১৯৩৩ সালে হিটলারের জার্মানিতে বই পোড়ানো হয়েছিল। ১০ মে একরাতে শুধুমাত্র বার্লিনের অপেরা স্কোয়ারে পোড়ানো হয়েছিল ২০০০০ বই। আর ওই সময় সারা জার্মানিতে পোড়ানো হয়েছিল কত যে বই তার সঠিক হিসেব কেউ জানে না। ইহুদিদের লেখা বই-এর পাশাপাশি, কম্যুনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের বই, যুদ্ধবিরোধী বই, নাৎসিদের সমালোচনামূলক বই ইত্যাদি ছিল নাৎসিদের লক্ষ্য। ওই রাতে বই-এর বহ্নুৎসবের সামনে দাঁড়িয়ে প্রবল ক্ষমতার দম্ভে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস ঘোষণা করেছিলেন জার্মান জাতীয়তার উত্থানের কথা।
বই আগুনে নিক্ষেপ করার আগে ৯ টি Fire Oaths ঘোষিত হয়েছিল। এগুলো ছিল কোন লেখকের বই কেন আগুনে ফেলা হচ্ছে—তার ঘোষণামূলক বক্তব্য। এই Fire Oaths-এর প্রথমটিই ছিল
Against class struggle and materialism,
For national community and an idealistic lifestyle,
I consign to the flames the writings of Marx and Kautsky.
অর্থাৎ শ্রেণিসংগ্রাম ও বস্তুবাদের বিরুদ্ধে,
জাতীয় ঐক্য ও আদর্শবাদী জীবনব্যবস্থার পক্ষে,
মার্কস ও কাউটস্কির লেখা আগুনে নিক্ষেপ করা হলো।
আজ যেভাবে পশ্চিম বাংলা জুড়ে দুর্গাপুজোয় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল লাগাতার ভাঙা হল, বই ছিঁড়ে কুটি কুটি করা হল, পদপিষ্ট করা হল, অগ্নিসংযোগ করা হল এবং কারণ হিসেবে যা যা বলা হল তার সঙ্গে যে কোনো সাধারণ বোধসম্পন্ন মানুষই ১৯৩৩-এর জার্মানিতে সেই বইয়ের বহ্নুৎসবের মিল খুঁজে পাবেন। সত্যজিতের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে উদয়ন পন্ডিতের পাঠশালায় পুঁথি পোড়ানোও মিলে যায় এর সঙ্গে।
কিন্তু বই ধ্বংসে এরা এত বেপরোয়া কেন? কারণ ফ্যাসিবাদ খুব ভালোই বোঝে ‘যে যত জানে’ সে এই ক্ষমতার আধিপত্যকে ‘তত কম মানে’! মমতার অপশাসনে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল বাংলার মানুষের বড় অংশ আর সেই সঙ্গে এসআইআর-এর বেআইনি কিঞ্চিৎ সুবিধে নিয়ে বেটক্কর ক্ষমতায় এসে গেছে বিজেপি। কিন্তু এই বাংলায় দীর্ঘকাল টিঁকে থাকতে হলে বাংলার বৌদ্ধিক চেতনাকে ধ্বংস করতেই হবে। যার বাহন হল বই।
তবে ১৯৩৩-এর জার্মানি আর আজকের পশ্চিমবাংলা এক নয়। ভারতবর্ষের সাহিত্যে একমাত্র নোবেল লরিয়েট রবীন্দ্রনাথ এবং সাহিত্যে নোবেলের তিনবার নমিনেশন পাওয়া তারাশংকরের এই বাংলায় বইয়ের প্রীতি এখনও বেঁচে আছে। মুখ্যমন্ত্রী, অর্জুন সিং ইত্যাদির প্রবল দাদাগিরিসুলভ হুহুংকার এবং ফলত বই পদদলিত করার ইতর গুন্ডামি, আর পুলিশ, আধা সেনা বুলডোজার এনে বুকস্টল গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রবলতর প্রশাসনিক সক্রিয়তা ভালো চোখে নেয়নি বাংলার মনীষা। সেটা বুঝে কিছুটা বিবেকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে বক্তব্য রাখতে হচ্ছে বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, আরএসএস নেতা জিষ্ণু বসু এবং সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাসগুপ্তকে। আর সারাক্ষণ এই সব ‘ভালো বিজেপি’রা বলছেন যারা এসব করছে তারা বিজেপির কেউ নয়। (কী মিস্টি !) এদিকে বুকস্টল ভাঙা হয়ে চলেছে, হয়েই চলেছে। প্রশাসন তাদের কিচ্ছুটি বলে না, কেউ গ্রেফতার হয় না, আবার স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আজো তার বক্তব্যে বুকস্টল না করতে দেওয়ার সিদ্ধান্তেই অবিচল থাকেন। এ ঠিক রাবড়ি জ্বাল দেওয়ার কেস। কড়াইয়ের নীচে প্রবল আগুন জ্বালিয়ে রাখার পাশাপাশি তপ্ত কটাহের ওপরে শীতল বাতাস করে যাওয়া।
সে যাই হোক চোখের সামনে বই ধ্বংস করা এবং তর্জনী তুলে দাদাগিরি আর নেওয়া যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর বারংবার হুহুংকার দেখে বোঝা যায় ক্ষমতার স্পর্ধা আজ লাগামহীন। পথের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইয়ের মৃতদেহ দেখে আমার হিটলারের হলোকস্টের কথাই মনে এসেছে বারংবার। এ অন্যায় তার সমতুল হয়ত নয় কিন্তু বই ধ্বংস করার, পদপিষ্ট করার যে অপরাধ আর পাপ আপনারা করলেন তার অভিঘাত সুদূরপ্রসারী। ক্ষমতার দম্ভে, কোনো দিন কোনো দমন পীড়ন জ্ঞানের সত্যকে শেষ করে দিতে পারে না। একদিন মানুষের শুভ চেতনাই আপনাদের এর শাস্তি দেবে।












