নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ নদী বিপর্যয়ের প্রভাব উত্তরবঙ্গে সরাসরি হয়ত পড়বে না। তবে উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি বর্তমানে গভীর সংকটে! সুদীর্ঘ কাল ধরে ( ১৯৬১ সাল থেকে) ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তায় ভূটানে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলছে। একটি প্রকল্পেরও এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট যথাযথ পদ্ধতি মেনে হয়নি। প্রতিটি প্রকল্পই “রান অব দি রিভার” জাতীয় হলেও তার রূপায়ণে যা যা কারিগরী ধাপ অনুসরণ করবার কথা, তা হয়নি। সস্তায় বিদ্যুৎ নিয়ে তা ভারতের শিল্পোন্নত বা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধশালী রাজ্যগুলির (মহারাষ্ট্র,রাজস্থান, হরিয়ানা, গুজরাট ইত্যাদি) বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটানোর যে পদ্ধতি অনুসৃত হয়ে আসছে তা প্রবহমান আছে। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে সেই ভাবে লেখালেখি, আলোচনা – সমালোচনাও কম! বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি জড়িয়ে থাকবার দরুণ সরকারের পক্ষে সহজেই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব!
কোথাও যেন একটা অস্বচ্ছ, প্রচ্ছন্ন বিষয় লুকিয়ে রাখা। সাম্প্রতিক ইন্দো-ভূটান সীমান্তবর্তী উত্তরবঙ্গের একেবারে লাগোয়া ভূটানের “টালা” জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এলাকায় মনুষ্য সৃষ্ট হড়পা বানের প্রকোপে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিলো। আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলা ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বললে ভুল বলা হবে না। সেদিন আজকের নেপালের ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মতোই ধ্বংসলীলা হতে পারতো। উত্তরবঙ্গের জনপ্রতিনিধিরা এই সমস্ত বিষয় নিয়ে কতটা ওয়াকিবহাল বা সচেতন, সেই বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভূটান পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য নদী, নালা, ঝোরার মধ্য দিয়ে বয়ে আসা জলের গতি প্রকৃতি বুঝবার যৎ কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, উত্তরবঙ্গের বিপদ শিয়রে! ইন্দো- ভূটান যৌথ নদী কমিশনের দাবী ও তা বাস্তবায়নের কথা বারংবার বলা হলেও কেউ এই অবহেলিত এলাকার কথা আজ সেই ভাবে তুলে ধরবার নয়। ভুরি ভুরি একাডেমিক গবেষণা সন্দর্ভ এই সমস্ত বিষয়ে রচিত হয়েছে বা হচ্ছে ;
কিন্তু এই সমস্ত বেশ জটিল খটমটে বিষয়গুলো আমাদের মতো সাধারণদের বোধগম্যতার বাইরে। গোটা উত্তরপূর্ব ভারতের কোনো কারিগরী ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে “রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং” পড়া ও গবেষণার সেই রকম কোনো সুযোগ নেই! সম্ভবতঃ খুব সম্প্রতি গৌহাটি আই. আই. টি. তে রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটি ডিপ্লোমা কোর্স শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই সাধারণ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে নদী নিয়ন্ত্রণ করবার চটজলদি প্রকৌশল তথা যত্রতত্র বাঁধ দেওয়ার প্রবণতাই নদী নিয়ন্ত্রণের একমাত্র নিদান – বিপর্যয় হতে বাধ্য!
গোটা উত্তরবঙ্গের নদী সমূহের সামগ্রিক জল বিভাজিকা ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞান সম্মত চেহারাটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে; তা এখনও অজানা! আজ নেপালের ‘ত্রিশূলী’ নদীর এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয় তান্ডব দেখেও আমাদের হুঁশ ফিরবে না!
সেই ‘৬২ সাল থেকেই তো এই সম্পূর্ণ অঞ্চলটিতে চীনের জুজু দেখিয়ে জল-জঙ্গল-নদীর বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার কাজ সুচারু রূপে করা হয়ে আসছে ; সামগ্রিক সুসংহত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন কোনো দিন কি হবে? ভূটান পাহাড় থেকে নেমে আসা জলঢাকা, রায়ডাক, সংকোশ, কালজানি, গাঠিয়া, ডায়না, মূর্তি, পানা, ডিমা, বসরা, নিমতি ঝোরা, হলং ইত্যাদি নদীগুলির উচ্চগতি যা ভূটানে প্রবাহিত সেখানে ধারাবাহিক লাগামহীন ভাবে নদী নিয়ন্ত্রণের নামে অবৈজ্ঞানিক কান্ড -কারবার হয়েই চলেছে আর এই পাড়ে দেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে বইতে থাকা ঐ নদীগুলোকেই আমরা বাঁধতে চাইছি; এ কি সম্ভব? কোন জাদু মন্ত্রবলে এটা সম্ভব?
ভূরাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে; এই অজুহাতে একটি বহমান নদীকে খন্ড খন্ড করে ভেবে সমস্যা সমাধান করবার প্রযুক্তিগত প্রয়াস কখনো কি সফল হতে পারে? বৈজ্ঞানিক স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত গুলোকে এইভাবে খন্ড খন্ড করে প্রয়োগ করবার কৌশলই তো অবৈজ্ঞানিক! নদী যখন তার আপন বেগে বয়ে চলে, তখন সেই নদী দেশ, এলাকা, সীমানা কোনো কিছুর তোয়াক্কা কিভাবে করবে? এ হয় না কি?
নেপাল, ভূটান, চীন অধিগৃহীত তিব্বত, আফগানিস্তান, পাকিস্থান, ভারত – এই উপমহাদেশের রাষ্ট্রনায়কেরা আর কবে ভাববেন? ভূটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির স্থান ব্যবস্থাপনা এমন দূর্গম জায়গায় অবস্থিত যে সেখানে সরজমিনে দেখে আসাও সহজসাধ্য নয়। ঐসমস্ত একেবারে দুর্গম জায়গাও আজ বড়ো বড়ো ট্রান্স ন্যাশনাল কর্পোরেটদের হাতে। উত্তরবঙ্গের জল, জমি, জঙ্গল আজ কর্পোরেট হাঙরদের লোভনীয় খাবার হিসেবে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো নিয়ে সত্যি কথা বলা, আশঙ্কা জানিয়ে লেখালেখি করাও তো রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে!
এক ভয়ানক পরিস্থিতি আমাদের অলক্ষে ধীরে ধীরে নীরবে তৈরী হয়ে চলেছে। এর থেকে মুক্তির তো আশু কোনো উপায় নেই! প্রকৃতি আজ আমাদের অমোঘ নিয়তির রূপ ধারণ করে এক ধ্বংস লীলায় মেতে উঠেছে। এটাই যেন ভবিতব্য। কোনো দুর্ভাবনা, আশঙ্কা নয়, আমাদের সম্মিলিত কৃতকর্মই আজকের এই ধ্বংসলীলার কারণ। তাই যতটুকু সাধ্য, যতটুকু ক্ষমতা ততটুকু দিয়েই আমাদের বাঁচার লড়াইতে সামিল হতে হবে!










