“হয় আমরা নয় ওরা” ,যে ভাষায় একজন মুখ্যমন্ত্রী হুমকি দিচ্ছেন যে মনে হচ্ছে না তিনি রাজ্যকে শাসন করতে এসেছেন।মনে হচ্ছে, তিনি বাঙালিকে শাসন করতে এসেছেন।গণতন্ত্রে রাজ্য শাসন করা যে রাজ্যবাসীকে শাসন করা নয়, এই ন্যূনতম বোধ যে নেতা বা দলের নেই তারা রাজ্যকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিতেই চান, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। প্রশাসনিক প্রয়োজন বা উন্নয়নে সকলকে নিয়ে কাজ করাটা তার রাজধর্ম।সেটাই গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ এমনকি উন্নয়নের অনিবার্য শর্ত । এসব তিনি ভুলে যেতে চাইছেন সচেতনভাবেই। তিনি তার পরিবর্তে যা করছেন সবটাই পরিকল্পনা মাফিক এবং সেটা স্বয়ং মোদির প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ করার এজেন্ডা হিসেবেই।ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনে অংশ নিতে এসে জনসভায় ভাষণ দিয়ে মোদি বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে যাদবপুরের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন,খুব স্বাভাবিকভাবেই শুভেন্দু সেই হুমকি দিচ্ছেন নিজেকে মোদির কাছে রাখতে।কিন্তু প্রথম প্রশ্ন : যাদবপুর কেন টার্গেট? কারণ যাদবপুর মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী।অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রী শিক্ষক বামপন্থী।তর্ক বিতর্ক প্রশ্ন তোলার মধ্যে দিয়ে সত্যিটা চিনতে চায়।
বিজেপির রাজনীতি এদের ভয় পায়।কারণ তারা মানুষকে অন্ধের মতো সব কিছুকেই ধর্মে বিশ্বাস করার মতো করে চালাতে চায়। প্রশ্ন করলেই সে দেশদ্রোহী। শুভেন্দু শর্বরীদের আক্রমণ তাই এই জ্ঞান চক্ষু খোলা ছেলে মেয়েদের উপর। তারা ছাত্রদের যুক্তি তথ্য আর বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ ভুলিয়ে প্রাচীন আমলের পৌরাণিক বিশ্বাসকে পুঁজি করে বাঁচতে শেখায়।সেটাই তাদের কাছে ” রাম রাজত্ব।”
রাজ্য শাসন করতে এসে দুর্বল গরিব প্রান্তিক মানুষদের জন্য বরাদ্দ বা ঘোষণা নেই । নেই সকল মহিলা, শিশু বৃদ্ধদের জন্য সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি। উন্নয়নের গল্প আছে, কোনো চাকরির ঘোষণা নেই। এসব নিয়ে লেখার প্রয়োজন ছিল না মাত্র একশ দিনেই, যদি দেখা যেত বিজেপি চাইছে গোটা রাজ্যে সদর্থক উন্নয়ন।কিন্তু তাদের প্রথম ১০০ দিন পুরোটাই আশা ভঙ্গের পর্ব । হতাশা গ্রাস করেছে সচেতন সাধারণ মধ্যবিত্তের। হকার থেকে টোটো অটোচালক ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে সরকারি কর্মী সকলের উপর নেমে এসেছে খাঁড়া, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে তিনি চাইছেন এই রাজ্যে আসুক হিন্দুত্বের জোয়ার।
শাসক দলের সর্বস্তরে তাই তারই প্রতিযোগিতা চলছে ।ক্ষমতা পাওয়ার পর বিভিন্ন দল থেকে বিজেপিতে আসা নেতারা ( শুভেন্দু নিজে সহ সজল সহ অনেকেই)! নিজেদের প্রমাণ করতে চাইছেন যে তারা পুরানো আর এস এস মনোনীত বা ঘনিষ্ঠ নেতাদের থেকেও বেশি সনাতনী আর কত বড় রাষ্ট্রবাদী! কাকে বলে রাষ্ট্রবাদী তার কোনো সংজ্ঞা কারুর জানা নেই, কিন্তু রাজ্যকে এরা বানাতে চায় সনাতনী সংস্কৃতি কেন্দ্র।নইলে আর এস এস সরিয়ে দেবে পদ থেকে।
তাই নাগপুর ও দিল্লির সর্বোচ্চ কর্তাদের কাছে গুড মার্কস পেতে শুভেন্দু উঠে পড়ে লেগেছেন। শুভেন্দু, দিলীপ, অগ্নিমিত্রা পালেরা এত বেশি অসাংবিধানিক কথা বলছেন যে এর পর এই শাসক দল বিজেপি গোটা সংবিধানটাই দেশবিরোধী বলে না বসে। অবশ্য সেটা তো এরা জন্মের সময় থেকেই সংবিধান নিয়ে একই কথা বলে যাচ্ছেন।রাজ্যবাসীর মধ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক বেস তৈরি করতে চায় বলেই শুভেন্দু সনাতনী ধর্মের পতাকা তুলে গণতন্ত্রের উত্তর নির্লজ্জ আক্রমণ চালাচ্ছে। এই সরকার তাই চরম মুসলিম ও বাম , ধর্ম নিরপেক্ষ, মুক্তচিন্তার বিদ্বেষী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপির বিধায়ক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সারা রাত তাণ্ডব করেছেন।
হিন্দুত্ববাদীরা এখন নিজেদের শক্তি বাড়াতে দুর্গাপুজোকেই টার্গেট করেছেন। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের ঐতিহ্য তারাই শাসন করবেন বলে জানাচ্ছেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাকর্মীরা।সঙ্গে বজরং দল ও হুমকি দিচ্ছে। বাঙালিকে প্রশাসনিক নিয়ম রীতি অনুযায়ী সুশাসন উপহার না দিয়ে পুলিশকে বানিয়েছে দলদাস। বাঙালির কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্য এবং জাতিসত্তার গোড়ায় আঘাত করে গোটা বাঙালি জাতিকে তাদের অন্ধ ভক্ত করবার জন্য একটা ব্লু প্রিন্ট নিয়ে ফেলেছে বিজেপি।
বাঙালির বহুত্ববাদ , আধ্যাত্মিকতা ,তার ধর্মীয় আচরণের স্বাতন্ত্র্য, অসাম্প্রদায়িক মৌলিক চেতনা উৎপাটিত করতে চাইছে বাঙালির সমাজ জীবন থেকে। সব বাঙালির মিলে মিশে একাকার হয়ে মাতৃভাবে দুর্গাকে আবাহন করাতেও তাদের আপত্তি।
ফলে এতদিন ধরে এই যে মুসলমানরাই রাজ্যের দুর্গা পুজো করে আসছিল এবার তারা কি করবে? ” আসলে যেকোনো ইস্যুতে বাংলার মানুষকে টুকরো করতে চায়। ” ওরা মুসলমান, ওরা টুকরে টুকরে গ্যাং, কিংবা ওরা দেমাগী নকশাল ” এসব বলে টুকরো করতে চায়। গোটা বাঙালিকে “আমরা – ওরা” বাইনারিতে ‘ বিভাজন করে নিজেদের কাছে টানতে চাইছে ।
চরম বিভাজনের রাজনীতি করে বাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালিকে দাঁড় করানোর এই রাজনীতি শুরু করেছিল ভোটের আগেই। ভোটের ফল পেয়ে এখন সেই অসমাপ্ত কর্মসুচি সম্পন্ন করে চলেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই।তাই ১০ হাজার কণ্ঠে বন্দেমাতরম গাওয়ানোর অনুষ্ঠান করে রাজ্যের হিন্দুত্ববাদীদের সংগঠিত করছেন মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে।রাজ্যে আড়াআড়িভাবে ধর্মীয় আবেগে মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে পরিচয়ের রাজনীতিতে টেনে আনছেন এইভাবেই। বাংলার প্রথম সারির একটি নির্দিষ্ট সংবাদপত্র গোষ্ঠীকে রিপোর্টে “গেরুয়া তান্ডব “শব্দটি লেখার জন্য রীতিমতো হুমকি দিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করানোর চেষ্টা করেন মুখ্যমন্ত্রী।এরপর তিনি হুমকি দেন, গেরুয়াধারী সাধুরা নাকি বদলা নিতে প্রস্তুত, তিনি শুধু তাদের আটকে রেখেছেন । কী আশ্চর্য মিল! ক্ষমতায় থাকাকালীন একটি পত্রিকা গোষ্ঠীকে ঠিক এভাবেই হুমকি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছিল কখনও বাম বা তৃণমূল সরকার ।কিন্তু কোনো সরকার এভাবে সংবাদপত্রকে ক্ষমা চাইতে বলছে, নইলে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের সাধুদের দিয়ে আক্রমণ হতে পারে, এমন অভূতপূর্ব ঘটনা বাংলার বুকে ইংরেজ আমলেও হয় নি। মুখ্যমন্ত্রীর এই হুমকিই বলে দিচ্ছে : এই সরকার প্রশাসন – সুশাসন নয়, বাঙালিকে বদলে দিতে চায়।
ভোটে জনাদেশ পেয়ে বাঙালির পরিচয় , ভাষা ও সংস্কৃতির উপর হিন্দি বলয়ের সনাতনী সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চায়। এরপর বাঙালিকে হয়তো বলবে অষ্টমী নবমীতেও নিরামিষ খেতে হবে কারণ সেটাই নাকি সনাতনী নিয়ম আচার! কিন্তু তার আগে ওদের বোঝা উচিত আর্যদের আমল থেকে আজকে পর্যন্ত বাঙালি ঐতিহাসিকভাবে কোনদিনই সনাতনী ছিল না। বাঙালি তার নিজস্ব জাতি সত্তার ভিত্তিতে আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির থেকে পৃথক ছিল। পরবর্তীকালে বাঙালি গড়ে ওঠে আর্য কিংবা অনার্য রীতি-নীতি থেকে নিজস্ব মৌলিক ভাবনা নিয়ে।বাঙালি গড়ে ওঠে এক মিশ্রিত সংকর সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী হিসেবে। এই বাংলায় বাল্মিকী রামায়ণ নয়। কৃত্তিবাস রামায়ণের রাম কে জন্ম দেয় নতুন ভাবে। আর্য দুর্গাকে বাংলার মাটিতে রূপান্তর ঘটায় বাঙালি ঘরের মেয়ে উমাতে।তাই বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে হিন্দু নাম নিয়ে হিন্দুস্থানীদের নিজেদের সংস্কৃতিকে সনাতনী সংস্কৃতি বলে চাপিয়ে দেওয়ার আগ্রাসন চলতে পারে না।
কথায় কথায় তাই সনাতনী সংস্কৃতি শেখাতে আসা এই আগ্রাসী শাসককে বাঙালির বোঝানো দরকার। বাঙালিকে কোণঠাসা করে তার উপর অবাঙালি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ভোট দেওয়া হয়েছিল রাজ্যটা শাসনের জন্য, বাঙালিকে শাসন করার জন্য নয়। বাঙালিকে সনাতনী সংস্কৃতি পালন করানো কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের কাজ নয়।তাই মুখ্যমন্ত্রী যা বলছেন সেটা বলাটাও আইনসম্মত নয়।
ইতিহাস বলে, বাংলার সংস্কৃতিতে সনাতনী সংস্কৃতি বলে কোন সংস্কৃতি কোনোকালে ছিল না । আজ তারা যেটাকে সনাতনী সংস্কৃতি বলছে, ঐতিহাসিকভাবে এটা উৎপত্তি গুপ্ত ও শশাঙ্কের আমলে। তারপর সেটা বাংলা প্রত্যাখ্যান করেছে এক হাজার বছর আগেই। বাংলার ইতিহাস না জানা হিন্দুস্থানী লোকেরা বাংলার মাটিতে সনাতনী হিন্দুত্বের ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপাতের ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি চাপাতে এসে বাংলার নিজস্ব মুক্তমনা সম্প্রীতির সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতি বলবে, সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ভয় পেয়ে বাঙালি যদি নিজের সংস্কৃতি নিজের সভ্যতা নিজের মেরুদণ্ড বিকিয়ে দেয়, নিজের ধর্ম ,বিশ্বাস, পুজো , আচরণ, খাদ্যাভ্যাসের উপর হুমকি মানতে থাকে,তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাঙালিকে দাসানুদাস হয়েই বাঁচতে হবে। বিজেপি সেটাই চাইছে। তাই আজ শুভেন্দু দিলীপরাই প্রকাশ্যে এসব বলছেন।
দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালিকে নিজের জাতি সত্তা রক্ষার স্বার্থে, নিজের পরিচয়কে রক্ষার স্বার্থে প্রতিবাদ করতে হবে। বাংলাকে উপেক্ষা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা শেখাতে এসেছে যারা তাদের এবার সবার আগে বাংলার মনের ভাষা পড়তে জানতে হবে। বাংলাকে শাসন করার আগে জানতে হবে যে তাদের রবীন্দ্র নজরুল রামমোহন রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের অহিংস, অ সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি শেখার সময় এসেছে।বাঙালির রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না। বিদ্যাসাগর শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ হয়েও নিজে ছিলেন নাস্তিক। চৈতন্য ছিলেন সনাতনী জাতপাতের বিরুদ্ধে, রামকৃষ্ণ নিজে ইসলাম সাধনা করে সর্ব ধর্ম এক , সব পথ সমান বলে শিখিয়ে গেছেন, এমনকি হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বললেও স্বামী বিবেকানন্দের হিন্দু ধর্ম ছিল সর্ব ধর্মের সমন্বয়ের। সমস্ত ভেদাভেদের উর্ধ্বে। তাই এই সনাতনী রাজনীতিকদের শেখার সময় এসেছে বাংলার নিজের ধর্ম যা লিখে গেছেন অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ,প্রফুল্লচন্দ্র,জগদীশচন্দ্র ,নেতাজি সুভাষ। শুভেন্দুর নেতৃত্বে এই রাজ্যের নতুন সরকার ভোট পেয়ে যা শুরু করেছে তাতে যাদবপুর না ,তারা নিজেরাই নিজেদের গ্রহণযোগ্যতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে । বাঙালির কাছে প্রতিদিন বিজেপি পায়ের তোলার মাটি হারাচ্ছে অতিরিক্ত উগ্রতা দেখাতে গিয়ে। বাঙালিও ভাবছে বাধ্য হয়ে শুভেন্দুর ভাষাতেই ” হিসেবের শেষ পর্যায়ে এসে গিয়েছে।…. মাঝে আর কিছু হবে না!”











