আজকের দিনটা আপনাদের মুখ পুস্তকের দেওয়ালগুলি ভরে যায় যে মানুষটির বিদ্রূপ, নিন্দায় তাঁকে নিয়ে আজকের এই চিঠি। গান্ধী কেমন লোক ছিলেন সে নিয়ে আপনাদের গুরুদেব “বীর” সাভারকারকে দিয়েই শুরু করা যাক।।
গান্ধীজির অনশন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সাভারকার বিবৃতি দিলেন: “এখন সময় এসেছে যে, গান্ধীজির স্বাস্থ্যের গুরুতর অবস্থা নিয়ে যাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তাঁর অমূল্য জীবন বাঁচাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে চান, তাঁদের অবিলম্বে উপলব্ধি করা উচিত যে, আমরা পছন্দ করি বা না করি, গান্ধীজির জীবন বাঁচানোর জন্য এখন অন্য যেকোনো উপায়ের চেয়ে অধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত হতে পারে এমন একমাত্র উপায় হলো, স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীর কাছে একটি জাতীয় আবেদন জানানো, যেন তিনি তাঁর অনশন ভঙ্গ করেন, তাঁর শোনার ক্ষমতা শেষ সীমায় পৌঁছানোর আগেই। এমনকি এখনও ভাগ্যের উপর নির্ভর করা বিপজ্জনক।[সূত্রঃ পাইওনিয়ার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩]
গান্ধীজীর জন্মদিনে সাভারকার অভিনন্দন জানালেন:, “তাঁর ৭৫তম জন্মদিনে আমি মহাত্মা গান্ধীজি এবং আমাদের জাতিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। ঈশ্বর তাঁকে দীর্ঘ জীবন ও সুস্বাস্থ্য দান করুন।” [সূত্র: প্রেস নোট, ২রা অক্টোবর, ১৯৪৩]
জেল থেকে গান্ধীজির ছাড়া পাওয়ায় সাভারকার আনন্দ প্রকাশ করে লিখলেন, “বার্ধক্য এবং সাম্প্রতিক গুরুতর অসুস্থতার কারণে স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বিবেচনা করে সরকার গান্ধীজিকে মুক্তি দিয়েছে, এই সংবাদে সমগ্র জাতি স্বস্তি বোধ করছে। এটি একটি মানবিক পদক্ষেপ ছিল। আমি গান্ধীজির দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। আমি আশা করি, সরকার এখন পণ্ডিত নেহেরু এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিনা বিচারে কারারুদ্ধ সকল ভদ্রলোককে মুক্তি দেবে, অথবা তাঁদের প্রকাশ্যে বিচার করবে, যাতে দেশ জানতে পারে যে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো কী।” [সূত্রঃ প্রেস নোট, ৭ই মে, ১৯৪৪]
গান্ধীজিকে মহাত্মা সম্বোধন করে তার জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে সাভারকার লিখলেন, “মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের আকস্মিক ও মর্মান্তিক সংবাদ আমার কাছে পৌঁছানোর সাথে সাথেই আমি একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এটিকে একটি নৃশংস ও ভ্রাতৃহত্যাজনিত অপরাধ হিসেবে প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছিলাম। এবং আজও আমি গান্ধীজীর হত্যাকাণ্ডের এমনই দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানাই।” [সূত্রঃ সাভারকার এর বিবৃতি, ২০শে নভেম্বর, ১৯৪৮]
গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসে, নারায়ণ আপ্তে সহ অন্যান্যদের পরিষ্কার ক্রিমিনাল আখ্যা দিলেন সাভারকার এবং শিষ্যদের কাজের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলেন, “অনেক অপরাধী তাদের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গুরু ও পথপ্রদর্শকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্য পোষণ করে এবং তাদের মতবাদ অনুসরণ করার দাবি করে। কিন্তু শুধুমাত্র অপরাধীদের গুরুদের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধার দাবির ভিত্তিতে কি গুরু বা পথপ্রদর্শকের তার অনুসারীদের অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি অনুমান করা এবং তা প্রমাণিত বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে? [সূত্র: সাভারকার এর বিবৃতি, ২০শে নভেম্বর, ১৯৪৮]
শুধু কথামাত্র নয়, কাজেও সাভাকার দেখিয়েছিলেন যে তিনি গান্ধী হত্যাকারীদের কতটা ঘৃণা করেন। গোপাল গডসের উকিল পি এল ইনমাদারের ভাষায়, “পুরো বিচার চলাকালীন আমি সাভারকরকে একবারও নাথুরামের দিকে মাথা ঘোরাতে দেখিনি, যিনি তাঁর পাশেই, এমনকি একেবারে লাগোয়া হয়ে বসতেন; তাঁর সাথে কথা বলা তো দূরের কথা… সাভারকর সেখানে স্ফিংসের মতো নিঃশব্দে বসেছিলেন, কাঠগড়ায় থাকা তাঁর সহ-অভিযুক্তকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, এক নির্ভুল শৃঙ্খলাবদ্ধ ভঙ্গিতে…” [সূত্রঃ ইনামদার, আত্মকথা]
তার গুরু, আদর্শ-প্রতিমার এই আচরণে হত্যাকারী নাথুরাম গডসে কতটা বিচলিত হয়েছিলেন ও দুঃখ পেয়েছিলেন তার নমুনা সেই উকিল ইনমাদারের ভাষায়, “নাথুরামের সাথে আমার বিভিন্ন আলাপচারিতার সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, রেডফোর্ট ট্রায়ালের সমস্ত দিনগুলিতে আদালতে বা রেডফোর্ট জেলে তাত্যারাও [সাভারকর]-এর তাঁর সাথে পরিকল্পিত ও প্রদর্শনমূলক মেলামেশাহীনতার বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। সেলের সেই নির্জন প্রকোষ্ঠে নাথুরাম তাত্যারাও-এর হাতের একটি স্পর্শ, একটি সহানুভূতির কথা, বা অন্তত একটি করুণার দৃষ্টির জন্য কতটা আকুল হয়ে থাকতেন। সিমলা হাইকোর্টে তাঁর সাথে আমার শেষ সাক্ষাতের সময়েও নাথুরাম এই বিষয়ে তাঁর আহত অনুভূতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।” [সূত্রঃ ইনামদার, আত্মকথা]
অতএব, হে আমার প্রিয় রাষ্টবাদি বন্ধুগণ, হয় আপনারা এই অভিযোগ মেনে নিন যে আসলে আপনাদের গুরু সাভারকার নিজের প্রকৃত মনোভাব লুকিয়ে গান্ধীজি সম্পর্কে এই সব বলেছেন এবং নিজেকে ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচাতে নাথুরাম গডসে এর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে তাকে ডিসওন করেছেন আদ্যন্ত কাপুরুষের মতো। ওনার মতো সুবিধাবাদী নেতা আর হয় না যে ফাঁক পেলে নিজের স্বার্থের জন্য নিজের একান্ত অনুগামীকে ফাঁসিতে ঝোলাতে ইতস্ততঃ করে না। অথবা এটা মেনে নিন যে আপনাদের গুরু সত্যিই আন্তরিক ভাবে গান্ধীজির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, ওনাকে “মহাত্মা” বলে মেনে নিয়েছিলেন, ওনার মৃত্যুতে প্রকৃত মর্মাহত হয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে আজ গান্ধীজির জন্মদিবস আপনারাও আপনাদের গুরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে গান্ধীকে অবমাননা, অপমান, চরিত্র হনন এর মতো ঘৃন্য কাজ থেকে বিরত থাকুন। আপনাদের জন্য এই দুটো চয়েস এর বাইরে আর কোনোও পথ দেখতে পাচ্ছি না।
ইতি
জনৈক দেশপ্রেমী (কিন্তু রাষ্ট্রবাদী নয়) ভারতবাসী।









