
পুজোর সময় কে আর ঘরে বসে থাকতে চায়? সকলেই চারপাশে আলোর ঝলকানি আর রাস্তায় মানুষের আনাগোনা দেখে পতঙ্গের মতো বাইরে বেরিয়ে পড়ে। আমিও বেরিয়ে পড়ি। সঙ্গে অবশ্য আমার ছায়া সঙ্গীনী মহোদয়াও ছিলেন। গন্তব্য আমার সাবেক পাড়া। সেখানে এবার পুজোর মেলা ধুমধাম, থিমের হাত ধরে নতুন করে চেগে ওঠার প্রচেষ্টা – পুকুর জুড়ে প্যান্ডেল, নতুন শিল্পীর হাতে মাতৃমূর্তির নব রূপায়ণ,আলোর ঝলকানি, ভিড়ে ভিড়াক্কার। ওখানে পৌঁছে বেশ ঠাওর করতে পারলাম ‘জমানা বদল গয়া’।
ফেরার পথে এক অবাঞ্ছিত ধুন্ধুমার কাণ্ডের সাক্ষী হতে হলো। আসলে পুজোর সময় এমন আসুরিক পুস্তক দহন পর্বের সাক্ষী হতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। বই নিয়ে বাঙালিদের একটা দুর্বলতা আছে। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে তবে প্রতিবাদ করার জন্য খুব বেশি মানুষ জুটবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
এমনই এক বিয়োগান্তক, মনখারাপ করে দেওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতে গৌড়া মশাইয়ের গপ্পোটা শুনতে মোটেই খারাপ লাগবে না। আঙ্কে গৌড়া জী কর্ণাটক রাজ্যের মানুষ। এই বছর ‘Unsung Hero’ বা ‘অবন্দিত নায়ক’ হিসেবে রাষ্ট্রিয় খেতাব পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছেন। প্রশ্ন হলো কি তার কৃতিত্ব?
৭৫ বছরের এই কন্নড় মানুষটি ২০,০০০,০০ বইকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তাঁর তৈরি ‘পুস্তক মানে’ বা ‘বুক হাউসে’। তাঁর এই বিপুল সংখ্যক বইয়ের সংগ্রহশালা তথা গ্রন্থাগারটি দেখতে চাইলে আমাদের যেতে হবে কর্ণাটকের মান্ডিয়া জেলার পান্ডভাপুরা তালুকের হারালাহাল্লি গ্রামে। হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন গ্রামে যেতে হবে আমাদের সবাইকে এই অতলান্ত জ্ঞানসমুদ্রে অবগাহনের জন্য।
গৌড়া জী শুরু করেছিলেন খুব সাধারণভাবে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় একজন বাস কন্ডাক্টর হিসেবে। পরবর্তী সময়ে পান্ডভাপুরাতেই একটি চিনি ফ্যাক্টরিতে সামান্য টাইম কিপারের কাজে যোগদান করেন। স্বল্প বেতন, কিন্তু সেখান থেকে পয়সা বাঁচিয়ে বই কিনতে শুরু করেন । বই সংগ্রহের নেশায় তিনি মাইশূরুতে থাকা নিজের জমি বিক্রি করে দেন। এখানেই শেষ নয়। অবসরের পর কোম্পানির পক্ষ থেকে পাওয়া টাকার সিংহভাগ বই কিনতে খরচ করেন। ভবিষ্যতে কিছু পাবার জন্য নয়,বইয়ের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা থেকেই তিনি এই সংগ্রহের কাজ করে গেছেন নীরবে নিভৃতে।
পান্ডভাপুরা তালুকের চিনাকুরলি গ্রামে আঙ্কে জীর জন্ম। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি স্থানীয় সান্ধ্য কলেজে পড়াশোনা করে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পড়ে করসপন্ডেন্স কোর্সের মাধ্যমে কানাড়া ভাষায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠ সমাপ্ত করেন।
আঙ্কে জীর সংগ্রহে রয়েছে জ্ঞানের বহু বিচিত্র সম্ভার। সাহিত্য,বিজ্ঞান, প্রযুক্তি,পুরাণ এবং দর্শনের বইপত্র। রয়েছে বহু পুরনো ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি যাদের মধ্যে ১৮৩২ সালের দুর্লভ নথিও রয়েছে। আঙ্কে জীর সংগ্রহে ঠাঁই পেয়েছে বিভিন্ন ভাষার প্রায় ৫০০০ অভিধান। সংগ্রহ করে রেখেছেন নানান বিদেশি ভাষার ৫০,০০,০০ গ্রন্থ।বইকে যত্ন করে রাখতে হয় কেননা প্রতিটি বইয়ের মধ্যেই আগলে রাখা রয়েছে মানুষের অগ্রযাত্রার মর্মবাণী।এ যে এক অনন্য পরম্পরা। যে বা যারা বইকে নষ্ট করে তাঁরা এই অনন্য ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করতে চায়। নিজেদের অজ্ঞানতাকে আড়াল করার এ এক অপচেষ্টা।
আঙ্কে গৌড়া জী কোনোদিনই চাকরিসূত্রে বিপুল অর্থ কামান নি। কন্ডাক্টর থেকে টাইম কিপার – কতোই বা বেতন ? কিন্তু সেই সামান্য আয়ের থেকেই একটু একটু করে অর্থ বাঁচিয়ে পছন্দের বই সংগ্রহ করে গেছেন। এই নেশায় মেতে থাকতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিতেও সামান্য কুন্ঠাবোধ করেননি আঙ্কে জী। তাঁর একমাত্র ভাবনা ছিল এই সংগ্রহ পড়ুয়াদের কাজে লাগবে। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে দেখে আঙ্কেজী তৃপ্ত।
আজ শেষ করবো কবি হুমায়ুন আজাদের লেখা একটা ছোট্ট কবিতা দিয়ে —
যে– বই জুড়ে সূর্য ওঠে
পাতায় পাতায় গোলাপ ফোটে
সে বই তুমি পড়বে।
যে – বই জ্বালে ভিন্ন আলো
তোমায় শেখায় বাসতে ভালো
সে বই তুমি পড়বে।…..
আলো আর ভালোবাসা ছেড়ে অন্ধকারে ডুবে যাবো কোন দুঃখে? মানুষ যে আলোর পথযাত্রী। আঙ্কে গৌড়া আমাদের সেই কথাই শিখিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। তাঁকে প্রণাম।
তথ্যসূত্র – দৈনিক সংবাদপত্র।












