আমি কেন, আমার বাপ-ঠাকুরদা, আমার চোদ্দপুরুষ এ গাঁয়ে থেকি গেছে। হেই যে দেখছেন ঐ পুরনো বাড়ি – ঐ একখান ঘর-ই শুধু পাকা।আমার ঠাকুর্দা করি গেছে। আর তো সব টালি, খড়ের চাল।গরীব মাইনসের মাটির ঘর বটে। জমি চাষ করি খাওয়ার লাগি। ঘর- বাড়ি কোত্থেকি হবে বলুন দিকি! এই গাঁয়ের ইস্কুলেই পড়া লিখা। দশক্লাস পাসও করিছি বটে, চাষের কাজ করতি করতি। বাস্, ঐ পয্যন্ত। ছেলে মেয়েরা অবশ্য মিথ্যে বলবো না – শহরের কলেজে পড়তিছে। তো সেই এস আর, না কী বলে? লিস্টিতে নাম তোলার লাগি সব দেখি ছুটতিছে। এত কেনে ঘুরবার লাগে? গ্রামে তো কটা মানুষ – সবাই দেখতিছে সবাইকে। এত কেনে লুকোচুরি? দেখতি-ই তো পাচ্ছো কে এ গাঁয়ের, আর কে না! সব ছুটতিছে বাবুদের এ অফিস থিকে ও অফিস। তিনটে কাগজ দিই তো বলে – আরো চারটে লাগবেক। দু’রকম কথা কেনে! মরদের এক কথা হবে না কেনে? আমার জমির দলিল, ভোটার, আধার, দশ-কেলাস সার্টিকেট- যা বলতিছে, তাই তো দিচ্ছি! শেষে বলে কিনা আমি নাকি এ দেশের-ই মানুষ না। ওমা! এ কী বলে গো! এরা কোত্থেকে এইছে! সে কী যে হাসি পেল আমার, হাসছি তো হাসছিই…. হাসি আর থামছেই নাকো! হাইসতে হাইসতে ভূঁই তে লুটাইছি,তবু হাসি থামছে নাকো! সবাই বললো – মাথা খারাপ হলো নাকি?
আরে না না, মাথা আমার খারাপ হবে কেনে? আমি ষোলো-আনা সেয়ানা আছি, শুধু আমি কেনে, আমার বাপ-ঠাকুরদা এই গাঁয়ে থেকি গেছে। হেই যে দেখতিছেন ঐ ডোবাটা – ঠাকুরদার আমলে ওটা মস্ত পুকুর ছিল। আমি তো তখন খুব ছোট ছিলাম বটে, আমারও কিছু স্মরণে আছে। পরে ঘর তুলবার লাগি আমার বাবা-ই মাটি ভরাট করিছিল।তাই এখন শুধু ঐ ডোবাটুকু-ই পরি আছে। তাতে ঘরে খাবার লাগি মাছ টুকু হই যায় বটে। আবার ঐ যে দেখতিছেন – ডোবার পাশে ঐ যে গোয়ালঘর,ওইডা আমার বাপের করা। দু’চার বিঘা জমি-জিরেত – তাতে ঘরের চার পাঁচটা পেট চলি যায়। আর দু-এক বিঘা ভাগে চাষ করি বটে, মিয়ার বাগানে ঐ ফজলুর শেখের বেলতলার জমিটা, ঐ পাকা রাস্তার উপরেই বটে। ওটা তো আমার বাপ ঠাকুরদার আমল থেকি আমরা চাষ করি।
তো, ঐ যে কী বলে – এস,আর না কি! ওরা বলে আমি নাকি বাংলাদেশি। আরে বাংলাদেশ তো আমি জম্মেই দেখি নাই। ঐ শুট-টাই পরা বাবুদের কথা শুনে আমার যে কী হাসিতে পেল, সে হাসি আর থামে কই! সবাই বলছে – এ কি পাগল নাকি? আরে নাগো না, পাগল না, জ্ঞান আমার টনটনে। কিন্তু সত্যি তো ঐ কথাডায় এতো হাসি পাবার কী আছে বল দেখি!
গ্রামের লোকজন ভেবে পায় না জাহিরুল সত্যিই কি পাগল হলো! কিন্তু ও যে কারণে হাসছে, হাসি তো পাবার-ই কথা! শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, মেন্টালে দেখাতে। ডাক্তারও বড় দ্বিধায় পড়লেন। সরকারের কাণ্ডকারখানাটা হাসি পাবার-ই মতো। ও হয়তো এতো গভীরে উপলব্ধি করেছে, তাই এতো হাসি! তাহলে তো ইলেক-কমিশনের-ই মানসিক চিকিৎসা করতে হয়! ডাক্তার বললেন -ন না,ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, যে ওর এই হাসি কোনো অসুস্থতা থেকে কিনা। একটা ঘুমের ওষুধ শুধু দিচ্ছি। দু-তিন দিন ভালো ঘুমোনোর পর যদি এটা ভুলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে – না,এটা কোনো অসুস্থতা নয়।









