সংবাদমাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার দেখলাম। বেশ গম্ভীর মুখে তিনি জানাচ্ছেন, চোরবাগান কাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে এবং সরকারি হাসপাতালগুলিতে ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতির তথ্যপ্রমাণ জনসমক্ষে তুলে ধরে যারা স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নতির দাবি জানাচ্ছে, তাদের কথায় তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান না। কারণ, তারা নাকি মাওবাদী ডাক্তার! আর তাদের অভিযোগ নাকি সবই মিথ্যে!
সাক্ষাৎকারটি শুনতে শুনতে বেশ চেনা একটা দৃশ্য মনে পড়ছিল। অপ্রিয় প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে প্রশ্নকর্তাকে মাওবাদী, নকশাল কিংবা অন্য কোনও তকমা দিয়ে দেওয়ার এই রাজনৈতিক অভ্যেস এ রাজ্যে নতুন নয়। পূর্বতন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর আমলেও আমরা এর বহু নিদর্শন দেখেছি।
প্রেসিডেন্সির এক ছাত্রীর প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাইভ টিভিতে তাঁকে মাওবাদী বলে বিতর্কসভা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই সেই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির এমন প্রত্যাবর্তন সত্যিই বিস্ময়কর। শেষ পর্যন্ত যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ! আর স্মৃতিভ্রম না হলে এ কথাও নিশ্চয়ই আপনার মনে থাকবে যাঁদের আজ মাওবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সেই জুনিয়র ডাক্তারদেরই আন্দোলনের মিছিলে আপনি নিজে হেঁটেছেন, সংহতি জানিয়েছেন। ক্ষমতার চেয়ার বদলালে কি প্রশ্ন করার অধিকারটাও বদলে যায়?
মন্ত্রীমশাই, একটা সহজ প্রশ্ন। আমরা ঠিক কোন তথ্যটি মিথ্যে বলেছি? অভিযোগ মিথ্যে হলে তথ্য দিয়ে ভুল প্রমাণ করুন। সরকারি হাসপাতালের ঘাটতির তালিকা প্রকাশ করে দেওয়া কি মাওবাদী কার্যকলাপ? নাকি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটা মানুষের সামনে চলে আসাটাই আপনাদের অস্বস্তির কারণ?
এবার একটু বাস্তব পরিস্থিতিতে আসা যাক।
আমাদের প্রেস কনফারেন্সের তিন দিন পরের, অর্থাৎ ৩০ অক্টোবরের আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের নিজস্ব Non-Availability (NA) List। একবার তালিকাটা ভালো করে দেখুন।
এখানে নেই Sterile gloves, নেই IV needle, নেই 25G Spinal needle, নেই বিভিন্ন মাপের Syringe। অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার জন্য প্রয়োজনীয় Shoe cover, Surgical cap, Disposable gown পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। নেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় Savlon-এর মতো antiseptic solution, নেই Micropore। নেই Major drape, Ortho drape, C-ARM cover-এর মতো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিভিন্ন মাপের ET Tube, Adult Oxygen mask, Nebulisation mask, Colostomy bag-এর মতো সামগ্রীও তালিকায় রয়েছে।
শুধু সামগ্রী নয়, তালিকায় রয়েছে Inj. Mephentermine এবং Inj. Magnesium Sulphate (MgSO4)-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধও। Mephentermine অ্যানেস্থেশিয়ার সময় রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে তা সামলাতে ব্যবহৃত হয়। Magnesium Sulphate প্রসূতি চিকিৎসায়, বিশেষত Eclampsia-তে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো কোনও ঐচ্ছিক ওষুধ নয়, নির্দিষ্ট জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো না পাওয়া গেলে রোগীর চিকিৎসা গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এছাড়াও রয়েছে PDS ও Ethilon sutures, Skin stapler, বিভিন্ন ধরনের সেলাইয়ের সুতো এবং আরও একাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
একটু ভেবে দেখুন। এগুলো কোনও বিলাসবহুল যন্ত্রপাতি নয়, কোনও বিশেষায়িত গবেষণার সরঞ্জামও নয়। এগুলো একটি সচল সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় উপকরণ। Sterile gloves, Needle, Syringe, Antiseptic solution-এর মতো প্রাথমিক সামগ্রীও যদি পাওয়া না যায়, তাহলে অস্ত্রোপচার ও অ্যানেস্থেশিয়ার পরিষেবা কীভাবে স্বাভাবিকভাবে চলবে? জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে চিকিৎসকরা কী নিয়ে রোগীর চিকিৎসা করবেন?
এবার বলুন, এগুলো থাকবে না কেন?
সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যাবে না, অথচ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নাকি দিব্যি চলছে! এটা কি নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ক্রমশ দুর্বল করে বেসরকারি চিকিৎসার বাজার আরও প্রসারিত করার এক বিপজ্জনক প্রবণতা?
সরকারের টাকা নেই? নাকি মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট আর আইটি সেলের প্রচারে খরচ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দে টান পড়ছে?
আর কতদিন সময় লাগবে? পাঁচ মাসের সরকার বলে আরও সময় চাই? আরও দু’বছর, তিন বছর? নাকি ২০৪৭ সালের বিকশিত ভারতের অপেক্ষায় সরকারি হাসপাতালের রোগীদেরও বসে থাকতে হবে?
মন্ত্রীমশাই বলেছেন, তাঁর বয়স হয়েছে, তাই তিনি মিথ্যে বলতে পারেন না। বয়সের প্রতি আমাদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের কাছে পৌঁছনো তথ্যের পরিধি যেন সংকুচিত না হয়ে যায়, সেই অনুরোধটুকু রাখব। কারণ আর জি করের অপারেশন থিয়েটারের এই তালিকাটা কোনও বিরোধী দলের বানানো অভিযোগ নয়। হাসপাতালের নিজস্ব বোর্ডে লেখা Non-Availability List।
মন্ত্রীমশাই আপনার কাছে আমাদের কোনও ব্যক্তিগত দাবি নেই। আমাদের দাবি, সরকারি হাসপাতালগুলো সচল থাকুক। রোগীরা ন্যূনতম চিকিৎসা পরিষেবা পান। চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাতে নিয়ে নিরাপদে চিকিৎসা করতে পারেন।
আর আপনার কাছে একটা ছোট্ট অনুরোধ, মাওবাদী তকমা দেওয়ার এই পুরনো অস্ত্রটা নিয়ে আর বেশি নাড়াচাড়া করবেন না। রাজ্যের মানুষ এই কৌশল বহুবার দেখেছেন। এই অস্ত্রের ধার অনেক আগেই কমে গেছে। আপনার পূর্বসূরির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেও নিশ্চয়ই কিছু শেখার আছে।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের এই N A লিস্টটি আদতে একটি উদাহরণ মাত্র। বলাই বাহুল্য, আরো একইরকম উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকারী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলিতে।
আপনি বরং হাসপাতালের এই NA List-গুলোর দিকে একটু নজর দিন। কোন জিনিসগুলো নেই, কেন নেই, কবে সেগুলো পাওয়া যাবে, তার একটা স্পষ্ট উত্তর দিন।
আমরা কোনও রাজনৈতিক তকমার লড়াই করতে আসিনি। আমরা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি চাই। আর সেই দাবিতে প্রশ্ন করা, তথ্যপ্রমাণ সামনে আনা এবং জবাবদিহি চাওয়া বন্ধ করব না।
সরকারের কাজ হাসপাতাল চালানো, প্রশ্নকর্তাদের তকমা দেওয়া নয়।













