ছাত্র সংগঠন করার সময় বারবার গাওয়া হতো তাঁর গান ‘মুক্ত হবে প্রিয় মাতৃভূমি সেদিন সুদূর নয় আর…’। কমিউনিস্টদের যেমন ‘জাগো জাগো সর্বহারা…’, তেমনই সমাজ পরিবর্তনকামী গণতান্ত্রিক ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ছিল প্রতুলদার এই গান।
যখনই কোন বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগোতে হয়েছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, জোগায় আজও ‘কিসের বাধা সাহসী মন…’
যে মানুষটার গান আসলে আমাদের আন্দোলনেরই গান, তিনি আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছিলেন ২০০৭ পরবর্তী সময়ে। আজ যখন এসএসকেএম হাসপাতালে কবি গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হলেন তখন তাঁর কয়েক দশকের সাথীদের থেকে তিনি অনেক দূরে।
১৯৪২ সালের ২৫ শে জুন অবিভক্ত ভারতের অবিভক্ত বাংলায় বরিশালে জন্ম প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের। বাবা প্রভাত চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সরকারি স্কুলের শিক্ষক, মা বাণী মুখোপাধ্যায়। দেশভাগের সময় সপরিবারে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন।
কম বয়স থেকেই কবিতায় সুর দিতেন প্রতুল। তাঁর কোন প্রথাগত সংগীত শিক্ষা ছিল না, নিজের হৃদয় নিঃসৃত আবেগকে সুর ও কথার মেলবন্ধনে বেঁধে ফেলতে পারতেন তিনি। অসংখ্য গান সৃষ্টি করেছেন তিনি। চীনের মহানায়ক মাও সে তুং-এর কবিতা বাংলা গানে রূপ নিয়েছে তাঁর কলমে।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা প্রেসিডেন্সি কলেজে স্ট্যাটিস্টিকস বিভাগে। চাকরি করেছেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার উচ্চ পদে।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় এলবামের মধ্যে রয়েছে পাথরে পাথরে নাচে আগুন, যেতে হবে, ওঠো হে, ইত্যাদি। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া খালি সুরেলা গলায় গাইতেন প্রতুল।
সারা জীবন যাঁর কেটেছে ন্যায্য গণ আন্দোলনের সঙ্গে, স্বাভাবিকভাবেই ২০০৭-এ অন্য অনেক পরিবর্তনকামী বুদ্ধিজীবীর মত তিনিও যুক্ত হন সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের ভূমি রক্ষা আন্দোলনে। যাঁরা ভূমি রক্ষা আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের সবাই কিন্তু পরিবর্তনের মুখ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেছে নেননি। প্রতুল বেছে নিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বুদ্ধিজীবী বাহিনীর অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দূরত্ব বেড়েছিল পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে।
ব্যক্তিগত কথায় আসি। আমার বাবা অতীন্দ্রমোহন গুণ যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে স্ট্যাটিসটিক্স অধ্যাপনা করতে ঢুকেছেন তখন ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন প্রতুলদাকে। প্রতুলদার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল আমার। আমার সংগঠন শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ যখন ২০০২ এর ১লা মে চেঙ্গাইলে শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র উদ্বোধন করল তখন প্রতুলদা গিয়েছিলেন আমার বাবার সঙ্গে।
সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলনে বারবার একসাথে পথে হেঁটেছি। প্রতুলদার দুটি ফ্ল্যাট, একটি কাঁকুড়গাছিতে যেখানে স্বামী স্ত্রী থাকতেন, অন্যটি কেষ্টপুরে। নিঃসন্তান দম্পতি ঠিক করেছিলেন কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাট মেডিকেল সার্ভিস সেন্টারকে দেবেন আর কেষ্টপুরের ফ্ল্যাট শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগকে। প্রতুলদার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আমাদের পক্ষে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
প্রতুলদার বৃহদন্ত্রে ক্যান্সারের কথা শুনেছিলাম। যখন এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তখন কথা বলেছি শল্যচিকিৎসকের সঙ্গে, ঘটনাচক্রে যে আমার পিডিয়েট্রিক সার্জারি শিক্ষকের পুত্র।
আজ যখন প্রতুলদা মারা গেলেন তখন আমি উত্তরবঙ্গে। অবশ্য কলকাতায় থাকলেই যে শেষ দর্শনে যেতাম এমনটা নয়। যে মানুষের গানে ব্যবস্থা বদলের লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছি তাঁর শেষযাত্রায় শোষক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সম্মান আমাদের কাছে বড়ই বেমানান।
১৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০২৫












যথার্থ লিখেছেন। এমন সংগ্রামী চেতনার মতাদর্শী রাষ্ট্রের কাছে বিকিয়ে গেলে সংগ্রাম এর আসলে ক্ষতি হয়। সেই ক্ষতি সত্যিকারের সংগ্রামে আজীবন থেকে যাওয়া মানুষের কাছে সত্যি আফসোশের, অভিমানের।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর যত গুলো লেখা পড়লাম তার মধ্যে এই লেখাটি সব চেয়ে তথ্যনিষ্ঠ। নির্মোহ ঋজুতা আর বলিষ্ঠতা ডঃ গুণের সব লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়।
Punyabrotobabur লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগল। তিনি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকের কথাই তুলে ধরেছেন।
একটা ঘটনার কথা বলি। 1990s এর কোন একদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে আমি PG 2–র class–এ চীন বিপ্লবের Long March পড়ানোর সময় আমার ছাত্র সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় প্রতুল বাবুর গাওয়া মাওযের লেখা Long March গানের record বাজানোর কথা বলে। পরের দিন সেই গানটি আমরা সবাই নতুন করে শুনি–“থাকনা হাজার অযুত বাধা, দীর্ঘ দূর যাত্রায কিসের এ ভয কিসের এ ভয, সাহসী মন লাল ফৌজের…লাফিয়ে হই পার “।
প্রতুল মুখোপাধ্যায় যখন গান গাইতেন, শুধু সুর আর কন্ঠস্বর দিয়ে নয, ভীষণভাবে শরীর দিয়েও গাইতেন। কবীর সুমনের একটা কথা মনে পড়ছে–‘মানুষটির শরীরটাই তো গান’।
প্রতুল মুখোপাধ্যায় এর গানে নকশালবাডী আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট। একই সঙ্গে নকশালপনথীরাও সেই সব গানের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। “মুক্ত হবে প্রিয় মাতৃভূমি , সেদিন সুদূর নয আর, দেখো লাল সূর্যের আলোয় লাল, পূর্ব সমুদ্রের ওপার”। কারাগারের নকশালপনথী বন্দিরা সেই গান গাইতেন, প্রেরণা পেতেন।
প্রতুল বাবু শেষ জীবনে শিবির পালটেছেন। সেটা আমাদের অনেকের কাছেই বেদনাদাযক। কিন্ত Punyobrata বাবুর মতো আমিও তার ইতিবাচক প্রধান দিকটাই বড় করে দেখবো, মনে রাখবো।
প্রয়াত মানুষটিকে আমার সশ্রদ্ধ নমস্কার আর প্রিয়জনের সমবেদনা জানাই।
Byaktigoto smriticharon ar bostunistho rajnoitik mulyaon e duier ashadharon melbondhon Punya da r lekhay. Gonosongramer erokom ek agropathik andhokar kana golir bnake path haralen ar amrityu sekhan theke firte parlen na e khed sottyi jawar noy.
প্রতুল মুখোপাধ্যায়—একটি নাম বা একজন গায়ক নন , তার গান আমাদের বয়েসী যারা তাদের অনেকেরই জীবনের একটি অধ্যায়ের মতো। তাঁর গানের স্রোত ধরে আমরা কলেজ জীবনে ছাত্র আন্দোলনের সাগরে ডিঙ্গা ভাসিয়েছি, বুঝতে শিখেছি অযুত বাধায় কিসের ভয় লাল ফৌজের, ঠিক লাফিয়ে পার হবে। তাই তার গান হয়ে উঠেছিল আমাদের কলেজজীবনের উদ্দীপনা, বামপন্থার আবেগ, প্রতিবাদের ভাষা, পরিবর্তনের স্বপ্ন, মিছিলের সারিতে আমাদের চেতনা মননে পাশাপাশি হাটা বিমূর্ত কমরেড।
কলেজের দিনগুলিতে যখন রক্তে সীসার গতি, ধমনীতে ভিসুভিয়াস — সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর তখন প্রতুলদার গান ছিল আমাদের অস্ত্রের মতো। গানের ভাষা ছিল সাধারণ মানুষের ভাষা, তাঁর সুরে ছিল এক মাদকীয় বিপ্লবী রোমান্টিসিজম। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র যুবদের দের লড়াইয়ে তাঁর গান এক অদ্ভুত শক্তি জোগাত। লাল পতাকার তলে দাঁড়িয়ে গাওয়া প্রতুলদার গান ছিল এক বিশেষ অনুভূতি।
সময়ের পরিক্রমায় প্রতুল মুখোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছেন। কিন্তু তবুও কি তাঁর গান বদলেছে? গান কি দলবদল করতে পারে? তাঁর কণ্ঠ থেকে উঠে আসা প্রতিটি লাইন, প্রতিটি সুর আসলে যাঁদের জন্য, যাঁদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের কথা বলে, তাঁরা তো বদলায়নি! আজও যখন কোনো মিছিলের কণ্ঠে প্রতুলের গান ধ্বনিত হয়, তখন বোঝা যায়—এই গান শুধু শিল্পীর নয়, এই গান এক ঐতিহ্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, হাত থেকে হাতে, আন্দোলনের আগুনের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলে। এছাড়াও একবার যে গান জনতার হয়ে ওঠে, তা আর কখনও ব্যক্তিগত থাকে কি?
জানিনা প্রতুলদা ভয় , স্বার্থ, মরণোত্তর গান স্যালুট বা কোন স্লোগান দিতে গিয়ে তার নৌকো বদলেছিলেন কিন্তু আমার অনুমান তিনি মনে মনে নিশ্চই উপলব্ধি করতে পারতেন ক্ষেপা মোষকে উস্কে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে একমাত্র লাল নিশানটাই। প্রতুলদার সঙ্গে সহচার্য ও বিরোধিতার বা ভালোবাসা ও দূরত্বের থিসিস – এন্টি থিসিস এর দ্বান্দ্বিকতা আছে থাকবে- কিন্তু তার গান স্বাধীন পাখির মতো পুবের আকাশে লাল সূর্যের বার্তা নিয়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে গণআন্দোলনের ঢেউয়ের মাথায় , বলে যাবে,
” ঝিঙে বেচো পাঁচ সিকেতে, হাজার টাকায় সোনা
বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচোনা।
ঘরদোর বেচো ইচ্ছে হলে, করব নাকো মানা
হাতের কলম জনম দুখী, তাকে বেচোনা।”
পুণ্যব্রতবাবুর লেখাটি, প্রতুল মুখোপাধ্যায় এর জীবন, রাজনীতি ও শিল্পচর্চার একেবারে যথার্থ মূল্যায়ন।