অভয়া মঞ্চের দিল্লি অভিযান নিয়ে কিছু অনুভব, কিছু কথা: সুদূর জলপাইগুড়ি শহর থেকে আজ দুপুর বেলা ট্রেনে দিল্লি নেমে, সোজ বাসস্থানে উঠলাম। ওখানেই দিল্লি অভিযান উপলক্ষে আমাদের সকলের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা!
দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ সভা ও সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে লাখো স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি তুলে দেওয়ার জন্য আমরা এসেছি দেশের রাজধানীতে।
এর আগে দিল্লি বার চারেক আসা হলেও, এইরকম উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথম আসা। দিল্লির যন্তরমন্তর চত্ত্বরে এই রকম বিক্ষোভ প্রদর্শনে অংশ নেওয়া আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা।
এই যন্তর মন্তর চত্ত্বরে যেভাবে আমরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংগঠিত করলাম, তার মধ্য দিয়ে এক বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম!
প্রথমেই দেখলাম, যন্তর মন্তরে যে জায়গায় আমরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করবো, সেখানে ঢুকবার সময় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা যারা ভেতরে ঢুকছেন, প্রায় সকলের দেহ সার্চ করে করে ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন। সি. আর. পি. এফ., সি. আই. এস. এফ. জওয়ান গিজ গিজ করছে। সবাই একেবারে বেশ গম্ভীর মুখে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দন্ডায়মান! অপরাহ্ন দুটো থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ঐ নির্দিষ্ট স্থানেই অভয়া মঞ্চ বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে পারবে বলে অনুমতি হয়েছে।
রাস্তার দুই ধারই পুরো দুই মানুষ সমান ব্যারিকেড আছে, ঐ নির্দিষ্ট সংখ্যক (যার উপস্থিতির সম্ভাব্য নির্দিষ্ট সংখ্যা আগে জানাতে হয়েছে)।
ঐ উঁচু ব্যারিকেডের পর দুই স্তরীয় লোহার রেলিং। বাইরের কোনো সাধারণ মানুষের আমাদের প্রতিবাদ দেখবার কোনো সুযোগ নেই!
যেখানে সভা অনুষ্ঠিত হলো, তার আশেপাশেও নীল রংবেরঙের পোশাক পরে পুরুষ ও মহিলা নিরাপত্তা রক্ষী বলতে গেলে গিজগিজ করছে! আমার তো প্রথমে সব দেখে ভেতর ভেতর একটা চাপা উত্তেজনাও তৈরী হয়ে গেছিলো। আমরা যে কয়জন এসেছি, দিল্লির কিছু সংগঠনের প্রতিনিধিরা, কিছু প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ওখানে উপস্থিত।
যখন ওখানে বিভিন্ন কর্মসূচি- বক্তৃতা, গান, আবৃত্তি হচ্ছিল, সাদা পোশাকের নিরাপত্তা রক্ষীরা অংশগ্রহণকারীদের আলোচনা পাশ থেকে শুনছিলেন। ওখানে বেশ কয়েকটা মাইকের চোঙ, সামগ্রিক সাউন্ড সিস্টেম, চেয়ার, অস্থায়ী মঞ্চ সবকিছু দিল্লি প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে তাদের অনুমোদিত ঠিকেদার লাগিয়ে দিয়েছেন। এর জন্য সামগ্রিক ভাবে বেশ ভালো রকমের অর্থ আমাদের দিতেও হয়েছে ‘ফি’ বাবদ। পাঁচটা বাজবার পাঁচ / দশ মিনিট আগেই ঐ নিরাপত্তা রক্ষীদের ক্যাম্প থেকে আমাদের মাইক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বলা হলো। এক মুহূর্ত সময়ও অতিরিক্ত নেওয়ার কোনো উপায় নেই! অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পর, সাথে সাথে নিরাপত্তা রক্ষীরা তড়িৎ গতিতে আমাদের বাইরে বের করে দিলেন।
এই রকম জবরদস্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাটোপে কোনো বিক্ষোভ কর্মসূচিও যে হতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে! নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজনেরা সম্পূর্ণ কর্মসূচি চলাকালীন সময়টা যেভাবে পজিশন নিয়ে থাকলেন, তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি!
যত সংখ্যক নিরাপত্তা রক্ষী যেভাবে কঠোর পরিশ্রম করে পাহারা দিলেন; তাতে মনে হচ্ছিলো, আমরা দেশবিরোধী নিষিদ্ধ কোনো জঙ্গী গোষ্ঠির সদস্য / সদস্যা!
একবার মনে হলো, অভয়া মঞ্চের কর্মসূচি জন্যই এত নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে আসা হয়েছে! খোঁজ নিয়ে জানলাম, বিষয়টি এরকম নয়। যে কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের অনুমতি প্রাপ্ত কর্মসূচি চলাকালীন সময়েই এরকম বহুমুখী নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে।
এও এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা! রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদ, রাষ্ট্রের সরাসরি তদারকিতে প্রতিবাদীদের বা বিরোধ প্রদর্শনকারীদের কর্মসূচি পালন করতে হবে, এটাই নাকি এখন কার সরকারি নীতি! দেশের রাজধানীর কোনো রাস্তায়, পার্কে কোনো প্রতিবাদ প্রদর্শন, বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা বেআইনী। কোনো বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচি সরাসরিভাবে দিল্লির রাস্তায় করবার প্রথা বিলুপ্ত।
১৯৭৫ সালে দেশে (১৫ ই জুন) ভারতবর্ষের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ৺ইন্দিরা গান্ধী জরুরী অবস্থা জারি করে গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরেছিলেন। হ্যাঁ এটা ঠিক ঐ সময় একের পর এক গণতন্ত্র বিরোধী সিদ্ধান্ত এসেছিলো, জরুরী অবস্থার সময়। এখন তো দেশে জরুরী অবস্থা জারি না করেই নাগরিক অধিকার ক্রমাগত খর্ব করা হচ্ছে! এ কোন ভারত? এই’ বদ্ধ ভারত’ তো আমার দেশ নয়!
রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনার প্রত্যক্ষ নির্দেশিকা ও নিয়ন্ত্রণেই সাধারণ নাগরিকদের প্রতিবাদ সংগঠিত হতে হবে, এই পথ আমাদের দেশে নতুন। রাজ্যের সরকার ও কেন্দ্রের সরকার – এই দুইয়ের মধ্যে গুণগত পার্থক্য আছে কি?
এক অঘোষিত জরুরী অবস্থা, এক আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরী করে পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখবার পদ্ধতি আগেকার রাজা- মহারাজা, জমিদার, জায়গিরদার, জোতদার, মহাজনদের সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকেও যেন কঠোর, ভয়ানক।
দেশের রাজধানীর মাটিতে দাঁড়িয়ে অভয়া’র ন্যায়বিচারের দাবীর কথা, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সি. বি. আই. এর ব্যর্থতার কথা সাধারণ নাগরিকদের আজ বলবার সুযোগ নেই! এ কোন গণতন্ত্রের অনুশীলন?
সত্যি কথা বলতে কি আজ এই জিনিস প্রত্যক্ষ করে, মনের ভেতরটা কূঁড়ে কূঁড়ে খাচ্ছে! এক অজানা ভয়, অনাগত দিনের আরও ভয়ানক অবস্থার কথা মনে আসছে !
একদিকে রাজ্য প্রশাসনের দোদুল্যমানতা, অন্যদিকে কেন্দ্রের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা….. অভয়া’র ন্যায় বিচার পাওয়ার দাবী হারিয়ে যাবে না তো? প্রশ্ন জাগে মনে।
গণ আন্দোলন, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদী আন্দোলনকে যেভাবে প্রাদেশিক, জাতীয় স্তরে আটকে রাখবার এই জাতীয় কদর্য রূপ ফুটে উঠছে তার পরিণতি কোথায়? এরকম একটা জটিল, কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দল-নিরপেক্ষ সকলের প্ল্যাটফর্ম অভয়া মঞ্চকে সংগঠিত করবার কঠিন কাজ করতে হবে। এই রূঢ় বাস্তবটা বুঝে নিতে হবে। এক কঠিন কাজ, এক অসাধারণ বিকল্পের অনুশীলনের কাজ ফেলে দিয়ে আমাদের মন বিক্ষিপ্ত হচ্ছে, আমাদের মূল লক্ষ্য থেকে ফোকাস সরানোর রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার মধ্যে অভয়া আন্দোলন আমাদের পরিচালনা করতে হবে। আমাদের এক ফোঁটা লঘু, হালকা পদক্ষেপ প্রতিপক্ষকে স্বস্তি দেবে, তাদের শক্তিশালী করবে – এই বোধ আমাদের কমতে থাকলে আরও বিপদ বাড়বে।
এখনও যেমন, পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে প্রতিবাদটুকু করা যাচ্ছে, কিছুটা হলেও বলা যাচ্ছে, এই ভাবে চলতে থাকলে আগামীতে এই বলাটুকুও উঠে যাবে, তখন? পরিস্থিতি ভাবলেই কেমন লাগছে মনের ভেতর! একটা চাপা ভয় গ্রাস করে।
অভয়া’র ন্যায়বিচারের লড়াই, তাড়াতাড়ি আমরা জিতবো না, জিততে দেবে না। আক্রমণ আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠবে। পাশাপাশি আমাদের প্রতিআক্রমণ তথা লড়াই আরও সংগঠিত ভাবে করতে হবে। নিছক প্রতিবাদ, প্রতিবাদের নামে আনুষ্ঠানিকতার ব্যক্তি প্রদর্শন করার মধ্যবিত্ত ঝোঁক পরিত্যাগ করতেই হবে। অভয়া মঞ্চের কাজে আমাদের আরও আরও ব্যাপকভাবে সাধারণের কাছে যেতে হবে। আজ রাজ্যের হাজার হাজার মানুষের কাছে অভয়া মঞ্চ এক বিশ্বাস, আস্থার আলাদা স্বকীয় বিশিষ্টতার জায়গায় কিছুটা হলেও পৌঁছেছে….. এটাকে চোখের মণির মতো রক্ষা করে, শাণিত চেতনায় বলীয়ান হয়ে, “হাজার হাজার” কে “লাখো – লাখো” তে পরিণত করতেই হবে – আর কোনো বিকল্প নেই!
০৮ /০৩/২০২৬










