সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল রাজনৈতিক সংগঠন ও গণপরিসরের ভিত্তি হিসেবে ‘পরিচয়’-এর ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য। জাত, ধর্ম, অঞ্চল, ভাষা, জাতিসত্তা এবং অন্যান্য পরিচয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক সমর্থনের ক্ষেত্র নির্মাণে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিচয়–ভিত্তিক রাজনীতির মধ্যে সাধারণভাবে কোনও ভুল নেই। ভারতবর্ষের মতো গভীর বৈষম্যপূর্ণ একটি সমাজে পরিচয় প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। দলিত আন্দোলন জাতপাতের নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়েছে; আদিবাসী আন্দোলন জমি ও সম্প্রদায়ের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে; নারী আন্দোলন পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছে; এবং সংখ্যালঘু আন্দোলন মর্যাদা, সমতা ও নিরাপত্তার দাবি তুলেছে। ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত মানুষের কাছে স্বীকৃতি কোনও বিলাসিতা নয়; ন্যায়বিচারের জন্য এটি অপরিহার্য।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ‘পরিচয়’ রাজনৈতিক স্বার্থকে বোঝার প্রধান, কখনও কখনও একমাত্র, মাধ্যম হয়ে ওঠে। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পিছনে চলে যায়: আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বেঁচে থাকার প্রাথমিক ও প্রধান স্বার্থগুলি কী?
একজন মুসলিম শ্রমিক এবং একজন হিন্দু শ্রমিক ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের হতে পারেন, কিন্তু দুজনই অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, বাড়তি জীবনযাত্রার খরচ এবং অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার সমস্যায় দিন গুজরান করতে পারেন। একজন দলিত শ্রমিক এবং একজন উচ্চবর্ণের শ্রমিক জাতিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে ভিন্ন অবস্থানে থাকলেও বেকারত্ব, অনিশ্চিত কাজ অথবা শ্রম অধিকার ক্ষয়ের মতো সমস্যায় একইভাবে আক্রান্ত হতে পারেন। একজন নারী প্ল্যাটফর্মশ্রমিক এবং একজন পুরুষ প্ল্যাটফর্মশ্রমিক লিঙ্গভেদে ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল দরকষাকষির ক্ষমতা, এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের মতো সমস্যায় একইভাবে ভোগেন।
পরিচয়ের পার্থক্যগুলি যেমন বাস্তব, বেঁচে থাকার সাধারণ স্বার্থগুলিও তেমনই বাস্তব। এখানেই শ্রেণির রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু শ্রেণিকে শুধুমাত্র আর একটি পরিচয় হিসেবে দেখা উচিত নয়—যেন একজনকে দলিত অথবা শ্রমিকের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে, অথবা মুসলমান এবং শ্রমিকের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। শ্রেণি বলতে উৎপাদন, বণ্টন ও অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্ক এবং কাজ ও সম্পদকে ঘিরে থাকা ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সেই সম্পর্ককে বোঝায়।
ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব–এর গবেষণা সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ভারতে আয় ও সম্পদের কেন্দ্রীভবনের তীব্র বৃদ্ধি নথিবদ্ধ করেছে এবং দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য জাতভিত্তিক বৈষম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বিপুল বৃদ্ধির কারণে কোটি কোটি ভারতীয় সংগঠিত কর্মক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে নয়, বরং অনিশ্চিত জীবিকার মধ্য দিয়ে প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতাকে অনুভব করেন।
তাই আজকের শ্রমিক শ্রেণি উনিশ শতকের শিল্প–শ্রমিক শ্রেণির থেকে অনেকটাই আলাদা। এর মধ্যে রয়েছেন নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, গৃহকর্মী, হকার, পরিযায়ী শ্রমিক, সাফাইকর্মী, ছোট উৎপাদক, ডেলিভারি কর্মী, অ্যাপ–ভিত্তিক চালক ইত্যাদি। কর্মসংস্থানের এই খণ্ডীকরণ শ্রমিকদের সমষ্টিগত পরিচয়কেও খণ্ডিত করেছে। এটাই এখন বিরাট রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
শুধুমাত্র পরিচয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনীতি আমাদের বলতে পারে: আমরা কারা? কী আমাদের ধর্ম, কী আমাদের জাত, কী আমাদের ভাষাগত পরিচয় ইত্যাদি। শ্রেণির রাজনীতি অন্য একটি প্রশ্ন করে: সম্পদ, কাজ এবং ক্ষমতার বণ্টনে কোথায় আমাদের অবস্থান?
আর তার থেকেও হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আসে: পরিচয়ের রাজনীতি দিয়ে আমাদের বিভক্ত রাখলে কার সবচেয়ে বেশি লাভ?
এর অর্থ এই নয় যে শ্রেণি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাত, ধর্ম, লিঙ্গ অথবা অন্য সব ধরনের সামাজিক বৈষম্যকে দূর করে দেয়। তা করে না। ভারতে শ্রেণি নিজেই জাত, লিঙ্গ, অঞ্চল এবং সম্প্রদায়ের দ্বারা প্রভাবিত; সম্পদের বণ্টন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে স্বাধীন নয়।
তাই আমাদের কাজ পুরনো ধরনের শ্রেণির রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া নয়, যেখানে নিপীড়নের অন্য সব রূপকে গৌণ বলে মনে করা হয়। বরং আমাদের প্রয়োজন এমন একটি রাজনীতি, যা সমস্ত ধরনের সামাজিক বৈষম্য এবং শ্রেণিবৈষম্যের আন্তঃসম্পর্ক খুঁজে বের করবে; সামাজিক পার্থক্যকে স্বীকার করবে, কিন্তু সেই সঙ্গে বেঁচে থাকার বস্তুগত স্বার্থগুলিকে—অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি—চিহ্নিত করে দেখাবে যে শেষ পর্যন্ত শ্রেণি একটি নির্ণায়ক শক্তি।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়: তুমি দলিত, না শ্রমিক? তুমি মুসলমান, না শ্রমিক? তুমি মহিলা, না শ্রমিক? প্রশ্ন হওয়া উচিত: জাত, ধর্ম, লিঙ্গ ও অন্যান্য পরিচয় কীভাবে তোমার শ্রমিকজীবনের অভিজ্ঞতাকে গড়ে তোলে? এবং ভিন্ন পরিচয়ের শ্রমিকরা কীভাবে একসঙ্গে সংগঠিত হতে পারে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে?
গত কয়েক দশক ধরে ভারতের অর্থনীতি ক্রমাগত নতুন ধরনের অনিশ্চিত কাজ তৈরি করে চলেছে। এর একটি বড় উদাহরণ প্ল্যাটফর্মশ্রমিকরা। এর জন্য একজন ডেলিভারি কর্মীকে তার ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগ করতে হয় না। একজন গৃহকর্মীকে তার জাতপরিচয় ত্যাগ করতে হয় না। একজন হকারকে বাঙালি, হিন্দিভাষী, মুসলমান, হিন্দু, দলিত, আদিবাসী—কোনও পরিচয়ই ত্যাগ করতে হয় না।
কিন্তু তাঁরা অন্য একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন করতে পারেন: আমাদের মধ্যে কী মিল?
আমাদের সবার সাধারণ স্বার্থ হল উপযুক্ত মজুরি, নিরাপদ কর্মসংস্থান, সুলভ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা, বাসস্থান ও জনপরিষেবা, কাজের জায়গায় মর্যাদা এবং সর্বোপরি—যে পরিস্থিতিতে আমরা বাঁচি ও কাজ করি, তার উপর কিছুটা হলেও আমাদের নিয়ন্ত্রণ।
এখানেই শ্রেণির রাজনীতি শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক মতবাদ হয়ে থাকে না। এটি হয়ে উঠতে পারে সংহতির রাজনীতি।
তাই পরিচয়–ভিত্তিক রাজনীতির উত্থানের জবাবে বামপন্থীদের পরিচয়কে অস্বীকার করা উচিত নয়। আবার একই খণ্ডিত রাজনৈতিক পরিসরে প্রতিযোগিতা করার জন্য বামপন্থীদের পরিচয়–রাজনীতির অনুকরণও করা উচিত নয়। তাঁদের কাজ আরও বড়—স্বীকৃতির সঙ্গে পুনর্বণ্টনকে, মর্যাদার সঙ্গে বস্তুগত সমতাকে এবং পরিচয়ের সঙ্গে সংহতিকে যুক্ত করা।
আম্বেদকর আমাদের শিখিয়েছেন যে সামাজিক গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন স্বাধীনতা, সমতা এবং ভ্রাতৃত্ব।
মার্কস আমাদের মনে করিয়ে দেন যে বস্তুগত সম্পর্ক এবং শ্রেণির ক্ষমতাকে পরীক্ষা না করে সমাজকে বোঝা যায় না।
আর গ্রামশি বুঝেছিলেন যে রাজনৈতিক আন্দোলনকে এমন বিস্তৃত সামাজিক জোট তৈরি করতে হয়, যা বিচ্ছিন্ন স্বার্থগুলিকে একটি সাধারণ প্রকল্পে রূপ দিতে পারে।
সমকালীন ভারতীয় প্রগতিশীল রাজনীতির সামনে হয়তো এটাই আজকের চ্যালেঞ্জ। জাত, ধর্ম, লিঙ্গ বা সম্প্রদায়ের প্রশ্নে আমাদের কম উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন আরও বেশি শ্রেণি–সচেতনতা।
তাই রাজনৈতিক প্রশ্নটি শুধু এই নয়: আমরা কারা? কী আমাদের ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়? এর সঙ্গে প্রশ্নটি আরও হওয়া উচিত: আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই? এবং যে সম্পদ, কাজ ও ক্ষমতা সেই সমাজকে তৈরি করে, তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
এই প্রশ্ন যতদিন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ফিরে না আসবে, ততদিন শ্রেণির রাজনীতির পতনের ফলে যে জায়গা খালি হয়েছে, পরিচয়–ভিত্তিক রাজনীতি সেই জায়গা দখল করে যেতে পারে।
তাই অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই।
শ্রমিক সংগঠনকে শ্রমিক মহল্লায় নিয়ে যান। শুধু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে ইউনিয়নকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ইউনিয়নকে যুক্ত করতে হবে।
একজন শ্রমিককে শুধু শ্রমিক, মজুর বা তাঁর শ্রমের বিক্রেতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁকে দেখতে হবে একজন মানুষ হিসেবে—যাঁর পরিবার আছে, কমিউনিটি আছে, আশা আছে, উদ্বেগ আছে, সম্পর্ক আছে, সাংস্কৃতিক জীবন আছে, এবং এই সব ছাড়াও একাধিক পরিচয় আছে।
ঠিক একইভাবে, একজন রাজনৈতিক কর্মীকে শুধু “রাজনৈতিক কর্মী” হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তাঁর পিছনে যে মানুষটি আছেন, তাঁকেও দেখতে হবে। কথাটা শুনতে খুব সহজ হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর।
আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই একটি ছোট উদাহরণ দিই।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যখন পুনর্বাসনের কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই হকারদের উচ্ছেদ শুরু করেছিল, তখন বামপন্থীরা সেই উচ্ছেদের সামনে দাঁড়িয়ে লড়েছিল। আমরা অনেক সময় এই মানুষগুলিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখেছি। মনে রাখিনি, তাঁরাও আমাদের মতোই মানুষ।
যে মানুষটি পরের দিন কলকাতার প্রচণ্ড রোদে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন, তিনিই হয়তো আগের রাতটা জেগে কোনও হকারের দোকান পাহারা দিয়েছেন। সেই মানুষটির পরিবার আছে, সন্তানদের পড়াশোনা করাতে হয়, বাড়িভাড়া দিতে হয়, অসুখ–বিসুখ সামলাতে হয় এবং মিছিলের বাইরেও তাঁর একটি জীবন আছে।
ঠিক যেমন একজন শ্রমিক শুধুমাত্র একজন শ্রমিক নন, ঠিক তেমনই একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং একজন মানুষ—দুজন আলাদা ব্যক্তি নন। একই মানুষ।
এখানেই আমাদের শ্রমিক সংগঠন এবং শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতির অর্থ নতুন করে ভাবতে হবে এবং শ্রমিক সংগঠনকে শুধুমাত্র কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
এই প্রসঙ্গে আমি আবার শঙ্কর গুহ নিয়োগী এবং ছত্তীসগড় মুক্তি মোর্চার অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিতে চাই।
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ছত্তীসগড় মাইন্স শ্রমিক সংঘ ১৯৭৯ সালে ছত্তীসগড় মুক্তি মোর্চায় রূপান্তরিত হয়। প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়নের ধারণার বাইরে গিয়ে খনি শ্রমিকদের সংগ্রামকে সমাজের বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল—কৃষক এবং শ্রমজীবী মানুষের অন্যান্য অংশের সংগ্রামের সঙ্গেও।
নিয়োগীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল যে ইউনিয়ন শুধুমাত্র মজুরি এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে দরকষাকষির সংগঠন হয়ে থাকতে পারে না। যে সমাজে শ্রমিকরা বাস করেন, সেই সমাজের মুক্তি ও পরিবর্তনের বৃহত্তর আন্দোলনের অংশও ইউনিয়নকে হয়ে উঠতে হবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পরিবেশ, নারীর অংশগ্রহণ এবং কমিউনিটি সংগঠনের ক্ষেত্রে ছত্তীসগড় মুক্তি মোর্চার উদ্যোগগুলি এই দিক থেকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মূল নীতিটি ছিল খুবই সহজ: কারখানার গেটের মধ্যে শ্রমিক তাঁর জীবনের সব কিছুকে রেখে আসেন না।
শঙ্কর গুহ নিয়োগী এবং ছত্তীসগড় মুক্তি মোর্চাকে নিয়ে কিছু বই ও প্রবন্ধ রয়েছে। একটি অনলাইন আর্কাইভও আছে—Sanhati – Shankar Guha Niyogi Archives। আগ্রহীরা সেই আর্কাইভ দেখতে পারেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আজ এই অভিজ্ঞতাকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে গ্রামশিকেও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। তাঁর ‘অরগানিক ইনটেলেকচুয়াল’ (organic intellectual)-এর ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক শ্রেণির এমন বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন নেই, যাঁরা বাইরে থেকে শুধু শ্রমিকদের হয়ে কথা বলবেন। প্রয়োজন এমন অরগানিক ইনটেলেকচুয়ালের, যাঁরা সামাজিক সংগ্রামের মধ্য থেকে উঠে আসবেন, মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখবেন, মানুষকে তাঁদের নিজেদের পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবেন এবং বিচ্ছিন্ন ও নির্দিষ্ট সংগ্রামগুলিকে সমাজ সম্পর্কে একটি বৃহত্তর উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত করবেন। এই মানুষগুলো আমাদের আশেপাশেই থাকেন। তাঁদের এই দায়িত্বটা নিতে হবে।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক চেতনা একদিনে তৈরি হয় না। আমাদের এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা পরিচয়ের বাইরে তাকাতে পারবেন এবং যে বস্তুগত স্বার্থ ও মানবিক অভিজ্ঞতা তাঁদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে, তা চিনতে পারবেন।
এর অর্থ জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, জাতিসত্তা বা অন্যান্য পরিচয় অস্বীকার করা নয়। এর অর্থ হল এমন একটি শ্রেণি–চেতনা তৈরি করা, যা সেই সমস্ত পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে সংহতি গড়ে তুলতে পারে।
আমার কাছে এটাই গ্রামশির War of Position-এর সমকালীন অর্থ—এমন একটি বিকল্প সংস্কৃতি তৈরি করা, যা প্রভাবশালী স্বার্থের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
এখানে দু–একটি বাস্তবতার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
ভারতে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র দেখা যায়—প্রায় সব ক্ষেত্রেই আক্রান্ত মানুষগুলি দরিদ্র, শ্রমজীবী এবং সামাজিকভাবে দুর্বল অংশের মানুষ। ধনী বা উচ্চ–মধ্যবিত্ত সংখ্যালঘু মানুষের উপর একই ধরনের আক্রমণের কথা শুনেছি বলে মনে পড়ে না।
এর অর্থ এই নয় যে পরিচয়ের কোনও গুরুত্ব নেই। বরং পরিচয়ই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় কে আক্রান্ত হবে। কিন্তু কে সবচেয়ে বেশি হিংসা, বঞ্চনা এবং উচ্ছেদের শিকার হবে, তার ক্ষেত্রে শ্রেণি একটি গভীর ভূমিকা পালন করে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এত বেশি বিদ্বেষ রাজনৈতিকভাবে প্রচার ও সংগঠিত করা হয় কেন?
এক্ষেত্রে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং বৈষম্য এখনও বড় সমস্যা। যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভাবগুলির যথাযথ সমাধান হয় না, তখন পরিচয়–ভিত্তিক রাজনীতি এমন একটি বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।
মানুষ কেন বেকার, কেন মজুরি স্থির হয়ে আছে, কেন বৈষম্য বাড়ছে, কেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে—এই প্রশ্নগুলির বদলে শাসক শ্রেণি মানুষকে অন্য প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে পারে: কে আমাদের? কে আমাদের নয়? এবং কাকে দায়ী করা উচিত?
তাই নির্বাচনী রাজনীতিকেও গভীরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যখন অর্থনৈতিক অসন্তোষ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন পরিচয়–ভিত্তিক মেরুকরণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়টিই বদলে দিতে পারে—কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, এবং বৈষম্য থেকে আলোচনাকে সরিয়ে ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতপাত ও অঞ্চলের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এর ফলে একটি রাজনৈতিক আপাতবৈপরীত্য তৈরি হয়: যে মানুষগুলি শ্রেণিগতভাবে এক, যাদের শ্রেণিস্বার্থ এক, তাদেরই একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করা হয় এবং শাসক শ্রেণি এতে অনেক সময়ই সাফল্য লাভ করে।
এই কারণেই শ্রেণি ও পরিচয়ের সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পরিচয় বাস্তব। পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যও বাস্তব। পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংগঠনও বাস্তব। কিন্তু পরিচয় শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। একজন মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান—দুই–ই বৈষম্য, হিংসা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা অথবা রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সুতরাং মূল প্রশ্নটি শুধু এই নয়: পরিচয়ের কারণে কাকে আক্রমণের লক্ষ্য করা হচ্ছে? প্রশ্নটি আরও হওয়া উচিত: সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে কারা এই আক্রমণের সবচেয়ে বেশি শিকার এবং কেন?
এই কারণেই সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে শ্রেণিকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে আমরা শুধু দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত হিসেবে দেখার ঝুঁকি নেব। এর ফলে যে শ্রেণি–সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এবং বস্তুগত বৈষম্যের কারণে মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেগুলি আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যাবে। বস্তুতপক্ষে শ্রেণি ও পরিচয়ের রাজনীতি যেখানে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়, জায়গাটি সেখানেই।
সাংস্কৃতিক আধিপত্যের জন্য এই সংগ্রাম চূড়ান্ত রাজনৈতিক সংঘর্ষের অনেক আগেই শুরু করা দরকার। এটি চায়ের দোকানে, পাড়ায়, কাজের জায়গায়, ইউনিয়ন ঘরে, স্কুলে, সাংস্কৃতিক পরিসরে, দৈনন্দিন জীবনে, এবং সামাজিক মাধ্যমে নিরন্তর চালিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সংগঠন, শিক্ষা এবং একটি বিকল্প ও সঠিক রাজনৈতিক বোধ।
এই ধরনের বিস্তৃত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি হওয়ার পরেই কোনও রাজনৈতিক শক্তি সরাসরি রাজনৈতিক সংগ্রাম—War of Manoeuvre-এর—জন্য প্রয়োজনীয় বৈধতা, সংগঠন, এবং জনসমর্থন অর্জন করতে পারে।
তাই আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু ট্রেড ইউনিয়নকে পুনরুজ্জীবিত করা নয়। ইউনিয়ন কী হতে পারে, সেটাই নতুন করে ভাবতে হবে।
এমন একটি ইউনিয়ন—
যে মজুরির জন্য লড়বে, কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যও লড়বে।
যে ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে লড়বে, কিন্তু শিক্ষার জন্যও লড়বে।
যে শ্রমিকের অধিকারের জন্য লড়বে, কিন্তু বাসস্থান ও মর্যাদার জন্যও লড়বে।
যে কাজের জায়গা এবং শ্রমিক মহল্লা—দুই জায়গাতেই সংগঠন গড়ে তুলবে।
যে শ্রমিককে শুধু উৎপাদক হিসেবে নয়, একজন সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখবে।
এবং এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন—যে মানুষকে তার পরিচয় ত্যাগ করতে বলবে না, বরং সেই পরিচয়গুলির মধ্যেই যে সংহতির সম্ভাবনা রয়েছে, তা আবিষ্কার করতে সাহায্য করবে।
সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে শ্রেণির রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনার এটি হয়তো একটি পথ হতে পারে। পরিচয়কে অস্বীকার করে নয়, পরিচয়ের চারপাশে আরও বৃহত্তর মানবিক ও বস্তুগত সংহতি গড়ে তুলে।
তাই ইউনিয়নকে কমিউনিটিতে নিয়ে যান। শ্রেণির রাজনীতিকে দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে নিয়ে আসুন। এবং সর্বোপরি, একজন শ্রমিককে একজন মানুষ হিসেবে দেখুন।
শেষ করার আগে, দুইজন কমিউনিস্ট নেতার দুটি বহুল প্রচলিত উদ্ধৃত কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। জ্যোতি বসু বলেছিলেন, “মানুষের মধ্যে যাও, মানুষের কাছ থেকে শেখো।” আর আজিজুল হক বলেছিলেন, “মানুষকে অফুরন্ত ভালোবাসো।” আমার মনে হয়, এই দুটি সহজ অথচ গভীর কথা দিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে।
আজ শহিদ শঙ্কর গুহ নিয়োগীর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই লেখা।










