাও”। ভুখমারি সে আজাদি, মনুবাদ সে আজাদির স্লোগান, মানববন্ধন আর “জনগণমন অধিনায়ক” দিয়ে শেষ হল এই কর্মসূচি।
একই সময় বেহালা প্রতিবাদী মঞ্চ শখের বাজারে রাত দখলের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে একটি কর্মসূচি পালন করে। প্রবল পুলিশি প্রতিরোধকে অগ্রাহ্য করে এই কর্মসূচিটিও সফল করেন উদ্যোক্তা এবং এলাকার মানুষজন। সন্তোষপুরে যাদবপুর সিটিজেনস ফোরামের উদ্যোগে আরো একটি প্রতিবাদ সভা হয় ১৪ তারিখ সন্ধ্যায়।
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি। এই ঘাঁটিতে ছলে বলে কৌশলে ঘটেছে তস্করের প্রবেশ। এই বাংলার মাটিতেই পুঁতে ফেলতে হবে বিভাজনকামী শক্তিকে।
‘ঘোর তিমিরঘন নিবিড় নিশীথে ‘ রাত দখলের আলো জ্বালানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদের সকলের উপর।












