মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম ইচ্ছা মৃত্যুর বর পেয়েছিলেন। ঐ রকম মহাবীর, ঐ রকমের প্রগাঢ় প্রজ্ঞা, ঐ অকল্পনীয় আত্মত্যাগ; তবুও শেষ বয়সে কি গভীর পরিতাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হল মানুষটিকে। দীর্ঘ জীবনের এই অভিশাপ নিয়ে খুব একটা লেখা নেই মহাভারতে। একেবারেই নেই তাই তো হতে পারে না। বলা হয়, “যা নেই ভারতে তাই আছে মহাভারতে, আর যা নেই মহাভারতে তা নেই ভূ ভারতে।” মা সত্যবতীকে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব, রাজ বাড়ী থেকে বনে নিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, “অতিক্রান্ত সুখা কালা, পৃথিবী গতযৌবনা।” মাগো, সুখের দিন শেষ, আমাদের পৃথিবীর বয়স হয়েছে, সংসারে থাকলে নানান অশান্তি তোমার সকল সুখ নষ্ট করে দেবে, এখন চল, আমরা বনে চলে যাই। ভবিষ্যত প্রজন্মের রাজা বা রাজপুত্রের অনাচার বসে বসে দেখার থেকে বয়স কালে বনবাসই ভালো। মহারাণী সত্যবতী তো ঋষি পুত্রের পরামর্শ মেনে বনে গিয়ে শেষ জীবন কাটালেন। কিন্তু মহান কর্তব্যনিষ্ঠ ভীষ্ম শেষ জীবন নাতি স্থানীয় রাজা বা যুবরাজদের কাছে যথেষ্ট অপমান সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সমস্ত শরীরে অসংখ্য তীরের আঘাত নিয়ে কুরুক্ষেত্রের খোলা প্রান্তরে পড়ে থাকলেও আরও কিছু কাজ বাকী থেকে যাওয়ায়, ইচ্ছা মৃত্যুর বর কাজে লাগিয়ে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নিতে পারেননি। নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা বিরাট রাজ পরিবারের প্রায় সব পুরুষ মানুষকে একে একে মরে যেতে দেখলেন। দীর্ঘ জীবনের এই চরম বিড়ম্বনা কি আমাদের কিছু শিক্ষা দেয়?
মৃত্যু নিয়ে মহাভারতেই একটি কঠিন বাস্তবতা দেখা যায়, যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে যখন কিছু প্রশ্ন করছিলেন। যক্ষ জিজ্ঞেস করলেন, “কিমাশ্চর্যম অতঃপর?” আশ্চর্য কি? উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, চোখের সামনে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, প্রতিদিন, প্রতি সময়, তবুও মানুষ ভাবে, আমি তো মরছি না; আমি বেঁচেই থাকব। মৃত্যু এক চরম সত্য জেনেও আমরা মৃত্যুকে সহজ ভাবে নিতে পারি না। জীবনের একমাত্র ধ্রুব সত্য যে মৃত্যু তাকে মেনে নেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি না।
এই দীর্ঘ জীবনের কঠিন বাস্তবতা আমি অনেকদিন থেকেই লক্ষ্য করে চলেছি। নিজের পরিবারে, আত্মীয় বন্ধুদের পরিবারে, বৃদ্ধাশ্রমের বিছানায় বিছানায় এই কঠিন সত্যটি আমি মন দিয়ে লক্ষ্য করি। নব্বই বছর বয়সের মা, মধ্য কলকাতার বৃদ্ধাশ্রমের বিছানায় শুয়ে আছেন, প্রায় নির্জীব হয়ে। আয়া মাসী জানালেন, ওনার উচ্চ শিক্ষিত একমাত্র পুত্র ইউরোপ না আমেরিকায় থাকেন। মাসে মাসে টাকা এসে যায়। বছর চার পাঁচ আগে একবার এসেছিলেন। এভাবে বৃদ্ধাশ্রমের বিছানায় শুয়ে থাকা ঐ মায়ের যদি ইচ্ছা মৃত্যুর বর থাকত, উনি কি করতেন?
আমার অত্যন্ত প্রিয় ‘বাঁকুড়ার দাদা’, আমি কলেজের রি ইউনিয়ন এ গিয়েছি জেনে, আমাকে তাঁর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। শহরের এক পাশে ছোট্ট বাড়ী। ওনাদের গ্রামের বাড়িতে আমি গিয়েছি। সাঁওতাল পল্লীর মাঝে মাটির ছোট্ট বাড়ী। সেই বাড়ীর বারান্দায় রাত্রে লেপ গায়ে শুয়ে “ হাড় কাঁপানো শীত” কাকে বলে টের পেয়েছিলাম, আমার আঠারো বছর বয়সে। সেই দাদার শহরের বাড়ী দেখে যতোটা আনন্দ পাওয়ার ছিল, হল না। ছন্নছাড়া অবস্থা। অবসরের সাত আট বছর পরে, শুধু বৃদ্ধা মাকে সাথে রাখার অপরাধে পরিবারের অন্য সদস্যরা দূরের জেলা শহরের বাসা বাড়ীতে চলে গেছে। দাদার মায়ের বয়সও তখন নব্বই পেরিয়ে গেছে। দাদা বলছিলেন, আমি একা এখন আর মাকে স্নান করাতে পারি না, তাই কদিন বোনের বাসায় রেখে এসেছি। দু বেলা নিজের বাড়ীতে খেতে আসেন, বাকী সময় মায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকেন। এই মায়ের পুত্র ভাগ্য ভালো নিশ্চয়ই। কিন্তু প্রায় সত্তর বছর বয়সী ছেলে নিজে রান্না করে খায়, এই ব্যাপারটি একজন মায়ের কাছে নিশ্চয়ই খুব সুখের ছিল না। উনি আরও কুড়ি বছর আগে মারা যেতে পারলে কি খুশী হতেন?
জেলা শহরের ডাক্তার পাড়ায় আমার এক বয়স্ক বন্ধুর দোতলা বাড়ি। আমার থেকে অন্তত তিরিশ বছর বেশী বয়স ছিল। আমরা মাঝে মাঝেই তর্ক করতাম। আত্ম বিশ্বাসী, খাঁটি মানুষটি আজীবন নিজের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন। যাঁদের সাথে চাটাইতে বসে মাটির খুড়িতে চা খেয়েছেন তাঁরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, পার্টি সম্পাদক হয়ে গেলেও, এক পয়সা সুযোগ সুবিধা তাঁদের কাছে চাননি। এই দোতলা বাড়ি তৈরীর সময় মোট আঠারো হাজার টাকা খরচ করতে গিয়ে, মাঝে মাঝে একবেলা খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। আমার সাথে আলাপ হওয়ার সময় সেই বাড়ীর দাম কয়েক লাখ টাকা। গলায় ক্যান্সার নিয়ে মারা যাওয়ার সময় ঐ বাড়ীর দোতলায় একাই থাকতেন। নীচের তলায় বড় মেয়ের সংসার। হঠাৎই এক সন্ধ্যায় গিয়ে আমি হাজির হয়েছিলাম। উনি যে ক্যানসারের চিকিৎসা করার সময় আমাকে অনেক খুঁজেছেন , জানতাম না। রোগের কষ্ট তো ছিলই, কিন্তু শেষ বয়সে নিজের কন্যার দুর্ব্যবহার মানুষটির বেঁচে থাকার সকল ইচ্ছা শেষ করে দিয়েছিল। একজন মানুষ কি সাংঘাতিক মানসিক যন্ত্রণায় থাকলে, নিজের থেকে তিরিশ বছরের ছোট, অনাত্মীয় একজনকে নিজের মানসিক যন্ত্রণার কথা বলতে পারে? আমাকে বলেছিলেন, “আর একদিনও বেঁচে থাকার ইচ্ছা করে না ডাক্তার মজুমদার। ক্লাশ থ্রীর ছাত্র একটি ছেলেকে নিয়ে আমার মেয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে আমাকে এক গ্লাশ গরম জল চাইলে দেয় না।” গভীর বিষাদের এক অনুভূতি নিয়ে সেদিন ফিরেছিলাম। দিন দশেক পরে, জামাইবাবু ফোন করে জানিয়েছিলেন, আমার বন্ধু পরলোক গমন করেছেন। আঃ, যেন একটা পাথর নেমে গেল আমার বুকের উপর থেকে। বার বার মনে হয়েছিল, ঈশ্বর করুনাময়। আজীবন নাস্তিক মানুষটিকে শারীরিক আর মানসিক দুই কষ্ট থেকেই মুক্তি দিয়েছেন।
বৃদ্ধ বয়সে কঠিন অসুখে ভোগার পর আমার ঐ বন্ধু মারা গেছেন জেনে এতটুকু দুঃখ পাইনি। সত্যি বলতে কি এক রকম প্রশান্তি অনুভব করেছিলাম। কিন্তু একেবারে জিম করা পেটাই চেহারার ছটফটে বন্ধু, পরের সপ্তাহেই যে আমাদের ব্যাচ রিইউনিয়ন এ এসে আনন্দ করার কথা, সে মাত্র কয়েক মিনিট বুকের ব্যথার পরই চলে গেল। নিজে যে নার্সিং হোমে রুগী ভর্ত্তি করে সেখান থেকে এম্বুলেন্স এসে গেলেও, তাতে ওঠার সময় পায়নি। যে কেউ শুনলেই বলবে, ওঃ কি দুঃখজনক। আমি কিন্তু খবরটা শুনে বন্ধুদের বলেছিলাম, আমাদের মধ্যে সবথেকে ভাগ্যবান ও। আমার স্বপ্নের মৃত্যু ওকে নিয়ে গেল।
এবার আমাকে বলুন, এই যে কয়েকটি মৃত্যুর খবর এখানে বললাম, “ইচ্ছা মৃত্যুর বর” থাকলে আপনি কোনটি বেছে নেবেন? চাকরী থেকে অবসর নিয়েছি। ছেলে মেয়ে স্বনির্ভর হয়ে গেছে। বাড়ী, গাড়ী, বিদেশ ভ্রমণ; একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ যা কিছু চায় সবই পাওয়া হয়ে গেছে। চাকরী জীবনে নিজের কাজে ফাঁকি দিতে চাইনি কখনও। যে কাজের জন্য সরকার বেতন দিত তার বাইরে বনের মোষ তাড়ানোর কাজও প্রায় আঠারো বছর ধরে করে চলেছি। দিন দিন সামাজিক আর রাজনৈতিক পরিবেশ আমাদের মত ছাপোষা লোকেদের কাছে কঠিন হয়ে উঠছে। আর কি দেখার আশায় বেঁচে থাকতে হবে? রাজনৈতিক পরিবেশ এর কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই বয়োবৃদ্ধ পন্ডিত মানুষটির মুখ। যিনি বলেছিলেন, “আজ আমি একজন দুঃখী মানুষ হয়ে গেলাম; সি পি এম এর থেকেও খারাপ কিছু হতে পারে, আমরা ভাবিনি!” আমি আবার একটা পুরনো হিন্দি রসিকতা মাঝে মাঝেই বলি; “ইস সে ভী বুরা হো সকতা হ্যায়!”
আর বছর চার পাঁচ পর শরীরের জোর আরও কমবে। সমাজ ,সংস্কৃতি, রাজনীতি সবই, ইস সে ভী বুরা হবে। এখনও যে বনের মোষ তাড়ানোর বাজে অভ্যেস ছাড়তে পারিনি সেটা তখনও আর থাকবে কি? আর এর মধ্যে কোন কঠিন অসুখ ধরে নিলে তো কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মৃত্যুর জন্য ব্যাকুল হতে হবে। পঁচানব্বই বছর বয়সে বাবা চলে যাওয়ার পর থেকেই মাকে দেখতাম, আরাধ্য দেবতা প্রভুর কাছে ব্যাকুল হয়ে শুধু একটি প্রার্থনা, আমাকে নিয়ে চলো প্রভু। তিন বছর সময় লেগেছিল মায়ের সেই প্রার্থনা সফল হতে। আর যাই হোক, আমার সেই বয়োবৃদ্ধ বন্ধুর মত, এক গ্লাশ গরম জলের জন্য অন্যের কাছে কাতর অনুনয় করতে চাই না। আমার বন্ধুর মত, এম্বুলেন্সে ওঠার আগে শেষ হয়ে যেতে চাই। বিছানায় পড়ে থেকে সরকারী পেনশন ধ্বংশ করতে চাই না। ইচ্ছা মৃত্যু পাওয়ার মত কোন মহৎ কাজ তো করতে পারিনি; অন্তত মৃত্যুর জন্য আমার এই ইচ্ছা ভগবান পূরণ করুন, এই প্রার্থনা।
১৯.২.২০২৬.












