দীর্ঘদিন সন্দীপ ঘোষ জেলে থাকায় তার সাম্রাজ্য চালনার জন্যে তার উত্তরসূরি বিরূপাক্ষকে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বানানোর অপচেষ্টা আপাতত আটকে গেল!
সার্বিক রোষের মুখে পড়ে নিয়োগের নোটিশ চলে আসার পরেও সেই নোটিশ আপাতত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হল ওয়েস্ট বেঙ্গল হেল্থ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড!
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সেই এক বছর আগেই বলে দিয়েছিলেন অবশ্য যে কারুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে সে অভিযুক্ত নয়, (অভিযুক্ত বলতে গেলেও স্বয়ং তাঁর অনুমতির প্রয়োজন।) তার চূড়ান্ত নিদর্শন দেখা গেল সাম্প্রতিক এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে নিয়োগের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে। প্যাথলজি বিভাগের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে যারা নিয়োগ পাবেন সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করছে বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের নাম।
এক জন সিনিয়র রেসিডেন্ট যে গত বছর থেকে বহু অভিযোগে দোষী হয়ে সাসপেন্ডেড রয়েছে স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে সে কীভাবে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে আদৌ ইন্টারভিউ দিতে পারল? আর ইন্টারভিউ দিতে পারলে তো নিয়োগ বোধ হয় পাকাপোক্তই ছিল, কারণ সেই রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাথায় বসে আছেন গড ফাদার সুদীপ্ত রায়। (প্রসঙ্গত এই সুদীপ্ত রায় বহু বিতর্কিত ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিল এর ও চেয়ারম্যান, এবং অভীক – বিরূপাক্ষ দের সেখান থেকেও সাসপেন্ড করার পরেও আবার বরণ করে এনেছিলেন তিনিই)। একজন ক্রিমিনাল, যার বিরুদ্ধে তোলাবাজি থেকে শুরু করে গুরুতর অভিযোগ আছে, স্বাস্থ্যভবন অবধি যাকে বাঁচাতে না পেরে সাসপেন্ড করতে বাধ্য হয়েছিল, সেই নাকি এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হতে চলেছিল!
অভয়া কান্ডে এই কীর্তিমান এর ভূমিকা নিশ্চয়ই বাংলার মানুষ ভুলে যান নি, তবু মনে করিয়ে দেওয়া, কারণ স্মৃতি সততই দুর্বল! এই সেই মহামানব যে বর্ধমান মেডিকেল কলেজে কর্মরত হয়েও জাদুমন্ত্র বলে আর জি করে অভয়ার মৃতদেহের কাছে পৌঁছে গেছিল ৯ই আগষ্ট সকালবেলা আরও ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞ, শাসক দলের উকিল, ফরেন্সিক ডাক্তার, ডেটা অপারেটর সহ।
১০ই আগষ্ট সমস্ত মেডিকেল কলেজের জুনিয়র ডাক্তার , মেডিকেল পড়ুয়া রা যখন বিশাল মিছিল করে আর জি করে গেলেন তখন এর নেতৃত্বেই আশীষ পান্ডে সহ সন্দীপ ঘোষ বাহিনী তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গেটে আটকানোর চেষ্টা করে। জেনারেল বডি মিটিং এর ঘরের আলো বন্ধ করে গুণ্ডা দিয়ে ঘিরে ফেলে বানচাল করে দেয়! এমনকি অভয়ার মৃতদেহ নিয়ে যখন পুলিশের গাড়ি দ্রুতবেগে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং তার সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, সেই মুহূর্তেও কলকাতার সমস্ত মেডিকেল কলেজ থেকে পৌঁছে যাওয়া জুনিয়র ডাক্তার, সিনিয়র ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল পড়ুয়াদের সেই গাড়ির কাছে পৌঁছতেই দেয়নি এই মাফিয়া বাহিনী। তার পরে প্রেস কনফারেন্স করে বলেছে আমাদের ‘ সম্মানীয় স্যার ‘ সন্দীপ ঘোষ সমস্ত রকম ‘ তদন্ত ‘ দারুণ ভাবে চালাচ্ছেন। (পড়ুন তথ্য প্রমাণ লোপাট করছেন)
কলেজে কলেজে নর্থ বেঙ্গল লবি আর তাদের দ্বারা ভয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করার অভিযোগ ওঠে কখনো সাগরদত্ত কলেজে, কখনো উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে আবার কখনো বর্ধমান মেডিলকেল কলেজে। শিরোনামে উঠে আসে সেই বিরূপাক্ষ ও অভিক দের মতো অনেক শাসকমদতপুষ্ট ডাক্তারি ছাত্র পড়ুয়ার নাম। আন্দোলনের চাপে মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় তৈরি হওয়া গ্রিভান্স সেলের কাছে গোপন চিঠির মাধ্যমে ছাত্রদের অভিযোগও জমা দিতে বলা হয়, কিন্তু প্রায় দেড় বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূর উপরন্তু ছলচাতুরির মাধ্যমে সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত চোখে পড়ছে ।
সাধারণ মানুষের গহীনে ক্ষোভের আঁচের অতল পাওয়া শাসকের সাধ্য না। তাই এই লিস্ট প্রকাশিত হতেই চিকিৎসক সমাজ সরব হতে শুরু করে, এই নিয়ে আইনি লড়াই এর প্রস্তুতি শুরু হয়, সংবাদ মাধ্যমেও খবর আসে, কিন্তু বহু সাধারণ মানুষের ই চোখ এড়ায় কারণ রাজ্যে এখন বেশি টি আর পি ওয়ালা উত্তেজনাময় পরিস্থিতি, নির্বাচনের আগে নিজেদের পছন্দমত ইস্যু বেছে নিয়েছে সমস্ত রাজনৈতিক দল। কিন্তু আমরা স্পষ্ট জানাচ্ছি, যারা ভাবছেন অভয়ার ঘটনার পিছনে মূল কারণগুলো আমরা ভুলে গেছি তারা ভুল ভাবছেন। হুমকি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই লড়াই ছিল প্রত্যেক মানুষ নিজে যে ভয়ের রাজনীতির সম্মুখীন হন তার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ। প্রতিষ্ঠানিক একটি মৃত্যু ও ধর্ষণ এর কারণ সরাসরি যুক্ত কীভাবে সেই ভয়ানক পরিবেশ প্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠতে পারে, কাদের মদতে নর্মলাইজ হয় সেক্স্যুয়াল হ্যারাসমেন্ট এর মত মারাত্মক অপরাধ মেডিকেল কলেজ গুলোর ভিতর – এই প্রশ্নগুলোর সাথে।
আর প্রতিবাদে সোচ্চার মানুষের ঐক্যবদ্ধ কন্ঠ যে শাসকের গলার কাঁটা, তার প্রমাণ আজ এই লিস্ট এর প্রত্যাহার। খুব ছোট হলেও তা সম্মিলিত জনমতের চাপের একটা জয় বটেই।
আমাদের প্রতিনিধিরা সমাজমাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করায় ও আইনি লড়াই এর প্রস্তুতির কথা বলায় এবং আপামর চিকিৎসক সমাজ সোচ্চার হতে শুরু করার সাথে সাথেই বিপদ আশঙ্কা করে নোটিশ টি ‘ টেম্পোরারিলি উইদহেল্ড ‘ করা হয়েছে। আবার সেই একজন দাগীর জন্যে গোটা নোটিশ কীভাবে স্থগিত রাখা যায় সেটার কারণও দর্শাতে হবে রিক্রুটমেন্ট বোর্ডকে।
আপাতত বলার, এই আন্দোলনের ঝাঁজ ১৭ মাস পরেও এতটা গন গনে যে মুখ পোড়ার ভয়ে আরেকটা সন্দীপ ঘোষের রিক্রুটমেন্ট করার নোটিশ দিয়েও ব্যর্থ হল নিজেদের দুষ্কর্ম কে বাস্তবায়িত করতে। অবশ্য সবই সাময়িক, আইনি লড়াই এর রাস্তা তো খোলা আছেই, কিন্তু সকলে একসাথে প্রতিবাদে সোচ্চার না হলে আইন ব্যবস্থাও যে বিচার দিতে কতটা শ্লথ হতে পারে সেটা আজ অন্তত আমাদের সবার কাছে দিনের আলোর মত পরিস্কার!
ফলে বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে আমাদের সম্মিলিত লড়াই এর সূচিমুখ শক্তিশালী প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের দিকে স্থির রাখুন এটুকুই আবেদন সমস্ত গণতান্ত্রিক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে।









