Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

না ভালবাসার গল্প: প্রথম পলাশ

Oplus_131072
Dr. Sukanya Bandopadhyay

Dr. Sukanya Bandopadhyay

Medical Officer, Immuno-Hematology and Blood Bank, MCH
My Other Posts
  • February 18, 2026
  • 7:12 am
  • No Comments

রবিবারের দুপুরবেলায় ফ্ল্যাটের একচিলতে পুবের বারান্দায় পাতলা হয়ে যাওয়া ডগা ফাটা ভিজে চুল শুকোতে শুকোতে সে ভাবছিল, এই বছর শীতটা কষে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘায়িত হলো না তেমন। রোদের তাপ এখনই জ্বালা ধরাচ্ছে চামড়ায় — দিনমানে সোয়েটার চাদরের তো প্রয়োজনই পড়ছে না, রাতও একটা হালকা ফ্লিস কম্বলেই পার করে দেওয়া যাচ্ছে। অথচ শোবার ঘরের বাসন্তীরঙের দেওয়ালে ঝোলানো মা কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের যে ক্যালেণ্ডারটা যখনতখন দুলে উঠছে দমকা ফাগুন হাওয়ায় — তাতে এখনও জ্বলজ্বল করছে মাঘ মাস। নাহ্, এবারে এসি সার্ভিসিংএর লোকটাকে খবর পাঠাতে হবে — নয়ত টপ ফ্লোরের এই চারতলার ফ্ল্যাটে টেকা দায় হয়ে উঠবে ক’দিন পর থেকেই।

ব্যালকনির প্লাস্টিক টুল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চৌখুপি গ্রিলের মধ্যে দিয়ে সে দৃষ্টি মেলে দিল দূরে। আশপাশের আমগাছগুলো ছেয়ে গুচ্ছের মুকুল এসেছে — এই বারান্দায় খানিকক্ষণ দাঁড়ালেই তার তীব্র, মদির সৌরভ ধাক্কা মারে নাসারন্ধ্রে। নাগরিক দিগন্তরেখা এখানে অদৃশ্য, বহুতল আর মোবাইল টাওয়ারে কেবলই বাধা পায় দূরের দর্শন — তবু সে জানে, নিচের ব্যস্ত রাস্তাটা যেখানে সামনের মোড় ঘুরেছে, সেখানে আকাশের দিকে নিষ্পত্র বাহু মেলে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা নিঃসঙ্গ পলাশগাছ। বিষণ্ণ, বিধুর, একলা পলাশের উৎসবের মরশুম আসছে সামনে।

সেই কিশোরীবেলা থেকেই পলাশ তার সবচেয়ে প্রিয় ফুল। রুদ্রপলাশ। নামটা জানত না, স্যার বলেছিলেন একদিন। মাঝেমাঝে ক্লাসের শেষে নিজের অভ্যস্ত নীড়ে ফেরার আগে, এখানে ওখানে চলে যেত স্যারের সঙ্গে — অনাঘ্রাত অনুরাগের টুকরো অবকাশ খুঁজে মরতো দুটো জীবন।

ভাবতে গিয়ে হেসে ফেলে সে। দুটো জীবন? না একটা?

‘রিণি, রিণি, রিণি

কানের কাছে বাজায় বাঁশি নিশিদিনই’ —

না, তার নাম রিণি নয়। কিন্তু বাড়ি ফেরবার পথে যেদিন পার্কার পেনের বাক্সটা হাতে দিয়ে স্যার বলেছিলেন– “পরে বাড়িতে গিয়ে খুলিস”, টিটাগড়ে তাদের গঙ্গার ধারের কোয়ার্টারের বিশাল বাথরুমের নিভৃতিতে পেনবক্সটা খুলে লেখাটা পড়ে অন্যরকম ভাললাগায় ভরে উঠেছিল মন। নাম না জানা শিরশিরে অনুভূতিতে টানটান হয়ে উঠেছিল সারা শরীর — সেই অনুভূতির নাম ও তখনও জানেনি। শুধু মনে মনে জেনেছিল, প্রিয় মানুষের আদরের সম্বোধনের যথাযথ মূল্য তাকে দিতে হবে, দিতেই হবে।

ডালহৌসি পাড়ার অফিস থেকে বাটানগরের এই অখ্যাত পাড়ার ফ্ল্যাটে ফিরতে হলে তাকে খিদিরপুর ছুঁয়ে আসতে হয়। ডকের ধারে গঙ্গার খাঁড়ির ওপরের পুল পেরিয়ে যখন বাস বাঁহাতি রাস্তা ধরে, কতবার তেমাথাটায় নেমে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে — মনে হয়েছে, শিয়রে অস্তসূর্য নিয়ে পশ্চিমমুখী যে পথটা সোজা চলে গিয়েছে, সেটা কোথায় গিয়ে শেষ হলো, একবার দেখে আসে। অচেনা পথ বড্ড হাতছানি দেয় আজও। শুধু নেমে যাওয়ার কৌতূহল আর সাহস, দুটোই হারিয়ে ফেলেছে সে।

অথচ সেদিন কিন্তু সাহস ছিল। সেও এক দামাল বসন্তের দিন। কলেজ থেকে আলাদা আলাদা ভাবে বেরিয়ে দুজনেই অল্প সময়ের তফাতে এসে পৌঁছেছিল স্টেশনে। তারপর সতর্ক ভাবে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পরিচিত চোখ এড়িয়ে লোকাল ট্রেনের আলাদা আলাদা কামরায় ওঠা, পরের স্টেশনে ফের একই কামরায় একত্রিত হওয়া। কথা ছিল শিয়ালদা পৌঁছে যে কোনও বাসে যাওয়া হবে ধর্মতলা, সেখান থেকে যে দূরপাল্লার বাস প্রথম চোখে পড়বে, উঠে বসা হবে তাতেই। তারপর? তারপর মন আর সময় যেমন নির্দেশ দেবে, সেভাবেই চলবে দুজনে।

পাওয়া গেল বাগনানের সিটিসি বাস। একটু পিছনের দিকের জোড়া সিট। ধাতু আর কাঠের নিভৃত ঘেরাটোপে ঘন্টাখানেকের অলজ্জ অবকাশ। অচেনা সহযাত্রীদের কৌতূহলী, সকৌতুক দৃষ্টির আড়ালে চোখে চোখ, আঙুলে আঙুল — এত কাছ থেকে কখনও কি দেখেছিল স্যারকে? চওড়া কপালে তিনটে গভীর খাঁজ, কাঁচাপাকা গোঁফের ফাঁকে পাতলা ঠোঁটের মোচড়ে পাগল করা হাসির আভাস, ঈষৎ বাদামি চোখের মণিতে তার নিজের প্রতিবিম্ব — সে দৃষ্টির গভীরতা মাপার সাধ্য ছিল না অষ্টাদশী হৃদয়ের।

“হোক চলন্ত বাস, দুটো লাইন লিখে দিতে পারবি না আমাকে?”

“কি লিখব?”

ওর অস্ফুট প্রশ্নের উত্তরে মাস্টারমশাই বলেছিলেন– “যা খুশি। শুধু আপনি করে লেখা চলবে না”।

মসৃণ বম্বে রোডের ওপর গতিমান বাস যেমন একটুও টাল খায়নি, তেমনই পার্কার পেনও টাল খায়নি চিলতে কাগজে,

“আমি নিশিদিন তোমায় ভালবাসি, তুমি অবসরমতো বাসিও”।

বাগনানে নেমে পথের পাশের একটা হাটুরে হোটেলে অবেলায় ভাত খাওয়ার পরেই কিন্তু মনে হয়েছিল, বাড়ি থেকে কত সহস্র যোজন দূরে যেন সে এসে পড়েছে — আর বুঝি কখনও ফেরা হবে না। ফিরতে না পারার ভাবনাতে ছটফট করে উঠেছিল মন। পড়ন্ত বিকেল, ঝকঝকে হাইরোড দিয়ে অজানা গন্তব্যে ছুটে চলা অসংখ্য বাস, ট্রাক, গাড়ি তাকে আরও চঞ্চল করে তুলছিল। প্রায় শ্বাসরুদ্ধ স্বরে সে ফিসফিস করে উঠেছিল– “বাড়ি ফিরব।”

বাড়ি! বাবা, মা, ভাই আর তার বাড়ি — বাটানগরের এই দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট। বাবা নেই, মা-ও চলে গিয়েছে অনেকদিন হলো, ভাইটা পাকাপাকিভাবে অন্য রাজ্যে ঘাঁটি গেড়েছে – বিয়েও করেছে স্থানীয় মেয়েকে। টুকরো টুকরো অযত্নের গেরস্থালির মাঝে অখণ্ড, নিস্তরঙ্গ নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে এই ঠিকানায় এখন শুধু সে থাকে। স্মৃতির কাঁটাগুলো মাঝে মাঝে টিকটিক করে বিরক্ত করে অবশ্য — কে জানে, বসন্তে ওরাও বোধহয় ঋতুমতী হয়। তাই তো এই ঋতুর রঙ লাল — শিমুলের মতো, অশোকের মতো, পলাশের মতো।

এমনই আর এক বসন্তদিনে কলকাতার ভিক্টোরিয়ার বাগানে বেড়াতে এসেছিল ওরা তিনজনে। স্যারের স্ত্রী তার এলো খোঁপায় যত্ন করে গুঁজে দিয়েছিলেন রক্তরাঙা পলাশ আর স্যারকে এড়িয়ে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেছিলেন– “আমার আকাশ তোমার হোক, পাখিদের ভাষা সে-ই বোঝে।”

অবিশ্বাসে মাখামাখি, বিভ্রান্ত চোখে সে তাকিয়েছিল সেই সুন্দরী মধ্যবয়সিনীর দিকে। তিনি তখন হাসছেন। হাসিতে অশ্রুবিন্দুর মতো মুক্তো ঝরে পড়ছে বলে মনে হয়েছিল তার। তিনি হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, “এত হাসি, আনন্দ, একসঙ্গে পথ চলা, একদিন কিন্তু তুমি ঠিক ভুলে যাবে আমাদের।”

সে সবেগে তার মাথাটি নাড়িয়ে আবেগ থরথর গলায় বলে উঠেছিল, “কক্ষণো না। কোনওদিন না। এ জীবনে তা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে।”

স্যারের স্ত্রীর মুখে শেষ বিকেলের ছায়া নেমে এসেছিল মেচেতার মতো — তিনি তার চিবুক ধরে নেড়ে বলেছিলেন -“ইউ আর আ হার্ড নাট টু ক্র্যাক, তাই না?”

সে আড়ষ্টভাবে প্রশ্ন রেখেছিল– “আপনাকে কি বলে ডাকব?”

উনি একটু থমকে কেমন একটা গলায় বলেছিলেন – “ইচ্ছে হলে বৌদি বলে ডেকো” – তারপর তাঁর হাসিতে যেন জলতরঙ্গ বেজে উঠেছিল– “কি করব বলো, আমার তো কোনও আদরের নাম নেই।”

কুণ্ঠায়, অপরাধবোধে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল তার। এক ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করেছিল সেখান থেকে। তারপরেই চোখ পড়েছিল স্যারের চোখে — সানুরাগ দৃষ্টির আশ্লেষে তাকে বেঁধে ফেলে তিনি বলে উঠেছিলেন –“বাহ্, চুলে পলাশফুল দিলে তোকে তো বেশ দেখায়”!

গ্রিলের রেলিংএর বাইরে ধুলোটে সন্ধ্যে নামছে। বাতিগুলো জ্বালাতে হবে এবার। বন্ধ করতে হবে জানলা। এইসময়ে বড্ড মশার উপদ্রব হয়। বারান্দার দরজাটা বন্ধ করার আগে ধোঁয়াটে আকাশের ক্যানভাসে পলাশগাছটার দিকে নজর গেল এক ঝলক। এখনও একটা ফুলও ফোটেনি। কে জানে, ওদেরও হয়ত পাঁজিপুঁথি আছে, দিনক্ষণ রয়েছে উন্মোচনের।

বেলেঘাটার ঘিঞ্জি অঞ্চলের অপরিসর এক গলিতে স্যারের নতুন বাড়ির গৃহপ্রবেশ হলো ধুমধাম করে। বাবা রিটায়ার করে গিয়েছেন ততদিনে। ওরাও চলে এসেছে শহরতলির এই ফ্ল্যাটে তাদের নিজস্ব ঠিকানায়। কলেজ পেরিয়ে পা রেখেছে ইউনিভার্সিটির চৌকাঠে — ভাই তখনও বারো ক্লাসে, হোস্টেলে। ততদিনে মোবাইল ফোন চলে এসেছে নগরজীবনে — যদিও এখনকার মতো চ্যাপটা মুঠোফোন নয়, ঢাউস টিকিওয়ালা বাক্সমার্কা যন্ত্র — তার শ্রী না থাক, আকর্ষণ ছিল খুবই। সে অবশ্য মোবাইলের স্বাধীন মালিক হয়নি তখনও। ফ্ল্যাটে এসে একটা ল্যাণ্ডলাইন নেওয়া হলো — সেটার কর্ডলেস সেটটা রাত এগারোটা বাজলেই চলে আসত তার দখলে। ওপারে শুধু স্যার নন, প্রায়ই থাকতেন বৌদিও।

সন্ধে গাঢ় হলে এই মফস্বলী ফ্ল্যাটে একলা মানুষের সঙ্গী কেবলমাত্র একটা সবাক টিভি। ফ্ল্যাটের বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে সচল হয় টিভিসেট। আর সেও নিবিষ্টচিত্তে দেখতে আরম্ভ করে ঝলমলে রঙিন বিজ্ঞাপনের চালচিত্রে একদল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিরর্থক চাপান উতোর, রাজনৈতিক কচকচি, যত রাজ্যের খুন জখম আর রক্তাক্ত দুর্ঘটনার অন্ধকারময় সব খবর। দেখা তো নয়, মনকে ভুলিয়ে রাখার ফিকির শুধু।

আজ কিন্তু অন্যরকম একটা খবরে চোখ আটকাল। সাগরে দানা বেঁধেছে অসময়ের নিম্নচাপ। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামতে পারে দু’একদিনের মধ্যে। অকালবৃষ্টির হাত ধরে অল্প সময়ের জন্য হলেও ফিরে আসতে পারে শীত। একটু আনমনা হলো সে। কি রকম বৃষ্টি নামতে পারে? বহু বহু বছর আগে এক শ্রাবণের দুপুরে যেমন নেমেছিল শহর ভাসিয়ে?

বাবা বারণ করা সত্ত্বেও ইউনিভার্সিটি গিয়েছিল সে। পূর্বাভাস ছিলই — সেটা মিলিয়ে দিয়ে বেলা এগারোটার পরেই দশদিক কালো করে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। দুপুরের পরে তোড় একটু কমতে, সে নেমে এসেছিল পথে। স্যারের আজ ক্লাস নেই, জানে। গতকাল রাতে বৌদির সঙ্গে কথা হয়েছে ফোনে। বৌদির বাপের বাড়ি চন্দননগরে, গতকাল বিকেল থেকেই তিনি সেখানে — মায়ের শরীর খারাপ, তাঁকে দেখতে এসেছেন, ক’দিন সেখানে থেকে তারপর বেলেঘাটা ফিরবেন।

এক জান্তব, অপরিচিত আবেগে ভর করে সূর্য সেন স্ট্রিটের মোড় থেকে সে চেপে বসেছিল একটা খালি ট্যাক্সিতে –”তাড়াতাড়ি চলুন দাদা, বেলেঘাটা যাব।”

ভিজে কুঁচকে যাওয়া শহরের রাস্তাঘাট মাড়িয়ে চেনা গলির সামনে এসে দাঁড় করিয়েছিল ট্যাক্সি। তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। মুহূর্তের জন্য থমকে দ্রুত হাঁটতে আরম্ভ করেছিল চেনা বাড়িটির দিকে — ছাতা খোলারও অবসর হয়নি। বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছে কলিংবেলের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে চোখে পড়েছিল, দরজা বন্ধ নয়, হালকা করে ভেজানো রয়েছে কেবল। ভিতরে ঢুকে একফালি বারান্দা পেরিয়ে ভিতরের ঘরে যাবার দরজাটাও খোলা পেয়ে একটু অবাক লেগেছিল তার। ওপাশের বড় শোবার ঘরটা মাস্টার বেডরুম। সেটার দরজা আধখোলা। ঠেলে ঢুকতে যাওয়ার আগে চোখ আটকে গিয়েছিল পাল্লার ফাঁকে।

বাইরে কি ঘরবসত কাঁপিয়ে বাজ পড়েছিল তখনই?

নাকি মাটির মাইল মাইল গভীরে ভারতীয় প্লেট উঠে পড়েছিল মায়ানমার প্লেটের উপরে? দেওয়ালির সমস্ত চোখ ধাঁধানো আতসবাজি কি কেউ একসঙ্গে জ্বালিয়ে দিয়েছিল তার চোখের সামনে? তাই মনে হয়েছিল, সাময়িকভাবে যেন অন্ধ হয়ে গিয়েছে ও?

অথচ আত্মবিস্মৃত প্রেমাসক্ত নরনারীর তীব্র শরীরী ভালবাসা যে জগতের অন্যতম মধুর আলেখ্য, এ কথা তো যুগে যুগে সত্য। দেশে বিদেশে কবি সাহিত্যিকরা কত অনবদ্য উপমা সহযোগে সযত্নে বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন সেই প্রেমের। তবু সেই সঙ্গমদৃশ্য দেখে সে বিদ্যুদাহতের মতো কেঁপে উঠল কেন? তার হিসেবের বাইরে ছিল বলে?

অপ্রস্তুত মন এই অতর্কিত অভিঘাতে কিছুক্ষণের জন্য অনুভূতিশূন্য হয়ে গিয়েছিল। সুসংহত চিন্তা করার শক্তি বোধহয় লোপ পেয়েছিল তার। সংবিত ফিরতে দ্রুত উলটোদিকে হাঁটতে আরম্ভ করেছিল সে। সদর দরজার কাছে পৌঁছে পিছনে একটা শব্দ শুনেছিল –“দাঁড়াও, যেও না।”

বৌদি।

এলোমেলো আঁচল কোনওমতে গায়ে জড়ানো, সিঁদুর লেপটে গিয়েছে কপালে, মুখে অদ্ভুত হাসি।

কাছে এসে তার কাঁধে হাত রেখেছিলেন বৌদি। সেই স্পর্শে অল্প কম্পন টের পাচ্ছিল সে।

“খুব রাগ হচ্ছে আমার উপর?”

উত্তর দেবার ক্ষমতা ছিল না। বৌদিই বলে চললেন– “আমার মায়ের শরীর ভালই আছে — তোমাকে মিথ্যে করে বলেছিলাম যে আজ থাকব না। আসলে তোমার স্যারের সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম — জানতাম, আমি থাকছি না জানলে তুমি আসবে।”

চমকে মুখ তুলে সে দেখেছিল সেই অশ্রুবিন্দুর মুক্তোফুল দুটো টলটল করছে বৌদির দু’চোখে– “তোমার এখন তেইশ, না গো? আমার চল্লিশ বছর বয়সটার সাধ্য কি তেইশ বছরের সঙ্গে লড়াই করবে? বাজি আমি হেরেই যাব, জানি।”

নির্নিমেষ, শীতল অথচ করুণ সে দৃষ্টির সামনে আর একমুহূর্ত দাঁড়াবার সাহস হয়নি তার। ফিরে চলে আসার মুহূর্তে চোখ পড়েছিল পিছনের দরজায়। স্যার এসে দাঁড়িয়েছেন। চিত্রার্পিত। তাকিয়ে রয়েছেন তার দিকে। কি নেই সেই দৃষ্টিতে? বিপন্নতা, হতাশা, বিস্ময়, কামনা মেশানো সেই কিম্ভূত পঙ্কিল দৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে তার মনে হয়েছিল সে যেন বহুদিনের পূরীষচিহ্ন মাখা অপরিষ্কার একটা কমোডের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে — তীব্র বিকর্ষণে সংকুচিত হয়ে উঠেছিল অন্তরাত্মা, শরীর গিলে নিয়েছিল উপচে ওঠা অন্ধ আবেগ, আসঙ্গলিপ্সা পরিণত হয়েছিল বিবমিষায়।

অথচ কেন? দুটি বৈধ মানুষের দেহজ প্রেম কি তার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল? নাকি বিশ্বাস ছিল, যা তার চোখের আড়ালে, সেখানে কিছু ঘটে না কখনো, ঘটতেই পারে না।

“তুই একটা রাণীর মতো মেয়ে — কতদিন জড়িয়ে থাকবি এই পরিণতিহীন সম্পর্কে?” — কোনও এক মায়াবী সন্ধ্যায় দু’জনেরই পরিচিত কলেজি বান্ধবীর বিয়ের নিমন্ত্রণের ফাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন স্যার। তার পরনে ছিল নীল বেনারসী, স্যারের চোখে বিষাক্তনীল মুগ্ধতা।

কাজলটানা দীঘল চোখের কোণে তৃষ্ণা লুকিয়ে অস্ফুটে বলে উঠেছিল সে– “আজীবন থাকব। চাই না কোনও পরিণতি। এই আমার ভাল, এতেই আমার সুখ।”

ততদিনে বন্ধুমহলে ভালই চাউর হয়ে গিয়েছে তাদের অসম প্রেমের আজব কিসসা। কনের সাজে সালঙ্কারা বান্ধবীও সেদিন মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল তার দিকে– “এবার একটা সিরিয়াস প্রেম কর তুই। আর কতদিন লটকে থাকবি শুড্ডাটার সঙ্গে?”

অভিমানী ঠোঁট মুচড়ে সে বলেছিল– “মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সেই কেউ বুড়ো হয় বুঝি? কতটা সৌম্য দেখতে ওকে, সেটা তোর নজরে পড়ে না? এবার একটা চশমা নে, বুঝলি?”

সত্যিই, এতটাই বোকা ছিল সে? এত অপরিণত, অবাস্তববাদী, স্বপ্নচারিণী মেয়ে? আজও বোধহয় সম্পূর্ণরূপে এর উত্তর পাওয়া হয়ে উঠল না তার।

সদরদরজা হাট করে খুলে জল সপসপ পথে পা রেখেছিল যান্ত্রিকভাবে। নিকাশি উপচোনো জলে রাস্তা থইথই করছে তখন। সেই জল ঠেলে কিভাবে বড় রাস্তায় পৌঁছেছিল আজ আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। যে বাস সামনে পেয়েছিল, উঠে বসেছিল তাতেই — বাসস্ট্যাণ্ডে অপেক্ষা করার প্রবৃত্তি হয়নি।

তারপর? তারপর চেনা পাঠ্যবইয়ের পাতা উলটে যাওয়ার মতো, একঘেয়ে পুনরাবৃত্তির মতো কেটে গিয়েছে চমকহীন তিরিশটা বছর। তিরিশবার বসন্তমতী হয়েছে ধরিত্রী — নিষ্ফলা।

রবিবারের পর একরাশ কর্মচঞ্চলতা নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসে সোমবারের সকাল। সে ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে একতলায় নামে। ন’টা পনেরোর বাসটা ধরতে পারলে সময়মতো পৌঁছনো যায় অফিসে। কবজি উলটে ঘড়ি দেখে — ন’টা সাত। টার্মিনাস ওর ফ্ল্যাটবাড়ির কোণাকুণি — রাস্তাটা পেরোতে হবে শুধু। আহ্, জানলার ধারের সিট পেয়ে যাবে মনে হচ্ছে আজ।

পেয়েও গেল।

সকালে স্নান সেরে বারান্দায় কাচা জামাকাপড় মেলতে গিয়ে দেখেছে মোড়ের মাথার গাছটার ন্যাড়া ডালগুলো ফুলের মুকুট পরেছে — মরশুমের প্রথম পলাশ ফুটেছে, গাছ সেজেছে নববধূর মতো। মনটা তার বড় প্রসন্ন তাই — আজ হয়ত সবকিছুই মনোমত হবে। নতুন করে কিছুই হওয়ার নেই যদিও।

বাসের জানলা দিয়ে দু’চোখ ভরে দেখে সে — ধূসর প্রতিবেশ আলো করে পলাশ ফুটেছে। দু’একটা পড়েও রয়েছে গাছের নিচে, রাস্তার উপরে। অফিসে চলেছে — এখন তো হবে না, ভাবল ফেরার সময় কুড়িয়ে নেবে কয়েকটা — বাড়িতে সাজিয়ে রেখে দেবে পোর্সেলিনের ফাটা প্লেটে। মনের মধ্যে গুনগুন করে ওঠে কবেকার হারিয়ে যাওয়া সুর —

‘লাল লাল পলাশ ফুটেছে,

দোল দোল ভোমরা জুটেছে,

আকাশে আর বাতাসে কার কানাকানি শোনা যায়’ —

কানফাটানো ইলেকট্রিক হর্ন বাজিয়ে, তীব্রগতিতে একটা লরি চলে গেল উলটোদিকে — চটকা ভেঙে গেল ওর। চমকে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল, ও কি? অত রক্ত কেন রাস্তায়? চাপচাপ, দলা দলা রক্ত! কাকে চাপা দিয়ে চলে গেল লরিটা? ভুল ভাঙল সঙ্গে সঙ্গেই। কাউকে চাপা দেয়নি তো! পথে পড়ে থাকা বৃন্তচ্যুত ফুলগুলোর উপর দিয়ে ব্যস্তসমস্ত চাকা চালিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে লরি – যেমন যায়।  জাত কি আপকো খালি কিয়া

কালো পিচের রাস্তা আলো করে, দলিতমথিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মরশুমের প্রথম পলাশ — চিরদিনের মতো।

PrevPreviousঅভয়া মঞ্চের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি কি?
Nextআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনNext
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

আইনী আপডেট

March 15, 2026 No Comments

গত নভেম্বর থেকে কলকাতা হাইকোর্টে অভয়ার মামলা ৩৫ বারের ও বেশি তালিকাভুক্ত হলেও একবারও কার্যকর শুনানি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অসহ্য বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রিতার

ভারতের শহরের বিপন্ন বায়ু এবং নাগরিক স্বাস্থ্য

March 15, 2026 No Comments

এ দেশের দূষণ এখন আম নাগরিকদের সহনসীমাকে ছাপিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আজকাল আমরা সকলেই আর খুব বেশি ভাবিনা,সব কিছুই কেমন গা – স‌ওয়া হয়ে গেছে

আবার এক সংগ্রামী বন্ধুর চিরবিদায়!

March 15, 2026 No Comments

আবার এক বন্ধুর বিয়োগ ঘটলো আমাদের। ‘আমাদের’ – মানে সরকারবিরোধী সংগ্রামী জনতার। বিশেষভাবে শ্রমিক তথা মেহনতী শ্রমজীবী মানুষের রুটি রুজির লড়াইয়ে দীর্ঘদিনের অবিচল সাথী কমরেড

দিল্লীর যন্তর মন্তরে অল ইন্ডিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি সুভাষ লাম্বার বক্তব্য

March 14, 2026 No Comments

জেনে নেবেন

March 14, 2026 No Comments

কখনো আমার প্রপিতামহকে দেখলে প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস জেনে নেবেন আর্যরা বহিরাগত ছিলেন কিনা মনুদেব তখনো বৌ পেটাতেন কিনা জেনে নেবেন কখনো আমার পিতামহকে দেখলে পরাধীন

সাম্প্রতিক পোস্ট

আইনী আপডেট

West Bengal Junior Doctors Front March 15, 2026

ভারতের শহরের বিপন্ন বায়ু এবং নাগরিক স্বাস্থ্য

Somnath Mukhopadhyay March 15, 2026

আবার এক সংগ্রামী বন্ধুর চিরবিদায়!

Dipak Piplai March 15, 2026

দিল্লীর যন্তর মন্তরে অল ইন্ডিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি সুভাষ লাম্বার বক্তব্য

Abhaya Mancha March 14, 2026

জেনে নেবেন

Aritra De March 14, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

613224
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]