সার্জিক্যাল স্ট্রাইকেরএর সময় পাকিস্তানে ডায়াপারের বিক্রি বেড়ে গিয়েছিল।
#একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, নকশালবাদ আর সন্ত্রাসবাদের ছায়া…আমরা সবাই সংকল্প নিয়েছিলাম অনেক হয়েছে অত্যাচার এবার মোদী সরকার।
#৫০০ বছর অপেক্ষার পর আমাদের রামলালার মন্দির কে নির্মাণ করিয়েছেন?
মোদিজী। তাহলে সবাই একসাথে বলুন জয় শ্রী রাম জয় শ্রী রাম।
না, কোন নির্বাচনী ইশতেহার নয়, এই উদ্ধৃতি গুলি একটি নাটকের – নাম ‘নমো সেবা’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি জয়গাথা। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি স্কুল এবং কলেজগুলিতে এই নাটকটি সরকারি মহল থেকে পাঠানো হয়েছে। কোন সরকারি নির্দেশনামা বেরোয়নি, উচ্চশিক্ষা দফতর থেকে জয়েন্ট ডিপিআই মারফৎ গুগল ফর্ম পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে কবে নাটকটি কলেজে অভিনীত হবে। জয়েন্ট ডিপিআইদের উপর নির্দেশ আছে গুগল ফর্মে সংগৃহীত তথ্য উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর। উচ্চতর কর্তৃপক্ষ কারা সেটা অবশ্য ফর্মে বলা নেই। করতে চাওয়া বা না চাওয়ার অপশন নেই। কবে এই নাটক অভিনীত হবে সেই তারিখটি প্রতিষ্ঠান গুগল ফর্ম মারফৎ জানানোর নির্দেশ পেয়েছে।
ভক্তিরসে ভেজা ভারতের মাটিতে কোন ধর্মীয় গুরু, শিল্পী সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের কেন্দ্র করে কাল্ট তৈরির প্রবণতা স্বভাবতই বেশি। আধুনিক ভারতে রূপালী পর্দার জগত থেকে আসা দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এম জি রামচন্দ্রন বা জয়ললিতার রাজ্যের দিকে তাকানো যাক। চলচ্চিত্র অভিনেতা থেকে প্রথম কোনো রাজ্যের পরিচালক হওয়ার ইতিহাস নির্মাতা এম জি রামচন্দ্রন ১৯৭৭ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন। শিশুদের জন্য মিড-ডে মিল প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি রাজ্যের শিক্ষা ও পুষ্টি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। যৎসামান্য মূল্যে খাবার যোগান দেবার জন্য ‘আম্মা ক্যান্টিন’, পরিত্যক্ত শিশুকন্যাদের সুরক্ষার জন্য ‘থোত্তিল কুলান্দাই’ প্রকল্প খ্যাত জয়ললিতা ও তামিলনাড়ুতে এক আইকনে পরিণত হয়েছিলেন। জন হিতৈষণা ও সাংস্কৃতিক জগতে শুধু নয়, রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এম জি আর বা আম্মা কাল্টের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে , ছাত্র যুব দের বিনামূল্যে ল্যাপটপ দান এবং অন্যান্য বিভিন্ন অনুদান প্রকল্পে জয়ললিতার সুসজ্জিত ছবি এবং আম্মা ব্র্যান্ডের ব্যবহার অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ তৈরি করেছিলেন দুজনেই। এম জি আর এর ক্ষেত্রে সিনেমার পর্দা এবং রাজনৈতিক জীবনের ইমেজের মধ্যে সীমারেখাটা প্রায়শই অদৃশ্য হয়ে যেত। সমস্ত সরকারি এবং এ আই ডি এম কে র দলীয় প্রোপাগান্ডার শীর্ষে থাকতো এম জি আর বা জয়ললিতার নাম এবং ছবি। দুজনেই শেষ দিন পর্যন্ত ক্ষমতা এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। তাঁদের জীবন নিয়ে তাঁদের জীবদ্দশাতেই বা তার পরে প্রশস্তি কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু এহেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা এবং নেত্রীর আমলেও সরকারি কোন নির্দেশনামায় তাঁদের জীবনকাহিনী নিয়ে নাটক লিখে স্কুল কলেজে পাঠিয়ে অভিনয় করতে বলা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আম্মা ক্যান্টিনের মত ৫ টাকায় ‘মা আহার’ চালু করেছিলেন। কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি সরকারি জনকল্যাণ প্রকল্পে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকর্ষণীয় ছবি বাংলার নতুন আইকন নির্মাণের চেষ্টা করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর পদকে ছাপিয়ে গিয়েছিল ব্যক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমেজ। সরকার বা মুখ্যমন্ত্রী নয়, ‘দিদি’র অনুপ্রেরণাই চালিকা শক্তি – এই ধারনা সরকারিভাবেই প্রচার করা হত। পুরুলিয়া জেলা স্কুলে ‘কন্যাশ্রী উন্নয়ন’ নামে একটি নাটকও অভিনীত হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কলকাতার ‘লোকবন্দনা অপেরা’ নামক যাত্রা দল ‘মমতার ডাকে দিল্লি চলো’ নামে একটি বিশেষ যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করেছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার ও কোন নাটকের স্ক্রিপ্ট পাঠিয়ে স্কুল কলেজে অভিনয় করতে বলেনি। এম জি আর, জয়ললিতা বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় – তিনজনের জন্মদিন দলগতভাবে পালিত হলেও সরকারি ভাবে পালিত হত না। ২০১৭ সালে তামিলনাড়ু সরকার এম জি আর-এর ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথমবার ১৭ জানুয়ারিকে রাজ্যজুড়ে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে তামিলনাড়ু সরকার ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে সরকারিভাবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে। জয়ললিতার মৃত্যুর পর তামিলনাড়ু সরকার তাঁর জন্মদিনটিকে সরকারি স্বীকৃতি দেয় । ২০২০ সালে তৎকালীন এআইএডিএমকে সরকার ঘোষণা করে যে প্রতি বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি জয়ললিতার জন্মদিনটি সরকারি উদ্যোগে “রাজ্য মহিলা ও শিশু সুরক্ষা দিবস” হিসেবে পালন করা হবে। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ইডাপ্পাদিকে পালানিস্বামী ঘোষণা করেন যে এখন থেকে জয়ললিতার জন্মবার্ষিকী প্রতি বছর সরকারি উৎসব হিসেবে উদযাপিত হবে।
এবার বর্তমান সময়ে ফেরা যাক। জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে সাধারণ মানুষকে ঘরে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ক’টা প্রদীপ জ্বলেছিল জানা নেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ৭০ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানো এবং স্কুলের ছাত্রদের জ্বালানোর জন্য প্রদীপ বিতরণ করার কথা ছিল। পনেরো দিন ধরে সেবা পক্ষ চলবে জানা গেছে। রক্তদান শিবির, স্বচ্ছতা অভিযান এবং বৃক্ষরোপণের মতো জনকল্যাণমূলক কাজ হবার কথা। এর সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে স্কুল-কলেজের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি- নরেন্দ্র মোদির জীবনের নানা দুর্ধর্ষ কর্মকাণ্ডের বিবরণ- ‘নমো-সেবা’ নাটক। একটি চরিত্র হিসেবে মোদী স্বয়ং উপস্থিত আছেন। মঞ্চে মোদী বলেন “সৌগন্ধ আমাকে এই মাটির, আমি দেশ মিটতে দেব না, আমি দেশ ঝুঁকতে দেব না!” এ আই দিয়ে অনুবাদ করা এই বাংলা ছাত্রছাত্রীরা কতটা বুঝবে সেটা জানা নেই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী থেকে অবতারে রূপান্তরের পথে পা বাড়াতে ভাষার দুর্বোধ্যতা বাধা হবেনা। ঠিক যেমন বেহালায় ১২০ নম্বর ওয়ার্ডের রায়নগর ময়দানে দেড় ফুট লম্বা
বিশ্বকর্মার পিছনে প্রধান পূজারী নরেন্দ্র মোদীর আট ফুট লম্বা কাট আউট সনাতনী পুজোর বিশুদ্ধতা নষ্ট করবে না।
SIR কাণ্ডে ভারত জোড়া তোলপাড়। এর মাঝে খবরের কাগজের হেডলাইন হয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না নমো সেবার খবর। স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্ররা সরাসরি কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করে তিরস্কৃত হয়েছে। কোন কলেজেই কেউ স্বেচ্ছায় করতে চাইছে না। কর্তৃপক্ষ গুগল ফর্মেই ত্রস্ত। অনিচ্ছুক ছাত্র ছাত্রীদের বোঝানো হচ্ছে এটা না করলে কলেজের সমূহ বিপদ। তাই কলেজের ভবিষ্যতের স্বার্থে প্রয়োজন আনুগত্য!
বাংলা এবং ভারত এক অভূতপূর্ব সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে। নতুন কাল্ট, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নতুন জাতীয়তাবাদ। সুভাষচন্দ্রের বদলে শ্যামাপ্রসাদ, জনগণ-ঐক্য-বিধায়ক ভারতভাগ্যবিধাতার পরিবর্তে ‘বহুবলধারিণীং নমামি তারিনীং রিপুদলবারিণীং মাতরম্/ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী… নমামি ত্বাম্’। তৈরি হচ্ছে আনুগত্যের নতুন পাঠ। নবনির্মিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমশ গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় সংবিধানের বিপরীত অভিমুখে যাত্রা করছে। একদিকে সংবিধান, অন্যদিকে বিকশিত ভারতের নতুন সংস্কৃতি। দুই মেরুর মাঝখানে আছেন দেশের মানুষ। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের জনগণই ঠিক করবেন ঘোর তিমিরে কোন মেরুকে তাঁরা বেছে নেবেন।











