কাঞ্চন সরকার ও গোপা মুখোপাধ্যায় রচিত।
“ভারতবর্ষ হাঁটছে” (অদিতি বসুরায়)
১৯৪২ এর “ভারত ছাড়ো আন্দোলন” থেকে ২০২৪ এর “রাত দখল আন্দোলন” হয়ে ভারতবর্ষের গনতন্ত্রপ্রিয় মানুষ কাল পৌঁছে গেছিলেন যন্তর মন্তরে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার (ভোটাধিকার) ফিরে পেতে। থুড়ি! শুরুতেই একটু ভুল লিখে ফেললাম, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মানুষগুলো যন্তর মন্তরে এর উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্র তাঁদের সেখানে পোঁছতে দেয়নি।
সাধারণ মানুষের চরম অসুবিধা করে দিল্লিগামী ২৪৫ টা ট্রেন বাতিল—এমনকী রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনও! আন্দোলনে যোগ দিতে আসা যাত্রীদের ট্রেন থেকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে!দিল্লির ৫৭ টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ। জনপথের ৪ কিমি ব্যাসার্ধ জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ। প্রায় ৪২ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন!৩০ টা অস্থায়ী ডিটেনশন ক্যাম্প । সিজেপির নেতাদের বিমানবন্দর থেকেই আটক করার খবর এসেছে। যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর আগেই বহু ছাত্র, যুবক, কর্মী ও রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অহিংস বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ ও ভাড়াটে গুন্ডাদের সহিংস আক্রমণ, নেতা-নেত্রী-সহ প্রায় সাত হাজার মানুষের আটক!
কি আশ্চর্য না? যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র বলপ্রয়োগের বৈধতা অর্জন করে, যে জনগণের অর্থে বলীয়ান হয়ে রাষ্ট্র পুলিশ, সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী গড়ে তোলে, যে সংবিধান রাষ্ট্রকে দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব দেয়, সেই সংবিধানকেই লাঞ্ছিত করে, জনগণকে উপেক্ষা করে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার রক্ষার দাবিকে অস্বীকার ও দমন করার চেষ্টা করে সেই রাষ্ট্রই!
আসলে প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে, কতজন আটক হলেন, কতগুলি রাস্তা বন্ধ হল, কত হাজার পুলিশ নামানো হল। প্রশ্নটা আরও গভীর – যে সরকার নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের রক্ষক বলে প্রচার করে সেই সরকারের এত ভয় কিসের? প্রতিবাদী তারুণ্যের সামনে রাজধানীকে প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলতে হবে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ১০ অক্টোবরকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পিছনে রয়েছে জেন জি-র ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, এবং দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসার উদ্বেগ।
ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন মানেই তো নাগরিকত্বের প্রশ্ন । টি. এইচ. মার্শাল নাগরিকত্বের ধারণাকে তিনটি অধিকারের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছিলেন—প্রথমত, নাগরিক অধিকার (Civil Rights): মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা, আইনের চোখে সমতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার,এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার অধিকার। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অধিকার (Political Rights): ভোট দেওয়ার অধিকার, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার, এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকার। তৃতীয়ত, সামাজিক অধিকার (Social Rights): শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং সমাজে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার।
এই এতগুলি অধিকারের মধ্যে অন্তত একটি ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সবচেয়ে ধনী থেকে সবচেয়ে দরিদ্র, সবচেয়ে ক্ষমতাশালী থেকে সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের সমান রাজনৈতিক অধিকার থাকার কথা। সেটি হল ভোটাধিকার—প্রত্যেক নাগরিকের একটি করে ভোট। কিন্তু সেই অধিকারটুকুও যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, যদি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় মানুষকে নিজের নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, ভারতীয় গণতন্ত্রে নাগরিকদের অবস্থান ঠিক কোথায়?
সিজেপির আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল সেই ভোটার তালিকার সংশোধন, বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর প্রক্রিয়া, এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে মানুষের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং এই প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অপরাধ নয়। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রবিরোধী নয়। বরং এমন প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন উঠলে তার স্বচ্ছ জবাব দেওয়াই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। সরকার বা কমিশনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেই কাউকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। আর প্রশ্নের জবাব যদি আসে ব্যারিকেড, আটক, পরিবহণে বাধা, এবং পুলিশি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে, তবে সেই জবাব নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়- ভোট যদি গণতন্ত্রের ভিত্তি হয়, তবে ভোটের অধিকার রক্ষার দাবিতে রাস্তায় নামা মানুষকে আটক করে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় কীভাবে?
জেন জি-র আন্দোলন নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ তাকে সাময়িক আবেগ বলে উড়িয়ে দেন, কেউ সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব বলে ব্যাখ্যা করেন, কেউ আবার পুরনো রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে থেকে নতুন নেতৃত্বের উত্থানকে সন্দেহের চোখে দেখেন। কিন্তু তরুণদের প্রশ্নগুলিকে এভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
কাজ কোথায়? শিক্ষার নিশ্চয়তা কোথায়? প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়? প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতার দায় কে নেবে? বিশ্ববিদ্যালয় কি স্বাধীন চিন্তা ও বিতর্কের জায়গা থাকবে, নাকি সেখানে প্রশ্ন করাটাই ক্রমশ ঝুঁকির হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নগুলি কোনও একটি প্রজন্মের ব্যক্তিগত হতাশা নয়। এগুলি সমাজের কাঠামোগত সংকটের প্রকাশ।
জেন জি: শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, নতুন রাজনৈতিক ভাষা। আগের প্রজন্মের আন্দোলনের ভাষা ছিল অন্য রকম। আজকের তরুণেরা হয়তো অন্য শব্দ ব্যবহার করেন, অন্য মাধ্যমে সংগঠিত হন, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সংশয় প্রকাশ করেন। তাতে তাঁদের অসন্তোষের বাস্তবতা কমে যায় না। বরং পুরনো রাজনৈতিক সংগঠনগুলির দায়িত্ব হল, এই নতুন ভাষা বোঝা, তার সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা, এবং নিজেদেরও নতুন করে পরীক্ষা করা।
সত্যি বলতে, আজকের জেন জি অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিণত। এদের স্লোগান বাছাই দেখুন, আন্দোলনের ধরণ দেখুন। এরা ক্লান্ত নিরাপত্তাকর্মীকে জল দেয়, পাখা দিয়ে বাতাস করে। জলকামানের জলে ভয় না পেয়ে স্নান করে নেয়। দেড়তলা উঁচু ব্যারিকেডের মাথায় উঠে পড়ে। আন্দোলনকারীদের আটক করতে আসা বাসের চাবি নিয়ে পালিয়ে যায়! এরা রাষ্ট্রকে ভয় পায় না। এরা আকাশটাকে অর্ধেক করে ভাগ করে নিতে জানে। জুনাইদ ভাই এদের খাবার দেন, শিখ ভাইরা এদের জন্য লঙ্গর খোলেন। জেন জি বিভাজন আর অস্মিতার লড়াইয়ে মত্ত ভারতকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। এদের আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, সাহস আছে, কল্পনাশক্তি আছে। সব সিদ্ধান্ত যে সঠিক হবে, এমন নয়। সব কৌশল যে সফল হবে, তাও নয়। কিন্তু নতুন কিছু গড়ে তোলার চেষ্টা যদি ভুলের আশঙ্কায় শুরুতেই বাতিল করে দেওয়া হয়, তাহলে নতুন রাজনীতির জন্ম হবে কীভাবে?
এই আন্দোলনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সিজেপির সঙ্গে AISA, SFI, AISF-সহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলির যৌথ অবস্থান। সেই প্রেক্ষাপটে ১০ অক্টোবরের যৌথ আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। যখন ভোটাধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা,এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির সংগঠনগুলির একসঙ্গে দাঁড়ানোর তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। তাই বামপন্থীদের সামনে এখন একটি বড় পরীক্ষা- বাম রাজনীতি যদি কেবল অতীতের সংগ্রামের গৌরব, পুরনো স্লোগান, এবং পরিচিত সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়বে। অন্যদিকে, জেন জি-র স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে যদি সংগঠিত সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত করতে হয়, তবে প্রয়োজন ধারাবাহিক সংগঠন, রাজনৈতিক শিক্ষা, গণতান্ত্রিক চর্চা, এবং শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক।
এখন ছিদ্রান্বেষী হওয়ার সময় নয়। নতুন আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভুল খুঁজে বের করা, পুরনো মাপকাঠিতে তার বিচার করা কিংবা নিজেদের রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকার সময়ও নয়। সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল—সিদ্ধান্তগুলি কে নিচ্ছে এবং কীভাবে নিচ্ছে; ব্যর্থতায় হতাশ না হয়ে, বরং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া। রোজা লুক্সেমবার্গের সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য এখানে মনে পড়ে: The working class demands the right to make its mistakes and learn the dialectic of history. অর্থাৎ, শ্রমিকশ্রেণি নিজের ভুল করার এবং ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া থেকে শিক্ষা নেওয়ার অধিকার দাবি করে।
নতুন প্রজন্মকেও সেই অধিকার দিতে হবে। তাদের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। বরং তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার, ভুল সংশোধন করার, এবং নিজেদের রাজনৈতিক পথ নির্মাণের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে।
জেন জি-র নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং শ্রমিক-কৃষকের দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা যদি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তাহলে আন্দোলনের পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে। বেকার তরুণের অনিশ্চয়তা, শ্রমিকের অনিরাপদ কাজ, কৃষকের সংকট, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার অসমতা—এগুলি আলাদা আলাদা সমস্যা নয়। এগুলির মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের ক্ষোভকে শ্রেণিগত প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না; আবার শ্রেণির রাজনীতির নামে নতুন প্রজন্মের স্বাধীন কণ্ঠকেও অস্বীকার করা যাবে না।
তাই যে তরুণেরা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে থেকে নিজেদের ভাষায় প্রতিবাদ গড়ে তুলছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। প্রশ্ন থাকবেই। জেন জি – দের নিজেদের সংগঠন ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, নাকি তাঁদের পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনস্থ করার চেষ্টা চলবে? বামেদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাম রাজনীতির ঐতিহাসিক শক্তি এসেছে ছাত্র-যুব আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম, এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই থেকে। সেই ইতিহাসকে সম্মান করার অর্থ কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; বর্তমানের নতুন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাও তার অংশ। তরুণদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার অধিকার, এবং সংগঠন গড়ার নিজস্ব পথকে সম্মান করতে হবে। যৌথ আন্দোলনের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক সিধান্ত, এবং বাস্তব দাবির ওপর ঐকমত্য।
ঐক্য মানে মতভেদ মুছে ফেলা নয়। ঐক্য মানে, প্রয়োজনের মুহূর্তে মতভেদ সত্ত্বেও একসঙ্গে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক বোধ। এই পথ সহজ নয়। মতভেদ থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, ভুল বোঝাবুঝিও থাকবে। কিন্তু সেই কারণেই সংলাপ ও যৌথ সংগ্রামের প্রয়োজন আরও বেশি। এই ভাবেই একদিন “শতফুল” বিকশিত হয়ে উঠবে ।
১০ অক্টোবরের ঘটনাবলি আমাদের কতগুলি কথা মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার নাম নয়। গণতন্ত্রের অর্থ হল, নির্বাচনের আগে ও পরে প্রশ্ন করার অধিকার; সরকারের সমালোচনা করার অধিকার; শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়ার অধিকার; এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি দাবি করার অধিকার।
রাষ্ট্রের হাতে পুলিশ আছে, প্রশাসন আছে, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আছে। সাধারণ মানুষের হাতে আছে সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, এবং প্রতিবাদের শক্তি। একটি সরকার কতটা শক্তিশালী, তার বিচার বিরোধীদের কতজনকে আটক করা গেল, কতগুলি রাস্তা বন্ধ করা গেল কিংবা কত হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হল, তা দিয়ে হয় না। বিরোধী মতকে কতটা সহ্য করা যায়, সমালোচনার জবাব কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে দেওয়া যায় এবং নাগরিকের অধিকার কতটা সম্মান করা হয়—সেই মাপকাঠিতেই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শক্তির বিচার হয়। দিল্লির রাস্তা বন্ধ করা যায়। মেট্রোর দরজা বন্ধ করা যায়। আন্দোলনকারীদের সাময়িক ভাবে আটক করা যায়। কিন্তু মানুষের প্রশ্নকে চিরকাল আটকে রাখা যায় কি?
১০ অক্টোবরের শিক্ষা এখানেই। জেন জি-র নতুন কণ্ঠস্বর, বামেদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকাররক্ষার লড়াই যদি পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত হতে পারে, তবে এই আন্দোলন একটি দিনের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আজ প্রয়োজন কোনও একক দলের আধিপত্য নয়; প্রয়োজন মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে গণতান্ত্রিক সংহতি। প্রয়োজন এমন রাজনীতি, যেখানে তরুণেরা শুধু মিছিলের ভিড় নয়, নিজেরাই রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নির্মাতা। কারণ গণতন্ত্র ক্ষমতাবানদের দেওয়া কোনও দয়া নয়। গণতন্ত্র মানুষের অধিকার—আর সেই অধিকার রক্ষা করতে হলে মানুষকেই বারবার রাস্তায় নামতে হয়। ইতিহাস সেই শিক্ষাই আমাদের দেয়।
প্রায় অর্ধ শতক আগে ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্স দেখেছিল প্রায় রক্তপাতহীন এক বিপ্লব। রাস্তা থেকে পাথরের চাঁই তুলে নিয়ে ব্যারিকেড , সরবোন বিশ্বাবিদ্যালয়ের সামনে নুড়ি পাথরের পাঁচিল। দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হয়েছিল ‘বাস্তববাদী হও আর অসম্ভবের দাবি তোলো’। ফ্রান্সের আন্দোলনের সমর্থনে যাদবপুরের দেওয়ালে লেখা হয়েছিল সরবোন থেকে যাদবপুর, সংগ্রামের একই সুর’। “আমাদের দুনিয়ায় এত বড় মেধাবী প্রলয় আর ঘটেনি” (সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় –‘সরবোন থেকে যন্তরমন্তর:যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে‘)। সাবেকী বামপন্থী রাজনীতির চেনা কাঠামোর বাইরে এই প্রথম ছাত্র আন্দোলন এক সর্বাত্মক আন্দোলনে পরিণত হয়। শ্রমিকশ্রেণী এবং সাধারণ জনগণ ছাত্রদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের জন্ম হয়। ১৯৬৮ তে চেক সোশাল রিপাবলিকে ‘প্রাগ বসন্ত’ আন্দোলনেও ছাত্র ও যুব শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ, নেপাল, এবং শ্রীলঙ্কা – তিনটি জায়গার রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনে যুব শক্তি নির্ধারক ভুমিকা পালন করেছে। এই মুহূর্তে ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে জেন জি আন্দোলন সরকার কাঁপাচ্ছে ফ্রান্স, সার্বিয়া, এবং আলবেনিয়ায়। বিভিন্ন জায়গার প্রেক্ষাপট আলাদা। দাবি আলাদা। আন্দোলনের চরিত্রও আলাদা। সব আন্দোলন সফল হয়নি, সব আন্দোলন সরকার বদলায়নি। সব আন্দোলন ঠিক অভিমুখে পরিচালিত হয়নি, তাই কাঙ্খিত পরিণতি পায়নি। সহযোগী শক্তির অভাবে কোন আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে।এই বৈচিত্রের মধ্যে প্রধান মিলের জায়গা হল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে যুব শক্তির রুখে দাঁড়ানোর স্পর্ধা। নেহা, ঐশী, অভিজিৎ,সৌরভ, আশুতোষ, এবং আরও অনেকে – এঁরা ভারতীয় রাজনীতির মরা গাঙে বান এনেছেন। আসমুদ্রহিমাচল জেগে উঠেছে জেন-জি দলের আহ্বানে। এক ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী শক্তির করাল গ্রাসে বিপন্ন ভারতবর্ষকে রক্ষা করার শপথ নিয়েছে এই তরুণ দল। এই তারুণ্যের শক্তি ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকেও নতুন ঐক্যের সন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। নিষেধ না মানার শক্তিই জলকামানের সামনে ব্রেক ডান্স করতে সাহস জোগায়। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে ঘটা অন্যায়কে যখন ঢক্কানিনাদে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন এই প্রজন্ম সজোরে অন্যায়কে আঘাত করতে পারে।
নিট কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করেছে যারা, যারা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে মোদি শাহ জুটির,তাদের প্রতিরোধ করার জন্য ১০ অক্টোবর দিল্লি এক অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত হয়েছিল। যন্তর মন্তর আসার সমস্ত রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছিল। ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা প্রায় সবাই গ্রেফতার। অভিজিৎ দিপকে প্লেন থেকে নামতে পারেন নি, দিল্লির মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে প্লেন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে অভিজিৎকে। তবু মানুষের যাত্রা বন্ধ করা যায়নি। সমগ্র দিল্লি শহর জুড়ে চলেছে প্রতিবাদের উৎসব । পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ – ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সব বাধা অতিক্রম করে উপস্থিত হয়েছেন।
নেহা বলেছেন “The powerful can kill one, two or hundred roses, but they’ll never stop the arrival of spring”. অনাগত বসন্তকে পাবার জন্য ভারতবর্ষের মানুষ হাঁটছেন। শুরু হয়েছে এক অন্তহীন যাত্রার। এই যাত্রাকে বুঝতে হবে, পায়ে পা মেলাতে হবে। স্বপ্নের দেশ, স্বপ্নের সমাজ দূরে নয় – ‘Another world is not only possible, she is on her way (অরুন্ধতী রায়)












