নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সম্পর্কে এতোদিনে সবাই অনেক কথা জেনে গিয়েছেন। যদিও পরপর একাধিক ঘটনার ঘনঘটায় নেপাল এখন এক শোচনীয় পরিস্থিতির কবলে । আমরা প্রত্যক্ষদর্শী নই। মোবাইল ফোনে ভেসে আসা ভিডিও ফুটেজ দেখে বিপর্যয়ের গভীরতা আন্দাজ করতে পারি মাত্র। প্রবল বৃষ্টির জেরে হঠাৎ করে নামা হড়পা বানের তোড়ে সবকিছু ধুয়েমুছে সাফ। নেপালের এমন দুর্গতির পেছনে গ্লফ বা হিমবাহ হ্রদের বিস্ফোরণকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের একাংশ। সবকিছু আরও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে।
প্রথম বিপর্যয়ের ক্ষত সামলে ওঠার আগেই প্রবল ধসের ঘটনায় নতুন করে বিপর্যস্ত হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল। গোটা পাহাড় বিপুল পরিমাণ বোঝা নিয়ে নেমে এসেছে উপত্যকার অংশে। আবারও নতুন করে হাহাকার জেগেছে পাহাড়তলির বিধ্বস্ত জনপদগুলোতে। সাম্প্রতিক সময়ে হিমালয়ের বুকে যতগুলো বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে তা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের ফল বলে চিহ্নিত করা হলেও প্রতিটি ঘটনার পেছনেই রয়েছে আমাদের মানে মানুষের পরোক্ষ প্রভাব। উন্নয়নের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষজন অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ।হিমালয়ের কোলে থাকা নেপাল একটি বিপর্যয় প্রবণ রাষ্ট্র। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে শাক্যমুনির জন্মভূমি এই পার্বত্য রাষ্ট্রটি প্রায় নিয়মিত ব্যবধানে কোনো না কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এবার গত আগস্ট মাসের মহা বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন বহু সংখ্যক মানুষ। এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ। তাঁদের পরিণতি কী হয়েছে সেই খবর এখনও অজানা। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয়, তবে এমন ঘটনার পেছনে আমাদের সক্রিয়তা এবং নিষ্ক্রিয়তা দুইই যুগপৎ দায়ী। সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি বলে স্বীকৃত মানুষের মাইন্ড সেট বা মনোপ্রবৃত্তি
কিন্তু এই ঘটনার পেছনে সমানভাবে দায়ী কেননা মানুষ হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি যে ‘খোদার ওপর খোদকারি’ করাটা নাকি আমাদের সহজাত অধিকার : এই ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর ওপরই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার হকদার একমাত্র মানুষই। আমরাই বিধাতার শ্রেষ্ঠতম জীব হিসেবে বদলে ফেলতে পারি জল স্থল অন্তরীক্ষের সমস্ত নিয়ম শৃঙ্খলা, ভারসাম্য। ভাবছেন তো এ আর নতুন কথা কি ? এ যাবৎকালের মধ্যে যত বিপর্যয়ের ঘটনায় মানুষের জীবন গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে তার সবকিছুই তো প্রকৃতির ওপর মানুষের সর্বময় ক্ষমতা জাহির করার ঔদ্ধত্যের ফল। তাহলে এই ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী বলে মনে করবো কেন?
ঠিক কথা।আসুন ঘটনার একটু গভীরে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে একটু খোঁজ খবর করি, অবশ্যই আমাদের মতো করে।প্রথমেই ২৬ আগস্টের ঘটনার দিকে একবার নজর দিই। ঘটনার আঁখো দেখা হাল হিসেবে যে সব ছবি ভেসে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে হঠাৎ করে পর্বতের একাংশ ভেঙে পড়ছে ভয়ঙ্কর ভাবে। অতিবৃষ্টির ফলে যেভাবে হড়পা বানের জল সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঠিক সেভাবেই সেদিন বিপুল পরিমাণ কাদা,মাটি,পাথর, বোল্ডার মেশানো জল নেমে এসেছিল প্রবল রভসে। এই অবস্কর ধারার অকল্পনীয় অভিঘাতে সেদিন তাসের ঘরের মতো নিমেষেই ভেঙে লোপাট হয়ে গিয়েছিল চিনা অভিবাসন দপ্তরের বিশাল কার্যালয়টি। ছবি দেখে আৎকে উঠেছি সকলে। এতো যত্ন করে গড়ে তোলা সুবিশাল হর্ম্য নিমেষেই লোপাট হয়ে গিয়েছিল কোন্ জাদুর মায়ায়? প্রথমে ভেবেছিলাম এটা বোধহয় ক্লাউড বার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির ফলেই ঘটেছে,পরে বিস্তারিতভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে এর পেছনে রয়েছে লাঙ্গটাং লাইরুং শৃঙ্গের কাছে অবস্থিত অঞ্চলে বিশাল হিমবাহ ভেঙে পড়ার ঘটনা। আর এর ফলেই ঘটেছে এমন বড়ো রকমের বিপর্যয়। আনুমানিক ১৪২ মিলিয়ন কিউবিক মিটার আয়তনের বরফের চাঙর আর পাথর সেদিন নেমে এসেছিল পর্বতের ঢাল বরাবর । এর ফলেই কেঁপে উঠেছিল গোটা এলাকা। এমন ধসের ফলে ৫. ২ কম্পাঙ্কের ভূমিকম্প ঘটার ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এই হিমধসের কারণে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ অবস্কর এসে জমা হয় নদীর গতিপথ আগলে, যার ফলে তৈরি হয় সাময়িক জলাধার বা হ্রদের। একসময় জলের চাপে হিম গ্রাব বা মোরেন বাঁধ ভেঙে গিয়ে উপচে পড়ে বিপুল জলরাশি। সেই বাঁধভাঙা জল ঢাল বরাবর প্রবলভাবে গড়িয়ে নেমে আসার সময় সামনের সবকিছুকে ভেঙেচুরে এগিয়ে চলে। এই ঘটনার ভয়াল পরিণতি আমাদের শিহরিত করেছে।প্রশ্ন হলো,এমন ঘটনা কেন ঘটলো? কে আড়ালে থেকে উস্কে দিলো এমন পরিণতিকে? এই প্রশ্নের উত্তর একটি বাক্য বা একটি শব্দবন্ধের সাহায্যে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে দুটি বিষয়ের কথা এখানে বলা যেতে পারে – প্রথমেই বলতে হয় বিশ্ব উষ্ণায়নের কথা যা পৃথিবীর আবহিক শৃঙ্খলাকে একেবারে তচনছ করে দিয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত উষ্ণায়নের ফলে ভঙ্গুর হিমালয় পর্বতকে আরও দুর্বল করে ফেলছে – উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য পর্বতের উচ্চতর অংশে জমে থাকা হিমবাহগুলো দ্রুত গতিতে গলছে, এই কারণে বাড়ছে হিম অবস্করের বোঝা। এই বোঝার চাপে পর্বতের ঢালের অস্থিতি ক্রমশই বাড়ছে। এ যেন পলতেতে আগুন ধরানোর অপেক্ষায় থাকা এক প্রচণ্ড শক্তিশালী বোমা। একটু উস্কে দিলেই ঘটবে মহা বিস্ফোরণ। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এই সম্পর্কের সত্যতাকেই মান্যতা দেয়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তীব্রতা এবং পৌনঃপুনিকতার ঘটনা অনেকটাই বেড়ে গেছে। বাড়ছে বন্যা এবং ভূমিধসের ভয়ালতা। বিগত পাঁচ বছরে এমনই ঘটনার খবর বারংবার উঠে এসেছে সংবাদপত্রের পাতায়। ২০২১ সালের উত্তরাখণ্ডের চামোলির বিপর্যয়, ২০২৪ এর সিকিমের হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, ২০২৫ সালের হিমাচল প্রদেশের বিপর্যয়ের ক্ষত মিটতে না মিটতেই হিমালয়ের বুকে থাকা নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা ঘটে গেল। এখানেই ইতি ঘটেছে তা নয় প্রায় প্রতিদিনই হিমালয়ের বুকে ঘটে চলেছে এমন বিপর্যয়ের ঘটনা যা বিপন্ন করছে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে। এক গভীর অনিশ্চয়তায় আশঙ্কিত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে বিপুল সংখ্যক হিমালয়বাসী মানুষ। তাঁদের সহজ সরল নির্বিবাদী অনাড়ম্বর জীবনের ছন্দ কেটে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষদের বিলাসী জীবনের কারণে।আসলে আমরা সবাই এই পরিণতির জন্য দায়ী। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর কৃতকর্মের ফল ভুগতে হচ্ছে গোটা দুনিয়ার মানুষজনকে। শিল্পোন্নত দেশগুলো বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাসের সংযোজন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়িয়ে চলেছে লাগাতার ভাবে। এই বিষয়ে কোনো হুঁশ নেই তাঁদের। এক নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন তাঁরা। এই স্বেচ্ছাকৃত ঔদাসিন্যের খেসারত দিচ্ছে পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মানুষজন। এটাই আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ – এক অপরিবর্তনীয় অবস্থার শিকার আমরা। আন্তর্জাতিক স্তরে সমবেতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে প্রাক্ শিল্প বিপ্লবকালীন তাপমাত্রার তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বৃদ্ধি পৃথিবীর সকলের পক্ষে সহনীয় হতে পারে। সুতরাং তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই প্রবণতায় যেভাবেই হোক লাগাম টানতে হবে। এটা না করলে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ – পৃথিবীর জমাট বাঁধা বরফের স্তূপগুলো গলে যাবে, বাড়বে সমুদ্রজলের উচ্চতা, বিপর্যয়ের মুখে পড়বে সমুদ্র স্রোতের শৃঙ্খলা। সুতীব্র উষ্ণতা ডেকে আনবে দাবদাহ,খরা, দাবানলের মতো বিধ্বংসী ঘটনা। এসবকে নিয়েই আমাদের আগামী দিনে বেঁচে থাকতে হবে লড়াই করে।প্রকৃতির এই বেনিয়মের ছোঁয়া লেগেছে আমাদের আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে। আজ নেপালের কথা চিন্তা করলেই সব সমীকরণ আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
একেই পর্বত সঙ্কুল হওয়ায় তার বিকাশের পথ সংকুচিত ; তার ওপর এমন ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ফলে,যার পেছনে নেপালের মানুষদের বড়ো কোনো ভূমিকা নেই, এক ধাক্কায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে তাঁরা। প্রকৃতির সীমারেখাকে ছাপিয়ে যাওয়া উন্নয়ন মানুষের জীবনে বড়ো রকমের অমঙ্গল ডেকে আনছে। অর্থহীন সামরিক আস্ফালন, অসার যুদ্ধংদেহী মনোভাব, মারণাস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের বাতাবরণকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারকে নির্লজ্জ ভাবে খর্ব করেছে। যুযুধান রাষ্ট্রগুলোর মতো আমরাও নির্বিকার চিত্তে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি একটু একটু করে।নেপালের কথা বলতে গিয়ে এসব কথা বলছি তার কারণ হিমালয় পর্বতকে ঘিরে চলতে থাকা কার্যকলাপের ফল ভুগতে হচ্ছে ওই অঞ্চলের মানুষকে। এমনিতেই হিমালয় পর্বত প্রাকৃতিকভাবে একটি অতি সংবেদনশীল এলাকা। অথচ উন্নয়নের নামে তাকে কেন্দ্র করেই চলেছে নানান কর্মকাণ্ড। হিমালয়ের ওপর নদী বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি আরও বহুবিধ কাজ যে আসলে হিমালয় প্রমাণ ভুল,তা অনেকদিন আগেই উচ্চারিত হয়েছিল পরিবেশবিদদের কন্ঠে। এসব কথা সকলেই জানেন তবুও হিমালয়ের মতো ইকোলজিকাল হট স্পট এর গুরুত্ব বুঝতে চাননা তাঁরা। আমরা জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে নানান কথা বলি বটে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করিনা। এতো শত বিপর্যয়ের পরেও আমরা আমাদের মতোই চলছি।
একের পর এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে হিমালয় তথা প্রকৃতি আমাদের সাবধান হয়ে,সমঝে চলার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, নিষেধ করছে প্রকৃতি পরিবেশ নিয়ে যথেচ্ছাচার না করতে, আসলে আমরা কানে গুঁজেছি তুলো আর চোখে বেঁধেছি কুলো তাই সবকিছু দেখেশুনেও আমরা নির্বিকার। পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে বেপথু হওয়া আমরা কি সত্যিই সঠিক পথের সন্ধান পাবো?
তথ্য সূত্র: সর্বভারতীয় দৈনিক পত্রিকার পাতা ও ডাউন টু আর্থ পত্রিকা।
National Pharmaceutical Pricing Authority (NPPA) সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে , ১ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ৯০০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বাড়বে। এদের ২৫ মার্চ ২০২৫-এর বিজ্ঞপ্তিতে
উৎসবের পরিবর্তে শঙ্কা: শরৎ ঋতুর আগমন এবং শারদীয় উৎসব শুধু বাংলায় নয় সর্বত্র বিভিন্ন রূপে প্রতীয়মান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউক্রেন, ইজরায়েল, ইরান যুযুধান দেশগুলির বেশ
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।