এক ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে তৎকালীন শাসকের প্রশ্রয়পুষ্ট গুণ্ডারা, যাদের সংবাদমাধ্যম মিষ্টি করে দুষ্কৃতী বলে,এই শহরের এক অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে যথেচ্ছ ভাঙচুর করেছিল — শহরের উত্তরাঞ্চলের ঘটনা ছিল সেটা, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সেই ক্ষতচিহ্ন এখনও শুকোয়নি।
দু’ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, ঘাসফুল পদ্মে রূপান্তরিত হয়েছে,শাসক পাল্টেছে। কিন্তু সেই আগস্ট,১৯ তারিখ মধ্যরাতে বর্তমান শাসকদলের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা দক্ষিণ কলকাতায় এক আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে একইরকম তাণ্ডব চালিয়েছে। তবে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনায় যাদের প্রশ্রয় বা পরিকল্পনা ছিল বলে মনে করা হয়েছিল, তাদের সামনাসামনি দেখতে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখানে এখন ডাবল ইঞ্জিনের ধামাকা, ফলে শাসকদলের নেত্রী তথা বিধায়কের মুখনিঃসৃত ভাষা যাকে আমরা হুমকি বলে মনে করি– তার প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গুণ্ডাবাহিনীর তাণ্ডব চলেছে,তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের লক্ষ করে আগুন ছুঁড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকটিকে পদদলিত করেছে ও ভেঙে ফেলেছে। যদিও এ নিয়ে তাদের কোনো লজ্জা বা দুঃখবোধ প্রত্যাশিতভাবেই দেখা যায়নি।
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ঐ মধ্যরাতে হামলা ও ভাঙচুরের উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট, ঘটে যাওয়া অপরাধের প্রমাণ লোপাট করা।
কিন্তু যাদবপুরের ঘটনা আরও অনেক বেশি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও অধ্যাপকদের সামগ্রিকভাবে কুৎসিত আক্রমণ করা, তাদের দেশদ্রোহী বলে অভিহিত করা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ যে মুক্তচিন্তা ও স-তর্ক বিকাশের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বহন করে চলেছে তাকে আঘাত করার এই চক্রান্ত নতুন না। অন্ধকারের জীবদের আলো সহ্য হয় না। জ্ঞানের আলো, শিক্ষার আলো, মুক্তচিন্তার আলো।তাই যারা যাদবপুরের ওপরে নির্লজ্জ আক্রমণ চালিয়েছে, তারা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শত্রু। তারা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিকে ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে মরীয়া।
অভয়া মঞ্চ অভয়াদের ন্যায়বিচারের দাবিতে, মহিলা শিশু প্রান্তিক লিঙ্গ বা জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য যেমন লড়াই করছে, তেমনই তার লড়াই প্রথম থেকেই ভয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে। যে রাজনৈতিক প্রশাসনিক আর্থসামাজিক বা সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ ভয়ের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে, মানুষকে ত্রস্ত করে — অভয়া মঞ্চ সেই পরিবেশের সদর্থক পরিবর্তন চায়।
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে সেই মধ্যরাতের আক্রমণের মতোই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে দুষ্কৃতীদের এই আক্রমণ সেই ভয় দেখানোর রাজনীতির উগ্র বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসন তথা শাসকদলের প্রশ্রয় না থাকলে কোনো জায়গাতেই এমন ঘটনা ঘটার কথা না।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে দুর্বৃত্তদের এই সশস্ত্র হামলা আসলে আমাদের মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল ঐতিহ্যের ওপরেই আক্রমণ, শিক্ষাঙ্গন থেকে নাট্যশালা সর্বত্রই আগ্রাসনের রাজনীতির আস্ফালন।
অভয়া মঞ্চর যূথবদ্ধ অবস্থান আজ আক্রান্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে। দেশের এই বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার জন্য, তার ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে বাঁচানোর জন্য শুভবুদ্ধির প্রতি আমাদের আবেদন রইল।











