পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হয়ে গেল। সরকার পরিবর্তনও হয়ে গেছে। ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ দিক হল, প্রায় সাড়ে ৩২ লাখ মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, এই নির্বাচনে তারা ভোট দিতে পারেননি। যেখানে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একজন বৈধ ভোটারকেও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না, সেখানে লাখ লাখ মানুষ অভূতপূর্বভাবে বঞ্চিত হলেন। এই রাজ্যে গোটা এস.আই.আর প্রক্রিয়াটিই ছিলো আসলে পরিকল্পিত ভাবে প্রধানত সংখ্যালঘু ভোটারদের এবং প্রধানতঃ মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া এবং হয়রান করার প্রক্রিয়া, কারণ আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন অবস্থা থেকে বাদ যাওয়া ২৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৭০% মুসলিম আর ৫১% মহিলা! এখন ভোট শেষ, বাংলার শাসনক্ষমতা দখলের সঙ্ঘের ১০০ বছরের চেষ্টা যেনতেনপ্রকারেণ বাস্তবায়িত হয়েছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তাতে ওই বাদ পড়ে যাওয়া সাড়ে ৩২ লাখের মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ লাখ নাম বাদ গিয়েছিল নির্বাচন কমিশনের হাতে, যাদের আবার ফর্ম-৬ ভর্তি করে নিজেদের নাম তালিকায় তুলতে বলা হয়েছে, যে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এবং এই প্রক্রিয়াও নির্ভুলভাবে চলছে না, অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে ২৭ লাখের কিছু বেশি মানুষের নাম বাদ গেছে কলকাতা হাইকোর্টের নেতৃত্বে বিচারপতিদের হাতে, এবং এই ২৭ লক্ষকে আবার নতুন করে প্রাক্তন বিচারপতিদের দিয়ে তৈরি করা ট্র্যাইবুন্যালে আবেদন করতে বলা হয়েছে, নানাভাবে তার চেয়েও বেশী প্রায় ৩৪ লক্ষ আবেদন জমা হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এই ১৯টি ট্রাইব্যুনাল চলছে কিভাবে তা জানা যাচ্ছে না, ২জন বিচারপতি ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন, নতুন কেউ দায়িত্ব নিয়েছেন কিনা জানা নেই, ফলে সবক’টি ট্রাইব্যুনাল প্রতিদিন বসে কিনা তাও জানা নেই! আর তা জানা সম্ভবও নয়, কারণ বেহালার জোকায় একটি বাহিনী ঘেরা, মানুষের প্রবেশাধিকারহীন, দুর্গের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা বসছেন, প্রতিদিন ক’টি আবেদন, ঠিক কি পদ্ধতিতে তাঁরা বিচার করছেন তা কোনভাবেই বাইরে আসছে না। বিচারপতিদের মুখোমুখি হয়ে নিজের বক্তব্য বলা বা কোন নথি জমা করারও কোন সুযোগ নেই। সুপ্রিম কোর্টের সওয়ালের আলোচনা থেকে কোনভাবে এইটুকু মাত্র জানা গেছে যে নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের ৭০%-ই ভোটাধিকার ফিরে পাচ্ছেন, কিন্তু কাজ হচ্ছে অতি ধীর গতিতে, গত ৪ মাসে সম্ভবতঃ মাত্র ৩৮০০০ কেসের ফ্য়সলা হয়েছে, যার অর্থ ৩৪ লক্ষ আবেদনের সুরাহা হতে ৩০ বছর লাগবে! আর এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী অধিকারী মহাশয় হুঙ্কার ছেড়েই যাচ্ছেন – ‘এদের সবাইকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেব, এদের কাউকে বসিয়ে খাওয়াব না, কোন নাগরিক অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুযোগ পাওয়ার অধিকার এদের থাকবে না’, যদিও তিনি বেশ জানেন যে এইভাবে একজনকেও আন্তর্জাতিক সীমানা পার করানোর ক্ষমতা ওনার বা ভারত সরকারের নেই। তবে দুশ্চিন্তা হয় যে এরপর জনগণনার সময়েও এই মানুষদের ওপরে অত্যাচার করা হবে, ফলে সেই অপচেষ্টাকে রোখাও আমাদের দায়িত্ব।
তাই সব মিলিয়ে, এস.আই.আর প্রক্রিয়ায় ডিলিটেড ভোটারদের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। গত ১০ মাস ধরে এরা কাগজ জমা করেছেন, এ’দোর ও’দোর দৌড়েছেন, কিন্তু অনিশ্চয়তার শেষ হয়নি। তাই ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’ মনে করে যে এবার কাগজ দেওয়া-নেওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিককালের ছাত্রদের অভিজ্ঞতার মতই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে পথে নামা ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই। তাই আজকের পরিস্থিতিতে একটাই স্পষ্ট দাবি তোলা দরকার … ‘সমস্ত টালবাহানা বন্ধ করো। অবিলম্বে আমাদের নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করো।’ এই দাবি আদায় করতে হলে শুধুমাত্র আইনের দরজায় কড়া নাড়লেই হবে না, আইনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ পথে নামলেই একমাত্র এই দাবি আদায় করা সম্ভব। যেহেতু ট্র্যাইবুন্যাল সচল করে নাম তোলার বিষয়টি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির অধীনে, তাই প্রধান বিচারপতি কাছে হাজার হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই কর্মসূচিই গ্রহণ করেছে ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’।
আগামী ২রা সেপ্টেম্বর, বুধবার, বেলা ১২-৩০টায় রামলীলা ময়দান (মৌলালি) থেকে হাজার হাজার ডিলিটেড ভোটারদের মিছিল শুরু হবে, ধর্মতলায় পৌঁছে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হবে। আওয়াজ উঠবে, ‘ডিলিটেড ভোটারদের নাম নথিভুক্ত কর; ট্রাইবুন্যালের কাজ গতিশীল করো; ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করো।’ আমরা আশা রাখি যে মহামান্য আদালত এত মানুষের সমস্যার সুরাহা করতে পদক্ষেপ নেবেন। আর সুরাহা না হলে, রাস্তার লড়াই আরও তীব্র হবে আর তেমনই প্রয়োজনে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত করার দাবীতে মানুষকে সাথে নিয়েই আমরা দিল্লীর সর্বোচ্চ আদালতেও পৌঁছে যাব। যেভাবেই হোক, এই অনিশ্চয়তা কাটাতেই হবে।
‘পথে এবার নামো সাথী
পথেই হবে পথ চেনা।’










