বাবুয়ার জ্বর হয়েছে। বাবুয়া একলা থাকে। তার বয়স প্রায় সত্তর। সে নিজেকে বাবুয়া বলে ভাবতে ভালোবাসে। তার মা আর বাবা এই নামে ডাকত তাকে।
যদিও সার্টিফিকেটে তার নাম তপোময় ব্যানার্জি। খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। কেউ নেই কথাটা ঠিক নয়। যে আছে সে প্রতিদিনের মত আজও টেলিফোনে খোঁজ নেবে।
কবে দেশে ফিরবে সেই আত্মজন?
★
জ্বর কেন হয়? ছোটো বেলায় খুব ভাবত বাবুয়া। সেই ছোটোবেলা মানে ষাট বছর আগে।
তার চেনা সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারা লোক একজনই।
ঠাকুরদা’ দুর্গাকান্ত।
বাবুয়ার জ্বর হত প্রায়ই। বাড়িতে অন্য সবাই বলত ভালুক জ্বর। ভালুকদের নাকি এমন হয়। প্রায়ই জ্বর আসে আবার চলেও যায়। জ্বর আসার ভালো মন্দ দুইই আছে। বড় হলে জেনেছিল, ইংরেজিতে একটু ভিন্নার্থে যদিও, তাকে বলে প্রস অ্যান্ড কনস্।
প্রস হল, ইশকুল যেতে হয় না। অঙ্ক করতে হয় না। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
কনস্ হল, বার্লি খাইয়ে শুয়ে রাখে মা। ইন্ডিয়ান পিউরিটি বার্লি। মাথা ঝিম ঝিম করে।
– দাদু, জ্বর কেন হয়?
দাদু বেচারি এক এক দিন এক এক রকম বলত। পুরোটাই বানিয়ে। “ঠাণ্ডা সর্দি লাগলে জ্বর হয়।”
“দ্যুত দাদু, সে তো মা বলে! বাবু ঠাণ্ডা লাগাস না। বাবু বৃষ্টিতে ভিজিস না, বাবু আইসক্রিম খাস না। রামু কাকা তো বৃষ্টিতে ভিজে চাষ করে। ওর তো জ্বর হয় না। আর বুলিদিরও জ্বর হয় না আইসক্রিম খেলে।”
দাদুরও এই সব ব্যাপার জানা নেই। তখন বানিয়ে বানিয়ে নানা রকম বলে। কোনও দিন বলে, “শোনো দাদুভাই, পরিরা উড়ে যায় যখন, তাদের ছায়া গায়ে লাগলে জ্বর হয়।”
তাই শুনে আবার গল্প করতে আসা দাদুর বন্ধু আসাদ নানা বলত, “আঃ রে দুর্গা, ভুল শিখাছিস ক্যানে? পরির ছায়া না। উকে বুলে জিনের আছর।”
শহরের থেকে আসত আশিস দা’। ডাক্তারি পড়ত। জিজ্ঞেস করতে ক্লাস ফাইভে পড়া বাবুয়াকে বলেছিল, “ওরে জ্বর কী আর একটা কারণে হয়? ইনফেকশনে জ্বর হয়। আরও কত কিছুর জন্য জ্বর হয়”
এই সব হাবিজাবি বকে গেছিল ঘণ্টা খানেক। বাবুয়া কিচ্ছু বোঝেনি অত। যাবার সময় বলে গেল, “যাক তোকে বলতে গিয়ে আমার একবার ঝালানো হয়ে গেল”।
ওই যে অন্য কিছুর জন্য জ্বর, কথাটা বুঝবার বয়স হওয়ার আগেই মারাত্মক ভাবে বুঝল বাবুয়া। বাড়িতে মা ছিল না সে’দিন। দাদু বাইরের ঘরে ঝিমুচ্ছে। বাবুয়ার শরীর খারাপ। ঘরে বসে অরণ্যদেবের বই পড়ছিল। বুলিদি হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ওর বিছানার পাশে।
“ওমা, তোর জ্বর নাকি? আমারও জ্বর, এই দ্যাখ্” বলে বাবুয়ার ডান হাতটা টেনে নিজের ব্লাউজের ভেতরে ঢুকিয়ে কেমন পাগলের মত হেসে উঠে বলল,”দ্যাখ, দ্যাখ, কত জ্বর!”
‘সেদিন সন্ধ্যেয় সত্যিই বাবুয়ার জ্বর এল। পরির ছায়া লেগেছিল যে! ধুম জ্বর। সেই জ্বর সারতে লাগল দেড় মাস। পুরো না খেতে পাওয়া মুরগি ছানার মত হয়ে গেছিল। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুতো না। জ্বরের মধ্যেই শুনেছিল বুলিদির বিয়ে হয়ে গেছে।
আসাদ নানার নাতি মকবুল, ওদের গরুকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল কোথায় যেন। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করতে চোখ মটকে বলল,”অ্যাখুনো ছুটো আছিস। বড় হলে শিখবি গাইগোরু গরম হয়ে গেলে, তাকে পাল খাওয়াতে হয়।”
এই সব জ্ঞান পেতে পেতে বাবুয়া বড় হয়।
★
বাবুয়া আরও বড় হয়। বেশ কিছুদিন বাদে সে তপোব্রত হয়ে যাবে কলেজে এসে।
মেসে থাকে। এই মেসের দোতলায় থাকে আবাসিকেরা কেউ আপিস কেউ কলেজ। একতলায় সপরিবারে থাকেন মেসের ম্যানেজার গুরুপদ বাবু। ওরা ঠাট্টা করে ম্যানেজার বাবুকে বলে সিইও।
মেসের রান্না করে রমার মা। রমার মার সুন্দরবনে দেশ। মাস তিন চার পরপর দেশে যায়। পাঁচ ছ’দিনের দিনের ব্যাপার।
সেই সময় কাজ চালায় ওর ঠিক করে দেওয়া অন্য কেউ। মেসের বোর্ডার অঙ্কের মাস্টারমশাই অসিতদা’র কথায় এরা সব ডেপুটেশন ভ্যাকান্সি।
তাদের সবার নাম একই ঘরানার। কারুরই নিজের নাম নয়। পুত্র কন্যার নামে পরিচিত তারা। কখনও ভূতোর মা, শঙ্করীর মা এই সব।
একবার এই বদলি ডিউটিতে এলো বিনুর মা। কপালে সিঁদুর নেই। বিধবা হয় তো। বছর কুড়ি-পঁচিশ বয়স। এও থাকবে ওই যদ্দিন রেবার মা না আসে।
★
এর বেশ কিছুদিন পরের কথা।
তপোময় পাশ করে ছোটোমোটো কাজ করে। খরচ খরচা কুলোয় না। টিউশনি করতে হয়।
এই রকম এক টিউশনি বাড়িতে ওই মেয়ের সঙ্গে দেখা। সে ঢুকছে আর ও বেরুচ্ছে।
তপোময় একগাল হেসে “কী বিনুর মা, এখানে রাঁধো বুঝি? বিনু কেমন আছে?”
এই সব বলে ঘেঁটে ঘ করে ফেলল।
★
ছাত্রের মা বলল, “কাকে কী বলছ বাবা! ও আমার দেওরঝিকে পড়াতে আসে। শ্যামলীর তো বিয়েই হয়নি।”
সেই থেকে আলাপ।
নাম শ্যামলী মণ্ডল। তপোময়ের চেয়ে দু’বছরের বড়। নিজেও এখন পড়ছে কলেজে। নাইটে। বস্তিতে থাকে মায়ের সাথে। টিউশনি আর নানারকম খুচরো কাজ করে খরচা চালায়।
★
“আমাদের মেস বাড়িতে ওই বিনুর মা নামে ঢুকেছিলে কেন?”
“ওই রমার মা, মুখ খারাপ যে মাসীটা আমায় ডিউটি ধরিয়েছিল, ওই বলেছিল, মেসের বাবুরা খুব খচ্চর। তুই আমাদের মত একটা কোনও ইয়ের মা নাম নে যাবি। তাইলে কিছু কত্তে পারবেনে!”
★
আলাপ হবার পর শ্যামলী আর তপোময়ের নিজেদের লড়াই চলতে চলতেই ওদের পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছে গেল। দারিদ্র্যটাই কমন আইডেনটিটি কার্ড ছিল।
শ্যামলীর মা অসুখে মরল। অনাহারে না অপুষ্টিতে বোঝার আগেই অন্য বিপদ দেখা দিল শ্যামলীর। কলকাতায় ওই কী বলে খচ্চর লোকের অভাব নেই সত্যিই।
কাজেই কে বাঁচাবে?
কে আবার? চিরকালের অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করা তপোময়। সে এসে উঠল শ্যামলীদের বস্তির ওই ঘরে।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে বস্তিতে লিভ টুগেদার অ্যালাউ করত না কেউ। কাজেই দু’চারদিন একঘরে থাকলেও ওরা কালিঘাটে গিয়ে বিয়েটা সেরে নিল।
★
শ্যামলীর সাথে তপোময়ের বিয়েটা হল ঠিকই, একটা মেয়েও হল। কিন্তু বিয়েটা টিকল না। তপোময়ের দোষে ঠিক না। ভাগ্যের দোষে।
দু’জনেরই কানে বিষ ঢালল যার যার নিকটজনেরা, যারা এই বিয়েটা মানতে পারেনি। এই নিকটজনদের মধ্যে বিশেষ ভূমিকা ছিল তপোময়ের গর্ভধারিণী আর নিজের দাদা-বৌদির।
ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণ ইস্যু।
অন্য পক্ষের কিছু বন্ধু আত্মীয়ও সবিশেষ আগ্রহী ছিল।
আমরা সেই বিষবচন পুরোটা জানি না। কিছু কিছু এ’রকম ছিল, “ও তপু, তুই তো বউ আনতে গিয়ে দিদিমা এনে ফেলেছিস।”
“শ্যামলী, এ তো যারে পায় তারে খায় টাইপের বর জুটিয়েছিস। তুই তো ডিউটিতে যাস। এর যা স্বভাব, তোকে শুইয়েছে আরও কতজনকে শোয়াচ্ছে কে জানে!”
“ওই বস্তির মেয়ের কি জাত গোত্রের ঠিক আছে? তা, হ্যাঁ রে গাই বাছুর কি একসঙ্গেই জুটল?”
হয় তো এর চাইতেও জঘন্য কিছু।
এত সামান্য উস্কানিতে কি ডিভোর্স হয়? হয় না।
ডিভোর্সটা হল না বটে কিন্তু দু’জনে আলাদা হয়ে গেল।
★
তপোময় একটা চাকরি জোগাড় করে ভেসে গেল দূর উত্তর বাংলার গ্রামে। সেখানে তার এক অতিদূর সম্পর্কের দাদা বৌদি থাকে। তাদের খুঁজে পেল।
আর শ্যামলী? এই কলকাতার আশে পাশেই বেঁচে রইল। একরত্তি মেয়েটা পড়ল মায়ের ভাগে।
★
এর পাঁচ বছরের মধ্যে চলে গেছে বাবুয়ার নিজের কটুভাষিণী মা। এখানের দূর সম্পর্কের দাদা বৌদিও মরেছে কিছুদিনের মধ্যে এক বাস অ্যাকসিডেন্টে। একসাথেই।
★
তপোময়ের দায় দায়িত্ব আর অবলম্বন বলতে এখন, হঠাৎ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া সেই দূর সম্পর্কের দাদা বৌদির অনাথ ছেলেটি।
সত্যিই অবলম্বন আর একজন যে হতে পারত সে তার ওই নিজের কন্যাটি। অভিমানী বাবুয়া অনন্ত তৃষ্ণা যদিও তার বুকে, মাতা-কন্যার খোঁজ নেয়নি। চাইলে হয় তো খোঁজ পেত। চায়ওনি। মন দিয়ে মানুষ করেছে ভাইপোটিকে।
★
যেহেতু শব্দসংখ্যায় এই পৃথিবীর রূপকথাগুলির অতিকথন নিষিদ্ধ, আমাদের কাহিনি এইবারে ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড বা বৃহৎ উল্লম্ফনে সামনে এগোবে।
শ্যামলীর মেয়ে মিমির ভালো নাম মনোমিতা। সম্প্রতি সে এক যুবকের ঘনিষ্ট হয়েছে। দুজনেই ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পাঠাভ্যাস করতে গিয়েছে। আপাতত এরা লিভিং টুগেদার নামের এক হাঁসজারু সম্পর্কে আবদ্ধ। ফলত এদের যৌথ যাপনের খরচ এখন অনেক কম।
একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় বিধেয় এদের এই একসঙ্গে বাসের অন্য উপকারী ও মনোহারি দিকগুলির কথা আলোচনা করব না। ওরা ঠিক করেছে, বিয়ে নামক অনুষ্ঠানটি স্বদেশে ফিরেই করবে।
★
“নারে মিমি, একসাথে থাকছিস থাক, জামাইকে না দেখে আমি এ বিয়েতে মত দেব না”, এইরকমের অর্থহীন আর স্ববিরোধী কথা শ্যামলী ভিডিও কলে প্রায়ই বলে। এদিকে জামাই বলে মেনেও নিয়েছে। আবার বিয়েতে নাকি মত দেবে না!
যেহেতু সে নিজে প্রচণ্ড লড়াই করে এই মেয়েকে বড় করেছে, তার কন্যা তার মায়ের এই সমস্ত আলগা কথাকে প্রবল স্নেহে মেনে নেয়।
মনোমিতার মা শ্যামলী একরকম চাপ দিয়েই পাত্রকে নিজে চোখে দেখতে এই সুদূর বিদেশে ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে হাজির হয়েছে।
★
যদিও লিভিং টুগেদার, ঐতিহ্য মেনেই মিমির সঙ্গী যুবক যাকে ইউনিভার্সিটির বাঙালিরা আর মিমিও ডাকে বুদ্ধু বলে, সে ভক্তিভরে মা বলে ডাকল শ্যামলীকে।
শ্যামলী এক কথায় পছন্দও করে ফেলল তার হবু জামাইকে। ভারি ভালো এই ছেলেটি। আর চেহারাটি? শ্যামলীর মনে হল যেন কতকালের চেনা।
★
সকাল থেকেই বুদ্ধুর মন খুব খারাপ। গতকালই ফোনে জেনেছে দেশে তার কাকার জ্বর। দেশে নিজের লোক বলতে এই কাকাই তার সব। আহা! সেই একলা মানুষটা কেমন আছে? কেন সে কাকাকে ফেলে এতদূরে এল, সে যতই কেন না কাকার আগ্রহ থেকে থাক!
স্থানীয় এমব্যাসিতে যেতে হয়েছিল পাসপোর্ট নিয়ে। শ্যামলীর ভিসা শেষ। তার ফেরার দিন চলে এসেছে। সেখানে গিয়ে চমকে গেল বুদ্ধু অর্থাৎ বুদ্ধদেব।
মিমির মায়ের স্বামীর নাম তপোময়। তপোময় ব্যানার্জি। মিমির মা স্বামী পরিত্যক্তা এইটুকুই মাত্র জানত সে। অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে বাকিটুকু জেনে নিল সে।
★
মোবাইলে রিং হতে বাবুয়া দেখল ভাইপোর নাম। ফোনটা ধরে, “কী রে, বুদ্ধু?” বলতেই, একটা অপরিচিত মেয়ের গলা জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, তোমার জ্বর কমেছে?”
সেই ইন্টারন্যাশনাল কলের বিস্তৃত কথা থাক।
★
বাবুয়ার জ্বর কমে গেছে। তার তৃষ্ণার জলের কলধ্বনি সে শুনতে পেয়েছে।
সে আর একা নয়!
এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরবে তার বহুকালের চেনা কেউ। বহুকালের চেনা কেউ তার কাছে থাকতে আসবে।











