National Pharmaceutical Pricing Authority (NPPA) সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে , ১ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ৯০০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বাড়বে। এদের ২৫ মার্চ ২০২৫-এর বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে – “The National Pharmaceutical Pricing Authority (NPPA) under the Department of Pharmaceuticals has fixed the ceiling prices of 928 scheduled formulations as on 25.3.2025. Further, as per provisions of the Drugs (Prices Control) Order, 2013 (DPCO, 2013), these ceiling prices of scheduled medicines are revised annually based on the Wholesale Price Index (WPI) (all commodities).” (সূত্রঃ https://pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=2116217)
বর্তমান পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য আমরা খানিকটা অতীত ঘেঁটে দেখি।
অতীতচারণ –১
ভারতীয় সংবাদপত্রের সূত্র অনুযায়ী (১৪ অক্টোবর, ২০২৪), ১১টি অত্যাবশ্যক ওষুধের ওপরে যে মূল্য নিয়ন্ত্রণ থাকে সেটা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে এ ওষুধগুলোর ক্ষেত্রে ৫০% অব্দি মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। এই ১১টি ওষুধের মধ্যে হাঁপানি, গ্লকোমা, থ্যালাসেমিয়া, টিবির মতো রোগের চিকিৎসার জন্য প্রথম ধাপের (ফার্স্ট লাইন ড্রাগস) ওষুধগুলো রয়েছে। এজন্য ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিকাল প্রাইসিং অথরটি-কে এদের নির্দেশিকার ১৯ নম্বর ধারার শরণ নিতে হয়েছে। এছাড়াও বেনজাইলপেনিসিলিন, অ্যাট্রোপিন, স্ট্রেপ্টোমাইসিন (টিবি ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ), সালবিউটামল ট্যাবলেট এবং ইনহেলার (শ্বাসকষ্টের জন্য ব্যবহৃত), অ্যান্টিবায়োটিক সেফাড্রক্সিল, থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ডেসফিরাঅক্সামিন ইনজেকশন, এবং মানসিক রোগের ওষুধ লিথিয়াম ইত্যাদি রয়েছে।
২০২১ সালে ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিকাল প্রাইসিং অথরিটি (এনপিপিএ) “এসেনশিয়াল” ওষুধের তালিকাভুক্ত ওষুধের দাম ১০.৭% বাড়িয়েছিল। ২০২৩ সালে আগেকার বর্ধিত দামের “এসেনশিয়াল” ওষুধের দাম বাড়ল আরও ১২.১%। ২০২৪ সালে ইতিমধ্যেই বর্ধিত সেই “ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনশিয়াল মেডিসিন”এর তালিকায় থাকা ওষুধের দাম বাড়ল আরও ৫০%। এর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অভিঘাত পড়ছে শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপরে এবং গ্রামের এক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের ওপরে। কীভাবে?
দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আয় বৃদ্ধি ঘটেনি, ফলে আমার মতো যারা জেলা শহর বা গ্রামাঞ্চলে প্রাক্টিস করেন সেসমস্ত চিকিৎসকের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একইরকম হবার কথা। এর কতকগুলো ধাপ বা পর্যায় আছে – (১) কয়েকদিন ওষুধ খাবার পরে পয়সার অভাবে ওষুধ বন্ধ করে দিচ্ছে (যাদের পোষাকী নাম “ড্রাগ ডিফল্টার”), কয়েকমাস পরে যখন হাতে পয়সা আসছে তখন আবার দেখাতে আসছে। এতে অদৃশ্যভাবে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের অসুখের রোগীদের ক্ষেত্রে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও লক্ষ্যণীয়, হাতে টাকা আসার ব্যাপারটি কখনো ফসল বিক্রির সাথে যুক্ত কিংবা গ্রামীণ জনতার সুবিশাল অংশ দিল্লি, মুম্বই, রাজস্থান, কেরালা বা পাঞ্জাবে তুলনায় অনেক বেশি আয়ের জন্য কাজ করতে যায়। এদের টাকা বাড়িতে এলে আবার চিকিৎসা করাতে আসে। চিকিৎসার সাথে শ্রমিকদের পরিযায়ী হবার সম্পর্কও জড়িয়ে যায়। (২) প্রতিটি গ্রামে, এমনকি শহরেও, এক বা একাধিক “কোয়াক ডাক্তার” আছে। ঝড়জলবৃষ্টির মধ্যে, দিনে রাতে এরাই গ্রামের মানুষের সঙ্গী। কিন্তু চিকিৎসায় জ্ঞানের অভাবে দু-তিনদিন দিনের ওষুধ দিয়ে রোগের উপসর্গ স্তিমিত হলেই (নিরাময় ছাড়া) রোগীকে ছেড়ে দেয়। এরকম বহু রোগী আবার রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে আমাদের কাছে দেখাতে আসে। তখন বাধ্য হয়ে বেশ খানিকটা দামী ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। একটু জটিল রোগের ক্ষেত্রে দুষ্টচক্রের মতো আবার প্রায়শই “ড্রাগ ডিফল্টার” তৈরি হয়। (৩) আয়ুর্বেদিয় চিকিৎসা তুলনায় গ্রামীণ জনতার মাঝে অনেক কম চালু, বেশি চালু অনেকক্ষেত্রেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা। সেক্ষেত্রেও চিত্র একইরকম।
জনস্বাস্থ্যের প্রাথমিক ভিত্তি হল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো, যেখানে রোগী এবং চিকিৎসকের প্রথম সাক্ষাৎ হয় এবং যে দরজা দিয়ে রোগী পরবর্তী চিকিৎসার জন্য কোথায় যাবে বুঝতে পারে। ১১ অক্টোবর ২০২৪-এ নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডসিন-এ প্রকাশিত “দ্য ফেইলিং ইউএস হেলথ সিস্টেম” প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে, যেদুটি বিষয়ে আমেরিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায়-পূর্ণত ব্যর্থ হয়েছে, সেদুটি ক্ষেত্র হল – (১) ব্যক্তি মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষা দেওয়া এবং (২) সামাজিকভাবে ভালো থাকার পরিবেশ তৈরি করা। আরেকটি বিষয়েও বলা হয়েছে, রোগিদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এবং অবান্তর মৃত্যু এড়ানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। আমেরিকায় জিডিপির ১৭-১৮% স্বাস্থ্যের জন্য ব্যয়িত হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অসুখী দেশগুলোর একটি। ভারতের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির বরাদ্দ এখনো ২%-এর কম। সহজেই অনুমেয়, এখানকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনতার স্বাস্থ্যের হালককিকৎ কী হতে পারে।
পশ্চিমবাংলার স্বাস্থ্যসাথী বা কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকৃত অর্থে সরকারের তরফে তৈরি করে দেওয়া বিশেষ ধরনের ইনসিউরেন্স। যদি প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর এবং মৃতপ্রায় অবস্থায় থাকে, তাহলে যারা এই ইনসিউরেন্সের সুবিধে পায় তারা সবাই হয় টারশিয়ারি চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা কর্পোরেট হাসপাতালের দিকে ঝুঁকবে। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হলে অবস্থা কী দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়।
২০২২ সালে ভারত সরকারের তরফে একটি অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা (ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনশিয়াল মেডিসিনস) প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ল্যান্সেট-এর মতো মান্য জার্নালে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে (জুন, ২০২২ – “দ্য ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনেশিয়াল মেডিসিনস অফ ইন্ডিয়া (এনএলইএম ২০২২)ঃ টমি, টো দ্য লাইন”) বলা হয় এই নির্দেশিকায় ওষুধগুলো সঠিক কিভাবে ব্যবহৃত হবে তার মাঝে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকার সঙ্গে বিস্তর ফারাক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিবশকারী ওষুধ লিগ্নোকেইন-এর ক্ষেত্রে ১%, ২%, ৫%, ৭.৫% ইনজেকশনের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কোন ইনজেকশন কিভাবে দিতে হবে তার কোন সুস্পষ্ট গাইডলাইন নেই। আবার “ড্রপস” বলে কিছু ওষুধের কথা বলা আছে। কিন্তু কোনটা শিশুদের মুখে দিতে হবে, কোনটিই বা চোখের ড্রপ সে কথারও কোন উল্লেখ নেই। তাহলে দাঁড়ালো এই যে আমাদের হাতে রইল একটি অস্পষ্ট নির্দেশিকা। এই অস্পষ্টতার দায় কার? কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থার প্রকাশিত সংস্থার এই অস্পষ্টতার দায়, সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায়, বর্তায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরে। এ দায় কেন্দ্রীয় সরকার নেবে কী? কোন টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হবে কী? ২০২৪ পর্যন্ত হয়নি। আর ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি?
অতীতচারণ – ২
১ মার্চ, ২০২৪-এ ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শিরোনাম ছিল “অ্যান্টিবায়োটিক কস্টস রাইজ ১১০০% অ্যাজ বিগ ফার্মা এক্সিটস নাইজেরিয়া”। আমাদের মতো আম-আদমি বা দরিদ্রতর অসংখ্য জনগণের জন্য এ খবরটি বিশেষ উদ্বেগজনক। এরপরে ভারতীয় সংবাদপত্রের সূত্র অনুযায়ী (১৪ অক্টোবর, ২০২৪), ১১টি অত্যাবশ্যক ওষুধের ওপরে যে মূল্য নিয়ন্ত্রণ থাকে সেটা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে এ ওষুধগুলোর ক্ষেত্রে ৫০% অব্দি মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। এই ১১টি ওষুধের মধ্যে হাঁপানি, গ্লকোমা, থ্যালাসেমিয়া, টিবির মতো রোগের চিকিৎসার জন্য প্রথম ধাপের (ফার্স্ট লাইন ড্রাগস) ওষুধগুলো রয়েছে। এজন্য ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিকাল প্রাইসিং অথরটি-কে এদের নির্দেশিকার ১৯ নম্বর ধারার শরণ নিতে হয়েছে। এছাড়াও বেনজাইলপেনিসিলিন, অ্যাট্রোপিন, স্ট্রেপ্টোমাইসিন (টিবি ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ), সালবিউটামল ট্যাবলেট এবং ইনহেলার (শ্বাসকষ্টের জন্য ব্যবহৃত), অ্যান্টিবায়োটিক সেফাড্রক্সিল, থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ডেসফিরাঅক্সামিন ইনজেকশন, এবং মানসিক রোগের ওষুধ লিথিয়াম ইত্যাদি রয়েছে।
২০২২ সালে ভারত সরকারের তরফে একটি অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা (ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনশিয়াল মেডিসিনস) প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ল্যান্সেট-এর মতো মান্য জার্নালে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে (জুন, ২০২২ – “দ্য ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনেশিয়াল মেডিসিনস অফ ইন্ডিয়া (এনএলইএম ২০২২)ঃ টমি, টো দ্য লাইন”) বলা হয় এই নির্দেশিকায় ওষুধগুলো সঠিক কিভাবে ব্যবহৃত হবে তার মাঝে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকার সঙ্গে বিস্তর ফারাক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিবশকারী ওষুধ লিগ্নোকেইন-এর ক্ষেত্রে ১%, ২%, ৫%, ৭.৫% ইনজেকশনের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কোন ইনজেকশন কিভাবে দিতে হবে তার কোন সুস্পষ্ট গাইডলাইন নেই। আবার “ড্রপস” বলে কিছু ওষুধের কথা বলা আছে। কিন্তু কোনটা শিশুদের মুখে দিতে হবে, কোনটিই বা চোখের ড্রপ সে কথারও কোন উল্লেখ নেই। তাহলে দাঁড়ালো এই যে আমাদের হাতে রইল একটি অস্পষ্ট নির্দেশিকা। এই অস্পষ্টতার দায় কার? কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থার প্রকাশিত সংস্থার এই অস্পষ্টতার দায়, সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায়, বর্তায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরে। এ দায় কেন্দ্রীয় সরকার নেবে কী? কোন টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হবে কী? ২০২৪ পর্যন্ত হয়নি।
খানিকটা পেছনে ফিরে দেখা যাক। ৫ অক্টোবর, ২০২২-এ বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা তথা হু-র তরফে একটি “মেডিক্যাল প্রোডাক্ট অ্যালার্ট” জারি করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়াতে ভারতের মেইডেন ফার্মাসিউটিক্যালসের (হরিয়ানার কোম্পানি) তৈরি চারটি ওষুধ – প্রমেথাজিন ওর্যাল সলিউশন, কোফেক্সমালিন বেবি কাফ সিরাপ, মাকফ বেবি কাফ সিরাপ এবং মাগ্রিপ এন কোল্ড সিরাপ – চিহ্নিত হয়েছে ৬৬ জন শিশুর অ্যাকিউট কিডনি ইনজ্যুরিতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে। হু-র তরফে বিজ্ঞপ্তি জারির সময় পর্যন্ত উৎপাদক সংস্থার তরফে এই প্রোডাক্টগুলোর নিরাপত্তা এবং গুণমানের ব্যাপারে কোনরকম তথ্য হু-কে জানানো হয়নি। বরঞ্চ হু-র তরফে জানানো হয়েছে, চারটি প্রোডাক্টের নমুনায় ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে নিশ্চিতভাবে দেখা গেছে অগ্রহণীয় পরিমাণের ডাইইথিলিন গ্লাইকল এবং ইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে। হু-র অনুমান, আপাতত গাম্বিয়াতে এই প্রোডাক্টগুলো পাওয়া গেলেও বিধিবহির্ভুত বাজারের সাহায্যে আরও অনেক অঞ্চলে বা দেশেও পৌঁছে যেতে পারে।
একই সতর্কীকরণে ডাইইথিলিন গ্লাইকল এবং ইথিলিন গ্লাইকলের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে এগুলো মনুষ্যদেহের পক্ষে ক্ষতিকারক। এগুলোর বিষাক্ত প্রভাবের মধ্যে রয়েছে পেটে ব্যথা, বমি, ডায়ারিয়া, প্রস্রাব না করতে পারা, মাথাব্যথা, পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা এবং অ্যাকিউট কিডনি ইনজ্যুরি যার ফলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এখানে বলা দরকার, বেশিরভাগ তরল কাফ সিরাপে দ্রাবক হিসেবে গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয় যাতে কোন ক্ষতি না হয়। কিন্তু অসাধু ওষুধ-উৎপাদকেরা মুনাফা বেশি রাখার জন্য গ্লিসারিনের (বা গ্লিসারল) পরিবর্তে উপরোক্ত ক্ষতিকারক পদার্থগুলো ব্যবহার করে। মানুষের জীবন মৃত্যু এদের মুনাফার উদগ্র লিপ্সার কাছে নগণ্য।
এছাড়াও একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে কয়েক বছর আগে আফ্রিকায় ভারতের রপ্তানি করা কাফ সিরাপ খেয়ে ৬৬ জন শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। প্রথমত, সামজিকভাবে সুষম স্বাস্থ্য সবার অধিগম্যতার মধ্যে থাকবে – সামজিক ন্যায্যতার এই ধারণা লঙ্ঘিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভারত যে জেনেরিক ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে “বিশ্বের ঔষধাগার” এ ধারণা কলঙ্কিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, জনস্বাস্থ্যের প্রসঙ্গটিকে আমরা কি চোখে দেখব এ প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। চতুর্থত, ভারতের ড্রাগ কন্ট্রোল অথরিটি জানিয়েছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত না হু-র তরফে এতগুলো শিশুর মৃত্যুর জন্য এ ওষুধগুলোই নিশ্চিতভাবে দায়ী ততক্ষণ অবধি কড়া পদক্ষেপ নেওয়া যাবেনা। এরকম কথার নির্গলিতার্থ হল হু-কে প্রমাণ দিতে হবে যে অভিযুক্ত সংস্থাটি অপরাধ করেছে। ডিজিসিআই-এর দায় নেই অভিযুক্ত সংস্থার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখার।
একথা কি আমরা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর তরফে অন্য সময়েও শুনতে পাব? মনে রাখতে হবে, মেইডেন ফার্মার একজন ডিরেক্টর হলেন প্রভূত বিত্তশালী, একদা জেট এয়ারওয়েজের মালিক নরেশ গোয়েল। আমরা তো জানি, অর্থ এবং ক্ষমতা হাত ধরাধরি করে চলে।
ভিন্ন প্রসঙ্গে বলা যায়, ১২ ডিসেম্বর, ১৯৯১, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তৎকালীন প্রধান অর্থনীতিবিদ লরেন্স সামার্স একটি গোপন নোট তৈরি করে সহকর্মীদের মধ্যে বিলি করেন, মতামত চান। ১৯৯২-এর ফেব্রুয়ারি মাসে পত্রিকা দ্য ইকনমিস্ট পত্রিকা নোটটি প্রকাশ করে দেয় “লেট দেম ইট পলিউশন” শিরোনামে। নোটটির মোদ্দা কথা ছিল, ধনী বিশ্বের সমস্ত দূষিত আবর্জনা আফ্রিকা বা কম-উন্নত দেশগুলো-তে পাচার করতে হবে। এজন্য সামার্সের স্বাস্থ্যের যুক্তি ছিল, আমেরিকার মতো দেশে ১,০০,০০০ জনে ১ জনেরও যদি দূষিত বর্জ্যের জন্য প্রোস্টেট ক্যান্সার হয় তাহলেও এর গুরুত্ব আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে যেখানে ৫ বছরের নীচে শিশু মৃত্যুর হার ১০০০ শিশুতে ৫ জন তার চাইতে বেশি। এরকম চমৎকার ও অভিনব ধারণার পুরস্কার হিসেবে ক্লিন্টন প্রশাসনে ৭ বছর ট্রেজারি সেক্রেটারি পদে ছিলেন। সে মেয়াদ শেষ হলে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
গাম্বিয়ার মতো দরিদ্র দেশে যাদের ওষুধের গুণমান পরীক্ষা করার ল্যাবরেটরি পর্যন্ত নেই সেসব দেশে স্বাস্থ্যের ওপরে এধরণের আঘাতকে পল ফার্মার “কাঠামোগত হিংসা” বলছেন। যদি হু মারফত বিশ্বের কাছে উন্মোচিত না হত তাহলে এরকম ঘটনা, আরও অনেক ঘটনার মতো, আমাদের কাছে অদৃশ্য এবং অশ্রুত রয়ে যেত। অমর্ত্য সেন পল ফার্মারের বিখ্যাত গ্রন্থ প্যাথলজিস অফ পাওয়ার-এর ভূমিকায় লিখছেন – “প্রতিরোধযোগ্য রোগকে যথার্থই প্রতিরোধ করা যায়, নিরাময়যোগ্য রোগকে নিরাময় করা যায়, এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যাধিগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য চিৎকার করে। প্রকৃতির বিরুদ্ধতার জন্য আক্ষেপ করার পরিবর্তে আমাদের সামাজিক অবস্থার আতঙ্কের কারণগুলো ভালো করে বোঝা দরকার”। বোঝা দরকার “বিশ্বগুরু” হবার সাথে সাথে আমরা যেন শিশু-হন্তারক না হয়ে উঠি।
প্রাত্যহিক বর্তমানে কোথায় যাব, আমরা?
ভারতে ৩০,০০,০০০-এর বেশি মানুষ মারাত্মক এবং মারণান্তক সিলিকোসিস রোগে ভুগছে। এ রোগ আমাদের প্রায় পড়ানো হয়না বললেই চলে। এ রোগ দরিদ্র হবার রোগ, দারিদ্র্যের অভিশাপের রোগ – পেটের দায়ে কৃষিতে সংকুলান না হবার খাদানে, বিভিন্ন ক্রাশার নিয়ে কাজ করার রোগ।
ক্লিনিকাল হেলথের শিক্ষা আমাদের কাছে এ রোগকে অদৃশ্য এবং অশ্রুত করে রেখেছে। একে দৃষ্টির সীমার মধ্যে এবং শ্রুতির স্তরে তুলে আনার প্রচেষ্টা কি আমরা চালাবো?
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার প্রাক্তন মহাসচিব গ্রো হারলেম ব্রান্টল্যান্ড এবং রাষ্ট্র সংঘের প্রাক্তন মহাসচিব বান কি মুন ২০১৮ সালে ভারতে আসেন স্বাস্থ্যের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য। পরে ল্যান্সেট-এ একটি প্রবন্ধে ব্রান্টল্যান্ড জানান – “ভারতের নতুন স্বাস্থ্যসংস্কারের যে সব প্রোগ্রাম সেক্ষেত্রে একটি ঝুঁকি রয়েছে যে, এই প্রোগ্রামগুলো যে অর্থ খরচ হবে সেটাকে টার্শিয়ারি কেয়ারমুখী করে তুলতে পারে। এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যের জন্য সরকারের স্বাস্থ্য বাজেটের অন্তত ২/৩ অংশ ব্যয়ের ঘোষিত নীতিকে গুরুত্বহীন করে তুলতে পারে।”
ব্রান্টল্যান্ড এক্ষেত্রে আমেরিকার উদাহরণ দিয়েছেন – যেখানে জিডিপির ১৮%-এর বেশি স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হলেও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নেই। ভারতে ২০২৪-২৫-এর বাজেটেও স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ জিডিপি-র ২%-এর কম। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ভিত্তিই ছিলো “স্বাস্থ্যের গোড়ার পরিষেবা পাবার ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত সার্বিক প্রবেশাধিকার” এবং এর জন্য ব্যয় বহন করবে রাষ্ট্র, রোগীকে কোন ব্যয় বহন করতে হবেনা। একবার যদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় কবচ সরিয়ে দেওয়া যায় তাহলে সরকারের তরফে ঢাকঢোল পিটিয়ে সরকারি ইন্সিউরেন্সের কথা বলা হলেও শেষ অব্দি তা বেসরকারি ইন্সিউরেন্সের হাতেই চলে যাবে।
ভারতে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায়-মৃত, ভঙ্গুর অবস্থায় থাকার জন্য “আয়ুষ্মান ভারত”-এর মতো সরকারি ইন্সিউরেন্স ব্যবস্থায় সমস্ত বরাদ্দেও শেষ অব্দি মানুষকে পাড়ি দিতে হবে শহরের টারশিয়ারি কেন্দ্রগুলোতে কিংবা ঘটিবাটির বিনিময়ে কর্পোরেট হাসপাতালে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এর প্রবন্ধ থেকে জানতে পারছি, কর্পোরেট বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যের প্রসারিত প্রান্তরেও ঢুকে পড়েছে। ২০০৫ সালে প্রযুক্তি-নির্ভর মেডিসিনের চাপে পড়ে ব্রাজিলকে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক হিসেব অনু্যায়ী বৃহত্তম ৮টি কোম্পানির রেভেন্যুর পরিমাণ ৬৬৮ বিলিয়ন ডলার (টাকার হিসেবে ৫৬৩৫৯.১৬ হাজার কোটি টাকা)
ঐতিহাসিকভাবে হু এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ১৯৭৮-এর আলমা-আটার “সর্বাঙ্গীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা”-র বিখ্যাত ঘোষণাপত্রে হু-র তরফে হ্যাফডান ম্যালারের অধিনায়কত্বে স্পষ্টত “নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা”-র ধারণা উচ্চারিত হয়েছিলো। ১৯৮০-র দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মন্দা এবং নিওলিবারাল অর্থনীতির উত্থানের ফলে হু কোণঠাসা অবস্থানে চলে যেতে লাগলো। ইংল্যান্ডের থ্যাচার এবং আমেরিকার রেগান হু-কে দেওয়া অনুদান প্রায় বন্ধ করে দেয়। কারণ ১৯৭৭-এ “এসেনশিয়াল মেডিসিনস প্রোগ্রাম” নেয় যেখানে জেনেরিক ড্রাগস (দামী ব্র্যান্ডের পরিবর্তে) ব্যবহার করার বিধান দেওয়া হয়। প্রত্যাশিতভাবেই দানবীয় বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো এর প্রবল বিরোধিতা করে।
ভারতের প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় এখনো ২%-এর কম। ফলে সহজেই অনুমেয়, কতটুকু অর্থবরাদ্দ পড়ে থাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের জন্য। মানুষ হিসেবে এরা বেঁচে আছে অথচ স্বাস্থ্যের অধিকার নেই! এ এক বিচিত্র ছলনা – কে নেবে এ সমাধানের দায়িত্ব? যে কয়েক কোটি মানুষ নিজেদের পকেট থেকে স্বাস্থ্যের জন্য খরচ করার দরুন দারিদ্র্য সীমার নীচে চলে যায়, সে সংখ্যা কী আরও বৃদ্ধি পাবে?
এর ওপরে আবার ওষুধের দাম বৃদ্ধি! কোথায় কোন পথে চলেছি আমরা?










